পোস্ট মুহাম্মদ না আবু হানিফা
‘মুহাম্মদী নামাজ’ বনাম ‘হানাফি নামাজ’: সুন্নাহর অনুসরণ, ইজতিহাদের অনিবার্যতা, তাকলিদের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি এবং মাযহাবি ফিকহের দার্শনিক তাৎপর্য
একটি গভীর উসুলি, ফিকহি, মানতিকি ও জ্ঞানতাত্ত্বিক পর্যালোচনা
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি
মানবসমাজে কিছু কিছু পরিভাষা এমনভাবে প্রচলিত হয়ে যায়, যেগুলোর বাহ্যিক শব্দার্থের আড়ালে একটি গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক বিভ্রান্তি, ধারণাগত অসংগতি এবং কখনো কখনো মারাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক সংকীর্ণতা আত্মগোপন করে থাকে। ‘মুহাম্মদী নামাজ’ ও ‘হানাফি নামাজ’—এই দ্বৈত পরিভাষার ব্যবহারও তেমনই একটি বিষয়। কোনো কোনো মুসলিম ভাইকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা মুহাম্মদী নামাজ পড়ি, আপনারা হানাফি নামাজ পড়েন।’ আবার কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, ‘আমরা তো মুহাম্মদ ﷺ-কে অনুসরণ করি, আপনারা আবু হানিফাকে অনুসরণ করেন কেন?’ কথাগুলোর বাহ্যিক আবেগ হয়তো নবীপ্রেম ও সুন্নাহর প্রতি আনুগত্যের দাবি বহন করে; কিন্তু এর অন্তর্নিহিত ধারণাগত কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে নববী সুন্নাহর অনুসরণ এবং সুন্নাহ অনুধাবনের স্বীকৃত ইলমি পদ্ধতির মধ্যে একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্ব নির্মাণ করা হয়েছে। যেন রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে অনুসরণ করা এবং কোনো স্বীকৃত মুজতাহিদ ইমামের ফিকহি ব্যাখ্যা অনুসরণ করা পরস্পরবিরোধী দুটি পথ! অথচ বিষয়টির প্রকৃত স্বরূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রথমেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করা প্রয়োজন: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণ বলতে ঠিক কী বোঝায়? তাঁর অনুসরণ কি কেবল তাঁর নাম উচ্চারণ করা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা, অথবা তাঁর কোনো হাদিসের অনুবাদ পাঠ করেই নিজের মতো করে একটি বিধান নির্ধারণ করে নেওয়ার নাম? নাকি তাঁর আনীত শরিয়তের বিধানসমূহকে যথাযথ জ্ঞান, ভাষাগত অনুধাবন, দলিলের সমন্বয়, প্রমাণের স্তরবিন্যাস এবং শরয়ি ব্যাখ্যাপদ্ধতির আলোকে গ্রহণ করার নামই প্রকৃত অনুসরণ?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ না করে ‘আমরা মুহাম্মদী, আপনারা হানাফি’—এ ধরনের বাক্য উচ্চারণ করা মূলত একটি জটিল ইলমি বিষয়কে স্লোগানের সরলতায় নামিয়ে আনার শামিল।
১. অনুসরণের প্রকৃত কেন্দ্র: ব্যক্তি নয়, নববী শরিয়ত
ইসলামের মৌলিক আকিদা ও শরয়ি কাঠামোতে চূড়ান্ত আনুগত্যের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসুল মুহাম্মদ ﷺ। কোনো ইমাম, মুহাদ্দিস, ফকিহ, মুফাসসির কিংবা আলেমের বক্তব্য স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্র শরয়ি কর্তৃত্বের অধিকারী নয়। তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে তাঁদের জ্ঞানগত সম্পর্ক, দলিলের ভিত্তি এবং উম্মাহর ইলমি ঐতিহ্যে তাঁদের স্বীকৃতির ওপর।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ
অর্থ: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল তাদেরও। অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো।’ (সূরা আন-নিসা, ৪:৫৯)
এ আয়াতের মধ্যে আনুগত্যের স্তরবিন্যাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য মৌলিক ও স্বতন্ত্র; আর উলুল আমরের আনুগত্য শরিয়তের অধীন। অর্থাৎ কোনো আলেম বা ইমামের বক্তব্য কুরআন-সুন্নাহর ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু এ কথার অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক সাধারণ ব্যক্তি নিজেই কুরআন-সুন্নাহ থেকে সব বিধান নির্ণয় করতে সক্ষম। বরং আয়াতটির শেষাংশে মতবিরোধের ক্ষেত্রে আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ এমন একটি জ্ঞানগত প্রক্রিয়ার দাবি করে, যার মাধ্যমে দলিল অনুধাবন, ব্যাখ্যা, সমন্বয় ও প্রয়োগ করা সম্ভব।
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণের নির্দেশ আরও সুস্পষ্টভাবে এসেছে:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ
অর্থ: ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন।’ (সূরা আলে ইমরান, ৩:৩১)
এখানে রাসুলের অনুসরণই আল্লাহর ভালোবাসা লাভের পথ। কিন্তু সেই অনুসরণ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ধারণ করতে হলে শরিয়তের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো বুঝতে হবে। কারণ নবী ﷺ-এর আনীত বিধান আমাদের কাছে পৌঁছেছে কুরআন, হাদিস, সাহাবিদের আমল, ইজমা, ফিকহি ব্যাখ্যা এবং প্রজন্মান্তরে সংরক্ষিত ইলমি উত্তরাধিকারের মাধ্যমে। এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারকে বুঝতে যে পদ্ধতিগত দক্ষতা প্রয়োজন, সেটিই উসুলুল ফিকহের অন্যতম আলোচ্য বিষয়।
অতএব, রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে অনুসরণ করা এবং তাঁর সুন্নাহ অনুধাবনে স্বীকৃত ফিকহি পদ্ধতির সাহায্য গ্রহণ করা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং দ্বিতীয়টি অনেক ক্ষেত্রে প্রথমটির বাস্তবায়নকে সহজ, সুশৃঙ্খল ও নির্ভরযোগ্য করে।
২. ‘মুহাম্মদী নামাজ’ কথাটির ধারণাগত অসংগতি
‘মুহাম্মদী নামাজ’ কথাটি যদি এ অর্থে বলা হয় যে, আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো পদ্ধতিতে নামাজ আদায় করি, তাহলে এতে আপত্তির কিছু নেই। প্রত্যেক মুসলমানের নামাজই হওয়া উচিত নববী শিক্ষার অনুসারী। কিন্তু যদি এই পরিভাষার দ্বারা বোঝানো হয় যে, একটি দল সরাসরি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে অনুসরণ করে, আর অন্য দল ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-কে অনুসরণ করার কারণে রাসুল ﷺ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তাহলে এটি একটি ভুল দ্বিবিভাজন।
এখানে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়: কোনো ব্যক্তি যখন বলে, ‘আমি মুহাম্মদী নামাজ পড়ি’, তখন তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কোন বর্ণনা, কোন হাদিস, কোন সাহাবির ব্যাখ্যা, কোন ফিকহি নীতি এবং কোন প্রমাণ-নির্বাচন পদ্ধতির ভিত্তিতে তাঁর নামাজের প্রতিটি খুঁটিনাটি নির্ধারণ করেন?
তিনি কি নিজে সব হাদিস সংগ্রহ করেছেন? সব হাদিসের সনদ যাচাই করেছেন? বর্ণনাকারীদের জীবন, স্মৃতিশক্তি, সাক্ষাৎ, সমকালীনতা ও রেওয়ায়েতের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন? সব সংশ্লিষ্ট বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় করেছেন? কোনো বর্ণনার সাধারণ অর্থ অন্য কোনো দলিল দ্বারা বিশেষায়িত হয়েছে কি না, কোনো নির্দেশ পরবর্তী বিধান দ্বারা রহিত হয়েছে কি না, কোনো আমল রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিয়মিত আমল নাকি বিশেষ পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত—এসব নির্ধারণ করেছেন?
যদি না করে থাকেন, তাহলে তাঁর নিজের অনুসরণও কোনো না কোনো আলেম, মুহাদ্দিস, গবেষক, অনুবাদক অথবা ফিকহি ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল। তিনি হয়তো সেটিকে ‘মুহাম্মদী’ নাম দিয়েছেন; কিন্তু নাম পরিবর্তন করলেই অনুসরণের জ্ঞানগত মধ্যস্থতা বিলুপ্ত হয়ে যায় না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে: সরাসরি নবীকে অনুসরণ করার আকাঙ্ক্ষা এবং সরাসরি নবী থেকে শরয়ি বিধান নির্ণয় করার যোগ্যতা এক জিনিস নয়। প্রত্যেক মুসলমান নবীকে অনুসরণ করতে চান; কিন্তু প্রত্যেক মুসলমান মুজতাহিদ নন। নবীপ্রেমের দাবি এবং ইজতিহাদের যোগ্যতা—দুটি পৃথক বাস্তবতা।
৩. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কে ছিলেন: ব্যক্তিপূজা নয়, ইলমি উত্তরাধিকারের স্বীকৃতি
ইমাম আবু হানিফা নু‘মান ইবন সাবিত (রহ.) ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম প্রসিদ্ধ ফকিহ ও মুজতাহিদ। তিনি দ্বিতীয় হিজরি শতকের একজন মহান ইমাম। তাঁর ফিকহি চিন্তাধারা কেবল ব্যক্তিগত মতামতের সমষ্টি ছিল না; বরং কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবিদের ফতোয়া, ইজমা, কিয়াস, ইস্তিহসান এবং অন্যান্য স্বীকৃত উসুলি উপাদানের আলোকে গড়ে ওঠা একটি সুসংবদ্ধ ইজতিহাদি ধারা।
তাঁর ইলমি অবস্থান বুঝতে হলে একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কোনো নতুন দ্বীন প্রবর্তন করেননি, কোনো নতুন নবী আনেননি, কোনো স্বতন্ত্র শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি মুহাম্মদ ﷺ-এর আনীত শরিয়তের বিধানসমূহ অনুধাবন ও বিন্যস্ত করার জন্য তাঁর জ্ঞান, গবেষণা, ইজতিহাদ এবং ফিকহি মেধা ব্যয় করেছেন।
তাঁর প্রতি হানাফি মাযহাবের অনুসারীদের আনুগত্য মূলত এই বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, তিনি শরিয়তের দলিলসমূহ অনুধাবনে অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের একজন মুজতাহিদ ছিলেন এবং তাঁর ফিকহি পদ্ধতি উম্মাহর বহু প্রজন্মের আলেমদের গবেষণা, সংশোধন, সংকলন ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে একটি সুসংহত মাযহাবে পরিণত হয়েছে।
এখানে ‘মাযহাব’ শব্দটির অর্থও বোঝা জরুরি। আরবি مَذْهَب শব্দটি ذَهَبَ ধাতু থেকে উদ্ভূত; এর মৌলিক অর্থ কোনো পথে গমন করা, মত বা অভিমুখ। ফিকহি পরিভাষায় মাযহাব বলতে কোনো মুজতাহিদ ইমাম বা তাঁর ইলমি ধারার অনুসৃত শরয়ি বিধান নির্ণয়ের পদ্ধতি, নীতিমালা এবং সেসবের ভিত্তিতে প্রণীত ফিকহি মতামতের সুসংহত ধারাকে বোঝানো হয়।
অতএব, হানাফি হওয়া মানে আবু হানিফাকে নবী মনে করা নয়; বরং তাঁর ইজতিহাদি ধারার আলোকে শরিয়তের বিধান অনুধাবন করা।
৪. ইজতিহাদ: শরিয়তের বিধান অনুধাবনের অনিবার্য জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া
এই আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হলো ইজতিহাদ। ইজতিহাদ ছাড়া ফিকহি জ্ঞানের বিকাশ, দলিলের বিশ্লেষণ এবং নতুন পরিস্থিতিতে শরয়ি বিধানের প্রয়োগ বোঝা সম্ভব নয়।
ইজতিহাদ শব্দটি جَهْد বা جُهْد ধাতু থেকে উদ্ভূত; এর অর্থ সাধ্যের সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত প্রচেষ্টা ব্যয় করা। উসুলুল ফিকহের পরিভাষায় কোনো শরয়ি আমলি বিধান নির্ণয়ের জন্য একজন যোগ্য মুজতাহিদের সর্বোচ্চ জ্ঞানগত প্রচেষ্টাকে ইজতিহাদ বলা হয়।
ইজতিহাদ কোনো সাধারণ মতামত প্রদান নয়। এর জন্য বহু শাস্ত্রে গভীর দক্ষতা প্রয়োজন। যেমন—
১. কুরআনের আহকামসংক্রান্ত আয়াতসমূহের জ্ঞান।
২. হাদিসের সনদ, মতন, বর্ণনাকারী, রেওয়ায়েতের স্তর ও হাদিসের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে জ্ঞান।
৩. আরবি ভাষা, নাহু, সরফ, বালাগাত, লুগাত ও আরবি বাক্যগঠনের সূক্ষ্মতা সম্পর্কে দক্ষতা।
৪. উসুলুল ফিকহের নীতিমালা সম্পর্কে গভীর অনুধাবন।
৫. ইজমা, কিয়াস, ইস্তিহসান, মাসলাহা এবং অন্যান্য স্বীকৃত দলিলের ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান।
৬. নাসিখ-মানসুখ, আম-খাস, মুতলাক-মুকাইয়্যাদ, মুজমাল-মুবাইয়্যান, মানতুক-মাফহুম ইত্যাদি উসুলি আলোচনার দক্ষতা।
৭. সাহাবায়ে কেরামের ফতোয়া, আমল এবং তাঁদের মধ্যে সংঘটিত ইজতিহাদি মতভেদের জ্ঞান।
৮. বিভিন্ন দলিলের মধ্যে আপাতবিরোধ দেখা দিলে তার সমাধান ও সমন্বয়ের পদ্ধতি।
এতসব জ্ঞানগত শর্তের উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য একটাই—শরিয়তের কোনো বিধান নির্ধারণের সময় যেন একজন গবেষক বিচ্ছিন্ন একটি দলিলকে সমগ্র শরিয়তের ওপর চাপিয়ে না দেন; বরং সংশ্লিষ্ট সব দলিল, ভাষাগত নির্দেশনা, প্রাসঙ্গিকতা ও উসুলি নীতির আলোকে বিধান নির্ণয় করেন।
এই কারণেই ইজতিহাদকে সাধারণ পাঠ বা অনুবাদনির্ভর উপলব্ধির সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।
৫. হাদিস জানা আর হাদিস থেকে বিধান নির্ণয় করা এক বিষয় নয়
এই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—হাদিসের অস্তিত্ব জানা এবং হাদিস থেকে ফিকহি বিধান নির্ণয় করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
একজন ব্যক্তি সহিহ বুখারির একটি হাদিস পড়লেন। তিনি আরবি জানেন না; অনুবাদ পড়ে বুঝলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ একটি কাজ করেছেন। এখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ওই কাজটি প্রত্যেক মুসলমানের জন্য সর্বাবস্থায় একইভাবে করা আবশ্যক।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাঁর এই সিদ্ধান্তের পক্ষে কি পর্যাপ্ত জ্ঞানগত ভিত্তি রয়েছে?
হাদিসে রাসুল ﷺ কোনো কাজ করেছেন—এটি এক ধরনের তথ্য। কিন্তু সেই কাজটি ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, মুস্তাহাব, মুবাহ, বিশেষ পরিস্থিতির আমল, নাকি অন্য কোনো শরয়ি শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত—এটি নির্ণয় করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজ।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ একটি কাজ করেছেন বলে বর্ণিত হলো। কিন্তু একই বিষয়ে অন্য হাদিসে ভিন্ন পদ্ধতিও বর্ণিত হতে পারে। তখন প্রশ্ন আসে: উভয়টি কি বৈধ বিকল্প? একটি কি অন্যটির ব্যাখ্যা? একটি কি বিশেষ পরিস্থিতির জন্য? কোনোটি কি পরবর্তী আমল? কোনোটি কি সাহাবির বর্ণনার ভিন্নতা? নাকি বর্ণনাকারীদের স্মৃতিগত পার্থক্যের কারণে রেওয়ায়েতে ভিন্নতা এসেছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ণয় করতে হাদিসশাস্ত্র ও উসুলুল ফিকহের গভীর জ্ঞান প্রয়োজন।
একটি বহুল আলোচিত হাদিস:
صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي
অর্থ: ‘তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ আদায় করতে দেখেছ, সেভাবে নামাজ আদায় করো।’ (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬৩১)
এই হাদিসে নববী নামাজের অনুসরণের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু নবী ﷺ-এর নামাজের পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য কেবল এই একটি হাদিস পাঠ যথেষ্ট নয়। বরং নামাজসংক্রান্ত অসংখ্য বর্ণনা, সাহাবিদের আমল, বিভিন্ন রেওয়ায়েতের সমন্বয় এবং ফিকহি বিশ্লেষণের প্রয়োজন।
সুতরাং কেউ যদি বলেন, ‘আমি শুধু হাদিস অনুসরণ করি’, তাহলে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা অন্যায় নয় যে, তিনি হাদিসের কোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন, কোন মুহাদ্দিসের তাহকিকের ওপর নির্ভর করেছেন, কোন ফকিহের উসুলি বিশ্লেষণ গ্রহণ করেছেন এবং ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনার মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করেছেন?
এ প্রশ্ন নবীপ্রেমের বিরোধিতা নয়; বরং শরয়ি জ্ঞান অনুধাবনের পদ্ধতি সম্পর্কে একটি বৈধ জিজ্ঞাসা।
৬. তাকলিদ: অন্ধ অনুকরণ নয়, বিশেষজ্ঞের জ্ঞানগত কর্তৃত্ব স্বীকার
তাকলিদ শব্দটি قَلَّدَ ধাতু থেকে উদ্ভূত। উসুলুল ফিকহের পরিভাষায় কোনো শরয়ি বিধান সম্পর্কে নিজে স্বাধীনভাবে দলিল নির্ণয় করতে অক্ষম ব্যক্তি কোনো যোগ্য মুজতাহিদ বা ফকিহের মতামত গ্রহণ করাকে সাধারণভাবে তাকলিদ বলা হয়।
তবে তাকলিদ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কোনো ব্যক্তি কোনো ইমামের বক্তব্যকে কুরআন-সুন্নাহর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে অন্ধভাবে গ্রহণ করল—এটি এক জিনিস; আর একজন অমুজতাহিদ ব্যক্তি শরয়ি বিধান অনুধাবনের জন্য যোগ্য ফকিহের ওপর নির্ভর করল—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
অর্থ: ‘তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।’ (সূরা আন-নাহল, ১৬:৪৩; সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৭)
এ আয়াতের মূল প্রেক্ষাপট ও সরাসরি বিষয় নবীদের সম্পর্কে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করার নির্দেশ হলেও এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্দেশনাও প্রতিফলিত হয়—যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে জ্ঞানীদের শরণাপন্ন হওয়া।
এখানে একটি সাধারণ যুক্তি প্রযোজ্য: প্রত্যেক মানুষ সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে পারে না। চিকিৎসার ক্ষেত্রে মানুষ চিকিৎসকের কাছে যায়, স্থাপত্যের ক্ষেত্রে প্রকৌশলীর কাছে যায়, আইনের ক্ষেত্রে আইনজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করে। তাহলে শরিয়তের জটিল বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একজন অমুজতাহিদ ব্যক্তি কেন যোগ্য ফকিহের শরণাপন্ন হবেন না?
তবে এ উদাহরণটি কেবল তুলনামূলক বোঝানোর জন্য। চিকিৎসা ও ফিকহের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো এক নয়; কিন্তু বিশেষজ্ঞের জ্ঞান গ্রহণের মৌলিক যুক্তিটি উভয় ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক।
এখানে আরও একটি প্রশ্ন আসে: একজন সাধারণ মুসলমান যদি বলেন, ‘আমি কোনো ইমামের তাকলিদ করব না; নিজেই হাদিস দেখে আমল করব’, তাহলে তিনি বাস্তবে কী করছেন? তিনি কি নিজেই হাদিসের সহিহ-দুর্বল নির্ধারণ করছেন? নিজেই আরবি ভাষার সূক্ষ্মতা বিশ্লেষণ করছেন? নিজেই সব দলিলের মধ্যে সমন্বয় করছেন? যদি না করেন, তাহলে তিনি কোনো না কোনো আলেমের গবেষণার ওপর নির্ভর করছেন। অর্থাৎ তিনি তাকলিদের নাম অস্বীকার করলেও জ্ঞানগত নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত নন।
এখানে প্রকৃত আলোচনা হওয়া উচিত—কোন ধরনের তাকলিদ গ্রহণযোগ্য, কোন ক্ষেত্রে তা প্রয়োজনীয়, কখন দলিলভিত্তিক পর্যালোচনা করা উচিত এবং কোন অবস্থায় অন্ধ গোঁড়ামি পরিহার করা আবশ্যক।
৭. চার মাযহাব: চারটি পৃথক দ্বীন নয়, একই শরিয়তের ইজতিহাদি ব্যাখ্যাধারা
সুন্নি ইসলামের ইতিহাসে চারটি প্রসিদ্ধ ফিকহি মাযহাব হলো—
- হানাফি মাযহাব: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ইলমি ধারা।
- মালিকি মাযহাব: ইমাম মালিক ইবন আনাস (রহ.)-এর ইলমি ধারা।
- শাফেয়ি মাযহাব: ইমাম মুহাম্মদ ইবন ইদরিস আশ-শাফেয়ি (রহ.)-এর ইলমি ধারা।
- হাম্বলি মাযহাব: ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.)-এর ইলমি ধারা।
এ চার ইমামের প্রত্যেকেই কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য হয়েছে দলিল অনুধাবন, বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা, ভাষাগত নির্দেশনা, সাহাবিদের আমল, কিয়াসের প্রয়োগ, দলিলের সমন্বয় এবং উসুলি নীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
তাঁদের মতভেদকে চারটি পৃথক ধর্মের মতভেদ মনে করা সম্পূর্ণ অজ্ঞতাপ্রসূত। বরং এগুলো একই শরিয়তের অধীনে সংঘটিত ইজতিহাদি মতভেদ।
একটি মৌলিক হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইজতিহাদের পুরস্কার সম্পর্কে বলেছেন:
إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ
অর্থ: ‘কোনো বিচারক যখন বিচার করার সময় ইজতিহাদ করেন এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান, তাঁর জন্য দুটি পুরস্কার। আর ইজতিহাদ করে ভুল করলে তাঁর জন্য একটি পুরস্কার।’ (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৭৩৫২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭১৬)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, যোগ্য ব্যক্তির ইজতিহাদে ভুল হওয়া সম্ভব; কিন্তু শরিয়তের বিধান নির্ণয়ে তাঁর আন্তরিক ও যোগ্যতাপূর্ণ প্রচেষ্টাও মূল্যবান।
অতএব, কোনো ইমামের ইজতিহাদি মতভেদ থাকা তাঁর ইলমি মর্যাদা নাকচ করে না। একইভাবে কোনো মাযহাবের অনুসারী হওয়া মানে অন্য মাযহাবের ইমামদের অবজ্ঞা করাও নয়।
৮. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহি পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহি ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো দলিলসমূহের মধ্যে সমন্বয়, সাহাবিদের ফতোয়ার প্রতি গুরুত্ব, কিয়াসের সুসংবদ্ধ ব্যবহার এবং ইস্তিহসানের প্রয়োগ।
তবে তাঁকে কেবল ‘যুক্তিবাদী’ বা ‘কিয়াসনির্ভর’ বলে চিহ্নিত করা একটি একপেশে ধারণা। তিনি কুরআন ও সুন্নাহকে শরিয়তের মৌলিক উৎস হিসেবে গ্রহণ করতেন। কিয়াস বা ইস্তিহসান কোনোভাবেই তাঁর কাছে ওহির বিকল্প ছিল না; বরং শরয়ি দলিলের আলোকে বিধান অনুধাবনের পদ্ধতিগত উপায় ছিল।
ইস্তিহসান শব্দটির অর্থ কোনো ব্যক্তিগত পছন্দকে শরিয়তের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়। উসুলুল ফিকহে এটি নির্দিষ্ট প্রমাণ ও শক্তিশালী শরয়ি বিবেচনার ভিত্তিতে সাধারণ কিয়াসের আপাত ফল থেকে অন্য অধিক উপযুক্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার একটি পদ্ধতি। এর প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে হলে হানাফি উসুলের গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করতে হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণীয়: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নামে প্রচলিত প্রতিটি বক্তব্যের ঐতিহাসিক প্রমাণ এক রকম নয়। তাঁর ফিকহি মতামতের অনেক কিছু তাঁর ছাত্রদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে; পরবর্তী হানাফি ফকিহরা সেগুলো বিন্যস্ত, বিশ্লেষণ ও পরিমার্জন করেছেন। অতএব, হানাফি মাযহাবকে কেবল একজন ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন বক্তব্যের সমষ্টি হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক ও ইলমি বিকাশ অনুধাবন করা সম্ভব হবে না।
৯. নামাজের শাখাগত পার্থক্য: সুন্নাহর বিরোধিতা, নাকি ইজতিহাদের ফল?
নামাজের কিছু আমলি বিষয়ে হানাফি ও অন্যান্য মাযহাবের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। যেমন—
- রাফউল ইয়াদাইন কোন কোন স্থানে করা হবে।
- নামাজে হাত কোথায় বাঁধা হবে।
- আমিন নীরবে বলা হবে নাকি উচ্চস্বরে।
- ইমামের পেছনে মুক্তাদির কিরাআতের বিধান কী।
- রুকু থেকে ওঠার পর হাত বাঁধা হবে নাকি ছেড়ে রাখা হবে।
- বিতরের নামাজের পদ্ধতি কী হবে।
এসব বিষয়ের প্রত্যেকটির পেছনে রয়েছে দলিল, রেওয়ায়েত, সাহাবিদের আমল এবং ফিকহি বিশ্লেষণ।
এখানে একটি বড় ভুল হলো—একটি আমলকে নিজের পছন্দের দলিলের সঙ্গে মিলে যাওয়ার কারণে ‘এটাই একমাত্র মুহাম্মদী পদ্ধতি’ ঘোষণা করা এবং অন্য স্বীকৃত ইজতিহাদি পদ্ধতিকে নববী সুন্নাহর বিরোধী বলে চিহ্নিত করা।
উদাহরণস্বরূপ, রাফউল ইয়াদাইন সম্পর্কে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে ইবন উমর (রা.)-এর বর্ণনা রয়েছে। অন্যদিকে হানাফি ফিকহে রাফউল ইয়াদাইন সম্পর্কে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছে, যার পক্ষে হানাফি মুহাদ্দিস ও ফকিহরা বিভিন্ন বর্ণনা ও সাহাবিদের আমলকে দলিল হিসেবে আলোচনা করেছেন।
এখানে বিতর্কের প্রকৃত বিষয় হলো: সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলোর মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, কোন বর্ণনার ওপর কোন পরিস্থিতিতে আমল করা হবে, সাহাবিদের বিভিন্ন আমলের তাৎপর্য কী এবং সংশ্লিষ্ট উসুলি নীতির আলোকে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হবে।
কোনো পক্ষের দলিলের বিশ্লেষণ না করে কেবল ‘এটাই নবীর নামাজ, ওটা ইমামের নামাজ’ বলে দেওয়া বৈজ্ঞানিক আলোচনা নয়।
এমনকি একটি বিষয়ে কোনো মাযহাবের মত অন্য মাযহাবের মতের তুলনায় অধিক শক্তিশালী বলে কোনো গবেষকের কাছে প্রতীয়মান হলেও সেটি অন্য মাযহাবের অনুসারীদের নবী-অনুসরণ থেকে বিচ্ছিন্ন প্রমাণ করে না। কারণ ইজতিহাদি মতভেদে দলিলের মূল্যায়ন ও গ্রহণযোগ্যতার স্তর নিয়ে আলেমদের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।
১০. সাহাবায়ে কেরামের যুগেও ইজতিহাদি মতভেদ ছিল
যারা মনে করেন, মাযহাবি মতভেদ মানেই নবী-অনুসরণের বিচ্যুতি, তাঁদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা অনুধাবন করা প্রয়োজন। সাহাবায়ে কেরামের যুগেও কিছু আমলি বিষয়ে মতভেদ ঘটেছে।
বনি কুরাইযার দিকে অভিযানের সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের বলেছিলেন:
لَا يُصَلِّيَنَّ أَحَدٌ الْعَصْرَ إِلَّا فِي بَنِي قُرَيْظَةَ
অর্থ: ‘তোমাদের কেউ যেন বনি কুরাইযায় পৌঁছার আগে আসরের নামাজ আদায় না করে।’
পথিমধ্যে আসরের সময় হয়ে গেলে সাহাবিদের একদল নির্দেশটির বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করে বনি কুরাইযায় পৌঁছে নামাজ আদায় করেন। অন্যদল নির্দেশটির উদ্দেশ্য হিসেবে দ্রুত অগ্রসর হওয়াকে বিবেচনা করে পথে আসরের নামাজ আদায় করেন। পরে বিষয়টি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে উত্থাপিত হলে তিনি কোনো দলকে তিরস্কার করেননি। (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৯৪৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭৭০)
এই ঘটনা উসুলুল ফিকহের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে একই নববী নির্দেশকে সাহাবিরা দুইভাবে অনুধাবন করেছেন। একদল শব্দের বাহ্যিক অর্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন; অন্যদল নির্দেশের উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতিগত তাৎপর্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
অর্থাৎ নবী ﷺ-এর নির্দেশ গ্রহণে আন্তরিক থাকা সত্ত্বেও ভাষাগত অনুধাবন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে পার্থক্য সৃষ্টি হতে পারে। এই পার্থক্যকে অবিলম্বে নবী-অনুসরণের বিরোধিতা বলা যায় না।
এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে, ইজতিহাদি মতভেদ কোনো পরবর্তী যুগের উদ্ভাবিত সমস্যা নয়; বরং শরয়ি দলিল অনুধাবনের স্বাভাবিক জ্ঞানগত বাস্তবতা।
১১. ‘আমরা আবু হানিফাকে অনুসরণ করি না, মুহাম্মদ ﷺ-কে অনুসরণ করি’—এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত যুক্তিগত সমস্যা
এবার বক্তব্যটির যুক্তিগত কাঠামো বিশ্লেষণ করা যাক।
কেউ বললেন, ‘আমরা মুহাম্মদ ﷺ-কে অনুসরণ করি, আবু হানিফাকে নয়।’
প্রথম দৃষ্টিতে কথাটি সঠিক। কারণ প্রত্যেক মুসলমানের চূড়ান্ত অনুসরণ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এরই হওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ বক্তব্য থেকে কীভাবে প্রমাণিত হলো যে, ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহি পদ্ধতি অনুসরণকারী ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে অনুসরণ করছেন না?
এখানে একটি যুক্তিগত ভ্রান্তি রয়েছে, যাকে false dichotomy বা মিথ্যা দ্বিবিকল্প বলা হয়। অর্থাৎ এমনভাবে দুটি বিকল্প দাঁড় করানো হয়েছে, যেন একটিকে গ্রহণ করলে অপরটিকে অবশ্যই বর্জন করতে হবে। অথচ বাস্তবে উভয়ের মধ্যে অপরিহার্য বিরোধ নেই।
একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। একজন রোগী বলেন, ‘আমি রোগকে অনুসরণ করি না, চিকিৎসককে অনুসরণ করি।’ কথাটি যেমন অর্থহীন, তেমনি কেউ যদি বলেন, ‘আমি চিকিৎসাবিজ্ঞানের নীতিমালা অনুসরণ করি, চিকিৎসককে নয়’, তাতেও চিকিৎসকের বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজন অস্বীকার করা হয় না। চিকিৎসক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকল্প নন; বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োগে দক্ষ একজন বিশেষজ্ঞ।
একইভাবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিকল্প নন; তিনি নববী শরিয়ত অনুধাবনে একজন মহান মুজতাহিদ। তাঁর অনুসারী হওয়ার অর্থ তাঁর মাধ্যমে নববী শরিয়তের ফিকহি ব্যাখ্যা গ্রহণ করা।
অবশ্য এ উপমার সীমা রয়েছে। শরিয়ত আল্লাহর ওহিভিত্তিক বিধান; আর চিকিৎসাবিজ্ঞান মানবীয় পরীক্ষণ ও গবেষণার ক্ষেত্র। তবুও বিশেষজ্ঞের জ্ঞান গ্রহণের মৌলিক যুক্তিটি বোঝাতে উপমাটি সহায়ক।
আরও একটি যুক্তিগত প্রশ্ন: যে ব্যক্তি বলেন, ‘আমি শুধু মুহাম্মদ ﷺ-এর অনুসারী’, তিনি কি নবী ﷺ-এর প্রতিটি হাদিস নিজে যাচাই করেছেন? তিনি কি বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাঈ, ইবন মাজাহ, মুসনাদে আহমদসহ সব হাদিসগ্রন্থের সংশ্লিষ্ট বর্ণনা নিজে তুলনা করেছেন? তিনি কি প্রত্যেক রাবির অবস্থা, ইলাল, শুযুয, নাসিখ-মানসুখ এবং ফিকহুল হাদিসের জটিল বিষয়গুলো নিজে নির্ণয় করেছেন?
যদি না করে থাকেন, তবে তিনি যেসব হাদিসের ওপর আমল করছেন, সেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোনো না কোনো আলেমের জ্ঞান গ্রহণ করছেন। সুতরাং তাঁর অবস্থানও বিশেষজ্ঞনির্ভর। পার্থক্য কেবল এই যে, তিনি হয়তো এককভাবে কোনো মাযহাবের অনুসারী নন; বরং বিভিন্ন আলেমের মতামত থেকে নির্বাচন করছেন। কিন্তু নির্বাচন করার যোগ্যতা ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
১২. সাধারণ মুসলমান কি নিজেই সব হাদিস থেকে বিধান নির্ণয় করবেন?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে। মুসলিম উম্মাহর সবাই মুজতাহিদ হতে পারেন না। একজন ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক, চিকিৎসক কিংবা শিক্ষার্থী—প্রত্যেকের পক্ষে শরিয়তের সব শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠা বাস্তবসম্মত নয়।
ইসলাম কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
অর্থ: ‘তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো।’ (সূরা আত-তাগাবুন, ৬৪:১৬)
আবার বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
অর্থ: ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব অর্পণ করেন না।’ (সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৬)
একজন সাধারণ মুসলমানের দায়িত্ব হলো নিজের প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা, যোগ্য আলেমের কাছে জিজ্ঞাসা করা এবং যে বিষয়ে তার ইলম নেই সে বিষয়ে নিজেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা মনে না করা।
অতএব, একজন সাধারণ মুসলমান যদি হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন, তাহলে তিনি এমন একটি সুসংহত ফিকহি ধারার ওপর নির্ভর করছেন, যার বিধানগুলো বহু প্রজন্মের আলেমের গবেষণা ও যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে সংরক্ষিত হয়েছে।
এটি জ্ঞানগতভাবে একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থান। তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক হানাফি ব্যক্তি নিজে সব দলিল বুঝে ফেলেছেন, অথবা মাযহাবের প্রতিটি মাসআলায় তাঁর ব্যক্তিগত গবেষণা রয়েছে। তাঁর অনুসরণ মূলত যোগ্য আলেমদের মাধ্যমে শরিয়ত অনুধাবনের একটি পদ্ধতি।
১৩. মাযহাব অনুসরণ কি কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণের প্রতিবন্ধক?
কেউ কেউ মনে করেন, মাযহাব অনুসরণ করলে কুরআন-সুন্নাহর সরাসরি অনুসরণ বাধাগ্রস্ত হয়। এই ধারণাটি মূলত মাযহাবের প্রকৃতি সম্পর্কে অসম্পূর্ণ বোঝাপড়া থেকে জন্ম নেয়।
মাযহাবের কাজ হলো কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিধান নির্ণয়ের পদ্ধতি, দলিলের শ্রেণিবিন্যাস এবং ফিকহি সিদ্ধান্তের একটি সুসংহত কাঠামো সংরক্ষণ করা। মাযহাব নিজে ওহি নয়; কিন্তু ওহি অনুধাবনের একটি ঐতিহাসিক ও ইলমি ধারা।
এখানে দুটি বিষয় পৃথক করতে হবে:
প্রথমত, শরিয়তের মূল উৎস—কুরআন ও সুন্নাহ।
দ্বিতীয়ত, এসব উৎস থেকে বিধান নির্ণয়ের মানবীয় ইজতিহাদি প্রক্রিয়া।
প্রথমটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহি এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রামাণ্য সুন্নাহ। দ্বিতীয়টি যোগ্য আলেমদের গবেষণা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্র, যেখানে সঠিক ও ভুল উভয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পার্থক্য স্বীকার করলেই মাযহাবি অনুসরণের প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট হয়। মাযহাবের প্রতি সম্মান থাকবে, কিন্তু মাযহাবকে ওহির সমপর্যায়ে উন্নীত করা যাবে না। ইমামের বক্তব্য গ্রহণ করা হবে তাঁর ইজতিহাদি মর্যাদা ও দলিলভিত্তিক পদ্ধতির কারণে; তাঁর বক্তব্যকে নববী সুন্নাহর বিকল্প হিসেবে নয়।
১৪. মাযহাবি গোঁড়ামি ও মাযহাববিমুখতার দ্বিমুখী বিপদ
এ আলোচনায় ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ একদিকে যেমন মাযহাবের নাম ব্যবহার করে অন্য মাযহাবের আলেমদের অবজ্ঞা করা, দলিলের আলোচনাকে নিষিদ্ধ করা কিংবা ইমামের প্রতিটি মতকে ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে মনে করা অনুচিত; অন্যদিকে মাযহাবের প্রয়োজন অস্বীকার করে প্রত্যেক সাধারণ ব্যক্তিকে নিজস্ব হাদিস-গবেষক ও মুজতাহিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাও বিপজ্জনক।
প্রথম প্রবণতাকে বলা যায় মাযহাবি গোঁড়ামি। এর মধ্যে রয়েছে—
- নিজের মাযহাবের বাইরে অন্য স্বীকৃত মাযহাবের অনুসারীদের হেয় করা।
- কোনো ইমামের মতকে দলিলের আলোচনার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।
- অন্য মাযহাবের আমলকে অবৈধ বা বিদআত বলে ঘোষণা করার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা।
- ইজতিহাদি মতভেদকে আকিদাগত বিভেদের রূপ দেওয়া।
দ্বিতীয় প্রবণতার মধ্যে রয়েছে—
- আরবি ভাষা ও উসুলের প্রয়োজন অস্বীকার করা।
- বিচ্ছিন্ন হাদিস পড়ে নিজস্ব সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত মনে করা।
- মুহাদ্দিস ও ফকিহদের শতাব্দীব্যাপী গবেষণাকে অপ্রয়োজনীয় ভাবা।
- নিজের অল্প জ্ঞানকে ইমামদের গবেষণার সমকক্ষ মনে করা।
- একাধিক মাযহাব থেকে সুবিধামতো মত বেছে নেওয়া, অথচ কোনো সুসংহত উসুলি নীতি অনুসরণ না করা।
এ দুই প্রবণতার কোনোটিই কাম্য নয়। প্রকৃত ইলমি অবস্থান হলো—কুরআন-সুন্নাহকে সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা, স্বীকৃত মুজতাহিদদের ইলমি অবদানকে সম্মান করা, নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং মতভেদের ক্ষেত্রে আদব বজায় রাখা।
১৫. চার মাযহাবের বাইরে কি নবী-অনুসরণের কোনো স্বতন্ত্র পথ আছে?
এখানে একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন আলোচনার দাবি রাখে। কেউ যদি চার মাযহাবের কোনো একটির অনুসারী না হন, তাহলে কি তিনি অবশ্যই নবী-অনুসরণ থেকে বিচ্যুত?
না। এমন সার্বিক সিদ্ধান্ত দেওয়া সঠিক নয়। একজন যোগ্য মুজতাহিদ নিজস্ব ইজতিহাদ করতে পারেন। একজন আলেম বিভিন্ন মাযহাবের দলিল পর্যালোচনা করে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে একটি মত গ্রহণ করতে পারেন। কোনো সাধারণ মুসলমানও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে যোগ্য আলেমের কাছ থেকে ভিন্ন মাযহাবের মত গ্রহণ করতে পারেন—এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
কিন্তু সমস্যা তখনই দেখা দেয়, যখন কেউ নিজের অযোগ্যতা সত্ত্বেও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ দলিল-নির্ণায়ক মনে করেন এবং শতাব্দীব্যাপী ইলমি ঐতিহ্যকে তুচ্ছ করেন।
অতএব, চার মাযহাবের অনুসরণকে একমাত্র সম্ভাব্য নবী-অনুসরণের পথ বলে ঘোষণা করা যেমন অতিরঞ্জন, তেমনি চার মাযহাবের সুসংহত ইলমি ঐতিহ্যকে অস্বীকার করাও জ্ঞানগতভাবে অযৌক্তিক।
১৬. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কি ভুলের ঊর্ধ্বে?
এ প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট: না। কোনো ইমামই নবী নন; কোনো ইমামই নিষ্পাপ নন। আহলুস সুন্নাহর দৃষ্টিতে নবীদের বিশেষ ওহিভিত্তিক সংরক্ষণ এবং সাধারণ আলেমদের ইজতিহাদি অবস্থান এক নয়।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) মহান মুজতাহিদ; কিন্তু তাঁর কোনো কোনো ইজতিহাদে ভুল হওয়া সম্ভব। একই কথা ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ (রহ.)-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এখানে ইমামদের প্রতি প্রকৃত সম্মান হলো তাঁদেরকে তাঁদের যথাযথ মর্যাদায় রাখা। তাঁদের ইলমি অবদান স্বীকার করা, তাঁদের গবেষণা থেকে উপকৃত হওয়া, তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে দলিলভিত্তিক গবেষণার আলোকে কোনো মতের পর্যালোচনা করা।
ইমামদের মর্যাদা রক্ষার নামে তাঁদেরকে নিষ্পাপ ঘোষণা করা যেমন ভুল, তেমনি তাঁদের ইজতিহাদি অবস্থান না বুঝে অবজ্ঞা করাও অন্যায়।
১৭. হানাফি মাযহাব অনুসরণ করে কি নবী ﷺ-এর অনুসরণ পূর্ণাঙ্গভাবে করা যায়?
এই প্রশ্নের উত্তরে শব্দচয়নে সতর্কতা প্রয়োজন। বলা উচিত—হানাফি মাযহাব অনুসরণ করে একজন সাধারণ মুসলমান নবী ﷺ-এর শরিয়ত অনুসরণের একটি সুসংহত, স্বীকৃত ও ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ফিকহি পথ অবলম্বন করতে পারেন।
কিন্তু ‘হানাফি মাযহাব অনুসরণ করলেই প্রত্যেক ব্যক্তি নবী ﷺ-কে অন্য সবার চেয়ে বেশি বা নিখুঁতভাবে অনুসরণ করছেন’—এ ধরনের দাবি করা ঠিক নয়। কারণ অনুসরণের পূর্ণতা নির্ভর করে ঈমান, ইখলাস, জ্ঞান, আমল, সুন্নাহর প্রতি আনুগত্য এবং আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নের ওপর। কেবল মাযহাবি পরিচয় কোনো ব্যক্তির তাকওয়া বা নবীপ্রেমের নিশ্চয়তা দেয় না।
একজন হানাফি যদি অহংকার, বিদ্বেষ ও অন্যকে হেয় করার মানসিকতা পোষণ করেন, তাহলে তাঁর মাযহাবি পরিচয় তাঁকে এসব দোষ থেকে মুক্ত করবে না। একইভাবে অন্য কোনো মাযহাবের অনুসারী যদি ইখলাস, তাকওয়া ও সুন্নাহর প্রতি গভীর আনুগত্য নিয়ে আমল করেন, তাঁর আমলকে কেবল মাযহাবি পরিচয়ের কারণে অবজ্ঞা করা যাবে না।
সুতরাং মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নবী ﷺ-এর প্রকৃত অনুসারী হওয়া; আর মাযহাব হবে সেই অনুসরণের একটি জ্ঞানসম্মত ও সুশৃঙ্খল পদ্ধতি।
১৮. মাযহাবি মতভেদের ক্ষেত্রে আদব: ইলমের সৌন্দর্য কোথায়?
ইসলাম কেবল বিধানসমষ্টির নাম নয়; এটি আদব, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধিরও ধর্ম। ফিকহি মতভেদে যদি শিষ্টাচার হারিয়ে যায়, তাহলে জ্ঞানের আলো অহংকারের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন এবং পরবর্তী যুগের ইমামদের মধ্যে মতভেদ ছিল; কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও শরিয়তের সঠিক অনুধাবন। তাঁরা পরস্পরের জ্ঞানকে স্বীকার করতেন এবং দলিলের আলোচনায় অংশ নিতেন।
তাই একজন হানাফি মুসলমানের উচিত নয় অন্য মাযহাবের অনুসারীকে বিদআতি, গোমরাহ বা নবী-অনুসরণবিমুখ বলে চিহ্নিত করা। একইভাবে অন্য মাযহাবের অনুসারীরও উচিত নয় হানাফিদের ‘আবু হানিফার পূজারি’ বলে অপমান করা।
এ ধরনের ভাষা জ্ঞানচর্চার ভাষা নয়; এটি দলীয় আবেগের ভাষা। এতে দলিলের আলোচনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সাধারণ মুসলমানের মনে বিভ্রান্তি জন্মায় এবং উম্মাহর ঐক্য দুর্বল হয়।
১৯. প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত: কোন বক্তব্যের পক্ষে কী দলিল এবং তার ব্যাখ্যা কী?
কোনো ফিকহি বিষয়ে মতভেদ হলে আলোচনা হওয়া উচিত এভাবে—
- সংশ্লিষ্ট কুরআনি নির্দেশ কী?
- এ বিষয়ে কোন কোন হাদিস বর্ণিত হয়েছে?
- বর্ণনাগুলোর সনদ ও গ্রহণযোগ্যতার অবস্থা কী?
- সাহাবিদের আমল কী ছিল?
- হাদিসগুলোর মধ্যে সমন্বয় কীভাবে করা হয়েছে?
- সংশ্লিষ্ট উসুলি নীতিগুলো কী?
- কোন মুজতাহিদ কোন প্রমাণের ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন?
- ভিন্ন মত গ্রহণের পেছনে কী যুক্তি রয়েছে?
এভাবে আলোচনা করলে মতভেদ জ্ঞানচর্চার অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু যদি আলোচনা শুরুই হয় ‘আমরা মুহাম্মদী, তোমরা হানাফি’—তাহলে সেখানে গবেষণার দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিচয়ভিত্তিক বিরোধের দরজা খুলে যায়।
২০. ইলমি বিনয়: নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করাও দ্বীনি জ্ঞানের অংশ
একজন প্রকৃত তালিবুল ইলম জানেন যে, তাঁর জ্ঞানের পরিধি সীমিত। তিনি জানেন, কুরআনের একটি আয়াতের অনুবাদ পড়া আর তার সব তাফসিরি ও ফিকহি তাৎপর্য অনুধাবন করা এক বিষয় নয়। একটি হাদিস মুখস্থ করা আর তার সনদ, মতন, প্রেক্ষাপট ও ফিকহি নির্দেশনা নির্ণয় করা এক বিষয় নয়। আরবি বাক্য পড়া আর তার নাহু, সরফ, বালাগাত ও উসুলি তাৎপর্য অনুধাবন করাও এক বিষয় নয়।
এই উপলব্ধিই মানুষকে বিনয়ী করে। আর বিনয়ী মানুষই জ্ঞান অর্জনের পথে অগ্রসর হতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَفَوْقَ كُلِّ ذِي عِلْمٍ عَلِيمٌ
অর্থ: ‘প্রত্যেক জ্ঞানীর ঊর্ধ্বে রয়েছেন আরও অধিক জ্ঞানী।’ (সূরা ইউসুফ, ১২:৭৬)
এ আয়াত মানুষের জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কোনো ব্যক্তি যতই জ্ঞান অর্জন করুন, তাঁর জ্ঞানের ঊর্ধ্বে আরও জ্ঞান রয়েছে। সুতরাং একজন মুসলমানের উচিত নয় সামান্য কিছু হাদিসের অনুবাদ পড়ে শতাব্দীব্যাপী ফিকহি গবেষণাকে অস্বীকার করা।
২১. হানাফি মাযহাবের অনুসারীর পরিচয়: একটি ইলমি ধারার সঙ্গে সম্পর্ক, নবীর বিকল্প কোনো পরিচয় নয়
একজন মুসলমানের মৌলিক পরিচয় হলো তিনি মুসলিম। তাঁর ঈমানের কেন্দ্র আল্লাহর একত্ববাদ এবং মুহাম্মদ ﷺ-এর রিসালাত। তিনি হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি বা হাম্বলি—এগুলো তাঁর ফিকহি অনুসরণের পরিচয়।
অর্থাৎ মাযহাবি পরিচয় তাঁর ইসলামের মূল পরিচয়ের বিকল্প নয়; বরং শরিয়তের আমলি বিধান অনুধাবনের একটি পদ্ধতিগত পরিচয়।
যেমন একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে মুসলিম, বাংলাদেশি, শিক্ষক এবং হানাফি হতে পারেন। এসব পরিচয়ের মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। কিন্তু যদি কোনো পরিচয়কে ইসলামের মৌলিক পরিচয়ের ওপরে স্থান দেওয়া হয়, তখন তা সমস্যার সৃষ্টি করে।
তাই ‘আমি হানাফি’ বলার অর্থ হওয়া উচিত—আমি ফিকহি বিধান অনুধাবনের ক্ষেত্রে হানাফি ইলমি ধারার ওপর নির্ভর করি। এর অর্থ কখনোই হওয়া উচিত নয়—আমি কেবল আবু হানিফার অনুসারী, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নয়।
বরং একজন হানাফির বিশ্বাস হওয়া উচিত, ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ইলমি মর্যাদা ও গবেষণার কারণেই তাঁর ফিকহি ধারা অনুসরণযোগ্য; আর সেই গবেষণার চূড়ান্ত উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশনা অনুধাবন করা।
২২. কয়েকটি প্রচলিত প্রশ্ন ও তার সংক্ষিপ্ত জবাব
প্রশ্ন: আমরা কি আবু হানিফাকে অনুসরণ করি, নাকি মুহাম্মদ ﷺ-কে?
জবাব: আমাদের চূড়ান্ত অনুসরণ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ-এর। আর হানাফি মাযহাব অনুসরণ করা হলো নববী শরিয়তের বিধান অনুধাবনে একজন স্বীকৃত মুজতাহিদের ইলমি পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা।
প্রশ্ন: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কি ভুল করতে পারেন?
জবাব: অবশ্যই। তিনি মহান মুজতাহিদ, কিন্তু নবী নন। তাঁর ইজতিহাদে ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে অন্য ইমামদের ইজতিহাদেও ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশ্ন: তাহলে আমরা কেন তাঁর মাযহাব অনুসরণ করব?
জবাব: কারণ সাধারণ মুসলমানের পক্ষে সব দলিল নিজে বিশ্লেষণ করে বিধান নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তাই তিনি একটি সুসংহত ও স্বীকৃত ফিকহি ধারার ওপর নির্ভর করতে পারেন।
প্রশ্ন: অন্য মাযহাবের অনুসারীরা কি নবী ﷺ-কে অনুসরণ করেন না?
জবাব: অবশ্যই করেন। চারটি সুন্নি মাযহাবই নববী শরিয়তের অনুসরণের ইজতিহাদি ধারা। তাদের মধ্যে শাখাগত মতভেদ রয়েছে।
প্রশ্ন: কোনো বিষয়ে সহিহ হাদিসের সঙ্গে কোনো মাযহাবের মতের আপাতবিরোধ দেখা গেলে কী হবে?
জবাব: প্রথমে দেখতে হবে, হাদিসটির সনদ, প্রাসঙ্গিকতা, অন্যান্য বর্ণনা, সাহাবিদের আমল এবং সংশ্লিষ্ট ফিকহি বিশ্লেষণ কী। কেবল অনুবাদ পড়ে কোনো মাযহাবকে হাদিসবিরোধী ঘোষণা করা উচিত নয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট ইজতিহাদ দলিলের আলোকে পর্যালোচনাযোগ্য—এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না।
প্রশ্ন: একজন সাধারণ মুসলমান কি নিজে নিজে হাদিস দেখে আমল করতে পারেন?
জবাব: তিনি অবশ্যই হাদিস পড়বেন, বুঝবেন, শিখবেন এবং সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করবেন। কিন্তু জটিল বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তাঁর নিজের যোগ্যতার সীমা বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনে যোগ্য আলেমের কাছে যেতে হবে।
২৩. এ বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ
যাঁরা এ বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে চান, তাঁদের জন্য কয়েকটি প্রাথমিক ও উচ্চতর গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হলো।
উসুলুল ফিকহ ও ইজতিহাদ:
১. أصول الشاشي — উসুলুশ শাশি।
২. أصول السرخسي — উসুলুস সারাখসি।
৩. كشف الأسرار عن أصول فخر الإسلام البزدوي — কাশফুল আসরার।
৪. الرسالة — ইমাম শাফেয়ি (রহ.)।
৫. المستصفى من علم الأصول — ইমাম গাজালি (রহ.)।
৬. الإحكام في أصول الأحكام — ইবন হাজম (রহ.)।
৭. روضة الناظر وجنة المناظر — ইবন কুদামা (রহ.)।
হানাফি ফিকহ ও মাযহাবি ঐতিহ্য:
১. المبسوط — ইমাম সারাখসি (রহ.)।
২. بدائع الصنائع في ترتيب الشرائع — আল্লামা কাসানি (রহ.)।
৩. الهداية في شرح بداية المبتدي — আল্লামা মারগিনানি (রহ.)।
৪. فتح القدير — ইবনুল হুমাম (রহ.)।
৫. رد المحتار على الدر المختار — ইবন আবিদিন (রহ.)।
৬. الاختيار لتعليل المختار — আল্লামা মাওসিলি (রহ.)।
এসব গ্রন্থের নাম উল্লেখ করার উদ্দেশ্য কেবল পাঠতালিকা দেওয়া নয়; বরং পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, হানাফি মাযহাব কোনো স্লোগাননির্ভর পরিচয় নয়। এর পেছনে রয়েছে শতাব্দীব্যাপী ইলমি সাধনা, উসুলি গবেষণা, হাদিস বিশ্লেষণ এবং ফিকহি বিন্যাস।
২৪. শেষ কথা: নবীপ্রেমের প্রকৃত পরিচয় হলো জ্ঞান, আদব ও অনুসরণ
একজন মুসলমানের জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসা জীবনের সর্বোচ্চ সম্পদ। তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা ঈমানের দাবি। কিন্তু সুন্নাহ অনুসরণের নামে যদি আমরা ইলমি ঐতিহ্যকে অস্বীকার করি, যোগ্য আলেমদের গবেষণাকে অবজ্ঞা করি, নিজেদের সীমাবদ্ধতা ভুলে যাই এবং অন্য মুসলমানকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি, তাহলে আমাদের নবীপ্রেমের প্রকাশে ভারসাম্যের অভাব থেকে যায়।
যে ব্যক্তি হানাফি, তার উচিত ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ইলমি মর্যাদা স্বীকার করার পাশাপাশি অন্য তিন ইমামের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকা। যে ব্যক্তি শাফেয়ি, মালিকি বা হাম্বলি, তারও উচিত হানাফি মাযহাবের ইলমি ঐতিহ্যকে সম্মান করা। আর যে ব্যক্তি কোনো এক মাযহাবের অনুসারী নন, তাঁরও উচিত মুজতাহিদদের জ্ঞানগত অবদানকে অস্বীকার না করা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ কোনো ব্যক্তিগত আবেগের বিষয় নয়; এটি ওহিভিত্তিক জ্ঞান, প্রামাণ্য বর্ণনা, ভাষাগত অনুধাবন, ফিকহি বিশ্লেষণ এবং শরয়ি প্রয়োগের এক সুসংবদ্ধ ব্যবস্থা।
সুতরাং ‘আমরা মুহাম্মদী, তোমরা হানাফি’—এ ধরনের বিভাজনমূলক বাক্যের পরিবর্তে আমাদের বলা উচিত: আমরা সবাই মুহাম্মদ ﷺ-এর উম্মত; আমরা সবাই তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করতে চাই। তবে শরিয়তের বিধান অনুধাবনের ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে বিভিন্ন স্বীকৃত ইজতিহাদি ধারা রয়েছে। কেউ হানাফি, কেউ শাফেয়ি, কেউ মালিকি, কেউ হাম্বলি। এই পার্থক্য আমাদের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষের কারণ হওয়া উচিত নয়।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-কে অনুসরণ করার অর্থ মুহাম্মদ ﷺ-কে পরিত্যাগ করা নয়; বরং তাঁর ইলমি পদ্ধতির মাধ্যমে মুহাম্মদ ﷺ-এর আনীত শরিয়তকে বোঝার চেষ্টা করা। তবে সেই অনুসরণ কখনোই অন্ধ গোঁড়ামিতে পরিণত হওয়া উচিত নয়। কারণ ইমামের মর্যাদা তাঁর ইলমে, তাঁর ইলমের উদ্দেশ্য নববী শরিয়তের অনুধাবন, আর নববী শরিয়তের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ-এর।
আমাদের প্রয়োজন এমন এক ইলমি সংস্কৃতি, যেখানে নবীপ্রেম থাকবে, সুন্নাহর প্রতি আনুগত্য থাকবে, ইমামদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে, দলিলের প্রতি নিষ্ঠা থাকবে, মতভেদের ক্ষেত্রে আদব থাকবে এবং নিজের অজ্ঞতা উপলব্ধি করার মতো বিনয় থাকবে।
কারণ যে জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে না, যে সুন্নাহর আলোচনা মানুষকে ভ্রাতৃত্বের আদব শেখায় না, যে মাযহাবি পরিচয় মানুষকে অন্য মুসলমানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে না—সেই জ্ঞানচর্চার কোথাও না কোথাও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক অনুধাবন, ইমামদের ইলমি অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন, ইখলাসপূর্ণ আমল এবং মতভেদের ক্ষেত্রে শরয়ি আদব রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমাদের অন্তরকে গোঁড়ামি, অহংকার, বিদ্বেষ ও অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করুন।
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
অর্থ: ‘তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৩)
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
Comments
Post a Comment