ইয়াসিন 2

 তালিবুল ইলমের পথচলা


মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা 


প্রিয় ভাই ইয়াসিন,

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

কেমন আছো, প্রিয় ভাই? আশা করি মহান আল্লাহ তাআলার অসীম রহমত, করুণা ও হেফাজতে ভালো আছো। মাঝে মাঝে একটু নির্জনে বসে নিজের অতীতের দিকে তাকিয়ে দেখো। একদিন তুমি কোথায় ছিলে, আর আজ মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর অশেষ অনুগ্রহে তোমাকে কোথায় পৌঁছে দিয়েছেন! এই পথচলার প্রতিটি ধাপই তাঁর অশেষ দয়া, অনুগ্রহ ও রহমতের এক একটি জীবন্ত নিদর্শন।

চিন্তা করে দেখো, আল্লাহ তাআলা তোমাকে হিফজে কুরআনের মতো এক মহামূল্যবান নেয়ামত দান করেছেন। পৃথিবীতে অসংখ্য মুসলিম রয়েছে, কিন্তু তাদের সবাই এই মহান সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারে না। তোমার অন্তরে তিনি তাঁর কালাম সংরক্ষণের তাওফীক দিয়েছেন। এটি এমন এক সম্মান, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ বান্দাদের মধ্য থেকেই যাদের ইচ্ছা তাদের দান করেন। অতএব তুমি একজন হাফেজে কুরআন—এটি শুধু একটি পরিচয় নয়; বরং এটি একটি আমানত, একটি দায়িত্ব এবং একই সঙ্গে আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের বহিঃপ্রকাশ।

এরপর আল্লাহ তাআলা তোমাকে আরেকটি মহামূল্যবান নেয়ামতের দিকে অগ্রসর করেছেন। তিনি তোমার অন্তরে কুরআনকে বোঝার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেছেন এবং কুরআন বোঝার জন্য যে মাধ্যমগুলো অর্জন করা অপরিহার্য—আরবি ভাষা, নাহু, সরফ, বালাগাত, উসূল এবং অন্যান্য শরঈ উলূম—সেগুলো শেখার সুযোগও করে দিয়েছেন। এটি এমন একটি তাওফীক, যা কেবল মেধা বা পরিশ্রমের ফল নয়; বরং এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। তিনি যাকে ভালোবাসেন, তাকেই তাঁর দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জনের পথ সহজ করে দেন।

একটু স্মরণ করো, একসময় তুমি মীযান জামাতের ছোট ছোট কিতাব নিয়ে পড়তে। একটি একটি শব্দ, একটি একটি নিয়ম বুঝতে কত চেষ্টা করতে হতো। অথচ আজ সেই তুমিই আল্লাহর অনুগ্রহে অপেক্ষাকৃত কঠিন কিতাব অধ্যয়ন করছ, জটিল ইবারত বুঝতে শিখছ, ইলমের বিভিন্ন শাস্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছ এবং ধীরে ধীরে গবেষণামূলক অধ্যয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছ। প্রতিটি নতুন দরস, প্রতিটি নতুন কিতাব এবং প্রতিটি নতুন ইলমি পরিভাষা আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য নতুন একটি নেয়ামত।

মনে রেখো, এই সৌভাগ্য সবাই লাভ করে না। কত মানুষ ইলমের পথে চলতে চেয়েও সুযোগ পায় না, কত মানুষ কুরআন মুখস্থ করার ইচ্ছা করেও তা পূরণ করতে পারে না, আবার কত মানুষ হিফজ সম্পন্ন করলেও দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জনের পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু মহান আল্লাহ তোমাকে একের পর এক নেয়ামত দান করে চলেছেন। তাই কখনো নিজের অবস্থাকে সাধারণ মনে করবে না; বরং সর্বদা উপলব্ধি করার চেষ্টা করবে যে, তুমি এমন এক নিয়ামতের মধ্যে আছো, যার প্রকৃত মূল্য ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

আল্লাহ তাআলা তোমাকে কতভাবে, কত দিক থেকে এবং কত অসংখ্য নেয়ামতে আচ্ছাদিত করে রেখেছেন—সেটি যদি তুমি গভীরভাবে চিন্তা করতে শুরু করো, তাহলে উপলব্ধি করবে যে, তোমার কল্পনাও সেই নেয়ামতের পূর্ণ হিসাব করতে সক্ষম হবে না। মানুষের জীবন, ঈমান, সুস্থতা, কুরআন, ইলম, নেক উস্তাদ, দ্বীনি পরিবেশ, ইবাদতের তাওফীক এবং সত্যের পথে চলার শক্তি—এসবই এমন নেয়ামত, যার তুলনা দুনিয়ার কোনো সম্পদের সঙ্গে হয় না।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

﴿وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا﴾

“তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করতে চাও, তবে কখনো তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।”

— (সূরা ইবরাহীম: ৩৪)

তাই, প্রিয় ভাই, এই নেয়ামতগুলোর শুকরিয়া আদায় করো। সুযোগ পেলে দুই রাকাত সালাতুশ্-শুকর আদায় করো। সিজদায় গিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মহান আল্লাহর দরবারে বলো—“হে আল্লাহ! আপনি যেভাবে অযোগ্য হয়েও আমাকে আপনার দ্বীনের খিদমতের পথে নিয়ে এসেছেন, কুরআনের হাফেজ বানিয়েছেন এবং আপনার কিতাব বোঝার পথে পরিচালিত করেছেন, তেমনি আমার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমাকে ইখলাস, তাকওয়া, ইলমে নাফে‘, সহীহ আমল এবং আপনার দ্বীনের খিদমতের ওপর অটল রাখুন। আমার অর্জিত ইলমে বরকত দান করুন, আমাকে অহংকার থেকে হেফাজত করুন এবং আমাকে এমন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যাদের মাধ্যমে আপনার দ্বীনের আলো যুগে যুগে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায়।”

মনে রেখো, যে বান্দা নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে, আল্লাহ তাআলা তার নেয়ামত আরও বৃদ্ধি করে দেন। আর যে ব্যক্তি নিজের প্রতিটি অর্জনকে আল্লাহর দান হিসেবে উপলব্ধি করে, আল্লাহ তাকে এমন উচ্চতায় পৌঁছে দেন, যা সে নিজেও কখনো কল্পনা করতে পারে না। তাই প্রতিটি দিন নতুন উদ্যমে ইলম অর্জন করো, প্রতিটি নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ হও এবং সর্বদা এই দোয়া করতে থাকো—মহান আল্লাহ যেন তোমাকে দ্বীনের এমন একজন খাদিম হিসেবে কবুল করেন, যার ইলম হবে নাফে‘, আমল হবে ইখলাসপূর্ণ এবং জীবন হবে কুরআন ও সুন্নাহর আলোয় আলোকিত।

এখন মহান আল্লাহ তাআলা তোমাকে এমন এক পরিবেশে নিয়ে এসেছেন, যা একজন মুমিনের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত—মাদ্রাসার পরিবেশ। এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি ইলম, আমল, আখলাক, তাকওয়া এবং আত্মগঠনের এক উর্বর বাগান। এখানে প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দরস, প্রতিটি আজান, প্রতিটি জামাত, প্রতিটি মুতালাআ এবং প্রতিটি নসীহত তোমার ব্যক্তিত্বকে গড়ে তুলছে। সকাল থেকে রাত, আবার রাত থেকে সকাল—তুমি এমন একটি পরিবেশে অবস্থান করছ, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত তোমাকে আল্লাহর দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তাই এই পরিবেশের মর্যাদা উপলব্ধি করা, এর হক আদায় করা এবং এর প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান মনে করা তোমার অন্যতম বড় দায়িত্ব।

প্রিয় ভাই, মনে রেখো—সময়ই একজন তালিবুল ইলমের সবচেয়ে মূল্যবান মূলধন। হারিয়ে যাওয়া সম্পদ ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় কখনো ফিরে আসে না। তাই তোমার প্রতিটি দিন এবং প্রতিটি ঘণ্টা এমনভাবে পরিকল্পিত হওয়া উচিত, যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং ইলমে উন্নতির পথে একটি মুহূর্তও অযথা নষ্ট না হয়। সময়ের হেফাজত করো, কারণ সময়ের হেফাজতই ইলমের হেফাজত, আর ইলমের হেফাজতই ভবিষ্যতের সফলতার ভিত্তি।

বিশেষভাবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতের সঙ্গে আদায় করার ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান হবে। আজানের ধ্বনি শোনামাত্রই যেন তোমার অন্তর আল্লাহর ঘরের দিকে ছুটে যায়। জামাতের প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে, কারণ একজন তালিবুল ইলমের পরিচয় শুধু তার কিতাবে নয়; বরং তার মসজিদের সঙ্গেও গভীর সম্পর্কের মধ্যে প্রকাশ পায়। প্রতিদিন নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করবে। কুরআন শুধু মুখে পড়ার জন্য নয়; বরং হৃদয়ে ধারণ করার জন্য, বুঝে পড়ার জন্য এবং জীবন গঠনের জন্য। প্রতিদিন অল্প হলেও কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে, কারণ যে হৃদয় কুরআনের সান্নিধ্যে থাকে, সে হৃদয় কখনো প্রকৃত অর্থে শূন্য হয় না।

প্রতিদিন দুই রাকাত সালাতুল হাজত আদায় করার অভ্যাস গড়ে তুলবে। আল্লাহর দরবারে নিজের প্রয়োজন, নিজের স্বপ্ন, নিজের দুর্বলতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ তুলে ধরবে। মানুষের কাছে নয়, সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছেই চাইবে। তিনিই দানকারী, তিনিই পথপ্রদর্শক এবং তিনিই অন্তর খুলে দেওয়ার মালিক। আর তাহাজ্জুদের ব্যাপারে কখনো উদাসীন হবে না। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করবে। রাতের নির্জনতায়, যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, তখন আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে শেখো। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যারা দিনের বেলায় উম্মাহর ইমাম হয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই রাতের অন্ধকারে আল্লাহর দরবারে দীর্ঘ সিজদা করেছেন। রাতের অশ্রুই দিনের ইলমকে নূরানী করে, আমলকে ইখলাসপূর্ণ করে এবং অন্তরকে জীবন্ত রাখে।

মাদ্রাসার প্রতিটি আচরণেও যেন তোমার পরিচয় একজন আদর্শ তালিবুল ইলম হিসেবে প্রকাশ পায়। উস্তাদদের প্রতি গভীর সম্মান, সহপাঠীদের প্রতি আন্তরিকতা, ছোটদের প্রতি স্নেহ, বড়দের প্রতি আদব, কথাবার্তায় সংযম, পোশাকে শালীনতা, চলাফেরায় ভদ্রতা এবং সর্বক্ষেত্রে সুন্নাহর অনুসরণ—এসবই তোমার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠুক। একজন তালিবুল ইলমকে মানুষ তার কথার আগে তার চরিত্র দেখে চিনে। তাই তোমার জীবন এমন হওয়া উচিত, যেন তোমাকে দেখলে মানুষের আল্লাহর কথা স্মরণ হয়।

প্রিয় ভাই ইয়াসিন, তোমাকে নিয়ে আমি সত্যিই আনন্দিত এবং আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞ। কারণ মহান আল্লাহ তোমাকে যে সুযোগ দিয়েছেন, তা সবার ভাগ্যে জোটে না। তিনি তোমার অন্তরকে স্বচ্ছ করেছেন, তোমাকে সুন্দর মেধা দিয়েছেন, ইলমের প্রতি ভালোবাসা দিয়েছেন এবং শেখার অদম্য আগ্রহ দান করেছেন। চারদিকে তাকিয়ে দেখো—কত ছাত্র খেলাধুলা, অকারণ আড্ডা, ঘোরাফেরা কিংবা উদ্দেশ্যহীন কাজে মূল্যবান সময় নষ্ট করে। আবার কত ছাত্র পড়তে চাইলেও যথেষ্ট আগ্রহ ধরে রাখতে পারে না, কিংবা মেধাগত সীমাবদ্ধতার কারণে এগোতে কষ্ট হয়। কিন্তু মহান আল্লাহ তোমার জন্য ভিন্ন একটি পথ নির্ধারণ করেছেন। তিনি তোমার অন্তরে ইলমের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করেছেন এবং পড়াশোনার প্রতি একাগ্রতা দান করেছেন। এই নিয়ামতের যথার্থ মূল্যায়ন করো এবং কখনো এটিকে অবহেলা করো না।

তোমার একটি গুণ আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে—তোমার শেখার আগ্রহ। আমি যখনই তোমার সঙ্গে পড়াশোনা নিয়ে কথা বলি, নতুন কোনো বিষয় বুঝিয়ে দিই, মুযাকারা করি কিংবা নতুন কোনো কিতাবের আলোচনা করি, তখন তোমার আগ্রহ আমাকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করে। একজন শিক্ষক, একজন বড় ভাই বা একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে যে, তার সামনে এমন একজন ছাত্র রয়েছে, যার হৃদয় ইলমের জন্য ব্যাকুল?

হয়তো তুমি বুঝতে পারো না, তোমার জন্য আমি কত সময় ব্যয় করি। কত রাত জেগে বিভিন্ন কিতাব ঘেঁটে, কত গবেষণা করে, কত লেখা প্রস্তুত করি, কত বিষয় সাজিয়ে তোমার সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি। কিন্তু আল্লাহর কসম, তোমার আগ্রহ, তোমার উদ্দীপনা এবং তোমার শেখার আন্তরিকতা দেখে কখনো এই পরিশ্রমকে কষ্ট বলে মনে হয় না। বরং মনে হয়, তোমার জন্য আরও বেশি পড়ি, আরও বেশি লিখি, আরও বেশি গবেষণা করি এবং তোমার ইলমি সফরে সামান্য হলেও সহযোগী হতে পারি। যদি তোমার উপকারের জন্য একটি রাত নয়, অসংখ্য রাতও জেগে থাকতে হয়, তবুও সেটিকে আমার কাছে কষ্ট মনে হবে না। কারণ একজন আন্তরিক তালিবুল ইলমের পেছনে সময় ব্যয় করা এমন একটি সদকায়ে জারিয়ার আশা, যার প্রতিদান একমাত্র আল্লাহ তাআলাই দিতে পারেন।

তাই, প্রিয় ভাই, কখনো তোমার এই আগ্রহকে হারিয়ে ফেলো না। ইলমের পথ দীর্ঘ, কখনো কঠিনও মনে হবে, কিন্তু ধৈর্য হারিয়ো না। প্রতিটি দরস, প্রতিটি মুতালাআ, প্রতিটি মুখস্থ, প্রতিটি মুযাকারা এবং প্রতিটি গবেষণা তোমাকে তোমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আজকের ছোট ছোট কষ্টই আগামী দিনের বড় বড় অর্জনের ভিত্তি।

আমি মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে আন্তরিকভাবে দোয়া করি—হে আল্লাহ! আপনি ইয়াসিনের অন্তরে ইলমের এই আগ্রহ, উদ্দীপনা ও ইখলাসকে আজীবন অটুট রাখুন। তাকে ইলমে নাফে‘, বিশুদ্ধ আমল, গভীর ফিকহ, প্রজ্ঞা, হিকমত এবং অসাধারণ স্মৃতিশক্তি দান করুন। তাকে তাকওয়া, বিনয়, ইখলাস ও সুন্নাহর অনুসরণে সুদৃঢ় রাখুন। তাকে এমন একজন আলেমে রব্বানী হিসেবে কবুল করুন, যিনি কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ ইলম মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন, উম্মাহর জন্য কল্যাণের উৎস হবেন এবং দ্বীনের খিদমতে নিজের জীবন উৎসর্গ করবেন।

হে আল্লাহ! আপনি তাকে ইলম, আমল, আখলাক ও তাকওয়ার এমন উচ্চ মর্যাদা দান করুন, যাতে তিনি এ দেশের উলামায়ে কেরামের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হন। আপনি তাকে এমন গভীর ইলম, প্রজ্ঞা, ফিকহ, ইখলাস ও দূরদৃষ্টি দান করুন, যা আমাদের যুগের শ্রেষ্ঠ আকাবির উলামায়ে কেরামের বৈশিষ্ট্য ছিল। আপনি তাকে এমন একজন আলেম বানান, যিনি মুফতি আব্দুল মালেক-এর ইলমি গভীরতা, গবেষণাপ্রবণতা ও বিনয় থেকে উত্তমভাবে উপকৃত হন এবং মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী-এর মতো কুরআন-সুন্নাহ, ফিকহ, ইখলাস ও উম্মাহর খিদমতের আদর্শ থেকে প্রেরণা গ্রহণ করে আপনার দ্বীনের একজন নিবেদিত খাদিম হিসেবে কবুল হন। আমীন।

প্রিয় ভাই ইয়াসিন,

মনে রেখো, ইলমের পথ কখনো ফুলে বিছানো পথ নয়। এটি নবীদের পথ, সিদ্দীকদের পথ, শহীদদের পথ এবং সালিহীনদের পথ। এই পথ যত মহান, এর পরীক্ষা তত কঠিন। তাই অবাক হবে না যদি তোমার সামনে একের পর এক বাধা আসে। তোমার স্বপ্নকে ভেঙে দেওয়ার জন্য, তোমার আশা-আকাঙ্ক্ষাকে নিভিয়ে দেওয়ার জন্য এবং তোমাকে ইলমের পথ থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য শয়তান তার সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, একজন সত্যিকারের তালিবুল ইলম যদি কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করতে পারে, তবে সে শুধু নিজের জীবনই আলোকিত করবে না; বরং অসংখ্য মানুষের হিদায়াতের মাধ্যম হয়ে উঠবে। তাই একজন তালিবুল ইলমকে পথভ্রষ্ট করা শয়তানের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষ্য।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

﴿إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا﴾

“নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু; অতএব তোমরা তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ করো।”

— (সূরা ফাতির: ৬)

শয়তান সব সময় প্রকাশ্যভাবে আসে না; বরং অধিকাংশ সময় সে ধীরে ধীরে, সুন্দর কথার আড়ালে, যুক্তির আবরণে এবং কল্যাণের ছদ্মবেশে মানুষকে প্রতারিত করে। একজন তালিবুল ইলমের জীবনেও সে নানাভাবে প্রবেশ করার চেষ্টা করবে। কখনো পারিবারিক কোনো সমস্যা বা মানসিক কষ্টকে সামনে এনে তোমাকে দুর্বল করে দিতে চাইবে। কখনো মাদ্রাসার ছোটখাটো বিষয়কে বড় করে দেখিয়ে তোমার অন্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। কখনো দুনিয়াবী লোভ, পদমর্যাদা, অর্থ কিংবা খ্যাতির স্বপ্ন দেখিয়ে তোমাকে তোমার মূল লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দিতে চাইবে। কখনো মানুষের দোষ-ত্রুটি নিয়ে ব্যস্ত রাখবে, কখনো গীবত, সমালোচনা ও অপ্রয়োজনীয় আলোচনায় জড়িয়ে দেবে, যাতে তোমার মূল্যবান সময়, মনোযোগ ও ইলমের বরকত নষ্ট হয়ে যায়।

অনেক সময় শয়তান তোমার অন্তরে এ ধরনের কুমন্ত্রণা দেবে—“মাদ্রাসায় পড়ে কী হবে? যদি স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে, তাহলে হয়তো আরও বড় চাকরি করতে পারতে, দুনিয়াবী সফলতা আরও বেশি পেতে।” মনে রেখো, এ ধরনের চিন্তার উদ্দেশ্য হলো তোমার অন্তরকে অস্থির করে দেওয়া এবং আল্লাহ যে পথে তোমাকে পরিচালিত করেছেন, সে পথ সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করা। একজন মুমিন জানে, রিযিক, সম্মান ও সফলতা একমাত্র আল্লাহর হাতে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর দ্বীনের পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য এমন কল্যাণের দরজা খুলে দেন, যা সে নিজেও কল্পনা করতে পারে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا ۝ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾

“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।”

— (সূরা আত-তালাক: ২–৩)

আবার কখনো তোমার মনে এ চিন্তা আসতে পারে যে, “ইংরেজি না জানলে হবে না, কম্পিউটার না শিখলে চলবে না; তাহলে এখনই এগুলো নিয়েই ব্যস্ত হয়ে যাই।” বাস্তবতা হলো, ইংরেজি ভাষা শেখা, কম্পিউটার শেখা কিংবা আধুনিক দক্ষতা অর্জন—এসব নিজ নিজ স্থানে উপকারী বিষয়। কিন্তু একজন তালিবুল ইলমের জীবনে প্রতিটি কাজের একটি নির্ধারিত সময়, অগ্রাধিকার ও পর্যায় রয়েছে। যে ভিত্তি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটিকে দুর্বল রেখে অন্য দিকে ছুটে গেলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই প্রথমে কুরআন, সুন্নাহ, আরবি ভাষা, নাহু, সরফ, ফিকহ ও মৌলিক শরঈ উলূমের ভিতকে মজবুত করো। পরে যখন উপযুক্ত সময় ও সুযোগ আসবে, তখন প্রয়োজনীয় অন্যান্য দক্ষতাও অর্জন করা যাবে। ইলমের সফরে তাড়াহুড়ো নয়; বরং সুশৃঙ্খল অগ্রসর হওয়াই প্রকৃত প্রজ্ঞা।

আরেকটি বড় ফিতনা হলো—সমালোচনাপ্রবণতা। শয়তান কখনো তোমাকে এ কথা বলবে—“মাদ্রাসার এই ব্যবস্থা ভালো নয়, ওই উস্তাদ এমন, এই ছাত্র তেমন।” ধীরে ধীরে সে তোমাকে গীবত, দোষ অনুসন্ধান এবং অপ্রয়োজনীয় আলোচনায় ব্যস্ত করে তুলবে। অথচ একজন তালিবুল ইলমের কাজ হলো নিজের ইলম, আমল ও চরিত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকা; অন্যের ত্রুটি অনুসন্ধান করা নয়। সালাফে সালেহীন বলতেন, যে ব্যক্তি নিজের সংশোধনে ব্যস্ত থাকে, সে অন্যের দোষ খোঁজার অবসর পায় না।

তাই সর্বদা সতর্ক থাকবে। যখনই কোনো চিন্তা, কোনো আকর্ষণ বা কোনো প্রলোভন তোমাকে ইলমের পথ থেকে সরিয়ে দিতে চাইবে, তখন নিজেকে প্রশ্ন করবে—এটি কি আমাকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করছে, নাকি দূরে সরিয়ে দিচ্ছে? যদি দেখো কোনো বিষয় তোমার ইলম, ইবাদত, আখলাক ও তাকওয়ার ক্ষতি করছে, তাহলে দ্বিধা না করে তা থেকে দূরে সরে যাবে। শয়তানের কুমন্ত্রণাকে কখনো গুরুত্ব দেবে না। বরং কুরআন-সুন্নাহ এবং আকাবির উলামায়ে কেরামের নির্দেশনা আঁকড়ে ধরবে। কারণ যে ব্যক্তি আহলে ইলমের পথ অনুসরণ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে নানা ফিতনা থেকে রক্ষা করেন।

আর যখন কেউ তোমাকে দুনিয়াবী সাফল্যের তুলনা দিয়ে নিরুৎসাহিত করবে, তখন মনে রাখবে—আল্লাহ তোমাকে এমন একটি পথে রেখেছেন, যেখানে তুমি শান্ত পরিবেশে ইলম অর্জন করছ, দ্বীনের শিক্ষা গ্রহণ করছ এবং নিজের আখিরাত গড়ার সুযোগ পাচ্ছ। এই নিয়ামতের মূল্য অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। দুনিয়ার অনেক মানুষ বাহ্যিক সফলতা অর্জন করেও অন্তরের প্রশান্তি পায় না। অথচ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইলম অর্জনের জীবন এমন এক নিয়ামত, যা হৃদয়ে প্রশান্তি, জীবনে বরকত এবং আখিরাতে মহাসাফল্যের আশা জাগায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ﴾

“আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের ইলম দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করবেন।”

— (সূরা আল-মুজাদিলাহ: ১১)

মনে রেখো, প্রকৃত সম্মান মানুষের হাতে নয়; সম্মান একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ইলম, তাকওয়া ও ইখলাস দান করেন এবং তাকে তাঁর দ্বীনের খিদমতের জন্য কবুল করেন, তখন মানুষের অন্তরেও তার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান সৃষ্টি করে দেন। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, অসংখ্য রব্বানী আলেম ছিলেন যাঁদের কাছে মানুষ শুধু মাসআলা জানার জন্য নয়, দোয়া নেওয়ার জন্য, নসীহত শোনার জন্য এবং তাঁদের ইলম ও আখলাক থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসত। এই সম্মান অর্থ বা ক্ষমতার দ্বারা অর্জিত হয় না; এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।

প্রিয় ভাই ইয়াসিন, তাই তুমি কখনো পথ হারিয়ো না। কোনো কষ্ট, কোনো প্রলোভন, কোনো সমালোচনা কিংবা কোনো দুনিয়াবী মোহ যেন তোমার হৃদয় থেকে ইলমের ভালোবাসা কেড়ে নিতে না পারে। ধৈর্য ধারণ করো, উস্তাদদের পরামর্শ আঁকড়ে ধরো, নিয়মিত ইবাদত করো, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় রাখো এবং সর্বদা আল্লাহর কাছে এই দোয়া করো—হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ইলমের পথে অটল রাখুন, ফিতনা থেকে হেফাজত করুন, শয়তানের সকল চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিন এবং আমার জীবনকে আপনার দ্বীনের খিদমতের জন্য কবুল করে নিন। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং তাঁর পথে অবিচল থাকে, আল্লাহ তাআলা কখনো তাকে নিরাশ করেন না।

প্রিয় ভাই ইয়াসিন, হয়তো অনেকেই একসময় তোমাকে বলবে—“মাদ্রাসায় পড়ে কী হবে? স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে হয়তো আরও ভালো ভবিষ্যৎ হতো, বড় চাকরি করতে পারতে, দুনিয়াবী প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে পারতে।” তখন তুমি কখনো এসব কথায় বিচলিত হবে না। বরং শান্তভাবে নিজের অন্তরে চিন্তা করবে—আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন এক পরিবেশে রেখেছেন, যেখানে আমি নিশ্চিন্তে তাঁর দ্বীনের ইলম অর্জন করতে পারছি। তিনি আমার জন্য ইলমের মজলিস, নেক উস্তাদ, ইবাদতের পরিবেশ, নিয়মিত জামাতে সালাত আদায়ের সুযোগ এবং কুরআন-সুন্নাহ শেখার মতো অমূল্য নিয়ামত সহজ করে দিয়েছেন। কত মানুষ অর্থ ব্যয় করেও এমন পরিবেশ পায় না, অথচ আল্লাহ আমাকে তাঁর অনুগ্রহে এই মহামূল্যবান নিয়ামতের মধ্যে রেখেছেন।

তুমি আরও ভাববে—আজ আমি যে কষ্ট করছি, তা দুনিয়ার জন্য নয়; বরং আল্লাহর দ্বীনের জন্য। আজ আমি যে কিতাব পড়ছি, যে ইবারত বুঝছি, যে ইলম অর্জন করছি—এগুলো একদিন ইনশাআল্লাহ আল্লাহর দ্বীনের খিদমতের পাথেয় হবে। যখন পড়াশোনা সম্পন্ন করে তাদরিস, দাওয়াত, ইফতা বা দ্বীনের অন্য কোনো খিদমতে আত্মনিয়োগ করব, তখন মানুষের প্রকৃত উপকার করার সুযোগ লাভ করব। এটি এমন এক সৌভাগ্য, যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না এবং পার্থিব কোনো পদমর্যাদার সঙ্গে তুলনা করা যায় না।

মনে রেখো, প্রকৃত সম্মান মানুষের হাতে নয়; সম্মান একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতে। তিনি যাকে তাঁর দ্বীনের খিদমতের জন্য কবুল করেন, মানুষের অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আস্থা সৃষ্টি করে দেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

﴿يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ﴾

“আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের ইলম দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করবেন।”

— (সূরা আল-মুজাদিলাহ: ১১)

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যুগে যুগে যেসব আলেম তাঁদের জীবন আল্লাহর দ্বীনের জন্য উৎসর্গ করেছেন, আল্লাহ তাআলা তাঁদের এমন গ্রহণযোগ্যতা দান করেছেন যে মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে তাঁদের কাছে ইলম অর্জন করতে, নসীহত শুনতে এবং দোয়া নিতে এসেছে। এই সম্মান সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতির মাধ্যমে অর্জিত হয় না; বরং এটি ইখলাস, তাকওয়া, ইলম এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিরলস খিদমতের ফল।

তাই প্রিয় ভাই, মানুষের কথায় নয়, আল্লাহর ওয়াদার ওপর ভরসা রাখো। তোমার লক্ষ্য যেন কখনো দুনিয়াবী তুলনা না হয়; বরং তোমার লক্ষ্য হোক এমন একজন রব্বানী আলেম হওয়া, যার ইলম মানুষের উপকারে আসে, যার চরিত্র মানুষকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং যার জীবন কুরআন ও সুন্নাহর খিদমতে অতিবাহিত হয়। এমন জীবনই প্রকৃত সফলতা, আর এমন সম্মানই দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান।

প্রিয় ভাই ইয়াসিন,

ইলমের পথে চলতে গিয়ে শুধু বাইরের মানুষ নয়, অনেক সময় নিজের পরিবার থেকেও নানা ধরনের পরীক্ষা আসতে পারে। এটি নতুন কিছু নয়; বরং যুগে যুগে দ্বীনি ইলমের পথে অগ্রসর হওয়া অনেক মানুষের জীবনেই এমন পরীক্ষা এসেছে। সংসারে যখন আর্থিক সংকট দেখা দেয়, অভাব-অনটন বৃদ্ধি পায় কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব বেড়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই অনেকেই দুনিয়াবী হিসাব-নিকাশের আলোকে বিভিন্ন পরামর্শ দিতে শুরু করেন। কেউ হয়তো বলবেন, “এত পড়াশোনা করে কী হবে? এখন কাজে নেমে পড়ো।” কেউ বলবেন, “বিদেশে চলে যাও, উপার্জন করো, সংসারের দায়িত্ব নাও।” আবার কেউ হয়তো বলবেন, “মাদ্রাসায় শুধু সময় আর অর্থ ব্যয় হচ্ছে, এর কোনো বাস্তব উপকার নেই।”

সেই মুহূর্তে কখনো উত্তেজিত হবে না, কারও কথায় কষ্ট পেয়ে কঠোর ভাষায় উত্তর দেবে না এবং মনে কোনো বিদ্বেষও পোষণ করবে না। বরং মনে রাখবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা তোমার অকল্যাণ চান না; বরং নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তোমার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই এসব বলেন। তাই তাদের প্রতি সর্বদা আদব, নম্রতা ও সম্মান বজায় রেখে কথা বলবে। আল্লাহ তাআলা যেমন পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গেও উত্তম ব্যবহার একজন মুমিনের পরিচয়।

তুমি তাদেরকে শান্তভাবে বলতে পারো, “আপনারা আমার জন্য দোয়া করুন। আমি যে পথে চলছি, তা আল্লাহর দ্বীনের ইলম অর্জনের পথ। আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ তাআলা তাঁর সন্তুষ্টির জন্য করা কোনো ত্যাগ ও পরিশ্রমকে কখনো বৃথা যেতে দেন না। আজ হয়তো কিছু কষ্ট আছে, কিছু অভাব আছে, কিছু অপেক্ষা আছে; কিন্তু আমি আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখি। তিনি যখন যেভাবে কল্যাণ নির্ধারণ করবেন, সেটিই আমার জন্য সর্বোত্তম হবে।”

তুমি আরও বলতে পারো, “আমি জানি, আজ আমি হয়তো আপনাদের আর্থিকভাবে খুব বেশি সহযোগিতা করতে পারছি না। এ বিষয়টি আমার নিজেরও কষ্টের কারণ। কিন্তু আমি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি এমন একটি জীবন গড়ে তুলতে, যা দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণের কারণ হবে। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাকে এমন ইলমে নাফে‘ দান করেন, যার মাধ্যমে মানুষের উপকার করতে পারি এবং আপনাদের জন্যও সদকায়ে জারিয়ার কারণ হতে পারি।”

আর তাদেরকে এই আশ্বাসও দিতে পারো, “আপনারা আমার জন্য দোয়া করতে থাকুন। আমি আমার সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে পড়াশোনা চালিয়ে যাব। ভবিষ্যৎ একমাত্র আল্লাহর হাতে। তিনি যদি চান, তাহলে তাঁর দ্বীনের সামান্য খিদমত করারও তাওফীক দেবেন। আমি চাই, এমন জীবন যাপন করতে, যাতে আপনারা আমার কারণে দুনিয়াতেও সম্মান অনুভব করেন এবং আখিরাতেও আল্লাহর রহমতের আশা করতে পারেন।”

বিশেষ করে পিতা-মাতাকে কখনো ভুলে যেও না। তাদেরকে বলবে, “আপনারা আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। আপনারা আমার জন্য দোয়া করুন। আপনাদের দোয়াই আমার মূল পাথেয়। যদি আমি কোনো কল্যাণ অর্জন করি, তবে সেটি আল্লাহর অনুগ্রহের পর আপনাদের দোয়া, ত্যাগ ও ভালোবাসারই ফল হবে।”

মনে রেখো, আন্তরিকতা, উত্তম চরিত্র এবং ধৈর্যের ভাষা এমন শক্তিশালী, যা অনেক কঠিন হৃদয়কেও নরম করে দেয়। যখন পরিবার দেখবে যে তুমি আগের চেয়ে আরও বিনয়ী হয়েছ, ইবাদতে যত্নবান হয়েছ, পড়াশোনায় আন্তরিক হয়েছ এবং তাদের প্রতিও আরও দায়িত্বশীল ও সম্মানশীল হয়েছ, তখন ইনশাআল্লাহ তাদের মনেও ধীরে ধীরে আস্থা জন্মাবে। তারা উপলব্ধি করবেন যে তুমি কোনো আবেগের বশে নয়, বরং একটি মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ইলমের পথে অগ্রসর হচ্ছ। তখন তারাই তোমাকে সাহস দেবেন, তোমার জন্য দোয়া করবেন এবং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তোমার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন।

তাই, প্রিয় ভাই, কোনো পারিবারিক পরীক্ষা যেন তোমার হৃদয় থেকে আল্লাহর ওপর ভরসা কেড়ে নিতে না পারে। ধৈর্য ধারণ করো, আদব বজায় রাখো, পরিবারের হক আদায় করো, তাদের জন্য দোয়া করো এবং তাদের দোয়া গ্রহণ করার চেষ্টা করো। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইলমের পথে অবিচল থাকে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য এমন সব কল্যাণের দরজা খুলে দেন, যা সে আগে কল্পনাও করতে পারেনি। তাঁর অনুগ্রহ সীমাহীন, আর তাঁর ওয়াদা কখনো ব্যর্থ হয় না।

তুমি তখন অত্যন্ত বিনয়, আদব ও ভালোবাসার সঙ্গে তোমার পরিবারকে বলবে, “আপনারা আমার জন্য দুশ্চিন্তা করবেন না। আমি কোনো দুনিয়াবী স্বপ্নের পেছনে ছুটছি না; আমি আল্লাহর দ্বীন শিখছি, কুরআন ও সুন্নাহর ইলম অর্জনের চেষ্টা করছি। আমি দৃঢ় বিশ্বাস করি, যে ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর দ্বীনের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে কখনো পরিত্যাগ করেন না। জীবনে সাময়িক কিছু কষ্ট, দুঃখ, অভাব কিংবা পরীক্ষা অবশ্যই আসতে পারে; কিন্তু এগুলো মুমিনের ঈমানের পরীক্ষা মাত্র। এসব পরীক্ষার পরেই আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য কল্যাণের দরজা খুলে দেন।”

তুমি আরও বলবে, “আজ হয়তো আমি আপনাদের জন্য দুনিয়াবী দিক থেকে তেমন কিছু করতে পারছি না। এটি আমার নিজেরও কষ্টের বিষয়। কিন্তু আল্লাহই ভালো জানেন, ভবিষ্যতে তিনি আমাকে কতটুকু তাওফীক দেবেন এবং আপনাদের খিদমত করার কতটুকু সুযোগ দান করবেন। তবে আমি সব সময় এই দোয়াই করি—আল্লাহ তাআলা যেন আমাকে এমন নেক বান্দা বানান, যার নেক আমল ও দ্বীনের খিদমতের বরকতে আমার পরিবারও উপকৃত হয়। আর যদি আল্লাহ তাআলা অনুমতি দান করেন, তবে আখিরাতে আপনাদের জন্য শাফাআতের সৌভাগ্য অর্জনেরও আমি আশা রাখি। কারণ আখিরাতই আমাদের প্রকৃত ও চিরস্থায়ী জীবন; দুনিয়ার জীবন তো ক্ষণিকের সফরমাত্র।”

তাদেরকে আরও বলবে, “আপনারা আর কিছু না পারলেও আমার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করতে থাকুন। আপনাদের দোয়াই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিছুদিন ধৈর্য ধারণ করুন, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। আমি আমার সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, ইলম অর্জনে কোনো প্রকার অবহেলা করব না এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করব। ভবিষ্যৎ একমাত্র আল্লাহর হাতে। তিনি যদি চান, তাহলে তাঁর দ্বীনের এমন খিদমতের তাওফীক দান করবেন, যা আপনাদের জন্যও গর্ব, সান্ত্বনা ও সদকায়ে জারিয়ার কারণ হবে।”

তুমি তাদেরকে এই আশাও শোনাবে যে, “হয়তো আজ আপনারা আমার জন্য কষ্ট করছেন, ধৈর্য ধরছেন এবং অনেক ত্যাগ স্বীকার করছেন। কিন্তু যদি আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগ্রহে আমাকে ইলমে নাফে‘, ইখলাস এবং দ্বীনের খিদমতের তাওফীক দান করেন, তাহলে একদিন আপনারাই আনন্দের সঙ্গে বলবেন—আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের এই ধৈর্য ও ত্যাগ বৃথা যায়নি। আল্লাহ আমাদের সন্তানকে তাঁর দ্বীনের একজন খাদিম হিসেবে কবুল করেছেন।” সেই দিন আপনাদের চোখের অশ্রু হবে আনন্দের অশ্রু, আর সেই আনন্দের মূল কারণ হবে আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত।

মনে রেখো, কোমল ভাষা, উত্তম চরিত্র, আদব এবং আন্তরিকতা মানুষের অন্তর পরিবর্তন করার অন্যতম বড় মাধ্যম। যখন তোমার পরিবার তোমার মধ্যে ইখলাস, তাকওয়া, ইবাদতের প্রতি যত্ন, পড়াশোনার প্রতি একাগ্রতা এবং তাদের প্রতি গভীর সম্মান দেখবে, তখন ইনশাআল্লাহ তারাও ধীরে ধীরে তোমার পথচলার গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন। হয়তো একসময় তারাই তোমাকে বলবেন, “তুমি মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাও। আল্লাহ যতদিন তাওফীক দেন, আমরা আমাদের সাধ্য অনুযায়ী তোমার পাশে থাকার চেষ্টা করব। আমরা তোমার জন্য দোয়া করে যাব, আর তুমি আল্লাহর দ্বীনের ইলম অর্জনে অবিচল থেকো।” তখন তাদের সেই দোয়া, ভালোবাসা ও সমর্থন তোমার ইলমি সফরের অন্যতম বড় শক্তিতে পরিণত হবে, ইনশাআল্লাহ।

প্রিয় ভাই ইয়াসিন,

আলহামদুলিল্লাহ, আমি সবসময় তোমার পাশে আছি এবং যতদিন আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করবেন, ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও তোমার পাশে থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করব। আজ হয়তো অর্থের দিক থেকে তোমাকে তেমন সহযোগিতা করতে পারছি না। এটি আমারও একটি কষ্ট। তবে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যদি আমাকে সামর্থ্য দান করেন, তাহলে আমি আমার সাধ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে তোমার ইলমি সফরে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব। শুধু আর্থিক সহযোগিতাই নয়; বরং পরামর্শ, মুযাকারা, মুতালাআ, তাহকীক এবং যেকোনো ইলমি প্রয়োজনে তোমার পাশে থাকার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।

তুমিও সর্বদা আল্লাহ তাআলার কাছে এই দোয়া করবে—“হে আল্লাহ! অর্থের সংকট যেন কখনো আমার ইলম অর্জনের পথে প্রতিবন্ধক না হয়। দারিদ্র্য কিংবা অভাব যেন আমাকে আপনার দ্বীনের ইলম থেকে বঞ্চিত না করে। হে আল্লাহ! আমার স্বপ্ন যেন অর্থের অভাবে থেমে না যায়। আপনি আমাকে এমন রিযিক দান করুন, যা হালাল, বরকতময় এবং আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের সহায়ক। আপনি আমার হৃদয়কে ইলমের প্রতি অটল রাখুন এবং আমার প্রয়োজনগুলো আপনার অশেষ অনুগ্রহে পূরণ করে দিন।”

আর এভাবেও আল্লাহর দরবারে মিনতি করবে—“হে আমার রব! আমার যখন যে কিতাবের প্রয়োজন হবে, আপনি আপনার অনুগ্রহে তার ব্যবস্থা করে দিন। ফিকহের গভীরতা অর্জনের জন্য যে কিতাবগুলো দরকার, আপনি তা সহজ করে দিন। তাফসীর বোঝার জন্য যে গ্রন্থগুলো প্রয়োজন, সেগুলো আমার নসীব করুন। হাদিস, উসূল, আকীদা, আরবি ভাষা, নাহু, সরফ, বালাগাত, আরবি আদব এবং অন্যান্য শরঈ উলূমের যেসব নির্ভরযোগ্য কিতাব আমার ইলমি সফরের জন্য প্রয়োজন, সেগুলো আপনার রহমতে আমার জন্য সহজলভ্য করে দিন। আমাকে এমন মানুষদের সঙ্গ দান করুন, যাদের মাধ্যমে আমি উপকারী ইলম অর্জন করতে পারি, এবং এমন রিযিক দান করুন, যার বরকতে আমি ইলমের খিদমত অব্যাহত রাখতে পারি।”

মনে রেখো, বান্দা যখন একান্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে চায়, তখন আল্লাহ তাআলা এমন সব উপায় সৃষ্টি করে দেন, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে। কখনো কোনো উস্তাদের মাধ্যমে, কখনো কোনো শুভাকাঙ্ক্ষীর মাধ্যমে, কখনো কোনো বন্ধু কিংবা দানশীল মানুষের মাধ্যমে, আবার কখনো এমন পথ দিয়ে আল্লাহ সাহায্য করেন, যা আগে কখনো কল্পনাও করা যায়নি। তাই মানুষের ওপর নির্ভর করার আগে আল্লাহর ওপর ভরসা করো এবং তাঁর কাছেই সবচেয়ে বেশি চাও।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

﴿وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾

“যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।”

— (সূরা আত-তালাক: ৩)

আর রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, দোয়া মুমিনের অন্যতম বড় শক্তি। তাই দোয়াকে কখনো হালকাভাবে নেবে না। রাতের নির্জনতায়, সিজদায়, ফরজ সালাতের পরে এবং বিশেষ সময়গুলোতে আল্লাহর কাছে নিজের সব প্রয়োজন খুলে বলবে। তিনি এমন রব, যিনি বান্দার ডাক শুনেন, তাঁর দরবার থেকে কাউকে নিরাশ ফিরিয়ে দেন না।

প্রিয় ভাই, জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়; সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাঁর সাহায্য এবং তাঁর সান্নিধ্য। যদি আল্লাহ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হন, তবে অভাবও তোমার জন্য কল্যাণের কারণ হয়ে যাবে; আর যদি তিনি তোমার সহায় হন, তবে পৃথিবীর কোনো অভাব তোমাকে প্রকৃত অর্থে পরাজিত করতে পারবে না। তাই সর্বদা এই দোয়া করবে—“হে আল্লাহ! আপনি আমার অভিভাবক হয়ে থাকুন, আমার অন্তরকে আপনার সঙ্গে যুক্ত রাখুন, আমার ইলমে বরকত দান করুন এবং আমাকে এমন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা আজীবন আপনার দ্বীনের খিদমতে নিবেদিত থাকে।”

মনে রেখো, যার সঙ্গে আল্লাহ আছেন, সে কখনো একা নয়। যার ভরসা আল্লাহ, তার আশা কখনো নিঃশেষ হয় না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য বানায়, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জগতেই তার জন্য কল্যাণের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। তাই মানুষের কাছে নয়, সর্বাগ্রে আল্লাহর কাছেই চাও, তাঁর ওপরই পূর্ণ ভরসা রাখো এবং তাঁরই রহমতের আশা নিয়ে ইলমের এই পবিত্র সফর অব্যাহত রাখো।

প্রিয় ভাই ইয়াসিন,

মনে রেখো, একজন তালিবুল ইলমের প্রকৃত সম্পদ তার কিতাব। যে যত বেশি কিতাবের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তার ইলমের জগৎ তত বিস্তৃত হয়। তবে একটি বিষয় বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে হবে—প্রয়োজনীয় সব কিতাব সব সময় নিজের পক্ষে ক্রয় করা সম্ভব হয় না। পৃথিবীর বড় বড় উলামায়ে কেরামের জীবন পড়লে দেখা যায়, তাঁদের অনেকেই আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অসংখ্য কিতাব কিনতে পারেননি; কিন্তু তাঁরা কখনো কিতাবের মুতালাআ বন্ধ করেননি। কারণ তাঁরা জানতেন, কিতাবের মালিক হওয়ার চেয়ে কিতাব থেকে উপকৃত হওয়াই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

তাই কোনো কিতাব কিনতে না পারলে হতাশ হবে না। বরং সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার করবে। যখনই দেখবে কোনো সহপাঠী, বড় ভাই কিংবা কোনো উস্তাদের কাছে তোমার প্রয়োজনীয় একটি কিতাব রয়েছে, তখন অত্যন্ত আদব ও বিনয়ের সঙ্গে বলবে, “ভাই, যদি দুই-এক দিনের জন্য কিতাবটি আমাকে দিতেন, তাহলে আমি অনেক উপকৃত হতাম। ইনশাআল্লাহ খুব যত্নের সঙ্গে পড়ে সময়মতো ফিরিয়ে দেব।” মানুষের কাছ থেকে কিতাব ধার নেওয়া কোনো লজ্জার বিষয় নয়; বরং এটি তালিবুল ইলমের বহু পুরোনো একটি সুন্নাতসদৃশ ইলমি সংস্কৃতি। তবে ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে কিতাবের পূর্ণ হেফাজত করবে, কোনো দাগ দেবে না, পৃষ্ঠা নষ্ট করবে না এবং নির্ধারিত সময়ে সুন্দরভাবে ফিরিয়ে দেবে। একজন তালিবুল ইলমের আমানতদারিতা তার চরিত্রের অন্যতম অলংকার।

তুমি যদি সত্যিকার অর্থেই ইলমের প্রতি ব্যাকুল হও, তাহলে দেখবে আল্লাহ তাআলা কিতাবের জন্য নানাভাবে দরজা খুলে দেবেন। কখনো কোনো উস্তাদের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি থেকে, কখনো কোনো বন্ধুর সংগ্রহ থেকে, কখনো কোনো মাদ্রাসার গ্রন্থাগার থেকে, আবার কখনো কোনো শুভাকাঙ্ক্ষীর উপহারের মাধ্যমে আল্লাহ তোমার জন্য প্রয়োজনীয় কিতাবের ব্যবস্থা করে দেবেন। তাই কিতাবের অভাবের অভিযোগ করার আগে নিজের আগ্রহের অভাব আছে কি না—সেটি যাচাই করবে। কারণ যার অন্তরে ইলমের প্রকৃত পিপাসা থাকে, আল্লাহ তার জন্য ইলমের উপকরণও সহজ করে দেন।

দেখবে, আমাদের অনেক আকাবির উলামায়ে কেরাম আজও নতুন নতুন কিতাবের সন্ধানে থাকেন। তাঁদের গবেষণার অন্যতম রহস্যই হলো—তাঁরা নিজেদেরকে কখনো “পূর্ণ” মনে করেন না। সুযোগ পেলেই নতুন গ্রন্থ, নতুন তাহকীক, নতুন সংস্করণ এবং নতুন গবেষণা খুঁজে দেখেন। উদাহরণস্বরূপ, মুফতি আব্দুল মালেক-এর ব্যাপারে সুপরিচিত যে, তিনি নতুন প্রকাশিত ইলমি কিতাব ও গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ রাখেন এবং সুযোগমতো গ্রন্থাগারে গিয়ে বিভিন্ন কিতাব পর্যালোচনা ও মুতালাআ করেন। একজন গবেষণামনস্ক আলেমের এই বৈশিষ্ট্য একজন তালিবুল ইলমের জন্যও অনুসরণীয়।

আর যদি মহান আল্লাহ তাআলা ভবিষ্যতে তোমার জন্য জামিয়াতুন নূর-এ বা এমন কোনো সমৃদ্ধ ইলমি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার তাওফীক দান করেন, তবে সেটিকে আল্লাহর এক বিরাট নিয়ামত মনে করবে। কারণ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে সাধারণত সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, অভিজ্ঞ উস্তাদ, গবেষণামুখী পরিবেশ এবং অসংখ্য দুর্লভ কিতাবের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ থাকে। সেখানে শুধু পাঠ্যবই নয়, বরং বিভিন্ন শাস্ত্রের মূল গ্রন্থ, তাহকীককৃত সংস্করণ, শরহ, হাশিয়া ও গবেষণাধর্মী কিতাবের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। একজন গবেষণাপ্রবণ তালিবুল ইলমের জন্য এটি অত্যন্ত মূল্যবান পরিবেশ।

তবে এমন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার আশা থাকলে তার প্রস্তুতিও আজ থেকেই শুরু করতে হবে। ভর্তি পরীক্ষার ধরন কী হতে পারে, কোন বিষয়গুলোতে অধিক দক্ষতা প্রয়োজন, আরবি ইবারত পড়া, নাহু-সরফ, ফিকহ, হাদিস, তাফসীর এবং অন্যান্য মৌলিক বিষয় কতটা শক্ত করতে হবে—এসব বিষয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা করবে। শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই লক্ষ্য হবে না; বরং সেখানে গিয়ে সর্বোচ্চ উপকার অর্জনের মানসিক প্রস্তুতিও গড়ে তুলবে।

আর যদি আল্লাহ তাআলা সেখানে বা অন্য কোনো উচ্চতর ইলমি প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ দান করেন, তাহলে প্রতিটি দরসকে জীবনের অমূল্য সম্পদ মনে করবে। উস্তাদের প্রতিটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে, গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য সঙ্গে সঙ্গে নোট করবে, বুঝতে অসুবিধা হলে আদবের সঙ্গে প্রশ্ন করবে এবং দরস শেষে অবশ্যই মুযাকারা করবে। উস্তাদদের মুহাযারা, বয়ান, নসীহত, প্রশ্নোত্তর—কোনো কিছুই অবহেলা করবে না। অনেক সময় একটি সংক্ষিপ্ত নসীহত বা একটি ছোট্ট ইলমি ইশারা এমন উপকার বয়ে আনে, যা দীর্ঘদিনের মুতালাআ থেকেও সহজে অর্জিত হয় না।

মনে রেখো, একটি ভালো লাইব্রেরি, একটি ভালো উস্তাদ এবং একটি ভালো ইলমি পরিবেশ—এই তিনটি একজন তালিবুল ইলমের জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামতের অন্তর্ভুক্ত। তাই কিতাবের সঙ্গে আজীবনের সম্পর্ক গড়ে তোলো। কিতাবকে শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, বরং জীবন গঠনের সঙ্গী বানাও। যে ব্যক্তি কিতাবের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, কিতাবও তাকে কখনো নিরাশ করে না; আর যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে ইলমের সন্ধান করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য ইলমের পথ, কিতাবের পথ এবং উপকারী উস্তাদদের পথ ক্রমশ সহজ করে দেন।

প্রিয় ভাই ইয়াসিন,

আর এই বছরই সম্ভবত আমার বর্তমান মারহালার পড়াশোনা সমাপ্ত হবে। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা তাওফীক দিলে আগামী বছর আমি তাখাসসুসের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করব। তখন হয়তো আমরা আগের মতো প্রতিদিন একসঙ্গে থাকতে পারব না। হয়তো আমাদের মাঝে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হবে। কিন্তু মনে রেখো, স্থানগত দূরত্ব কখনো হৃদয়ের দূরত্ব নয়। একজন আন্তরিক শুভাকাঙ্ক্ষীর দোয়া, ভালোবাসা ও নসীহত দূরত্বের কারণে কখনো কমে যায় না।

গত একটি বছর আল্লাহ তাআলা আমাকে তোমার পাশে থাকার সুযোগ দিয়েছেন। এই সময়ে আমি যতটুকু পেরেছি তোমাকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, ইলমের পথ সম্পর্কে বলেছি, মাদ্রাসার জীবন সম্পর্কে বলেছি, মুতালাআ, মুযাকারা, আদব, সময়ের মূল্য, উস্তাদদের হক, সহপাঠীদের সঙ্গে আচরণ—এসব বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতার আলোকে তোমার সঙ্গে অনেক কথা ভাগ করে নিয়েছি। যদি আমার কোনো কথার মাধ্যমে তোমার সামান্যও উপকার হয়ে থাকে, তাহলে সেটি একমাত্র আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ।

আগামী বছর যদি আমরা একসঙ্গে থাকতে না-ও পারি, তবুও কখনো মন খারাপ করবে না, নিজেকে একা মনে করবে না এবং কোনো অবস্থাতেই ভেঙে পড়বে না। কারণ আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহর রহমতে তুমি এখন অনেক কিছুই বুঝতে শিখেছ। কীভাবে মাদ্রাসায় চলতে হয়, কীভাবে দরসে মনোযোগ দিতে হয়, কীভাবে উস্তাদদের সম্মান করতে হয়, কীভাবে সহপাঠীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে হয়, কীভাবে সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হয় এবং কীভাবে একজন তালিবুল ইলম নিজের দিনকে সাজায়—এসব বিষয় ধীরে ধীরে তোমার আয়ত্তে চলে এসেছে। এখন থেকে তোমাকে নিজের ভেতরে আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস এবং আত্মনির্ভরতার গুণ আরও দৃঢ়ভাবে গড়ে তুলতে হবে।

মনে রেখো, জীবনের প্রতিটি মারহালায় একজন মানুষকে ধীরে ধীরে নিজের দায়িত্ব নিজেকেই গ্রহণ করতে হয়। তাই ভবিষ্যতে অনেক কাজ তোমাকে নিজ উদ্যোগে সম্পন্ন করতে হবে। নিজের সময় নিজেকেই পরিকল্পনা করতে হবে, পড়াশোনার জন্য নির্দিষ্ট সময় বের করতে হবে, মুতালাআ, মুখস্থ, পুনরাবৃত্তি এবং নোট তৈরির কাজ নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে। যে ছাত্র নিজের সময়কে নিজে পরিচালনা করতে শেখে, আল্লাহ তাআলা তার সময়ের মধ্যেই বরকত দান করেন।

মাদ্রাসার জীবনে শুধু পড়াশোনাই নয়, ইজতিমায়ী অনেক দায়িত্বও থাকে। কখনো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ, কখনো খাবার পরিবেশন, কখনো অতিথি আপ্যায়ন, কখনো উস্তাদদের দেওয়া কোনো দায়িত্ব, আবার কখনো মাদ্রাসার অন্য কোনো খিদমত। মনে রাখবে, এগুলো কখনো অতিরিক্ত বোঝা নয়; বরং এগুলোও একজন তালিবুল ইলমের তারবিয়াতের অংশ। তাই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ যখনই কোনো দায়িত্ব দেবে, সেটিকে আন্তরিকতা, আমানতদারিতা ও ইহসানের সঙ্গে সম্পন্ন করার চেষ্টা করবে। ছোট কোনো খিদমতকে কখনো তুচ্ছ মনে করবে না। অনেক সময় একটি আন্তরিক খিদমত এমন বরকতের কারণ হয়ে যায়, যা বহু ইলমি আলোচনার চেয়েও অধিক ফলপ্রসূ হয়।

আমি তোমার জন্য যে লেখাগুলো প্রস্তুত করেছি, সেগুলো শুধু একবার পড়ে রেখে দেওয়ার জন্য নয়। সময়ে সময়ে আবার পড়বে, চিন্তা করবে, নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে এবং প্রয়োজনে নোট করবে। যখনই তুমি এই লেখাগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়বে, তখন হয়তো আমি তোমার পাশে বসে থাকব না; কিন্তু আশা করি, লেখার প্রতিটি বাক্যের মধ্যে তুমি আমার আন্তরিক নসীহতের সুর অনুভব করবে। যেন আমি আবারও তোমাকে বলছি—“প্রিয় ইয়াসিন, মনোযোগ দিয়ে পড়ো, ইলমকে ভালোবাসো, নিজের চরিত্রকে সুন্দর করো, একজন নেক মানুষ হও, একজন রব্বানী আলেম হও এবং এমনভাবে জীবন গড়ো, যাতে আল্লাহ তাআলা তোমাকে তাঁর দ্বীনের একজন কবুলকৃত খাদিম হিসেবে গ্রহণ করেন।”

আর এখন থেকে যে আলোচনাগুলো তুমি পড়বে, সেগুলো খুব মনোযোগের সঙ্গে পড়বে। শুধু পড়ে শেষ করবে না; বরং বুঝবে, নোট করবে, প্রয়োজনে উস্তাদদের কাছে জিজ্ঞাসা করবে এবং জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। কারণ প্রকৃত ইলম সেই ইলম, যা মানুষের চরিত্র, চিন্তা ও আমলের মধ্যে প্রতিফলিত হয়।

আমি যেখানেই থাকি না কেন, ইনশাআল্লাহ তোমার খবর নেওয়ার চেষ্টা করব। সুযোগ হলে তোমার সঙ্গে দেখা করব, তোমার পড়াশোনার অগ্রগতি জানব এবং যতটুকু পারি তোমাকে পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করব। তাই কখনো এই চিন্তা করবে না যে তুমি একা হয়ে গেছ। বরং যেকোনো পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলবে। কারণ একজন প্রকৃত তালিবুল ইলম পরিবেশের ওপর নির্ভর করে না; সে তার লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রতিটি পরিবেশকে ইলম অর্জনের উপযোগী করে তোলে।

ভবিষ্যতের পথ দীর্ঘ। সামনে নতুন নতুন মারহালা আসবে, নতুন নতুন দায়িত্ব আসবে, নতুন নতুন চ্যালেঞ্জও আসবে। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দিলে, সময়ে সময়ে আমি আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী তোমাকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করব। আর তুমি তোমার পক্ষ থেকে একটিই কাজ করবে—নিয়মিত পড়াশোনা করবে, উস্তাদদের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় রাখবে, পরীক্ষায় সর্বোত্তম ফলাফল অর্জনের চেষ্টা করবে এবং ইলমের সফরকে কখনো থামিয়ে দেবে না।

মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে আমার আন্তরিক দোয়া—হে আল্লাহ! আপনি ইয়াসিনকে কবুল করুন, তাকে মাকবুল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, তার ইলমে, আমলে, আখলাকে এবং তাকওয়ায় বরকত দান করুন। তাকে কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ ইলমের একজন বিশ্বস্ত বাহক হিসেবে গড়ে তুলুন এবং তার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে হিদায়াতের আলো দান করুন।

আর প্রিয় ভাই, তুমি আমার জন্যও বিশেষভাবে দোয়া করবে। আল্লাহ তাআলা যেন আমাকে ইখলাস, তাকওয়া, সহীহ ইলম, হিকমত, ধৈর্য এবং মানুষের উপকার করার তাওফীক দান করেন। তিনি যেন আমাকে এমন যোগ্যতা দান করেন, যার মাধ্যমে আমি তোমার মতো আগ্রহী তালিবুল ইলমদের ইলমের পথে সহযোগিতা করতে পারি, তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারি এবং আল্লাহর দ্বীনের খিদমতে নিবেদিতপ্রাণ উলামায়ে কেরামের কাতারে পৌঁছানোর জন্য তাদের উপকারী সঙ্গী হতে পারি। যদি আল্লাহ তাআলা আমার এই সামান্য প্রচেষ্টাকে কবুল করেন, তবে সেটিই হবে আমার জীবনের অন্যতম বড় সৌভাগ্য। আল্লাহ আমাদের উভয়কে তাঁর দ্বীনের জন্য কবুল করুন এবং আমাদের জীবনকে কুরআন, সুন্নাহ ও ইখলাসের আলোয় পরিপূর্ণ করে দিন। আমীন।


Comments

Popular posts from this blog

🌸 শুরু কথা: ফুলের মত সুন্দর জীবন

SSC ইংরেজি: সাধারণ ভুল ও কমন প্রশ্ন-উত্তর

ذِكْرَى رِحْلَةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الطَّائِف