পোস্ট সেই ছোট্ট আমি — ৩
সেই ছোট্ট আমি — ৩
শৈশবের স্মৃতিতে বাবা, মায়ের ভালোবাসা আর এক বুক হাহাকার
লেখক: মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি
আলহামদুলিল্লাহ! ‘সেই ছোট্ট আমি’ ধারাবাহিকের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের পর আজ প্রকাশ করছি তৃতীয় পর্ব। ইনশাআল্লাহ, ধারাবাহিকভাবে দশটি পর্ব পর্যন্ত লেখার ইচ্ছা রয়েছে। এই ধারাবাহিকে তুলে ধরব আমার ছোটবেলার নানা স্মৃতি, বেড়ে ওঠার গল্প, বাবা-মায়ের ভালোবাসা, তাঁদের আদর-যত্ন এবং জীবনের সেই সোনালি দিনগুলোর কথা—যে দিনগুলো আজ স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে আছে।
মানুষের জীবনে কিছু সময় থাকে, যেগুলো কখনো ফিরে আসে না; অথচ মনের গভীরে সেগুলো চিরকাল বেঁচে থাকে। শৈশব ঠিক তেমনই এক অধ্যায়। তখন হয়তো জীবনের অনেক কিছুই বুঝতাম না, ভালোবাসার গভীরতা মাপতে জানতাম না, ত্যাগের অর্থ উপলব্ধি করতে পারতাম না। কিন্তু আজ বড় হয়ে যখন অতীতের দিকে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—সেই ছোট্ট জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে কতটা মমতা, কতটা যত্ন আর কতটা নিঃস্বার্থ ভালোবাসা মিশে ছিল!
আমার শৈশব, আমার ঢাকা, আমার বাবা-মা
আলহামদুলিল্লাহ, ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় আমার বেড়ে ওঠা। ঢাকার মতিঝিলে কেটেছে আমার শৈশবের অনেকটা সময়। আমার জন্ম আজিমপুর হাসপাতালে। পৃথিবীর আলো দেখার সেই মুহূর্ত থেকে আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার বাবা-মায়ের অসংখ্য স্বপ্ন, প্রত্যাশা, আনন্দ আর ভালোবাসা।
আমি তখন কিছুই বুঝতাম না। বুঝতাম না, একটি সন্তানকে পৃথিবীতে আনার পর তার বাবা-মায়ের হৃদয়ে কত স্বপ্ন জন্ম নেয়। বুঝতাম না, সন্তানের সামান্য হাসি তাঁদের মনে কত আনন্দ এনে দেয়, আবার তার সামান্য অসুস্থতা তাঁদের বুকের ভেতর কতটা অস্থিরতা তৈরি করে। শুধু তাঁদের আদর পেতাম, তাঁদের স্নেহের ছায়ায় বেড়ে উঠতাম। আজ সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে মনে হয়, শৈশবের সেই ছোট্ট পৃথিবীটাই ছিল আমার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
আমার বাবা আমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। তাঁর ভালোবাসার ধরনটা ছিল অন্য রকম—গভীর, মমতাময় এবং আগলে রাখার মতো। ছোটবেলা থেকেই তিনি আমাকে নিজের কাছছাড়া করতে চাইতেন না। নিজের কোলেই রাখতেন, নিজের কাছেই রাখতে পছন্দ করতেন। অন্য কেউ আমাকে কোলে নিলে কিংবা আমার সঙ্গে একটু খেলাধুলা করলে, আমার মনে হতো বাবা যেন কিছুটা রাগ করতেন! আসলে সেই রাগের ভেতরেও লুকিয়ে ছিল তাঁর গভীর মায়া—আমার প্রতি তাঁর একান্ত অধিকারবোধ আর আমাকে আগলে রাখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
বাবা যেন আমাকে পৃথিবীর সবটুকু আদর দিয়ে নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে চাইতেন। তাঁর কাছে আমি শুধু একটি সন্তান ছিলাম না; ছিলাম তাঁর ভালোবাসার এক টুকরো পৃথিবী। আমার সামান্য কষ্টও তিনি সহ্য করতে পারতেন না। আমাকে কে কোলে নিল, কে আমার সঙ্গে খেলল, আমি ঠিক আছি কি না—এসব বিষয়েও তাঁর গভীর মনোযোগ ছিল। আজ যখন সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়ে, তখন বুঝতে পারি, একজন বাবার ভালোবাসা সব সময় মুখের কথায় প্রকাশ পায় না; কখনো তা প্রকাশ পায় তাঁর আগলে রাখা, তাঁর সতর্ক দৃষ্টি আর সন্তানের প্রতি নিঃশব্দ মমতার মধ্য দিয়ে।
আমার প্রয়োজন মানেই বাবার ব্যস্ততা
আমার যখন যে পোশাকের প্রয়োজন হতো, বাবা তা কিনে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন। যখন যে খাবার প্রয়োজন হতো, আমার জন্য সেই খাবারের ব্যবস্থা করতেন। আমার চাহিদা পূরণ করতে তিনি কতটা ব্যস্ত থাকতেন, কত কিছু চিন্তা করতেন—সেই ছোট্ট বয়সে তা বোঝার ক্ষমতা আমার ছিল না।
তখন আমার কাছে নতুন পোশাক মানে ছিল আনন্দ, পছন্দের খাবার মানে ছিল তৃপ্তি, আর বাবার কোলে থাকা মানে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় থাকা। কিন্তু আজ বুঝি, সেই পোশাকের পেছনে ছিল বাবার শ্রম, সেই খাবারের পেছনে ছিল তাঁর চিন্তা, আর আমার মুখে হাসি ফোটানোর পেছনে ছিল তাঁর অসংখ্য ছোট-বড় চেষ্টা।
একটি শিশু যখন তার প্রয়োজনের জিনিসটি পেয়ে যায়, তখন সে হয়তো শুধু আনন্দটাই অনুভব করে। কিন্তু সেই জিনিসটি জোগাড় করতে একজন বাবা কতটা ভাবেন, কতটা পরিশ্রম করেন, কতটা দায়িত্ব বহন করেন—সন্তান বড় হওয়ার আগে তা বুঝতে পারে না। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। আমি বাবার ভালোবাসা পেয়েছি, কিন্তু সেই ভালোবাসার গভীরতা পুরোপুরি উপলব্ধি করার মতো বয়স তখন আমার হয়নি।
আজ সেই স্মৃতিগুলো ফিরে ফিরে আসে। মনে হয়, আহা! তখন যদি বুঝতে পারতাম, বাবার প্রতিটি আদরের ভেতর কতটা মমতা লুকিয়ে ছিল! যদি বুঝতে পারতাম, আমার জন্য তাঁর প্রতিটি ছোট্ট ব্যবস্থা আসলে ভালোবাসারই একেকটি নিদর্শন! তাহলে হয়তো আরও বেশি করে বাবাকে জড়িয়ে ধরতাম, আরও বেশি সময় তাঁর কোলে থাকতাম, আরও গভীরভাবে অনুভব করতাম তাঁর সান্নিধ্য।
শৈশবের খাবারের ডিব্বা, আর স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকা বাবা
আমার ছোটবেলার খাবার নিয়েও মায়ের মুখে অনেক গল্প শুনেছি। আম্মু আমাকে বলেছেন, ছোটবেলায় আমাকে হরলিক্স, কমপ্লেইনসহ বিভিন্ন খাবার খাওয়ানো হতো। আমার জন্য এসব খাবার নাকি বাইরে থেকে অর্ডার করে আনানো হতো। এমন অনেক খাবার ছিল, যেগুলো আমার জন্য বিশেষভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
তখন হয়তো বাজারে গেলেই সবকিছু সহজে পাওয়া যেত না, কিংবা আমার প্রয়োজনীয় খাবারগুলো সংগ্রহ করতে আলাদা ব্যবস্থা করতে হতো। কিন্তু বাবা আমার জন্য যা প্রয়োজন মনে করতেন, তা জোগাড় করার চেষ্টা করতেন। তাঁর কাছে আমার প্রয়োজনটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বড় হওয়ার পর একসময় সেই খাবারগুলোর পুরোনো ডিব্বা আমার চোখে পড়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেগুলোর কিছু এখনো আমাদের কাছে আছে। সাধারণ চোখে দেখলে সেগুলো হয়তো নিছক পুরোনো কয়েকটি ডিব্বা। কিন্তু আমার কাছে সেগুলো কেবল ডিব্বা নয়; সেগুলো আমার শৈশবের সাক্ষী, বাবার যত্নের স্মারক, মায়ের মুখে শোনা গল্পগুলোর বাস্তব নিদর্শন।
কখনো কখনো মনে হয়, স্মৃতি বোধ হয় এমনই—কোনো একটি পুরোনো জিনিস চোখের সামনে এলেই মনের ভেতর বহু বছরের পুরোনো একটি দরজা খুলে যায়। তারপর একে একে ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো। মনে পড়ে সেই ছোট্ট আমি, মনে পড়ে বাবার আদর, মনে পড়ে মায়ের স্নেহ, মনে পড়ে সেই ঘর, সেই পরিবেশ, সেই নির্ভার সময়।
আজ সেই ডিব্বাগুলোর দিকে তাকালে শুধু অতীত দেখি না; দেখি আমার জীবনের এমন এক অধ্যায়, যেখানে আমি ছিলাম ছোট্ট, অসহায়, সম্পূর্ণ নির্ভরশীল—আর আমার পাশে ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী আমাকে ভালো রাখার চেষ্টা করতেন।
সত্যিই, কিছু স্মৃতির কোনো বাজারমূল্য নেই, কিন্তু হৃদয়ে তাদের মূল্য অসীম। পুরোনো একটি ডিব্বাও কখনো কখনো অমূল্য হয়ে ওঠে, যদি তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রিয় কোনো মানুষের ভালোবাসার গল্প।
আজ বাবা নেই, কিন্তু বাবার ভালোবাসার স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে
আহ্, আজ সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়লে বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্যতা তৈরি হয়! যে মানুষটি আমাকে ছোটবেলা থেকে এতটা আগলে রেখেছিলেন, যিনি আমার প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখতেন, যাঁর ভালোবাসার ছায়ায় আমার শৈশব কেটেছে—সেই বাবা আজ আমার পাশে নেই।
বাবা আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন। জীবনের কঠিন বাস্তবতা হলো, যাঁদের উপস্থিতিকে আমরা একসময় স্বাভাবিক বলে মনে করি, একদিন তাঁদের অনুপস্থিতিই আমাদের জীবনের সবচেয়ে গভীর শূন্যতাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তখন বুঝতে পারি, একজন মানুষের উপস্থিতি কতটা মূল্যবান ছিল, তাঁর কণ্ঠস্বর কতটা আপন ছিল, তাঁর সান্নিধ্য কতটা নিরাপদ ছিল।
আজ আমার শৈশবের কথা মনে পড়লে বাবার মুখটা মনে ভেসে ওঠে। মনে হয়, সেই ছোট্ট আমি যদি আবার ফিরে যেতে পারতাম! যদি আরেকবার বাবার কোলে মাথা রাখতে পারতাম! যদি আরেকবার তাঁর স্নেহভরা উপস্থিতিতে কিছুটা সময় কাটাতে পারতাম! যদি একবার বলতে পারতাম—বাবা, তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসতে, তা হয়তো তখন বুঝিনি; কিন্তু আজ তোমার অনুপস্থিতি আমাকে সেই ভালোবাসার গভীরতা নতুন করে অনুভব করায়।
আহ্, আজ যদি আমার বাবা বেঁচে থাকতেন!
আজ যদি বাবা বেঁচে থাকতেন, তাঁকে হয়তো আমার ছোটবেলার গল্পগুলো আরও শুনতে বলতাম। তাঁর মুখে আমার শৈশবের আরও কত অজানা ঘটনা শুনতাম! জানতে চাইতাম, আমি ছোটবেলায় কেমন ছিলাম, কী করলে তিনি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতেন, আমার কোন আচরণে তিনি হেসে উঠতেন, আর কোন বিষয়গুলো নিয়ে আমাকে সবচেয়ে বেশি আগলে রাখতেন।
হয়তো আজ বড় হয়ে বাবাকে নতুন করে ভালোবাসার ভাষা বুঝিয়ে বলতে পারতাম। হয়তো তাঁর পাশে বসে বলতাম, “বাবা, তোমার সেই ছোট্ট সন্তানটি আজ বড় হয়েছে। এখন সে বুঝতে শিখেছে, তোমার আদর কত মূল্যবান ছিল, তোমার যত্ন কত গভীর ছিল, তোমার ভালোবাসার ঋণ কত বিশাল!”
কিন্তু জীবনের সব ইচ্ছা পূরণ হয় না। কিছু কথা বলা হয়ে ওঠে না, কিছু আলিঙ্গন আর ফিরে আসে না, কিছু মুহূর্ত শুধু স্মৃতির ভেতরেই বেঁচে থাকে। এটাই জীবনের নির্মম বাস্তবতা।
তবুও আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। আলহামদুলিল্লাহ, আমি এমন একজন বাবার ভালোবাসা পেয়েছি, যিনি আমার শৈশবকে তাঁর স্নেহ দিয়ে ঘিরে রেখেছিলেন। এমন একজন মায়ের স্নেহ পেয়েছি, যাঁর মুখে আজও আমার ছোটবেলার গল্পগুলো শুনতে পাই। আমার জীবনের এই স্মৃতিগুলো আমার কাছে আল্লাহর দেওয়া এক মূল্যবান নিয়ামত।
বাবা আজ আমার পাশে নেই, কিন্তু তাঁর ভালোবাসার স্মৃতিগুলো আমার সঙ্গে আছে। তাঁর আদরের গল্পগুলো আমার হৃদয়ে আছে। আমার শৈশবের সেই পুরোনো ডিব্বাগুলোতে যেন আজও লুকিয়ে আছে তাঁর যত্নের নীরব সাক্ষ্য।
আল্লাহ তাআলা আমার বাবাকে ক্ষমা করুন, তাঁর প্রতি রহম করুন, তাঁর কবরকে প্রশস্ত ও নূরান্বিত করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।
আর আমার আম্মুকে আল্লাহ সুস্থতা, শান্তি ও বরকতময় জীবন দান করুন। তাঁর স্নেহ ও দোয়ার ছায়া আমার জীবনে দীর্ঘদিন অটুট রাখুন।
‘সেই ছোট্ট আমি’ আজও আমার ভেতরে বেঁচে আছে। শুধু বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে জীবনের বাস্তবতা। শৈশবের সেই ছোট্ট আমি আজ বড় হয়েছে; কিন্তু বাবার কোলে থাকা সেই অনুভূতি, মায়ের আদরের সেই স্মৃতি আর ভালোবাসায় ঘেরা সেই দিনগুলো আজও আমার হৃদয়ের সবচেয়ে কোমল জায়গাটিতে অমলিন হয়ে আছে।
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের ভালোবাসা চলে যায় না। কিছু সময় হারিয়ে যায়, কিন্তু তার স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। আর কিছু সম্পর্ক এমন, যেগুলোর গভীরতা আমরা সবচেয়ে বেশি অনুভব করি তখনই, যখন প্রিয় মানুষটি আর আমাদের পাশে থাকেন না।
আহ্, বাবা! তোমাকে খুব মনে পড়ে।
Comments
Post a Comment