সময়ের অপচয়, আত্মপ্রদর্শন ও সামাজিক মাধ্যমে অহেতুক প্রকাশ: এক আত্মসমালোচনামূলক আলোচনা
সময়ের অপচয়, আত্মপ্রদর্শন ও সামাজিক মাধ্যমে অহেতুক প্রকাশ: এক আত্মসমালোচনামূলক আলোচনা
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনে যে অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান নিয়ামতগুলোর একটি হলো সময়। মানুষের জীবন আসলে সময়ের সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ঘন্টা, প্রতিটি দিন—সব মিলিয়েই একটি মানুষের জীবন গড়ে ওঠে। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো আমরা সেই মূল্যবান সময়কে এমন সব কাজে ব্যয় করি যার কোনো স্থায়ী উপকারিতা নেই। কখনো কখনো আমরা এমন কাজে সময় ব্যয় করি যা আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা সময়ের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য বিশেষভাবে শপথ করেছেন। তিনি বলেছেন—
﴿وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ﴾
অর্থাৎ “সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।” (সূরা আল-আসর)।
এই আয়াতটি মানুষের জীবনের এক গভীর বাস্তবতা তুলে ধরে। মানুষ যদি তার সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার না করে, তাহলে সে প্রকৃতপক্ষে ক্ষতির মধ্যেই রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ সময়ের মূল্য সম্পর্কে আমাদেরকে আরও সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন—
«نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ»
অর্থাৎ “দুটি নিয়ামত রয়েছে যার ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত হয়—সুস্থতা এবং অবসর সময়।” (সহিহ বুখারী)।
এই হাদিস আমাদেরকে গভীরভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করে। কারণ আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না যে আমাদের জীবনের কত বড় একটি অংশ এমন কাজের মধ্যে চলে যাচ্ছে যার কোনো বাস্তব মূল্য নেই।
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনে এক বিশাল প্রভাব বিস্তার করেছে। এটি একদিকে মানুষের যোগাযোগ সহজ করেছে, কিন্তু অন্যদিকে অনেক মানুষের জন্য এটি সময় অপচয়ের একটি বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ আমরা এমন একটি বাস্তবতার মুখোমুখি যেখানে অনেক মানুষ জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্তকে অন্যদের সামনে প্রদর্শন করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমরা কোথাও ভ্রমণে গেলে ছবি তুলছি, কোনো রেস্টুরেন্টে খাবার খেলে তার ছবি তুলছি, ইফতার করছি সেটারও ছবি তুলছি, এমনকি ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোকেও আমরা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করছি।
প্রশ্ন হলো—এসব করার উদ্দেশ্য কী? আমরা কি সত্যিই কোনো উপকারী উদ্দেশ্যে এসব করছি, নাকি এটি শুধু একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে?
অনেকে বলে—এগুলো তো শুধু স্মৃতি হিসেবে রাখা। কিন্তু যদি সত্যিই স্মৃতি হিসেবে রাখার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সেটি ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষণ করলেই তো হয়। মানুষের সামনে প্রকাশ করার প্রয়োজন কী?
কুরআনে আল্লাহ তাআলা অহংকার ও আত্মপ্রদর্শন সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন—
﴿وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ﴾
অর্থাৎ “আল্লাহ কোনো অহংকারী ও গর্বকারী মানুষকে পছন্দ করেন না।” (সূরা লুকমান: ১৮)।
যখন মানুষ তার প্রতিটি কাজ অন্যদের সামনে প্রদর্শন করতে শুরু করে, তখন অনেক সময় অজান্তেই তার মধ্যে আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা জন্ম নিতে পারে। সে হয়তো মনে মনে আশা করে মানুষ তাকে প্রশংসা করবে, তার জীবনযাত্রাকে প্রশংসা করবে, তার অবস্থানকে বড় করে দেখবে।
ইসলামে এই প্রবণতাকে রিয়া বলা হয়। রিয়া এমন একটি রোগ যা মানুষের আমলকে নষ্ট করে দিতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ» قَالُوا: وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ؟ قَالَ: الرِّيَاءُ
অর্থাৎ “আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভয় করি ছোট শির্ককে।” সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন—ছোট শির্ক কী? তিনি বললেন—রিয়া (মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করা)। (মুসনাদ আহমদ)।
ইসলামের ইতিহাসে সালাফে সালেহীন নিজেদের আমলকে গোপন রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তারা মনে করতেন যে গোপন আমল মানুষের ইখলাসকে রক্ষা করে।
ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন—“যে ব্যক্তি তার নেক আমলকে মানুষের প্রশংসার জন্য প্রকাশ করে, তার জন্য এটি একটি বড় বিপদের কারণ হতে পারে।”
ইমাম গাজ্জালী (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ “ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন”-এ লিখেছেন যে মানুষের অন্তরে আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রবেশ করে। অনেক সময় মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না যে তার কাজের মধ্যে রিয়া ঢুকে গেছে।
আজকের যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই রিয়ার দরজাকে আরও সহজ করে দিয়েছে। কারণ মানুষ খুব সহজেই নিজের জীবনকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময় অপচয়। আমরা অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছবি তোলা, ছবি সম্পাদনা করা, সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করা এবং মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখার মধ্যে কাটিয়ে দিই।
এই সময় যদি আমরা কুরআন তিলাওয়াতে ব্যয় করতাম, ইলম অর্জনে ব্যয় করতাম, অথবা কোনো উপকারী কাজে ব্যয় করতাম—তাহলে সেটি আমাদের জীবনের জন্য কত বড় কল্যাণের কারণ হতে পারত।
হাসান বসরী (রহ.) বলেছেন—
“হে আদম সন্তান! তুমি আসলে কিছু দিনের সমষ্টি। যখন একটি দিন চলে যায়, তখন তোমার একটি অংশ চলে যায়।”
এই কথাটি মানুষের জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরে। প্রতিটি দিন আমাদের জীবনকে ছোট করে দিচ্ছে।
একদিন এমন একটি সময় আসবে যখন আমরা অতীতের দিকে তাকিয়ে দেখব—আমাদের জীবনের কত বড় একটি অংশ এমন কাজের মধ্যে চলে গেছে যার কোনো মূল্য ছিল না।
কিয়ামতের দিন মানুষ তার প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দেবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ…»
অর্থাৎ কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা নড়বে না যতক্ষণ না তাকে তার জীবনের সময় কোথায় ব্যয় করেছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
এই বাস্তবতা যদি আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি, তাহলে হয়তো আমরা আমাদের সময়কে আরও মূল্যবানভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পূর্ণ খারাপ নয়। এটি অনেক ভালো কাজের জন্যও ব্যবহার করা যায়। কেউ যদি এর মাধ্যমে উপকারী জ্ঞান প্রচার করে, দ্বীনের কথা ছড়িয়ে দেয়, মানুষের উপকার করে—তাহলে সেটি অবশ্যই প্রশংসনীয়।
কিন্তু যখন এটি অহেতুক প্রদর্শন, আত্মপ্রদর্শন এবং সময় অপচয়ের মাধ্যম হয়ে যায়, তখন এটি মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাই একজন মুমিনের উচিত প্রতিটি কাজ করার আগে নিজের নিয়তকে পরীক্ষা করা। সে যেন নিজেকে প্রশ্ন করে—আমি কি এই কাজটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছি, নাকি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য?
যদি আমরা সত্যিই আমাদের জীবনকে অর্থবহ করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে সময়ের মূল্য বুঝতে হবে এবং অহেতুক কাজ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতে হবে।
কারণ একদিন যখন মৃত্যুর মুহূর্ত সামনে আসবে, তখন আমরা হয়তো উপলব্ধি করব—আমাদের জীবনের কত মূল্যবান সময় আমরা এমন কাজে ব্যয় করেছি যার কোনো স্থায়ী উপকার ছিল না।
সেদিন হয়তো আমাদের অন্তরে গভীর আফসোস জাগবে। কিন্তু তখন আর সেই সময় ফিরে পাওয়া যাবে না।
তাই আজই আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত—আমরা আমাদের সময় কোথায় ব্যয় করছি? আমরা কি এমন কাজ করছি যা আমাদের আখিরাতের জন্য উপকারি হবে?
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সময়ের মূল্য বুঝার তাওফিক দান করুন, আমাদেরকে অহেতুক প্রদর্শন ও আত্মপ্রদর্শনের রোগ থেকে রক্ষা করুন এবং আমাদের জীবনকে এমন কাজে ব্যয় করার তাওফিক দিন যা দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ বয়ে আনবে।
Comments
Post a Comment