শেষ দশকের ডাক: ই‘তিকাফ, শবে কদরের অনুসন্ধান ও মুমিনের জাগরণ
শেষ দশকের ডাক: ই‘তিকাফ, শবে কদরের অনুসন্ধান ও মুমিনের জাগরণ
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের জীবনে আবারও এক মহামূল্যবান সময় এসে উপস্থিত হয়েছে। রমজানের দিনগুলো দ্রুত অতিক্রান্ত হয়ে যায়, আর হঠাৎ করেই আমরা দেখতে পাই—শেষ দশক এসে গেছে। এই শেষ দশক এমন একটি সময়, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম একটি রাত—লাইলাতুল কদর। যে রাতের মর্যাদা, ফজিলত এবং বরকতের কথা কুরআনুল কারীমে নিজেই ঘোষণা করেছেন মহান আল্লাহ তাআলা। একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্যের বিষয় আর কী হতে পারে যে, সে এমন একটি সময়ের সম্মুখীন হয়েছে, যেখানে সামান্য ইবাদতও অগণিত সওয়াবের কারণ হয়ে যায়।
রমজানের শেষ দশকে মসজিদে ই‘তিকাফে বসা এবং লাইলাতুল কদরের সন্ধান করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত। এটি কেবল একটি ইবাদত নয়; বরং এটি একটি আত্মিক বিপ্লব। যখন মানুষ দুনিয়ার ব্যস্ততা, বাজার, ব্যবসা, মোবাইল, কথাবার্তা—সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর ঘরে এসে বসে, তখন তার হৃদয়ে নতুন এক আলোর সূচনা হয়।
মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ই‘তিকাফের ব্যাপারে ইঙ্গিত করে বলেন:
وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ
“তোমরা যখন মসজিদে ই‘তিকাফে অবস্থান করো তখন স্ত্রীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো না।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৭)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ই‘তিকাফ একটি স্বীকৃত ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর মাধ্যমে বান্দা দুনিয়ার সবকিছু থেকে নিজেকে আলাদা করে আল্লাহর দরবারে অবস্থান করে। যেন সে বলছে—হে আল্লাহ! আমি তোমার ঘরে এসে বসেছি, তোমার রহমত ছাড়া আমার আর কোনো আশ্রয় নেই।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে আমরা দেখি, তিনি নিয়মিত রমজানের শেষ দশকে ই‘তিকাফ করতেন। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:
كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللَّهُ
“রাসূলুল্লাহ ﷺ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত রমজানের শেষ দশকে ই‘তিকাফ করতেন।”
(সহিহ বুখারি)
এই হাদিস আমাদেরকে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন নিষ্পাপ, তাঁর পূর্বের ও পরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিল। তবুও তিনি এই দশকে এমনভাবে ইবাদতে মগ্ন থাকতেন যেন তিনি নতুন করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চান। তাহলে আমরা, যারা প্রতিনিয়ত গুনাহে জড়িয়ে পড়ি, আমাদের কত বেশি দরকার এই সময়কে কাজে লাগানো!
রমজানের শেষ দশক শুধু একটি সময় নয়; এটি আত্মশুদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ। এই দশকে মানুষের হৃদয় নরম হয়, দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়, আর রহমতের দরজা খুলে যায়। বিশেষ করে লাইলাতুল কদরের সন্ধান করা এই দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
মহান আল্লাহ বলেন:
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ
“নিশ্চয়ই আমি কুরআন নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আর তুমি কি জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” (সূরা আল-কদর)
হাজার মাস মানে প্রায় তিরাশি বছরেরও বেশি সময়। অর্থাৎ একজন মানুষ যদি এই একটি রাত ইবাদতে কাটায়, তাহলে সে যেন তিরাশি বছরের ইবাদতের সমান সওয়াব অর্জন করতে পারে। ভাবো, আল্লাহ আমাদের জন্য কত বড় সুযোগ খুলে দিয়েছেন!
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদতে দাঁড়াবে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
এই হাদিসের ভেতরে লুকিয়ে আছে মুমিনের জন্য বিরাট সুসংবাদ। আমরা যারা অতীতের ভুল, গুনাহ ও অবহেলার কারণে অন্তরে ভার অনুভব করি, তাদের জন্য এই রাত হতে পারে নতুন জীবনের সূচনা।
উলামায়ে কেরাম বলেন, লাইলাতুল কদর মূলত আল্লাহর বিশেষ রহমতের রাত। ইমাম ইবনে কাসির রহ. বলেন—এই রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং রহমতের দরজা খুলে যায়। যারা আল্লাহর স্মরণে রাত কাটায়, তাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন আল্লাহ তাআলা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ শেষ দশক শুরু হলে নিজেও ইবাদতে আরো বেশি মনোযোগ দিতেন এবং তাঁর পরিবারকেও জাগিয়ে দিতেন। হাদিসে এসেছে:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ وَأَحْيَا لَيْلَهُ وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ
“রমজানের শেষ দশক প্রবেশ করলে রাসূলুল্লাহ ﷺ কোমর বেঁধে ইবাদতে লেগে যেতেন, রাত জাগতেন এবং পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন।” (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, এই দশক সাধারণ দশক নয়। এটি এমন একটি সময়, যখন একজন মুমিনকে দুনিয়ার ব্যস্ততা কমিয়ে ইবাদতের দিকে মনোযোগী হতে হয়।
ই‘তিকাফের মূল উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর করা। একজন মানুষ যখন মসজিদে ই‘তিকাফে বসে, তখন সে নিজের হৃদয়কে গুনাহ থেকে পরিষ্কার করার সুযোগ পায়। দুনিয়ার কোলাহল থেকে দূরে থেকে সে আল্লাহর স্মরণে সময় কাটায়—কুরআন তিলাওয়াত করে, দোয়া করে, তওবা করে, ইস্তিগফার করে।
হযরত ইমাম যুহরি রহ. একবার বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন—মানুষ কীভাবে ই‘তিকাফ ছেড়ে দেয়! অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ জীবনের শেষ পর্যন্ত এই সুন্নতকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন।
ই‘তিকাফে বসা মানে শুধু মসজিদে থাকা নয়; বরং এটি নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা, সময়কে মূল্য দেওয়া এবং আল্লাহর সাথে একান্ত সম্পর্ক স্থাপন করা। এখানে মানুষের হৃদয় ধীরে ধীরে নরম হয়, চোখে অশ্রু আসে, দোয়া আন্তরিক হয়ে ওঠে।
অনেক সময় আমরা দুনিয়ার কাজের চাপে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে, নিজের আত্মার কথা ভুলে যাই। কিন্তু ই‘তিকাফ সেই ভুলে যাওয়া আত্মাকে আবার জাগিয়ে তোলে। এটি মানুষের হৃদয়ে নতুন করে ঈমানের আলো জ্বালিয়ে দেয়।
ভাবো, যদি আমরা এই শেষ দশকে মসজিদে বসে আল্লাহর কাছে কাঁদি, তাঁর কাছে ক্ষমা চাই, তাঁর কাছে জান্নাত চাই—তাহলে কি তিনি আমাদের ফিরিয়ে দেবেন? আল্লাহ তো নিজেই বলেন:
ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
“তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।”
লাইলাতুল কদরের রাতগুলোতে বিশেষ একটি দোয়া পড়তে রাসূলুল্লাহ ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত আয়েশা রা. জিজ্ঞেস করেছিলেন—যদি আমি লাইলাতুল কদর পাই তাহলে কী দোয়া করব? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ العَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
“হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।”
এই দোয়ার মধ্যে রয়েছে এক অসীম গভীরতা। মানুষ তার জীবনের সমস্ত ভুল নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায় এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চায়।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমাদের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। আমরা জানি না আগামী বছর রমজান পর্যন্ত আমরা বেঁচে থাকব কি না। হয়তো এটাই আমাদের জীবনের শেষ রমজান। যদি এমন হয়, তাহলে কি আমরা এই শেষ দশককে অবহেলা করতে পারি?
আসুন আমরা সবাই নিয়ত করি—আমরা এই শেষ দশককে মূল্যবান করে তুলব। আমরা চেষ্টা করব ই‘তিকাফে বসতে, অন্তত কিছু সময় মসজিদে কাটাতে, কুরআনের সাথে সম্পর্ক গভীর করতে। আমরা রাতগুলো জাগব, দোয়া করব, কান্না করব, আল্লাহর কাছে ফিরে আসব।
হয়তো এই রাতগুলোর কোনো এক রাতে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। হয়তো এই রাতেই আমাদের ভাগ্য বদলে যাবে। হয়তো এই রাতেই আমাদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে যাবে।
রমজানের শেষ দশক তাই আমাদের জন্য এক মহান সুযোগ। এটি এমন একটি সময়, যখন একজন মানুষ তার অতীতের সব ভুল মুছে দিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে।
আসুন আমরা সবাই আন্তরিক নিয়ত করি—আমরা লাইলাতুল কদরের সন্ধান করব, আমরা ইবাদতে রাত কাটাব, আমরা আল্লাহর দরবারে নিজেদের সমর্পণ করব। যেন কিয়ামতের দিন আমরা বলতে পারি—হে আল্লাহ! আমরা চেষ্টা করেছিলাম, আমরা আপনার রহমত কামনা করেছিলাম।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ই‘তিকাফ করার তাওফিক দান করুন, লাইলাতুল কদর পাওয়ার সৌভাগ্য দান করুন এবং আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন। আমীন।
Comments
Post a Comment