পোস্ট মা বাবা
মা-বাবার প্রতি অবহেলা: বিস্মৃত আত্মত্যাগ, মাতৃযন্ত্রণার ইতিহাস এবং অকৃতজ্ঞ সন্তানের নৈতিক অধঃপতন
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি
মানুষ পৃথিবীতে আগমন করেই নিজের অস্তিত্বের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ঘোষণা করতে পারে না; বরং তার জন্মের অন্তরালে থাকে দুজন মানুষের নির্ঘুম রজনী, অগণিত আত্মবিসর্জন, অব্যক্ত বেদনা এবং এমন এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ইতিহাস, যার যথার্থ মূল্যায়ন করার মতো মানসিক পরিপক্বতা অনেক সন্তানের মধ্যেই পরিণত বয়সেও জন্মায় না। অথচ পরিতাপের বিষয়, মানুষ যখন ধীরে ধীরে জ্ঞান, সম্পদ, প্রতিপত্তি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার অধিকারী হয়, তখন কখনো কখনো সেই মানুষটিই বিস্মৃত হয়ে যায় তার অস্তিত্বের প্রাথমিক আশ্রয়দাতাদের—তার মা-বাবাকে। যে পিতামাতার স্নেহচ্ছায়ায় তার শৈশব নিরাপদ হয়েছে, যাঁদের শ্রমে তার জীবন বিকশিত হয়েছে, যাঁদের প্রার্থনা ও ত্যাগে তার পথচলা সুগম হয়েছে, তাঁদের প্রতিই যখন অবজ্ঞা, বিরক্তি, রূঢ়তা ও দায়িত্বহীনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে, তখন তা কেবল পারিবারিক শিষ্টাচারের অবক্ষয় নয়; বরং মানবিক কৃতজ্ঞতাবোধের এক গভীর সংকট।
একজন সন্তান যখন মায়ের গর্ভে অবস্থান করে, তখন সে পৃথিবীর কোনো দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত থাকে না। তার কোনো বোধশক্তি নেই, কোনো আত্মনিয়ন্ত্রণ নেই, নিজের অস্তিত্ব রক্ষার সামর্থ্যও নেই। অথচ তার সেই অসহায় অস্তিত্বকে ধারণ করার জন্য মাকে বহন করতে হয় শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের দীর্ঘ অধ্যায়। গর্ভাবস্থায় বমিভাব, ক্লান্তি, ঘুমের ব্যাঘাত, শারীরিক অস্বস্তি, পুষ্টিগত চাহিদার পরিবর্তন এবং নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। প্রত্যেক নারীর অভিজ্ঞতা অবশ্য এক নয়; কারও গর্ভকাল তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক, আবার কারও জন্য তা হয়ে ওঠে কঠিন পরীক্ষার সময়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, গর্ভধারণ, প্রসব এবং প্রসবোত্তর সময়ে গুরুতর জটিলতা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও বিদ্যমান; যথাযথ চিকিৎসা ও সময়োপযোগী সেবা অনেক ক্ষেত্রেই এসব ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে পারে। অর্থাৎ মাতৃত্ব কেবল আবেগের কোনো অলংকারময় ধারণা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাস্তব শারীরিক শ্রম, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এবং কখনো জীবনসংকটের নির্মম বাস্তবতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য এ বাস্তবতার প্রামাণ্য সাক্ষ্য বহন করে।
কুরআনুল কারিম মায়ের এই ত্যাগকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভাষায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও; আমার কাছেই প্রত্যাবর্তন।” (সুরা লুকমান, ৩১:১৪)। এই আয়াতের তাৎপর্য কেবল মাতৃগর্ভে সন্তান ধারণের শারীরিক কষ্ট স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি পিতামাতার প্রতিও কৃতজ্ঞতাবোধকে নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। যে সন্তান নিজের জন্মের ইতিহাস ভুলে যায়, সে কার্যত নিজের অস্তিত্বের ভিত্তিকেই অস্বীকার করার মতো এক আত্মবিস্মৃতির মধ্যে নিমজ্জিত হয়।
প্রসবের মুহূর্তে একজন মা যে যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা ও শারীরিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যেতে পারেন, তা কোনো সাহিত্যিক উপমা দিয়ে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্রসবের অভিজ্ঞতা নারীভেদে ভিন্ন হলেও এর সঙ্গে যুক্ত শারীরিক শ্রম, চিকিৎসাগত ঝুঁকি এবং মানসিক উদ্বেগকে তুচ্ছ করার অবকাশ নেই। সন্তান পৃথিবীতে আসার পরও মায়ের দায়িত্বের অবসান ঘটে না; বরং শুরু হয় আরেক দীর্ঘ অধ্যায়। শিশুর ক্ষুধা, কান্না, অসুস্থতা, ঘুমের অনিয়ম, পরিচর্যা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে মাকে প্রায়ই নিজের বিশ্রাম, আরাম এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে পেছনে সরিয়ে রাখতে হয়। যে সন্তান একসময় নিজের ক্ষুধা প্রকাশ করার ভাষাও জানত না, তার কান্নার অর্থ বোঝার জন্য মা ধীরে ধীরে নিজের অভিজ্ঞতাকে শাণিত করেছেন। যে সন্তান নিজের বিপদ সম্পর্কে সচেতন ছিল না, তাকে বিপদ থেকে রক্ষার জন্য মা নিজের উদ্বেগকে অবিরাম জাগ্রত রেখেছেন। এই সম্পর্কের গভীরে রয়েছে এমন এক দায়িত্ববোধ, যার অধিকাংশই প্রতিদানের প্রত্যাশায় পরিচালিত হয় না।
অন্যদিকে, পিতার আত্মত্যাগও অনেক সময় সন্তানের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়। সংসারের অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য বহু পিতাকে অবিরাম পরিশ্রম করতে হয়। কখনো নিজের পছন্দ বিসর্জন দিতে হয়, কখনো ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য পরিত্যাগ করতে হয়, আবার কখনো নিজের দুঃখ গোপন করে সন্তানের সামনে দৃঢ়তার মুখোশ ধারণ করতে হয়। প্রতিটি পিতার অভিজ্ঞতা একরকম নয়; তবু দায়িত্বশীল পিতৃত্বের কেন্দ্রে থাকে পরিবারের কল্যাণে শ্রম, উদ্বেগ ও আত্মসংযমের এক বিস্তৃত অধ্যায়। সন্তান যখন নতুন পোশাক পরে, তখন অনেক সময় সে পোশাকের মূল্য দেখে, কিন্তু তার পেছনের শ্রমের ইতিহাস দেখে না; যখন শিক্ষার সুযোগ পায়, তখন সুযোগটিকে স্বাভাবিক অধিকার মনে করে, কিন্তু সেই সুযোগ নির্মাণের জন্য পিতার কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, তা অনুধাবন করে না। এই অদৃশ্য শ্রমের প্রতি অজ্ঞতা থেকেই অনেক সময় কৃতজ্ঞতাহীনতার জন্ম হয়।
মানুষের মনস্তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো—যে সুবিধা দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত থাকে, মানুষ অনেক সময় সেটিকে আর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে অনুভব করে না; বরং স্বাভাবিক প্রাপ্য বলে ধরে নেয়। পিতামাতার ভালোবাসার ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটতে পারে। শৈশব থেকে সন্তান খাবার, আশ্রয়, স্নেহ, নিরাপত্তা ও সহযোগিতা পেতে পেতে একসময় এসবকে অবধারিত বাস্তবতা মনে করতে শেখে। ফলে পিতামাতার শ্রমের প্রতি তার সংবেদনশীলতা ক্রমশ কমে যেতে পারে। বয়ঃপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের অধিকার, বন্ধুসমাজের প্রভাব এবং সামাজিক প্রতিযোগিতা তার মনোযোগকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। এসব পরিবর্তন নিজে অপরাধ নয়; কিন্তু স্বাধীনতার নামে পিতামাতার অবদান অস্বীকার করা, তাঁদের অপমান করা কিংবা তাঁদের প্রয়োজনকে তুচ্ছজ্ঞান করা নিঃসন্দেহে নৈতিক বিচ্যুতি। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কখনোই কৃতজ্ঞতাবোধের পরিপন্থী হতে পারে না।
আরও বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, কিছু সন্তান আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পিতামাতার সঙ্গে আচরণে এমন পরিবর্তন আনে, যেন জীবনের সাফল্য তার একক কৃতিত্ব এবং অতীতের কোনো ঋণ তার ওপর অবশিষ্ট নেই। অথচ মানুষের সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত মেধা ও পরিশ্রমের ফল নয়; এর পেছনে থাকে পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক সহায়তা, সুযোগ এবং বহু মানুষের অবদান। পিতামাতার অবদান সব সময় অর্থের অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না। তাঁদের দেওয়া সময়, স্নেহ, উদ্বেগ, ত্যাগ ও নিরাপত্তার কোনো পূর্ণাঙ্গ আর্থিক হিসাব তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই তাঁদের সঙ্গে সদাচরণকে কোনো আর্থিক লেনদেনের প্রতিদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়; বরং এটি কৃতজ্ঞতা, মানবিকতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার স্বাভাবিক প্রকাশ।
ইসলাম পিতামাতার মর্যাদাকে যে উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে, তা কুরআনের একাধিক আয়াতে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতামাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না, তাঁদের ধমক দিও না এবং তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।” (সুরা আল-ইসরা, ১৭:২৩)। লক্ষণীয় যে, এখানে শুধু পিতামাতার ভরণপোষণের নির্দেশ দেওয়া হয়নি; বরং তাঁদের প্রতি বিরক্তিসূচক সামান্যতম অভিব্যক্তি এবং অসম্মানজনক বাক্য ব্যবহারের বিরুদ্ধেও সতর্ক করা হয়েছে। এর পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে, “তাঁদের প্রতি দয়ার সঙ্গে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তাঁরা শৈশবে আমাকে যেভাবে লালন-পালন করেছেন, আপনিও তাঁদের প্রতি সেভাবে দয়া করুন।” (সুরা আল-ইসরা, ১৭:২৪)। আল-কুরআন পিতামাতার প্রতি সদাচরণকে নিছক সামাজিক সৌজন্য নয়, বরং ইবাদতনির্ভর নৈতিক জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
পিতামাতার প্রতি সদাচরণের অর্থ এই নয় যে, তাঁদের সঙ্গে কখনো মতপার্থক্য হবে না কিংবা তাঁদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে সন্তানের একমত হতেই হবে। মানুষের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও প্রজন্মগত বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু মতপার্থক্যকে অবজ্ঞা, অপমান কিংবা নিষ্ঠুরতার অজুহাত বানানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামও পিতামাতার আনুগত্যকে সীমাহীন ও শর্তহীন করেনি। সুরা লুকমানের ১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, পিতামাতা যদি আল্লাহর সঙ্গে শরিক করার জন্য চাপ দেন, তবে সে বিষয়ে তাঁদের আনুগত্য করা যাবে না; কিন্তু দুনিয়ার জীবনে তাঁদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করতে হবে। অর্থাৎ নীতিগত সীমারেখা বজায় রেখেও পিতামাতার প্রতি সম্মান, সৌজন্য ও মানবিক আচরণ অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব। প্রকৃত নৈতিকতা হলো, মতভিন্নতার মধ্যেও শিষ্টাচার রক্ষা করা।
পিতামাতার বার্ধক্য জীবনের এমন এক অধ্যায়, যখন তাঁদের শারীরিক শক্তি হ্রাস পেতে পারে, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে, চলাফেরায় অসুবিধা দেখা দিতে পারে এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য অন্যের সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। যে মা একদিন সন্তানের অসংখ্যবারের কান্নায় বিরক্ত না হয়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, সেই মায়ের পুনরাবৃত্ত প্রশ্নে সন্তান যদি বিরক্ত হয়ে ওঠে, তবে তাকে নিজের শৈশবের কথা স্মরণ করা উচিত। যে বাবা সন্তানের অসুস্থতায় রাত জেগেছেন, সেই বাবার অসুস্থতার সময় সন্তান যদি সামান্য সময়ও দিতে অনিচ্ছুক হয়, তবে তার আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। বার্ধক্য কোনো মানুষের মর্যাদা হ্রাস করে না; বরং এ সময় তাঁদের প্রতি ধৈর্য, সহমর্মিতা ও পরিচর্যার প্রয়োজন আরও বেড়ে যেতে পারে। পিতামাতার দুর্বলতাকে উপহাস করা, তাঁদের কথাকে গুরুত্বহীন মনে করা কিংবা তাঁদের উপস্থিতিকে বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা মানবিকতার পরিপন্থী।
অবশ্য সব পারিবারিক সম্পর্কের অভিজ্ঞতা এক নয়। কোনো কোনো সন্তান পিতামাতার কাছ থেকে নির্যাতন, অবিচার কিংবা গভীর মানসিক আঘাতের শিকার হতে পারে। এমন পরিস্থিতিকে অস্বীকার করে কাউকে অনিরাপদ পরিবেশে থাকতে বাধ্য করা উচিত নয়। পিতামাতার প্রতি সম্মান বজায় রেখেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, ন্যায়সংগত সীমারেখা এবং উপযুক্ত সহায়তা নিশ্চিত করা যায়। এই বাস্তবতা স্বীকার করেও বলা যায়, সাধারণ বিরক্তি, আত্মকেন্দ্রিকতা কিংবা সাময়িক মতবিরোধের কারণে পিতামাতার প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন কোনো সুস্থ নৈতিক অবস্থান নয়। সম্পর্কের জটিলতা থাকলে তা সমাধানের জন্য সংলাপ, সংযম, পারিবারিক মধ্যস্থতা এবং প্রয়োজনে পেশাগত সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
পিতামাতার প্রতি ভালোবাসা কেবল আবেগপূর্ণ বাক্যে প্রকাশিত হয় না; বরং তার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় আচরণে। তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, অসুস্থতায় পাশে থাকা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, সামর্থ্য অনুযায়ী ভরণপোষণে সহযোগিতা করা, তাঁদের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাঁদের অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল থাকা—এসবই ভালোবাসার বাস্তব রূপ। দূরে অবস্থান করলেও নিয়মিত যোগাযোগ, খোঁজখবর এবং প্রয়োজনের সময় আন্তরিক সহযোগিতার মাধ্যমে তাঁদের একাকিত্ব অনেকাংশে লাঘব করা যায়। আর পিতামাতা মৃত্যুবরণ করে থাকলে তাঁদের জন্য দোয়া করা, তাঁদের বৈধ অঙ্গীকার পূরণ করা এবং তাঁদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সদাচরণ করাও কল্যাণকর কাজের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো, পিতামাতার প্রতি সদাচরণকে ভবিষ্যতের কোনো সুবিধা অর্জনের কৌশল হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁরা বৃদ্ধ হলে সম্পত্তি পাওয়া যাবে, তাঁদের সন্তুষ্ট করলে সামাজিক প্রশংসা মিলবে কিংবা তাঁদের সেবা করলে ভবিষ্যতে নিজের সন্তানও অনুরূপ আচরণ করবে—এমন প্রত্যাশা মানবিকতার পূর্ণাঙ্গ ভিত্তি হতে পারে না। সদাচরণের মূল উৎস হওয়া উচিত কৃতজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ, মমত্ব এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা। প্রতিদানের নিশ্চয়তা না থাকলেও ভালো কাজের নৈতিক মূল্য অক্ষুণ্ণ থাকে। সন্তান হিসেবে পিতামাতার কাছে আমাদের ঋণ কোনো হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি জীবনের ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত এক নৈতিক দায়।
অতএব, যে সন্তান নিজের মা-বাবার ত্যাগ ভুলে যায়, তার উচিত আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজের হৃদয়ের কঠোরতা শনাক্ত করা। একবার ভাবা দরকার—শৈশবে তার অসহায়ত্বের সময় কারা তাকে আগলে রেখেছিল, অসুস্থতায় কারা উদ্বিগ্ন হয়েছিল, ব্যর্থতায় কারা সান্ত্বনা দিয়েছিল এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকা সত্ত্বেও কারা তার জন্য স্বপ্ন দেখেছিল। পিতামাতা নিখুঁত মানুষ নন; তাঁদেরও ভুল হতে পারে, সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু তাঁদের মানবিক অসম্পূর্ণতা উপলব্ধি করার পাশাপাশি তাঁদের অবদানকে স্বীকার করা এবং যথাসম্ভব সম্মানজনক আচরণ করা সন্তানের নৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়।
পরিশেষে বলা যায়, মা-বাবা মানুষের জীবনে এমন দুটি আশ্রয়, যাঁদের অবদানকে কেবল বস্তুগত সাফল্যের মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। তাঁদের আত্মত্যাগের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া কোনো সন্তানের পক্ষেই সম্ভব নয়; কিন্তু কৃতজ্ঞতা, সেবা, সম্মান ও আন্তরিক ভালোবাসার মাধ্যমে সেই ঋণের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রকাশ করা সম্ভব। যে ঘরে পিতামাতা সম্মানিত হন, সেখানে মানবিকতার চর্চা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর যে সমাজে পিতামাতার অবদান বিস্মৃত হয়, সে সমাজের নৈতিক ভিত্তিও ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই আজই আত্মজিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন—আমরা কি সত্যিই আমাদের মা-বাবার প্রতি যথাযথ আচরণ করছি, নাকি তাঁদের ভালোবাসাকে এমন এক চিরস্থায়ী প্রাপ্য বলে ধরে নিয়েছি, যার জন্য কখনো কৃতজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করি না? মনে রাখতে হবে, সময়ের প্রবাহে শৈশব ফিরে আসে না, হারানো মুহূর্ত পুনরুদ্ধার করা যায় না, আর মৃত্যুর পর অনুশোচনার অশ্রু জীবিত পিতামাতার সেবার বিকল্প হতে পারে না। তাঁরা জীবিত থাকতেই তাঁদের সম্মান করি, তাঁদের কষ্ট উপলব্ধি করি, তাঁদের পাশে দাঁড়াই এবং আল্লাহর কাছে তাঁদের জন্য দোয়া করি—কারণ কৃতজ্ঞ সন্তানের পরিচয় তার মুখের কথায় নয়, তার আচরণের মহত্ত্বে।
Comments
Post a Comment