প্রকৃত তালিবুল ইলমের পথচলা: কিতাবমুখী জীবনের অঙ্গীকার

প্রকৃত তালিবুল ইলমের পথচলা: কিতাবমুখী জীবনের অঙ্গীকার

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

মাদ্রাসার জীবন একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর জীবনে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়টিই এমন একটি সময় যখন একজন ছাত্র নিজের জীবনকে ইলমের আলোয় আলোকিত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে উম্মাহর একজন আলোকিত পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারে। আমরা যারা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করি—আমাদের কেউ মিযান পড়ি, কেউ নাহবেমীর, কেউ হেদায়াতুন্নাহ, কেউ কাফিয়া, কেউ শরহে বেকায়া, কেউ জালালাইন, আবার কেউ মেশকাত শরীফ অধ্যয়ন করি। প্রত্যেকটি জামাতের প্রতিটি কিতাবের পেছনে রয়েছে শত শত বছরের ইলমি ঐতিহ্য, উলামায়ে কেরামের গভীর গবেষণা এবং উম্মাহর জন্য অমূল্য সম্পদ।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—আমাদের অনেকের মধ্যেই একটি বড় দুর্বলতা দেখা যায়। আমরা এক জামাত থেকে আরেক জামাতে উঠি, কিন্তু সেই জামাতের কিতাবগুলোকে পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারি না। আমরা হয়তো পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উপরের জামাতে চলে যাই, কিন্তু সেই কিতাবের সাথে আমাদের প্রকৃত সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। ফলে কয়েক বছর পরে দেখা যায়—আমরা অনেক জামাত পার হয়ে গেছি, কিন্তু আমাদের ইলমের ভিত ততটা শক্ত নয় যতটা হওয়া উচিত ছিল।

এই বাস্তবতা আমাদেরকে গভীরভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করে। আমরা কি সত্যিই তালিবুল ইলমের হক আদায় করছি? আমরা কি সেই উদ্দেশ্য নিয়ে পড়াশোনা করছি যার জন্য আমাদের পূর্বসূরি উলামায়ে কেরাম নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন?

নতুন বছরের অঙ্গীকার

যখন একটি নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়, তখন আমাদের উচিত একটি দৃঢ় নিয়ত করা। আমরা যে জামাতেই পড়ি না কেন—মিযান, নাহবেমীর, হেদায়াতুন্নাহ, কাফিয়া, শরহে বেকায়া, জালালাইন কিংবা মেশকাত—আমাদের প্রত্যেকের উচিত এই অঙ্গীকার করা যে এই বছর আমরা আমাদের কিতাবগুলো এমনভাবে পড়ব যেন এই কিতাবগুলো আমাদের জীবনের অংশ হয়ে যায়।

আমাদের উচিত নিজের মনে এই প্রতিজ্ঞা করা: “এই বছর আমি আমার জামাতের প্রতিটি কিতাব এমনভাবে পড়ব যেন কিতাবের প্রতিটি লাইন আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। আমার উস্তাদবৃন্দ যেভাবে আমাকে দিকনির্দেশনা দেবেন আমি সেভাবেই চলব।”

তালিবুল ইলমের প্রকৃত পরিচয়

একজন প্রকৃত তালিবুল ইলম কেবল একজন ছাত্র নয়; বরং তিনি ইলমের একজন অনুসন্ধানকারী। তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং দ্বীনের ইলম অর্জনের মাধ্যমে মানুষের মাঝে হিদায়াতের আলো পৌঁছে দেওয়া।

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন— “যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করতে চায় তাকে দরিদ্রতা, কষ্ট ও ধৈর্যের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”

এই কথাটি আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে ইলম অর্জনের পথ সহজ নয়। এটি ত্যাগ, ধৈর্য ও পরিশ্রমের পথ।

কিতাবের সাথে সম্পর্ক

মাদ্রাসার একজন ছাত্রের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পর্ক হওয়া উচিত কিতাবের সাথে। কিতাবই তার বন্ধু, কিতাবই তার সঙ্গী, কিতাবই তার পথপ্রদর্শক।

আমাদের পূর্বসূরি উলামায়ে কেরাম কিতাবের সাথে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন যে তারা ঘুমানোর সময়ও কিতাব পাশে রাখতেন। কেউ কেউ বলেছেন—“আমরা যখন কিতাব খুলে বসতাম তখন সময়ের হিসাবই ভুলে যেতাম।”

এই ভালোবাসা এবং সম্পর্কই একজন তালিবুল ইলমকে প্রকৃত আলিমে দ্বীনে পরিণত করে।

বিভিন্ন ব্যস্ততার সমস্যা

আজকের যুগে তালিবুল ইলমদের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা। কেউ ইংরেজি শেখার প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহী হয়ে পড়ে, কেউ কম্পিউটার শেখার দিকে ঝুঁকে পড়ে, কেউ আবার মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া বা আড্ডার মধ্যে সময় নষ্ট করে।

এই বিষয়গুলো নিজের জায়গায় হয়তো উপকারী হতে পারে, কিন্তু সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয় যখন এগুলো আমাদের মূল কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মাদ্রাসার ছাত্রের মূল কাজ হলো কিতাব পড়া, ইলম অর্জন করা এবং উস্তাদদের কাছ থেকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান গ্রহণ করা।

যদি আমরা এই সময়টাকে অন্য কাজে ব্যয় করি, তাহলে পরে আফসোস ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।

প্রতিটি কিতাব আয়ত্ত করার পদ্ধতি

একজন তালিবুল ইলমের উচিত প্রতিটি কিতাবকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা। শুধু দরসে শুনে চলে যাওয়া যথেষ্ট নয়। বরং দরসের আগে কিতাব পড়া, দরসের পরে পুনরায় পড়া এবং উস্তাদের ব্যাখ্যা নিয়ে চিন্তা করা—এই তিনটি ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম ধাপ হলো—দরসের আগে কিতাব পড়া। এতে করে দরসে বসার সময় বিষয়টি সহজে বোঝা যায়।

দ্বিতীয় ধাপ হলো—দরসের সময় মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নোট করা।

তৃতীয় ধাপ হলো—দরস শেষে কিতাব পুনরায় পড়া এবং যেসব বিষয় বুঝতে অসুবিধা হয় সেগুলো উস্তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করা।

উস্তাদের প্রতি সম্মান

মাদ্রাসার জীবনে উস্তাদদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উস্তাদরা কেবল কিতাব পড়ান না; বরং তারা ছাত্রদের চরিত্র গঠন করেন, তাদেরকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন।

আমাদের উচিত উস্তাদদের প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করা এবং তাদের নির্দেশনা মেনে চলা। কারণ উস্তাদের সন্তুষ্টি ছাড়া ইলমে বরকত আসে না।

মাদ্রাসার জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। কয়েকটি বছর চোখের পলকেই শেষ হয়ে যায়। এই সময়টাকে যদি আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে আমরা ভবিষ্যতে উম্মাহর জন্য উপকারী আলিম হয়ে উঠতে পারব।

তাই আমাদের উচিত নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই একটি দৃঢ় নিয়ত করা—আমরা আমাদের কিতাবের সাথে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলব যা আমাদেরকে প্রকৃত তালিবুল ইলমে পরিণত করবে। আমরা অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকব এবং আমাদের সময়কে ইলম অর্জনের জন্য ব্যয় করব।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি