ইলম ছাড়া দ্বীনের বিষয়ে কথা বলা: আমাদের দায়িত্ব ও সতর্কতা
ইলম ছাড়া দ্বীনের বিষয়ে কথা বলা: আমাদের দায়িত্ব ও সতর্কতা
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
আমাদের সমাজে একটি মারাত্মক স্বভাব দিন দিন বিস্তৃত হয়ে যাচ্ছে। আমরা এমন অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলি যেগুলো সম্পর্কে আমাদের প্রকৃত জ্ঞান নেই। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো—সে নিজের মতামত প্রকাশ করতে চায়, আলোচনা করতে চায়, অন্যদের সামনে কিছু বলতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো পৃথিবীর অসংখ্য বিষয় রয়েছে যেগুলো আমাদের জানার বাইরে। মানুষের জ্ঞান সীমিত, আর আল্লাহ তাআলার জ্ঞান সীমাহীন। তাই ইসলামের শিক্ষা হলো—মানুষ যেন তার জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং যেটুকু জানে শুধু সেটুকুই বলে।
বিশেষ করে যখন বিষয়টি কুরআন ও হাদিসের মতো পবিত্র জ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত হয়, তখন বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। কারণ কুরআন ও হাদিস কোনো সাধারণ সাহিত্য নয়, কোনো সাধারণ বই নয়। এটি আল্লাহ তাআলার দ্বীন, যা মানুষের হিদায়াতের পথ নির্ধারণ করে। তাই এই বিষয় নিয়ে কথা বলা মানে শুধু একটি মতামত দেওয়া নয়; বরং এটি একটি বড় দায়িত্ব গ্রহণ করা।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন—“তোমরা সেই বিষয়ে কথা বলো না যার সম্পর্কে তোমাদের কোনো জ্ঞান নেই।” এই আয়াতের মধ্যে একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। অর্থাৎ যে বিষয় সম্পর্কে আমাদের নিশ্চিত জ্ঞান নেই, সেই বিষয়ে মতামত দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। কারণ জ্ঞান ছাড়া কথা বলা অনেক সময় ভুলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এই বিষয়ে আমাদেরকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন—যে ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়া কুরআনের বিষয়ে কথা বলে, সে যেন নিজের জন্য জাহান্নামের স্থান প্রস্তুত করে। এই হাদিসটি আমাদেরকে বুঝিয়ে দেয় যে কুরআন সম্পর্কে কথা বলা কত বড় দায়িত্বের বিষয়। এটি কোনো সাধারণ আলোচনা নয়; বরং এটি এমন একটি বিষয় যা মানুষের ঈমান ও আমলের সাথে জড়িত।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজকের যুগে আমরা এমন একটি বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি যেখানে অনেক মানুষ কুরআন ও হাদিস নিয়ে আলোচনা করছে অথচ তাদের কাছে সেই আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় ইলম নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এখন যে কেউ খুব সহজেই একটি লেখা তৈরি করতে পারে এবং হাজার হাজার মানুষের সামনে তা প্রকাশ করতে পারে।
বর্তমান সময়কে আমরা প্রযুক্তির যুগ বলি। গুগল, বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নানা সফটওয়্যার মানুষের জন্য তথ্য খুঁজে পাওয়া সহজ করে দিয়েছে। এই প্রযুক্তিগুলো নিঃসন্দেহে একটি বড় নিয়ামত। এগুলোর মাধ্যমে মানুষ দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয় যখন মানুষ এই তথ্যগুলোকে যাচাই না করেই সত্য হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে।
আজ আমরা দেখতে পাই—অনেকেই বিভিন্ন সফটওয়্যার বা অনলাইন মাধ্যম থেকে কিছু লেখা কপি করে কুরআন ও হাদিসের বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। সেই লেখাগুলো তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে এবং মনে করে যে তারা দ্বীনের একটি বড় খেদমত করে ফেলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই লেখাগুলো কি সত্যিই নির্ভরযোগ্য? এগুলো কি কুরআন ও হাদিসের প্রকৃত মানদণ্ড?
যদি সেই লেখার মধ্যে কোনো ভুল থাকে, তাহলে একজন সাধারণ মানুষ কি সেই ভুল ধরতে পারবে? যদি কেউ কুরআনের আরবি ইবারত পড়তে না পারে, যদি কেউ হাদিসের সনদ ও রাবিদের পরিচয় সম্পর্কে কিছুই না জানে, তাহলে সে কীভাবে বুঝবে যে কোন বক্তব্যটি সঠিক আর কোনটি ভুল?
কুরআন ও হাদিসের আলোচনা একটি অত্যন্ত গভীর বিষয়। এটি শুধু অনুবাদ পড়ে বোঝা যায় না। এর জন্য আরবি ভাষার গভীর জ্ঞান, তাফসিরের জ্ঞান, উসুলুল ফিকহ, উসুলুল হাদিস, এবং ইসলামি শিক্ষার দীর্ঘ অধ্যয়নের প্রয়োজন হয়।
ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই—মহান মুহাদ্দিস ও ফকিহরা একটি হাদিস যাচাই করার জন্য বছরের পর বছর পরিশ্রম করেছেন। তারা দূর দূরান্তে ভ্রমণ করেছেন, রাবিদের চরিত্র পরীক্ষা করেছেন, বিভিন্ন কিতাবের তুলনা করেছেন। এই কঠিন গবেষণার মাধ্যমে তারা হাদিসের সত্যতা নির্ধারণ করেছেন।
একইভাবে কুরআনের তাফসিরও কোনো সহজ বিষয় নয়। একটি আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা বুঝতে হলে সেই আয়াতের ভাষাগত দিক, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, অন্যান্য আয়াতের সাথে সম্পর্ক এবং নবীজির ব্যাখ্যা—সবকিছু জানা প্রয়োজন।
তাই যখন কোনো ব্যক্তি এই বিষয়গুলো না জেনেই কুরআন ও হাদিস নিয়ে আলোচনা শুরু করে, তখন অনেক সময় সে অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল ছড়িয়ে দেয়। সেই ভুলের কারণে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে এবং দ্বীনের বিষয়ে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
আমাদের উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা নয়। বরং এটি একটি আন্তরিক নসিহত। যারা সত্যিই দ্বীনের জন্য কিছু করতে চান, তাদের উচিত প্রথমে নিজের জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
ইসলামের ইতিহাসে বড় বড় আলেমদের জীবনে আমরা বিনয়ের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। তারা কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানলে স্পষ্টভাবে বলতেন—“আমি জানি না।” অথচ তারা ছিলেন সেই যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম।
ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহর একটি বিখ্যাত ঘটনা রয়েছে। এক ব্যক্তি দূর দেশ থেকে এসে তাকে বহু প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি সেই প্রশ্নগুলোর অনেকগুলোর উত্তরে বলেছিলেন—“আমি জানি না।” তখন সেই ব্যক্তি অবাক হয়ে বলেছিলেন—“আপনি তো এত বড় আলেম, আপনি জানেন না?” তখন ইমাম মালিক বলেছিলেন—“মানুষকে বলো, মালিক জানে না।”
এই ঘটনা আমাদেরকে একটি বড় শিক্ষা দেয়। না জানা কোনো লজ্জার বিষয় নয়। বরং না জেনেও কথা বলা প্রকৃত লজ্জার বিষয়।
আজকের যুগে প্রযুক্তিকে আমরা অবশ্যই ব্যবহার করব। কিন্তু সেই ব্যবহার হতে হবে সতর্কতার সাথে। যদি আমরা প্রযুক্তির সাহায্যে কোনো তথ্য পাই, তাহলে সেটিকে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের উচিত নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে যাচাই করা, আলেমদের কাছে জিজ্ঞাসা করা এবং নিশ্চিত হওয়ার পরই কোনো কথা বলা।
কারণ কুরআন ও হাদিসের বিষয়ে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়া শুধু একটি সাধারণ ভুল নয়; এটি মানুষের ঈমানের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই আমাদের উচিত বিনয়ী হওয়া, ইলম অর্জনের চেষ্টা করা এবং প্রকৃত আলেমদের কাছ থেকে শেখা।
যদি আমরা সত্যিই দ্বীনের খেদমত করতে চাই, তাহলে আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজেদেরকে ইলমের পথে এগিয়ে নেওয়া। ধীরে ধীরে শিখতে হবে, বুঝতে হবে, তারপর কথা বলতে হবে।
কারণ ইলমের আলো ছাড়া কথা বলা অনেক সময় অন্ধকার ছড়ানোর মতো হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সত্য বুঝার তাওফিক দান করুন, ইলমের প্রতি ভালোবাসা দান করুন এবং আমাদেরকে এমন কথা বলা থেকে রক্ষা করুন যা আমাদের জানা নেই।
Comments
Post a Comment