পোস্ট পরিবহনদের সাথে ভালো ব্যবহার

 যাঁদের শ্রমে আমাদের পথচলা, তাঁদেরই কেন অপমান করি?

গণপরিবহনের চালক, রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি আমাদের নৈতিক দেউলিয়াত্ব, শ্রেণিগত অহংকার এবং মানবিক মর্যাদাবোধের সংকট

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 

ভূমিকা

আমাদের সবার ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। দৈনন্দিন জীবনে আমরা রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা, সিএনজি ও বাসের মতো যানবাহনের ওপর নির্ভর করি। অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য এসব বাহন আমাদের অপরিহার্য সঙ্গী। অথচ যাঁদের শ্রমের ওপর নির্ভর করে আমরা গন্তব্যে পৌঁছাই, তাঁদের অনেকের সঙ্গেই আমরা অসম্মানজনক আচরণ করি। ভাড়া কমিয়ে দেওয়া, অশালীন ভাষায় কথা বলা, ‘তুই’ বলে সম্বোধন করা, ধমক দেওয়া কিংবা তাঁদের পেশাকে তুচ্ছজ্ঞান করা আমাদের সমাজে কখনো কখনো স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে দেখা হয়। অথচ এই প্রবণতা আমাদের সামাজিক ন্যায়বোধ, মানবিকতা ও সভ্যতার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

১. শ্রমের মর্যাদা ও শ্রেণিগত অহংকার

একজন মানুষের সামাজিক মর্যাদা তাঁর সম্পদ, পোশাক, পদবি কিংবা পেশার ওপর নির্ভর করে না। চিকিৎসক, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর যেমন মানবিক মর্যাদা রয়েছে, তেমনি রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও বাসচালকেরও রয়েছে। পেশাগত পার্থক্য কখনো কাউকে অন্য কাউকে অপমান করার অধিকার দেয় না।

আমরা অনেক সময় উচ্চপদস্থ ব্যক্তির সঙ্গে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলি, কিন্তু দরিদ্র চালকের সঙ্গে তাচ্ছিল্য করি। এটি শ্রেণিগত দ্বৈতনীতির প্রকাশ। যে ভদ্রতা কেবল ক্ষমতাবান ব্যক্তির জন্য সংরক্ষিত, তা প্রকৃত ভদ্রতা নয়; বরং স্বার্থনির্ভর সামাজিক কৌশল।

২. আমাদের নাগরিক জীবনে পরিবহনশ্রমিকদের অবদান

রিকশাচালক ও অন্যান্য পরিবহনশ্রমিকের শ্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মজীবী মানুষ কর্মস্থলে এবং অসুস্থ ব্যক্তি হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন। তাঁদের কাজের পেছনে থাকে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শারীরিক পরিশ্রম, যানজট, আবহাওয়ার প্রতিকূলতা ও আয়ের অনিশ্চয়তা।


Sharifa Begum ও Binayak Sen-এর ‘Pulling rickshaws in the city of Dhaka: a way out of poverty?’ শীর্ষক গবেষণাটি ২০০৫ সালে Environment and Urbanization সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় ঢাকার রিকশাচালকদের দারিদ্র্য, কঠোর শারীরিক শ্রম, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জীবিকার অনিশ্চয়তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি নির্দিষ্ট সময়ের তথ্যভিত্তিক; তাই একে সব চালকের বর্তমান পরিস্থিতির সর্বজনীন পরিসংখ্যান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

৩. ভাড়া কমিয়ে দেওয়া ও ন্যায্যতার প্রশ্ন

ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি নিজে অন্যায় নয়। চালক অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করলে বা পূর্বসম্মত শর্ত ভঙ্গ করলে যাত্রীর প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু যাত্রার আগে নির্ধারিত ন্যায্য ভাড়া গন্তব্যে পৌঁছে কেবল নিজের সুবিধার জন্য কমিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।

ভাড়ার ন্যায্যতা নির্ধারণে দূরত্ব, সময়, যানজট, বাহনের ধরন ও স্থানীয় নিয়ম বিবেচনা করা উচিত। যাত্রী ও চালক—উভয়েরই অন্যায় পরিহার করা দরকার। নিজের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে অন্যের অধিকার নষ্ট করা ন্যায়বিচার নয়।

৪. ‘তুই’ সম্বোধন ও ভাষার সামাজিক তাৎপর্য

বাংলা ভাষায় ‘তুই’, ‘তুমি’ ও ‘আপনি’ সম্বোধনের অর্থ সম্পর্ক, অঞ্চল ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে ‘তুই’ স্নেহের প্রকাশও হতে পারে। কিন্তু অপরিচিত চালককে অবজ্ঞা বা অপমানের উদ্দেশ্যে ‘তুই’ বলা অসম্মানজনক আচরণ। বিশেষ করে কেউ যদি সামাজিকভাবে দুর্বল ব্যক্তির সঙ্গেই এমন ভাষা ব্যবহার করেন, তবে তা শ্রেণিগত অবজ্ঞার লক্ষণ হতে পারে।

‘ভাই, একটু সামনে যাবেন?’ কিংবা ‘চাচা, এখানে থামাবেন?’—এমন সম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করলে কারও মর্যাদা কমে না। বরং ভদ্রতা ও আত্মসংযমের পরিচয় প্রকাশ পায়।

৫. ইসলামি দৃষ্টিতে মানবিক মর্যাদা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ

অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আমি আদমসন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।’

—সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭০।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:

وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا

অর্থ: ‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’

—সূরা আল-বাকারা, ২:৮৩।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ

অর্থ: ‘অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।’

—সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯১।

এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অহংকার শুধু সম্পদ প্রদর্শনের নাম নয়; মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করাও অহংকারের অন্তর্ভুক্ত। কোনো ব্যক্তিকে তাঁর পেশা বা দারিদ্র্যের কারণে হেয় করা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ

অর্থ: ‘কেউ কখনো নিজের হাতের উপার্জন থেকে খাওয়ার চেয়ে উত্তম খাদ্য খায়নি।’

—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২০৭২।

এই হাদিস বৈধ শ্রমের মর্যাদা তুলে ধরে। একজন রিকশাচালক নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করেন; তাঁর শ্রমকে অবজ্ঞা করার নৈতিক ভিত্তি নেই।

৬. অন্যের প্রাপ্য অর্থ আটকে রাখা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ

অর্থ: ‘হে মুমিনগণ, তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।’

—সূরা আন-নিসা, ৪:২৯।

পূর্বসম্মত ন্যায্য ভাড়া অন্যায়ভাবে অস্বীকার করা প্রতিশ্রুতি ও অধিকার রক্ষার প্রশ্ন। তবে ভাড়ার বিরোধে প্রকৃত পাওনা, পূর্বসম্মতি ও পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। চালক অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করলে সেটিও অন্যায়।

৭. শিক্ষা ও সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দিতে পারে; কিন্তু সেই জ্ঞান আচরণে প্রতিফলিত না হলে নৈতিক উন্নতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একজন ব্যক্তি উচ্চশিক্ষিত হয়েও যদি দরিদ্র চালককে অপমান করেন, তবে তাঁর আচরণে শিক্ষার মানবিক উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হচ্ছে না। প্রকৃত সভ্যতা প্রকাশ পায় দুর্বল অবস্থানে থাকা মানুষের সঙ্গে আমাদের ব্যবহারে।

৮. ক্ষমতার অসমতা ও দুর্ব্যবহারের স্বাভাবিকীকরণ

অনেক চালক দৈনিক আয়ের প্রয়োজনের কারণে অপমানের প্রতিবাদ করেন না। কিন্তু নীরবতা সম্মতির প্রমাণ নয়। অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অন্যায় সুবিধা নেওয়া নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে চালকেরাও যাত্রীকে হয়রানি, প্রতারণা বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে পারেন না। ন্যায়বিচার উভয় পক্ষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

৯. সম্মান মানে অন্ধ সমর্থন নয়

কোনো চালক বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালালে, অতিরিক্ত ভাড়া চাইলে বা যাত্রীকে হয়রানি করলে প্রতিবাদ করা ন্যায়সংগত। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা শালীন হওয়া উচিত। ভুলের সমালোচনা করতে হবে, ব্যক্তির মানবিক মর্যাদাকে অপমান করে নয়। ভদ্রতা দুর্বলতা নয়, আর অপমান শক্তির প্রমাণ নয়।

১০. পরিবহনশ্রমিকদের অধিকার ও কর্মপরিবেশ

International Labour Organization-এর ‘Guidelines on the Promotion of Decent Work and Road Safety in the Transport Sector’ পরিবহনশ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, শ্রমের মর্যাদা ও সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে। শ্রমিকের ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বিশ্রাম, সামাজিক সুরক্ষা এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

১১. আমাদের করণীয়

প্রথমত, অপরিচিত চালকের সঙ্গে সম্মানজনক সম্বোধন ব্যবহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যাত্রার আগে ভাড়া পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত। তৃতীয়ত, পূর্বসম্মত ন্যায্য ভাড়া অন্যায়ভাবে কমানো যাবে না। চতুর্থত, কোনো ভুল হলে গালাগাল না করে যুক্তিসংগতভাবে প্রতিবাদ করতে হবে। পঞ্চমত, সন্তানদের শেখাতে হবে যে পেশার পার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদার পার্থক্য নয়। ষষ্ঠত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে শ্রমের মর্যাদা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

১২. আত্মসমালোচনার আহ্বান

আমরা কি কখনো চালককে এমন ভাষায় কথা বলেছি, যা নিজের শিক্ষক বা কর্মকর্তার সঙ্গে ব্যবহার করতাম না? আমরা কি কখনো তাঁর আর্থিক দুর্বলতাকে নিজের সুবিধার জন্য কাজে লাগিয়েছি? আমরা কি তাঁর পেশাকে ছোট করে দেখেছি, অথচ প্রতিদিন তাঁর শ্রমের ওপর নির্ভর করেছি?

এসব প্রশ্নের উত্তর নিজের কাছে সৎভাবে দেওয়া জরুরি। ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং নৈতিক উন্নতির সূচনা। পরবর্তীবার রিকশায় ওঠার সময় সম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করা, ন্যায্য ভাড়া দেওয়া এবং মতবিরোধে সংযত থাকা—এসব ছোট পরিবর্তন বৃহত্তর সামাজিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

১৩. উপসংহারবিহীন শেষ কথা

একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু তার ভবন, রাস্তা কিংবা প্রযুক্তিতে নয়; বরং শ্রমজীবী ও দুর্বল অবস্থানে থাকা মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়, তাতেও প্রকাশ পায়। পরিবহনশ্রমিকেরা আমাদের নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের প্রতি সম্মান কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এটি ন্যায়সংগত সামাজিক সম্পর্কের ন্যূনতম শর্ত।

আমরা ভাড়া নিয়ে আলোচনা করব, কিন্তু অপমান করব না; অন্যায়ের প্রতিবাদ করব, কিন্তু অশালীনতা অবলম্বন করব না; চালকের ভুল ধরিয়ে দেব, কিন্তু তাঁর পেশা বা আর্থিক অবস্থাকে হেয় করব না। যে মানুষের শ্রম গ্রহণ করে আমরা গন্তব্যে পৌঁছাই, সেই মানুষটির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। অন্যের মর্যাদা রক্ষা করার মধ্য দিয়েই নিজের চরিত্রের প্রকৃত উচ্চতা প্রকাশ পায়।


।

Comments

Popular posts from this blog

সময়ের অপচয়, আত্মপ্রদর্শন ও সামাজিক মাধ্যমে অহেতুক প্রকাশ: এক আত্মসমালোচনামূলক আলোচনা

বেফাক পরীক্ষার প্রস্তুতি: মিশকাত জামাতের জন্য নিয়ম-নীতি ও কলাকৌশল

সংক্ষেপে আরবী কায়দা