রমজান বিদায়ের বেদনায় ঈদের আনন্দ

রমজান বিদায়ের বেদনায় ঈদের আনন্দ

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

আজ ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় হয়ে গেল। গতকাল পর্যন্ত ছিল পবিত্র রমজান মাসের ত্রিশটি রোজা— এই বছরও আমাদের জীবনের একটি রমজান বিদায় নিয়ে চলে গেল। কত দ্রুত যে একটি মাস কেটে গেল! মনে হয় যেন গতকালই আমরা প্রথম রোজা শুরু করেছিলাম, আর আজ ঈদের আনন্দে দাঁড়িয়ে আছি বিদায়ের এক গভীর অনুভূতি নিয়ে।

একটি মাস—কিন্তু কত স্মৃতি, কত অনুভূতি, কত আমল, কত ব্যস্ততা, কত রহমত ও বরকতের মুহূর্ত! এই একটি মাস আমি তারাবির নামাজ পড়িয়েছি, কুরআন তিলাওয়াত করেছি, নামাজে কুরআন খতম দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। প্রতিদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙেছে সাহরির জন্য, আবার সন্ধ্যার সময় অপেক্ষা করেছি ইফতারের সেই মধুর মুহূর্তের জন্য।

কখনো বাড়িতে বসে ইফতার করেছি, কখনো মসজিদের পরিবেশে হুজুরদের সঙ্গে, কখনো মুয়াজ্জিন সাহেব, কখনো হাফেজ সাহেবদের সাথে মিলেমিশে একসাথে ইফতার করার সৌভাগ্য হয়েছে। কখনো বাজারে গিয়ে ইফতারের জন্য বুট, বুন্দিয়া, মুড়ি কিনেছি—যেন প্রতিটি ছোট কাজের মধ্যেও ছিল এক অপার্থিব আনন্দ।

রাত হলেই শুরু হতো তারাবির প্রস্তুতি। কুরআনের আয়াতের সাথে হৃদয়ের এক গভীর সম্পর্ক তৈরি হতো। নামাজের প্রতিটি রাকাতে যেন অনুভব করতাম—এই তো সেই মাস, যে মাসে নাজিল হয়েছে আল-কুরআন। এই মাসেই মানুষ আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হতে পারে।

আজ যখন সেই দিনগুলো স্মরণ করি, তখন মনে হয়—সব যেন একে একে স্মৃতির পাতায় চলে গেল। সাহরি, ইফতার, তারাবি, তাহাজ্জুদ, কুরআন তিলাওয়াত—সবই যেন এক বছরের জন্য আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।

আমরা জানি না—এই রমজান কি আবার আমাদের জীবনে ফিরে আসবে? আগামী বছর আমরা কি আবার এই বরকতময় মাসকে পাবো? নাকি এটাই ছিল আমাদের জীবনের শেষ রমজান? এই প্রশ্নগুলো হৃদয়ের গভীরে নীরব এক কাঁপন সৃষ্টি করে।

আজ ঈদের দিন—আনন্দের দিন। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও হৃদয়ের ভেতর কোথাও যেন এক চাপা কষ্ট কাজ করছে। কারণ দোয়া কবুলের মুহূর্তগুলো বিদায় নিয়ে চলে গেল। কুরআন পড়ার সেই আগ্রহ, সেই ব্যাকুলতা, সেই তৃষ্ণা—যেটা রমজানের প্রতিটি রাতে অনুভব করতাম—সেটা যেন ধীরে ধীরে কমে যেতে শুরু করেছে।

রমজান ছিল মিল-মহব্বতের মাস। ছিল ভালোবাসার মাস। ছিল আত্মশুদ্ধির মাস। মানুষে মানুষে সম্পর্ক গভীর করার মাস। কিন্তু আজ সেই মাসটিও শেষ হয়ে গেল।

হে রমজান! হে সিয়াম! তোমাকে আমরা পেয়েছিলাম, কিন্তু তোমার যথার্থ হক আদায় করতে পারিনি। তোমাকে আমরা গ্রহণ করেছিলাম, কিন্তু যেভাবে তোমার সাথে আচরণ করার কথা ছিল—সেভাবে আচরণ করতে পারিনি। তবুও চেষ্টা করেছি, আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছি—কিন্তু সেই চেষ্টার মধ্যেও কত অপূর্ণতা রয়ে গেছে, তা আল্লাহই ভালো জানেন।

হে তারাবির রাত! তোমার বুকে দাঁড়িয়ে আমরা কুরআন তিলাওয়াত করেছি, খতম দিয়েছি, আল্লাহর দরবারে মাথা নত করেছি— কিন্তু জানি না, সেই তিলাওয়াত কতটুকু কবুল হয়েছে।

হে ইফতার! তুমি ছিলে কত মধুর! বুট, বুন্দিয়া, মুড়ি—এই সাধারণ খাবারগুলোও তোমার কারণে কত সুস্বাদু, কত বরকতময় হয়ে উঠেছিল! আজ তুমি এক বছরের জন্য আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলে।

হে সাহরি! তোমার জন্যই গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যেত। তোমার জন্যই তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার সৌভাগ্য হতো। তোমার জন্যই চোখের কোণে জমে থাকা দুই ফোঁটা অশ্রু আল্লাহর দরবারে নিবেদন করার সুযোগ পেতাম। আজ তুমি নেই—তুমি চলে গেছো।

আজ থেকে আর কেউ গভীর রাতে সাহরির জন্য ডাকবে না। আজ থেকে আর সেই ব্যাকুলতা থাকবে না—“সাহরি শেষ হয়ে যাবে”—এই ভয় নিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ার। আজ থেকে হয়তো তাহাজ্জুদের সেই নিয়মিত অভ্যাসটিও ধীরে ধীরে কমে যাবে।

হে রমজান! তুমি আমাদের শিখিয়ে গেলে ধৈর্য। শিখিয়ে গেলে সংযম। শিখিয়ে গেলে ভালোবাসা। শিখিয়ে গেলে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার পথ।

কিন্তু আফসোস! যারা এই রমজান পেয়েও রোজা রাখেনি— তারা কি জবাব দেবে আল্লাহর কাছে? তারা কি জবাব দেবে এই বরকতময় মাসকে? তারা কি জবাব দেবে সেই অসংখ্য রহমতের মুহূর্তকে, যেগুলো তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল?

আজ ঈদের দিন— একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে বিদায়ের বেদনা। একদিকে হাসি, অন্যদিকে স্মৃতির অশ্রু। একদিকে উৎসব, অন্যদিকে আত্মসমালোচনার মুহূর্ত।

হে আল্লাহ! আমাদের এই সামান্য আমলগুলো কবুল করে নিন। আমাদের অপূর্ণতাগুলো ক্ষমা করে দিন। আমাদের আবার যেন রমজান পাওয়ার সৌভাগ্য দান করেন। আর যদি না পাই— তবে এই রমজানকেই আমাদের জীবনের সর্বোত্তম রমজান হিসেবে কবুল করে নিন।

আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি

🌸 শুরু কথা: ফুলের মত সুন্দর জীবন