ইয়াসিন 1

 

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, প্রিয় ইয়াসিন।

আশা করি, আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতে তুমি ভালো আছো এবং পরিপূর্ণ সুস্থতার সঙ্গে দ্বীনি ইলম অর্জনের পথে অগ্রসর হচ্ছ। আলহামদুলিল্লাহ, দেখতে দেখতে সময় কত দ্রুত চলে গেল! মনে হয় যেন সেদিনই তুমি নাহবেমির জামাতে ভর্তি হলে, আর আজ আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহে তোমার প্রথম সাময়িক পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়ে গেল। সময়ের এই অগ্রযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একজন তালিবুল ইলমের জীবন প্রতিটি দিন, প্রতিটি মাস ও প্রতিটি বছর নতুন নতুন জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হতে থাকে।

প্রিয় ভাই, ইলম অর্জনের পথ কখনো সহজ নয়; কিন্তু এটি পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পথগুলোর একটি। এই পথেই নবী-রাসূলগণ মানুষকে পরিচালিত করেছেন, সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং যুগে যুগে অসংখ্য মুহাক্কিক, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ফকীহ উম্মাহর জন্য অমূল্য অবদান রেখে গেছেন। আজ তুমি সেই বরকতময় পথের একজন পথিক। এটি নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার এক মহান নিয়ামত।

আলহামদুলিল্লাহ, ধীরে ধীরে তোমার ইলম বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিটি ক্লাস, প্রতিটি পাঠ এবং প্রতিটি পরীক্ষার মাধ্যমে তুমি জ্ঞানের নতুন নতুন স্তরে প্রবেশ করছ। আজ তুমি এমন অনেক পরিভাষা, ইস্তিলাহ (اصطلاحات) ও বৈজ্ঞানিক শব্দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছ, যেগুলো একসময় তোমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। তুমি বিভিন্ন ফনের (علوم) সঙ্গে পরিচিত হচ্ছ—কখনো নাহুর সূক্ষ্ম নিয়ম, কখনো সরফের রূপান্তরের সৌন্দর্য, কখনো আরবি সাহিত্য ও বালাগাতের অলংকার, আবার কখনো কুরআন ও হাদিসের গভীর অর্থ অনুধাবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছ। এভাবেই একজন তালিবুল ইলম ধাপে ধাপে নিজের জ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণ করে।

এক সময় ছিল, যখন নাহু ও সরফের নাম শুনলেও হয়তো এর প্রকৃত তাৎপর্য তোমার কাছে স্পষ্ট ছিল না। ই'রাব, আমিল, মা'মূল, মাবনি, মু'রাব কিংবা বিভিন্ন সরফি সীগাহ—এসব বিষয় তোমার কাছে নতুন ছিল। আরবি সাহিত্য, বালাগাত, ফাসাহাত ও আরবদের ভাষার সৌন্দর্যও তখনো তোমার অজানা ছিল। কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহে, নিয়মিত অধ্যবসায়, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে তুমি ধীরে ধীরে এসব বিষয় আয়ত্ত করার পথে এগিয়ে যাচ্ছ। এটাই একজন প্রকৃত ছাত্রের পরিচয়—সে প্রতিদিন নিজেকে আগের দিনের চেয়ে একটু বেশি সমৃদ্ধ করে।

মনে রাখবে, ইলম এমন একটি সম্পদ, যা কখনো শেষ হয় না। যতই শিখবে, ততই উপলব্ধি করবে যে, শেখার এখনও অনেক কিছু বাকি রয়েছে। প্রকৃত আলেমরা নিজেদেরকে কখনো জ্ঞানের শেষ প্রান্তে মনে করেন না; বরং প্রতিটি নতুন জ্ঞান তাদের মধ্যে আরও বিনয়, আরও অনুসন্ধিৎসা এবং আরও শেখার আগ্রহ সৃষ্টি করে। তাই কখনো অহংকার নয়; বরং বিনয়, একাগ্রতা এবং নিয়মিত অধ্যয়নই হবে তোমার স্থায়ী সঙ্গী।

তুমি যে পথে চলছ, সেটি শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার পথ নয়; বরং কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামী ঐতিহ্যের গভীর জ্ঞান অর্জনের পথ। এই পথের লক্ষ্য শুধু তথ্য সংগ্রহ করা নয়; বরং এমন ইলম অর্জন করা, যা মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে, চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে এবং মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়তা করে। তাই তোমার প্রতিটি অধ্যয়নের সঙ্গে আমল, ইখলাস ও আল্লাহভীতিকে যুক্ত রাখবে।

প্রিয় ভাই ইয়াসিন, তোমার এই সুন্দর অগ্রযাত্রাকে আমি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। আমি আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করি, তিনি যেন তোমার জন্য ইলমের দরজাগুলো আরও প্রশস্ত করে দেন, তোমার বুঝশক্তি বৃদ্ধি করেন, তোমার স্মৃতিশক্তিকে বরকতময় করেন এবং তোমাকে এমন ইলম দান করেন, যা তোমার নিজের জন্য, উম্মাহর জন্য এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য কল্যাণের কারণ হবে।

আমি আরও দোয়া করি, আল্লাহ তাআলা যেন তোমাকে ইলমের সুবিশাল প্রান্তরে বিচরণ করার তাওফিক দান করেন। তুমি যেন নাহু, সরফ, ফিকহ, তাফসির, হাদিস, উসূল, আরবি সাহিত্য এবং ইসলামের অন্যান্য সকল ফনে গভীর দক্ষতা অর্জন করতে পারো। তোমার জ্ঞান যেন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং তোমার চরিত্র, আমল, দাওয়াত ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার সুন্দর প্রতিফলন দেখা যায়। আল্লাহ তাআলা তোমাকে এমন একজন উপকারী আলেম হিসেবে কবুল করুন, যার দ্বারা দ্বীনের খেদমত হবে এবং মানুষ হেদায়াতের আলো খুঁজে পাবে।

প্রিয় ভাই ইয়াসিন,

আলহামদুলিল্লাহ, আজ যখন তোমার ইলমি সফরের দিকে ফিরে তাকাই, তখন আল্লাহ তাআলার অশেষ অনুগ্রহ স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারি। বছরের শুরুতে যখন তুমি নতুনভাবে ইলমের পথে যাত্রা শুরু করেছিলে, তখন তোমার সামনে ছিল একটি সম্পূর্ণ নতুন জগৎ। দ্বীনি শিক্ষার বিশাল অঙ্গন, ইলমের পরিভাষা, বিভিন্ন ফনের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং একজন তালিবুল ইলমের দায়িত্ব সম্পর্কে তখন তোমার ধারণা ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের। এটি ছিল খুবই স্বাভাবিক; কারণ প্রত্যেক বড় আলেমের যাত্রাও একদিন এভাবেই একটি ছোট পদক্ষেপ দিয়ে শুরু হয়েছিল।

সে সময় তোমার জন্য আমি "ইলমের পথে আমাদের করণীয়" শিরোনামে যে লেখাগুলো প্রস্তুত করেছিলাম, সেগুলো মূলত একটি ভূমিকা ছিল। সেখানে আমি কোনো জটিল ইলমি পরিভাষা, দীর্ঘ তাহকিকী আলোচনা বা মতভেদের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে প্রবেশ করিনি। বরং চেষ্টা করেছি সহজ, প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় একজন নবীন তালিবুল ইলমের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক বিষয়গুলো তুলে ধরতে। আমার উদ্দেশ্য ছিল—তুমি যেন ইলমকে ভালোবাসতে শেখো, ইলমের মর্যাদা উপলব্ধি করো এবং একজন ছাত্র হিসেবে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে পারো।

কারণ শিক্ষাদানের একটি মৌলিক নীতি হলো, শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ও মানসিক প্রস্তুতি অনুযায়ী তাকে শিক্ষা প্রদান করা। ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে একদিনে সবকিছু শিক্ষা দেননি; বরং ধাপে ধাপে, সময় ও প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের শিক্ষা দিয়েছেন। পরবর্তীকালে মুহাদ্দিস, ফকীহ ও উসূলবিদগণও এই নীতিকেই অনুসরণ করেছেন। তাই একজন ছাত্রকে তার সামর্থ্যের বাইরে জটিল আলোচনায় প্রবেশ করিয়ে বিভ্রান্ত না করে, ধীরে ধীরে ইলমের উচ্চতর স্তরে নিয়ে যাওয়াই হলো সঠিক পদ্ধতি।

আলহামদুলিল্লাহ, আজ তুমি সেই প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করে আরও এক ধাপ সামনে এগিয়েছ। নাহু, সরফ, আরবি ভাষার মৌলিক কাঠামো, বিভিন্ন ইলমি পরিভাষা এবং মাদরাসার পাঠ্যক্রমের সঙ্গে এখন তোমার একটি পরিচিতি তৈরি হয়েছে। যদিও এটি এখনও ইলমের সূচনা মাত্র, তবুও এই সূচনাই ভবিষ্যতের গভীর অধ্যয়নের ভিত্তি। যে ভিত্তি যত দৃঢ় হবে, তার ওপর নির্মিত ইলমের অট্টালিকাও তত মজবুত হবে।

এই কারণেই এখন থেকে আমাদের আলোচনার ধরনও কিছুটা পরিবর্তিত হবে। আগের তুলনায় বিষয়গুলো আরও গভীর হবে, ইলমি হবে এবং প্রয়োজনে তাহকিকের দিকও স্পর্শ করবে। বিভিন্ন ইলমি পরিভাষা, মূলনীতি, বিশ্লেষণ এবং ফনের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা আসবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আলোচনা তোমার সামর্থ্যের বাইরে চলে যাবে। বরং আমি সর্বদা চেষ্টা করব তোমার বর্তমান ইলমি অবস্থান, বুঝশক্তি এবং অধ্যয়নের স্তর বিবেচনা করেই প্রতিটি বিষয় উপস্থাপন করতে।

একজন বিজ্ঞ শিক্ষক কখনো শিক্ষার্থীকে এমন বিষয়ের ভার দেন না, যা তার জন্য বহন করা কঠিন হয়ে যায়। আবার এমনও নয় যে, সে কেবল সহজ বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে। বরং প্রকৃত শিক্ষা হলো—প্রতিটি নতুন পাঠ শিক্ষার্থীর আগের জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হবে এবং ধীরে ধীরে তাকে উচ্চতর স্তরে উন্নীত করবে। এই ধারাবাহিক অগ্রগতিই একজন তালিবুল ইলমকে একদিন গভীর গবেষক, মুহাক্কিক ও উপকারী আলেমে পরিণত করে।

তাই এখন থেকে তুমি যে লেখাগুলো পড়বে, সেগুলো শুধু অনুপ্রেরণামূলক নসিহত হিসেবে নয়; বরং ইলমি চিন্তা গঠনের একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করবে। প্রতিটি আলোচনা মনোযোগ দিয়ে পড়বে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নোট করবে, অপরিচিত পরিভাষার অর্থ জানার চেষ্টা করবে এবং প্রয়োজনে শিক্ষকদের কাছে জিজ্ঞাসা করবে। কারণ একজন প্রকৃত তালিবুল ইলমের বৈশিষ্ট্য হলো—সে শুধু পড়ে না; বরং বুঝে, চিন্তা করে, প্রশ্ন করে, গবেষণা করে এবং ধীরে ধীরে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে।

মনে রাখবে, এই লেখাগুলোর সঙ্গে তোমার ভবিষ্যতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এগুলো শুধু বর্তমান পাঠ্যক্রমের জন্য নয়; বরং তোমার চিন্তাশক্তি, ইলমি মানসিকতা, গবেষণার যোগ্যতা এবং দ্বীনি ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য রচিত হচ্ছে। যদি তুমি ধৈর্য, একাগ্রতা ও নিয়মিত অধ্যবসায়ের মাধ্যমে এগুলো অধ্যয়ন করো, তাহলে ইনশাআল্লাহ এগুলো তোমার ইলমি সফরে মূল্যবান পাথেয় হয়ে থাকবে এবং ভবিষ্যতে উচ্চতর ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে দৃঢ় ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

প্রিয় ভাই, ইলমের পথে সফলতা শুধু অধিক পড়ার মাধ্যমে অর্জিত হয় না; বরং সঠিক পদ্ধতিতে, ধাপে ধাপে, গভীর মনোযোগের সঙ্গে অধ্যয়নের মাধ্যমে অর্জিত হয়। তাই প্রতিটি লেখা গুরুত্বের সঙ্গে পড়বে, চিন্তা করবে এবং নিজের ইলমি জীবনকে প্রতিনিয়ত আরও পরিণত করার চেষ্টা করবে। আল্লাহ তাআলা যেন তোমার জন্য ইলমের দরজাগুলো আরও উন্মুক্ত করে দেন, তোমাকে নাফে' ইলম, বিশুদ্ধ বুঝ এবং সহিহ আমলের তাওফিক দান করেন।

প্রিয় ভাই ইয়াসিন,

আলহামদুলিল্লাহ, আজ তোমাকে একটি অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ জানাতে চাই। তোমার ইলমি সফরকে আরও সমৃদ্ধ, সুসংগঠিত এবং গভীর করার উদ্দেশ্যে আমি একটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। দীর্ঘ সময় ধরে বাছাই করে আল-কাউসার-এর শিক্ষার্থীদের পাতা এবং বিশেষভাবে হযরত মাওলানা মুফতি আব্দুল মালেক (দামাত বারাকাতুহুম)-এর লিখিত প্রবন্ধসমূহ থেকে তোমার বর্তমান ইলমি স্তর ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনা নির্বাচন করেছি। এগুলোকে প্রায় একশত পৃষ্ঠার একটি সংকলনের আকারে তোমার জন্য প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছি।

প্রিয় ভাই, একজন তালিবুল ইলমের প্রকৃত উন্নতি কেবল দরসে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয় না; বরং নিয়মিত মুতালাআ (مطالعة), গভীর চিন্তা, গবেষণামূলক অধ্যয়ন এবং বিজ্ঞ আলেমদের রচনার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমেই তার ইলমি ব্যক্তিত্ব বিকশিত হয়। মাদরাসার পাঠ্যক্রম একজন ছাত্রকে ইলমের ভিত্তি প্রদান করে, কিন্তু সেই ভিত্তির ওপর শক্তিশালী ইলমি ভবন নির্মাণ হয় অতিরিক্ত মুতালাআ, নিরবচ্ছিন্ন অধ্যয়ন এবং আহলে ইলমের চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে।

মুফতি আব্দুল মালেক (দামাত বারাকাতুহুম)-এর রচনাগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—সেখানে ইলমের গভীরতা, তাহকীক, দলিলনির্ভর আলোচনা, পরিমিত ভাষা, সাহিত্যিক সৌন্দর্য এবং একজন তালিবুল ইলমের জন্য প্রয়োজনীয় আদব ও মানহাজ অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর প্রতিটি প্রবন্ধ শুধু তথ্যসমৃদ্ধ নয়; বরং চিন্তার দিগন্ত উন্মোচনকারী। একজন মনোযোগী পাঠক যখন তাঁর লেখা নিয়মিত অধ্যয়ন করে, তখন তার ভাষার পরিশুদ্ধি, চিন্তার পরিপক্বতা এবং ইলমি রুচি ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যদি তুমি এই প্রবন্ধগুলো ধৈর্য, মনোযোগ ও নিয়মিততার সঙ্গে অধ্যয়ন করো, তাহলে ইনশাআল্লাহ তোমার ইলমি জীবনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। তোমার ভাষাজ্ঞান সমৃদ্ধ হবে, নতুন নতুন ইলমি পরিভাষার সঙ্গে পরিচয় ঘটবে, গবেষণামূলক চিন্তাশক্তি বিকশিত হবে এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্লেষণ করার যোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে তুমি উপলব্ধি করতে পারবে যে, একটি ইলমি প্রবন্ধ কীভাবে পরিকল্পিত হয়, কীভাবে একটি বিষয়কে ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করা হয়, কীভাবে দলিল ও যুক্তির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী আলোচনা উপস্থাপন করা হয় এবং কীভাবে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ভাষায় একটি বিষয় পাঠকের সামনে তুলে ধরা যায়।

মনে রাখবে, একজন সফল তালিবুল ইলম শুধু কিতাব পড়ে না; বরং কিতাবের সঙ্গে কথা বলে। সে প্রতিটি বাক্য নিয়ে চিন্তা করে, লেখকের উদ্দেশ্য অনুধাবন করে, দলিলের উৎস খুঁজে দেখে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলাদা করে এবং নিজের জ্ঞানের সঙ্গে সেগুলোর সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা করে। এভাবেই একজন সাধারণ পাঠক ধীরে ধীরে একজন গবেষণামনস্ক ছাত্রে পরিণত হয়।

এই কারণেই আমি তোমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি—এই প্রবন্ধগুলো কখনো তাড়াহুড়ো করে বা অমনোযোগের সঙ্গে পড়বে না। যখন তোমার মন সম্পূর্ণ প্রশান্ত থাকবে, মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবে এবং অধ্যয়নের উপযুক্ত পরিবেশ থাকবে, তখনই মুতালাআ করবে। কারণ ইলমি মুতালাআর উদ্দেশ্য শুধু একটি লেখা শেষ করা নয়; বরং লেখকের চিন্তা ও বক্তব্যকে নিজের অন্তরে ধারণ করা। অনেক সময় একটি মাত্র অনুচ্ছেদ গভীরভাবে বোঝা, পুরো একটি প্রবন্ধ দ্রুত পড়ে শেষ করার চেয়েও অধিক উপকারী হতে পারে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস আজ থেকেই গড়ে তুলবে। যখনই কোনো কিতাব, প্রবন্ধ বা ইলমি লেখা মুতালাআ করবে, তখন অবশ্যই তোমার পাশে একটি স্বতন্ত্র নোট খাতা থাকবে। এটি হবে তোমার ব্যক্তিগত ইলমি নোটবুক। এই খাতার উদ্দেশ্য একটিই—মুতালাআর সময় যে বিষয়গুলো তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, নতুন, গভীর বা চিন্তার উদ্রেককারী মনে হবে, সেগুলো সেখানে সংরক্ষণ করা।

নোট গ্রহণের ক্ষেত্রেও একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি অনুসরণ করবে। প্রতিটি নোটের শুরুতে তারিখ, বার, কিতাব বা প্রবন্ধের নাম, লেখকের নাম এবং প্রয়োজনে পৃষ্ঠাসংখ্যা লিখবে। এরপর সংক্ষিপ্ত অথচ স্পষ্ট ভাষায় মূল বক্তব্য লিপিবদ্ধ করবে। কোনো নতুন পরিভাষা পেলে তার অর্থ লিখবে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি পেলে তা সংরক্ষণ করবে এবং কোনো বিষয় নিয়ে নিজের মনে প্রশ্ন জাগলে সেটিও নোট করবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নোটবুকই তোমার ব্যক্তিগত ইলমি ভাণ্ডারে পরিণত হবে।

বিশেষভাবে মনে রাখবে, এই নোট খাতা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করবে না। এটি ব্যক্তিগত হিসাব, সাধারণ লেখা কিংবা অন্য কোনো বিষয়ের জন্য নয়। এটি হবে শুধুমাত্র মুতালাআ, তাহকীক, ইলমি ফাওয়ায়েদ, গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি, নতুন পরিভাষা এবং গবেষণামূলক নোট সংরক্ষণের জন্য। একজন গবেষক ও মুহাক্কিকের পরিচয়ের অন্যতম লক্ষণ হলো—তার ব্যক্তিগত ইলমি নোটসমূহ সুসংরক্ষিত থাকে। বহু বড় বড় আলেমের ইলমি ভাণ্ডারের পেছনে এমন হাজার হাজার নোটের ইতিহাস রয়েছে।

প্রিয় ভাই, আমি আশা করি তুমি এই সংকলনকে একটি সাধারণ পাঠ্য হিসেবে নয়; বরং তোমার ইলমি জীবনের একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে গ্রহণ করবে। নিয়মিত মুতালাআ, ধারাবাহিক নোট গ্রহণ, পুনরালোচনা এবং শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা—এই চারটি বিষয়কে যদি তোমার জীবনের স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করতে পারো, তাহলে ইনশাআল্লাহ অল্প সময়ের মধ্যেই তোমার চিন্তাশক্তি, ভাষা, গবেষণার যোগ্যতা এবং ইলমি পরিপক্বতায় স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করবে। আল্লাহ তাআলা তোমাকে নাফে' ইলম, গভীর ফাহম, বিশুদ্ধ মানহাজ এবং ইখলাসের সঙ্গে দ্বীনের খেদমত করার তাওফিক দান করুন।


Comments

Popular posts from this blog

🌸 শুরু কথা: ফুলের মত সুন্দর জীবন

SSC ইংরেজি: সাধারণ ভুল ও কমন প্রশ্ন-উত্তর

ذِكْرَى رِحْلَةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الطَّائِف