এসো আল্লাহর বন্ধু হই

এসো আল্লাহর বন্ধু হই

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

মারিয়া ও মাসুমা, তোমরা কেমন আছো আমার স্নেহের দুইটি ছোট্ট প্রাণ? আশা করি আল্লাহর রহমতে তোমরা ভালো আছো, সুস্থ আছো এবং তোমাদের দিনগুলো শান্তি ও আনন্দের মধ্য দিয়ে কেটে যাচ্ছে। মানুষ যখন প্রিয় কাউকে কিছু বলতে চায়, তখন সে খুব ভেবে-চিন্তে কথা বলে—যেন সেই কথাগুলো শুধু শোনা না হয়, বরং হৃদয়ের ভেতরে জায়গা করে নেয়। আজ আমি তোমাদের সাথে ঠিক তেমন কিছু কথাই বলতে চাই। এমন কিছু কথা, যেগুলো শুধু পড়ে শেষ করে দেওয়ার জন্য নয়; বরং বারবার পড়ার জন্য, ভাবার জন্য এবং হৃদয়ে ধারণ করার জন্য।

আজকের এই লেখাগুলো আমি বিশেষভাবে তোমাদের দুজনকে সামনে রেখেই লিখছি। তোমরা আমার কাছে শুধু আত্মীয় নও, তোমরা আমার কাছে এমন দুটি কোমল হৃদয়ের মানুষ, যাদের জীবনের সামনে অনেক বড় পথ খোলা রয়েছে। সেই পথ যেন আলোর পথে যায়, সেই পথ যেন ভালোবাসা, শান্তি আর কল্যাণের পথে যায়—এই কামনাই আমার হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে। সেই কারণেই আমি কিছু দিকনির্দেশনামূলক কথা তোমাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। এগুলো কোনো কঠিন উপদেশ নয়, কোনো ভারী কথা নয়; বরং এমন কিছু সহজ, সুন্দর এবং হৃদয়গ্রাহী কথা, যেগুলো মানুষের জীবনকে ধীরে ধীরে সুন্দর করে তোলে।

তোমরা হয়তো ভাবতে পারো—জীবনের পথ তো অনেক বড়, সেখানে অনেক আনন্দ আছে, অনেক ব্যস্ততা আছে, অনেক স্বপ্ন আছে। ঠিকই, মানুষের জীবনে অনেক কিছু থাকে। কিন্তু সেই সব কিছুর মাঝেও কিছু মূল কথা থাকে, কিছু পথনির্দেশ থাকে, যেগুলো মানুষকে সঠিক পথে রাখে। মানুষ যদি সেই পথগুলোকে মনে রাখে, যদি সেই কথাগুলোকে জীবনের অংশ বানাতে পারে, তাহলে তার জীবন অনেক শান্ত, সুন্দর এবং অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই কারণেই আমি চাই তোমরা আমার এই কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ো। শুধু একবার পড়ে রেখে দেবে না। ধীরে ধীরে পড়বে, বুঝে পড়বে, ভেবে পড়বে। মাঝে মাঝে আবার পড়বে। হয়তো একদিন পড়লে মনে হবে—আচ্ছা, এই কথাটা তো আগে বুঝিনি। আবার কোনোদিন পড়লে মনে হবে—এই কথাটা তো সত্যিই খুব দরকারি। এভাবেই একটি লেখা ধীরে ধীরে মানুষের হৃদয়ের ভেতরে জায়গা করে নেয়।

আমি চাই তোমরা দুজন একসাথে বসে এই লেখাগুলো পড়বে। একজন পড়বে, আরেকজন শুনবে। তারপর আবার অন্যজন পড়বে, আর প্রথমজন শুনবে। যখন একজন আরেকজনকে শুনিয়ে শুনিয়ে পড়ে, তখন সেই কথাগুলো আরও গভীরভাবে মনে বসে যায়। অনেক সময় আমরা একা পড়লে কিছু কথা এড়িয়ে যাই, কিন্তু যখন একসাথে পড়ি তখন সেই কথাগুলো নতুনভাবে ধরা দেয়।

তোমরা যখন এই লেখাগুলো পড়বে, তখন একটু সময় নিয়ে পড়বে। তাড়াহুড়ো করে পড়বে না। প্রতিটি বাক্যের ভেতরে যে অনুভূতি আছে, যে ভালোবাসা আছে, যে দিকনির্দেশ আছে—সেগুলো বোঝার চেষ্টা করবে। ভাববে, এই কথাগুলো তোমাদের জীবনের সাথে কীভাবে মিলিয়ে নেওয়া যায়। মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন সবসময় বড় বড় কাজ দিয়ে শুরু হয় না; অনেক সময় ছোট ছোট উপলব্ধি থেকেই বড় পরিবর্তনের শুরু হয়।

আমি চাই তোমরা অন্তত প্রতি সপ্তাহে একবার হলেও এই লেখাগুলো পড়বে। হয়তো কোনো শান্ত সময়ে বসে আবার পড়বে। দেখবে, প্রতিবার পড়ার সময় নতুন কিছু অনুভব করতে পারছো। নতুন কোনো চিন্তা তোমাদের মনে জন্ম নিচ্ছে। এভাবেই একটি ভালো কথা ধীরে ধীরে মানুষের চরিত্রের অংশ হয়ে যায়।

জীবনে অনেক বই পড়া হয়, অনেক গল্প শোনা হয়, অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু সব কথা মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে না। কিছু কথা থাকে, যেগুলো মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দিতে পারে। আমি চাই আমার এই ছোট ছোট কথাগুলো তোমাদের জীবনে তেমন প্রভাব ফেলুক—যেন তোমাদের জীবন আলোর দিকে এগিয়ে যায়, যেন তোমাদের হৃদয় আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।

আমি সবসময় চাই তোমাদের জীবন আলোকিত হোক। তোমাদের হৃদয়ে যেন ভালোবাসা থাকে, সম্মান থাকে, সত্যের প্রতি আকর্ষণ থাকে। তোমরা যেন এমন মানুষ হয়ে বড় হও, যাদের উপস্থিতি অন্য মানুষের জীবনেও শান্তি নিয়ে আসে। একজন মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার বাহ্যিক সাজে নয়; তার সৌন্দর্য থাকে তার চরিত্রে, তার আচরণে এবং তার হৃদয়ের ভেতরের আলোতে।

এই লেখাগুলো আমি সেই আলোর কথা ভেবেই লিখছি। যেন তোমাদের জীবনের পথ আরও পরিষ্কার হয়, যেন তোমরা বুঝতে পারো জীবনের আসল সৌন্দর্য কোথায়। পৃথিবীর অনেক কিছুই মানুষকে আকর্ষণ করে, কিন্তু সবকিছু মানুষের হৃদয়কে শান্তি দেয় না। সত্যিকারের শান্তি আসে সঠিক পথে চলার মাধ্যমে, ভালো কাজ করার মাধ্যমে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য বানানোর মাধ্যমে।

আল্লাহ তাআলার কাছে আমি আন্তরিকভাবে দোয়া করি—তিনি যেন তোমাদের দুজনকে কবুল করেন, তোমাদের জীবনকে কল্যাণে ভরিয়ে দেন, তোমাদের হৃদয়কে সৎ পথে স্থির রাখেন। তোমরা যেন এমন মানুষ হয়ে উঠতে পারো, যাদের জীবন আল্লাহর নিকট প্রিয় হয়ে ওঠে এবং যাদের উপস্থিতি পৃথিবীতে কল্যাণের কারণ হয়।

আল্লাহ তোমাদের কবুল করুন, মাকবুল বানান, তোমাদের জীবনে আলো দান করুন এবং তোমাদের ভবিষ্যৎকে সুখময়, শান্তিময় ও বরকতময় করে দিন। আমীন।

p> আজ আমি হৃদয়ের গভীর অনুভূতি নিয়ে তোমাদের সামনে কিছু কথা লিখছি। সত্যি বলতে কি, এই মুহূর্তে আমার অন্তরের ভেতরে এক ধরনের প্রশান্তি ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি কাজ করছে। কারণ মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সে উপলব্ধি করে—আল্লাহ তাআলা তাকে একটি বিশেষ সুযোগ দিয়েছেন। আজ আমি ঠিক তেমনই একটি অনুভূতির মধ্য দিয়ে তোমাদের সাথে কথা বলছি। আমি আজ খুবই গর্ব অনুভব করছি যে আমি তোমাদেরকে কিছু কথা বলতে পারছি, তোমাদের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভাগ করে নিতে পারছি। আমার কাছে এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; বরং আমি এটিকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি বড় নিয়ামত হিসেবে মনে করি।

আমরা যখন জীবনের দিকে গভীরভাবে তাকাই, তখন বুঝতে পারি যে মানুষের জীবনে যা কিছু ঘটে, তার পেছনে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাই কাজ করে। আমরা অনেক সময় মনে করি—আমরা নিজেরাই পরিকল্পনা করি, আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিই, আমরা নিজেরাই সবকিছু পরিচালনা করি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আল্লাহ তাআলার হুকুম ছাড়া পৃথিবীতে একটি পাতাও নড়ে না। মানুষের জীবনের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি সাক্ষাৎ, প্রতিটি সুযোগ—সবই আল্লাহর নির্ধারিত পরিকল্পনার অংশ।

আজ তোমাদের সামনে বসে কিংবা এই লেখার মাধ্যমে তোমাদের সাথে কথা বলতে পারছি—এটাও আল্লাহর একটি বিশেষ ব্যবস্থা। তিনি যদি না চাইতেন, তাহলে হয়তো কখনোই এই সুযোগ তৈরি হতো না। এই উপলব্ধি থেকেই আমার হৃদয়ে গভীর কৃতজ্ঞতা জন্ম নেয়। তাই আমি আল্লাহ তাআলার কাছে অনেক শুকরিয়া আদায় করছি যে তিনি আমাকে এমন একটি সুযোগ দিয়েছেন, এমন একটি পথ খুলে দিয়েছেন যার মাধ্যমে আমি তাঁর পথে আহ্বান করার, কিছু ভালো কথা বলার, কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি।

আমার পরিচয় তোমাদের কাছে নতুন নয়, তবে হয়তো সম্পূর্ণভাবে স্পষ্টও নয়। তাই আমি নিজেকে তোমাদের সামনে আবার পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। আমি তোমাদের মামা—মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা। তবে তোমরা আমাকে পারভেজ নামেই চেনো। তোমাদের কাছে আমি সেই পারভেজ মামাই। নাম যাই হোক না কেন, সম্পর্কের সৌন্দর্যই আসল বিষয়। তাই তোমরা আমাকে যেই নামেই ডাকো না কেন, তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তোমাদের সাথে এই সম্পর্ক, এই ভালোবাসার বন্ধন।

জীবনের পথ মানুষকে কখনো কাছাকাছি নিয়ে আসে, আবার কখনো দূরে সরিয়ে দেয়। অনেক সময় এমন হয় যে কাছের মানুষও অনেক বছর দেখা হয় না, কথা হয় না, এমনকি একে অপরের খবরও জানা হয় না। আমার জীবনেও ঠিক তেমনটাই হয়েছে। প্রায় সতেরো বছর পর আমি আবার কিশোরগঞ্জে এসেছি। এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর এই জায়গায় ফিরে আসা আমার জন্য এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে এসেছে।

এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আমি তোমাদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না। সত্যি বলতে কি, আমি কখনোই তোমাদেরকে দেখিনি, তোমাদের সাথে পরিচয় হয়নি, এমনকি তোমাদের নামটাও আমার জানা ছিল না। মানুষ যখন কাউকে না দেখে, না চিনে অনেক বছর পার করে দেয়, তখন সেই অজানা সম্পর্কের ভেতরে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যখন কারো সাথে কারো পরিচয় করিয়ে দিতে চান, তখন সেই দূরত্বও মুহূর্তের মধ্যে দূর হয়ে যায়।

এইবার কিশোরগঞ্জে এসে আমি তোমাদেরকে দেখেছি, চিনেছি এবং তোমাদের সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি। তোমাদের সাথে দেখা হওয়ার পর মনে হয়েছে—আল্লাহ তাআলা সত্যিই একটি নতুন দরজা খুলে দিয়েছেন। এমন একটি সুযোগ দিয়েছেন যার মাধ্যমে আমি তোমাদের সাথে কিছু সময় কাটাতে পারি, কিছু কথা বলতে পারি, কিছু শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি।

এই পুরো রমজান মাস আমি এখানে কাটিয়েছি। রমজান মাস এমন একটি সময় যখন মানুষের হৃদয় একটু নরম হয়, মানুষ আল্লাহর দিকে বেশি মনোযোগ দেয়, নিজের জীবনের কথা একটু বেশি ভাবতে শুরু করে। এই বরকতময় সময়ে তোমাদের কাছে আসতে পেরে, তোমাদেরকে দেখতে পেরে আমার খুব ভালো লেগেছে। এই সময়ের মধ্যে আমি দুইবার তোমাদের বাসায়ও গিয়েছি। সেই সময়গুলো আমার কাছে খুবই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এখন ঈদের দিনগুলোও প্রায় শেষ হয়ে আসছে। ঈদের পর আমাকে আবার চলে যেতে হবে। মানুষের জীবন তো এক জায়গায় থেমে থাকে না; তাকে চলতেই হয়, তাকে আবার নিজের পথ ধরতেই হয়। তাই হয়তো খুব শিগগিরই আমাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। তবে সত্যি কথা বলতে কি, আমি জানি না আবার কবে এখানে আসা হবে, আবার কবে তোমাদের সাথে দেখা হবে। মানুষের পরিকল্পনা থাকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।

এইবার এখানে আসার আগে আমি নিজের মনে একটি পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম—যদি রমজান মাসে এখানে আসার সুযোগ হয়, তাহলে আমি চেষ্টা করব তোমাদেরকে কিছু সময় দেওয়ার। আমি চাইছিলাম তোমাদের সাথে বসে কিছু পড়াশোনা করাতে, তোমাদেরকে কিছু শেখাতে। বিশেষ করে আমি ভেবেছিলাম তোমাদেরকে আরবি ভাষার কিছু বিষয় শেখাবো, মাদ্রাসার পড়াশোনার কিছু অংশ বুঝিয়ে দেবো।

আর একটি বিষয় আমার মনে বিশেষভাবে ছিল। আমি চেয়েছিলাম তোমাদের দুজনকে ইংরেজি ভাষা শেখানোর চেষ্টা করতে। কারণ আজকের পৃথিবীতে ইংরেজি ভাষা জানা একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। আমি ভেবেছিলাম—যদি একটু সময় পাই, তাহলে ধীরে ধীরে তোমাদেরকে কিছু বিষয় বুঝিয়ে দেবো, কিছু অনুশীলন করাবো, যাতে তোমাদের ভবিষ্যতের পড়াশোনায় কিছুটা হলেও উপকার হয়।

কিন্তু মানুষের ইচ্ছা সবসময় বাস্তবতার সাথে মিলে যায় না। সময়ের সীমাবদ্ধতা, দূরত্বের সমস্যা এবং নানা ব্যস্ততার কারণে আমি সেই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারিনি। মারিয়া ও মাসুমা, তোমাদেরকে আমি সেইভাবে সময় দিতে পারিনি যেভাবে দিতে চেয়েছিলাম। আমার মনে যে আশা ছিল—তোমাদেরকে নিয়মিত কিছু শেখাবো, কিছু পড়াবো—সেটাও পূরণ করতে পারিনি।

এই বিষয়টি মাঝে মাঝে আমার মনে এক ধরনের আক্ষেপের জন্ম দেয়। কারণ আমি সত্যিই চাইছিলাম তোমাদের সাথে কিছু সময় কাটাতে, তোমাদেরকে কিছু শেখাতে। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা অনেক সময় মানুষের পরিকল্পনাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। তবুও আমি আশা করি—যে অল্প সময়ে তোমাদেরকে দেখেছি, যে অল্প পরিচয় হয়েছে, সেটিই হয়তো ভবিষ্যতের জন্য একটি সুন্দর সূচনা হয়ে থাকবে।

p> যদিও আমি তোমাদের সাথে নিয়মিত বসে পড়ানোর সুযোগ খুব বেশি পাইনি, তবুও আমি চেষ্টা করেছি যেন তোমাদের জন্য কিছু রেখে যেতে পারি। তাই আমি আমার লেখা একটি কায়দা তোমাদের হাতে দিয়েছি। এই কায়দাটি আমি খুব যত্ন করে লিখেছি, যেন যে কেউ ধীরে ধীরে পড়লে কুরআন মাজীদের সঠিক পাঠ শিখে নিতে পারে। তোমরা যখন এই কায়দাটি পড়বে, তখন তাড়াহুড়ো করবে না। ধীরে ধীরে, মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি হরফ, প্রতিটি হরকত এবং প্রতিটি নিয়ম বোঝার চেষ্টা করবে। যদি তোমরা মন দিয়ে এটি অনুশীলন করো, তাহলে ইনশাআল্লাহ খুব সহজেই কুরআন মাজীদের রিডিং সুন্দর হয়ে যাবে।

আমি জানি তোমরা আগেই কুরআন পড়তে পারো। এটা আমার জন্য খুবই আনন্দের বিষয়। কিন্তু শুধু পড়তে পারা আর সুন্দরভাবে, সঠিকভাবে পড়তে পারা—এই দুইয়ের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কুরআন মাজীদ এমন একটি মহান কিতাব, যার প্রতিটি হরফের ভেতরে রহমত রয়েছে। তাই যখন আমরা কুরআন পড়ি, তখন চেষ্টা করি যেন প্রতিটি শব্দ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারি, প্রতিটি মাখরাজ ঠিকভাবে আদায় করতে পারি এবং প্রতিটি নিয়ম বুঝে পড়তে পারি। তোমরা যদি আমার দেওয়া কায়দাটি ভালো করে পড়ো, তাহলে শুধু কুরআন পড়াই নয়—কুরআনের ভেতরে কোন জায়গায় কোন নিয়ম প্রয়োগ হচ্ছে সেটাও ধীরে ধীরে বুঝতে পারবে।

একটি সময় আসবে যখন তোমরা কুরআনের কোনো আয়াত পড়তে গিয়ে নিজেই বুঝতে পারবে—এখানে নুন সাকিনের নিয়ম আছে, এখানে গুন্নাহ হচ্ছে, এখানে মাদ টানতে হবে, আবার কোথাও কলকলাহ উচ্চারণ করতে হবে। তখন কুরআন পড়া তোমাদের কাছে শুধু একটি পড়াশোনা থাকবে না; বরং এটি হয়ে উঠবে একটি সুন্দর অনুভূতি, একটি প্রশান্তির ইবাদত। তাই আমি চাই তোমরা ধীরে ধীরে, নিয়মিতভাবে এই কায়দাটি পড়বে এবং অনুশীলন করবে।

তোমরা একসাথে বসে পড়তে পারো। একজন পড়বে, আরেকজন শুনবে। তারপর আবার অন্যজন পড়বে, প্রথমজন শুনবে। এতে ভুলগুলো ধরা পড়বে, আবার পড়ার আনন্দও বাড়বে। মনে রেখো, কুরআন শেখা শুধু একটি শিক্ষা নয়—এটি একটি সৌভাগ্য। পৃথিবীর অনেক মানুষ আছে যারা এই সৌভাগ্য পায় না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তোমাদের সেই সুযোগ দিয়েছেন। তাই এই নিয়ামতের মূল্য অবশ্যই বুঝতে হবে।

যাই হোক, জীবনের পথ তো চলতেই থাকে। এখন হয়তো আমাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। হয়তো আবার অনেক দিন পরে দেখা হবে, হয়তো আবার কোনো এক সময় আল্লাহ তাআলা আমাদের সাক্ষাৎ ঘটাবেন। মানুষের জীবন তো সবসময়ই অনিশ্চয়তার মধ্যে চলে। তাই আমি ভেবেছি—যদি আমি চলে যাই, তাহলে অন্তত এমন কিছু তোমাদের কাছে রেখে যাই যা তোমাদের জীবনের পথে সঙ্গী হয়ে থাকবে।

এই কারণেই আমি চাই তোমাদের কাছে একটি আমানত রেখে যেতে। এমন একটি আমানত, যা কখনো তোমাদের সাথে প্রতারণা করবে না, কখনো ভুল পথে নিয়ে যাবে না। মানুষের বন্ধু অনেক সময় বদলে যায়, অনেক সময় দূরে চলে যায়, আবার অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝিও হয়। কিন্তু একটি ভালো বই কখনো মানুষের সাথে প্রতারণা করে না। একটি ভালো বই সবসময় মানুষের জীবনের বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে থাকে।

তাই আমি চেয়েছি তোমাদের কাছে এমন কিছু বই রেখে যেতে, এমন কিছু লেখা দিয়ে যেতে, যেগুলো তোমাদের জীবনের জন্য উপকারি হবে। যখনই তোমরা একা থাকবে, যখনই কোনো প্রশ্ন মনে আসবে, যখনই জীবনের পথ নিয়ে ভাববে—তখন এই লেখাগুলো তোমাদের পাশে থাকবে। একটি ভালো বই অনেক সময় এমন উপদেশ দেয়, যা মানুষ বছরের পর বছর মনে রাখে।

আমি চাই তোমরা এই লেখাগুলোকে শুধু সাধারণ লেখা মনে না করো। এগুলোকে তোমাদের জীবনের বন্ধু মনে করো। যখন ইচ্ছা হবে পড়বে, যখন মন খারাপ হবে তখন পড়বে, আবার যখন ভালো লাগবে তখনও পড়বে। ধীরে ধীরে দেখবে—এই কথাগুলো তোমাদের চিন্তাকে সুন্দর করে দিচ্ছে, তোমাদের হৃদয়কে নরম করে দিচ্ছে এবং তোমাদের জীবনকে আরও আলোকিত করে তুলছে।

আমার এই ছোট্ট প্রচেষ্টার পেছনে একটি বড় আশা লুকিয়ে আছে। আমি চাই তোমাদের পরবর্তী জীবন সুন্দর হোক। তোমরা যেন এমন মানুষ হয়ে বড় হও, যাদের জীবন আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত হয়। তোমাদের চরিত্র সুন্দর হোক, তোমাদের চিন্তা পরিষ্কার হোক, তোমাদের হৃদয় সৎ ও আলোকিত হোক—এই কামনাই আমার অন্তরের গভীর থেকে উঠে আসে।

এই আশাই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে তোমাদের জন্য কিছু কথা লিখতে। তোমাদের ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে আমি কিছু বিষয় ধীরে ধীরে তোমাদের সামনে তুলে ধরব। এই কথাগুলো হয়তো খুব বড় কোনো দর্শন নয়, কিন্তু এগুলো এমন কিছু সত্য, যা মানুষের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে।

তাই মনোযোগ দিয়ে শোনো, মারিয়া ও মাসুমা। তোমাদের এই জীবনটি কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এই জীবনটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তোমাদের হাতে তুলে দেওয়া একটি মূল্যবান আমানত। যেমন কেউ কাউকে মূল্যবান কিছু সংরক্ষণ করার জন্য দেয়, ঠিক তেমনি আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনটাকে আমাদের হাতে দিয়েছেন—যেন আমরা এটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করি, এটিকে সঠিক পথে পরিচালিত করি।

মানুষ যদি এই আমানতের মূল্য বুঝতে পারে, তাহলে সে তার জীবনকে খুব যত্ন করে পরিচালনা করে। সে বুঝতে পারে—এই পৃথিবীর জীবন শুধু খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো বা আনন্দ করার জন্য নয়; বরং এটি একটি দায়িত্ব, একটি পরীক্ষা এবং একটি মহান উদ্দেশ্যের পথে যাত্রা।

p> তোমরা একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখো—এই পৃথিবীতে আমাদের আগমন কি শুধুই কাকতালীয়? আমরা কি অনর্থকভাবে সৃষ্টি হয়েছি? নিশ্চয়ই না। আল্লাহ তাআলা যখন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তখন তিনি কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া তা করেননি। তিনি আমাদেরকে এমনভাবে সৃষ্টি করেননি যে আমরা ইচ্ছামতো জীবন কাটাবো, যেভাবে মন চায় সেভাবেই দিন-রাত পার করব, আর নিজের খেয়ালখুশি মতো চলতে থাকব। মানুষের জীবন এত সস্তা নয়, এত অর্থহীন নয়। বরং মানুষের জীবন একটি মহান উদ্দেশ্যের জন্য সৃষ্টি হয়েছে—আল্লাহকে চিনে নেওয়া, তাঁর নির্দেশ মেনে চলা এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে নিজের জীবনকে পরিচালিত করা।

অনেক সময় মানুষ ভুলে যায় যে সে একজন বান্দা। মানুষ মনে করে—সে স্বাধীন, সে যা খুশি তাই করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা কেউই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নই। আমরা সবাই আল্লাহ তাআলার বান্দা। আর বান্দার জীবনের সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন সে তার রবের নির্দেশ মেনে চলে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরআন মাজীদের মাধ্যমে যে পথ দেখিয়েছেন, সেই পথই মানুষের জন্য প্রকৃত কল্যাণের পথ। তাই আমাদের জীবনকে এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে, যেন তা আল্লাহর নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

মানুষ যদি একটু মনোযোগ দিয়ে নিজের জীবনের দিকে তাকায়, তাহলে সে বুঝতে পারবে—আল্লাহ তাআলা তাকে কত অসংখ্য নিয়ামত দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। প্রতিটি মুহূর্তে আমরা আল্লাহর অগণিত দানের মধ্যে বসবাস করছি। আমরা শ্বাস নিচ্ছি—এটিও একটি নিয়ামত। আমরা খাবার খাচ্ছি—এটিও একটি নিয়ামত। আমরা নিরাপদে চলাফেরা করছি—এটিও একটি নিয়ামত। আসলে এমন কোনো মুহূর্ত নেই, যখন আমরা আল্লাহর দান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকি।

এই নিয়ামতগুলোকে সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করতে হলে একজন বান্দাকে তার রবকে জানতে হবে। আল্লাহ তাআলার পরিচয় জানতে হবে, তাঁর মহত্ত্ব বুঝতে হবে, তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ অনুভব করতে হবে। যখন মানুষ তার রবকে চিনতে শুরু করে, তখন তার হৃদয়ের ভেতরে এক ধরনের বিনয় জন্ম নেয়। তখন সে বুঝতে পারে—সে যা কিছু পেয়েছে, সবই আল্লাহর দান।

তোমরা একটু নিজের দিকে তাকাও। আমরা কত সুন্দরভাবে খাবার খেতে পারি। আমাদের হাত আছে, যার মাধ্যমে আমরা খাবার তুলে মুখে দিতে পারি। আমরা হাঁটতে পারি, দৌড়াতে পারি, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারি। আমরা পড়াশোনা করতে পারি, বই খুলে পড়তে পারি, নতুন কিছু শিখতে পারি। আমরা কথা বলতে পারি, একে অপরের সাথে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি। আমরা ক্লান্ত হলে শান্তিতে ঘুমাতে পারি, আবার সকালে ঘুম থেকে উঠে নতুন দিন শুরু করতে পারি।

এখন একটু ভেবে দেখো—এই সবকিছু কি আমরা নিজেরা তৈরি করেছি? আমরা কি নিজেরা নিজের শরীর বানিয়েছি? আমরা কি নিজেরা নিজের চোখ তৈরি করেছি, নিজের কান তৈরি করেছি, নিজের জিহ্বা তৈরি করেছি? না, এর কোনোটিই আমরা নিজেরা বানাইনি। এগুলো সবই আল্লাহ তাআলার দান। তিনি আমাদেরকে এগুলো দিয়েছেন, তিনি আমাদেরকে এই সুন্দরভাবে জীবন যাপন করার ক্ষমতা দিয়েছেন।

তোমরা হয়তো রাস্তায় কিংবা কোথাও এমন মানুষ দেখেছো, যারা কথা বলতে পারে না। তারা চাইলেও তাদের মনের কথা প্রকাশ করতে পারে না। আবার এমন মানুষও আছে যারা দেখতে পায় না—তাদের চোখ নেই, বা চোখ থাকলেও তারা আলো দেখতে পায় না। কেউ কেউ আবার শুনতে পায় না—পৃথিবীর কোনো শব্দ তাদের কানে পৌঁছায় না। কেউ আছে যারা হাঁটতে পারে না, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না।

যখন আমরা এমন মানুষদের দেখি, তখন আমাদের হৃদয়ে এক ধরনের উপলব্ধি জন্ম নেওয়া উচিত। আমরা বুঝতে পারি—আল্লাহ তাআলা চাইলে আমাদেরকেও ঠিক এমনভাবেই সৃষ্টি করতে পারতেন। তিনি যদি চাইতেন, তাহলে আমরাও হয়তো কথা বলতে পারতাম না, হয়তো আমরা অন্ধ হয়ে জন্মাতাম, হয়তো আমরা বধির হতাম। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম দয়া ও করুণার মাধ্যমে আমাদেরকে সুস্থ শরীর দিয়েছেন।

তিনি আমাদেরকে দুটি হাত দিয়েছেন, যাতে আমরা কাজ করতে পারি, অন্যকে সাহায্য করতে পারি। তিনি আমাদেরকে দুটি পা দিয়েছেন, যাতে আমরা পৃথিবীর পথে চলতে পারি। তিনি আমাদেরকে দুটি চোখ দিয়েছেন, যাতে আমরা পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে পারি এবং সত্যের পথ চিনতে পারি। তিনি আমাদেরকে দুটি কান দিয়েছেন, যাতে আমরা ভালো কথা শুনতে পারি, উপদেশ শুনতে পারি এবং জ্ঞান অর্জন করতে পারি।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—তিনি শুধু এগুলো দিয়েই থেমে থাকেননি; বরং এগুলোকে সুস্থ ও কার্যকরও রেখেছেন। আমাদের হাত কাজ করছে, আমাদের পা শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের চোখ স্পষ্ট দেখতে পারছে, আমাদের কান পরিষ্কারভাবে শুনতে পারছে। আমরা পঙ্গু হয়ে জন্মাইনি, আমরা অসহায় হয়ে পড়ে থাকিনি।

একটু ভেবে দেখো—যদি আল্লাহ তাআলা চাইতেন, তাহলে তিনি আমাদেরকে পঙ্গু বানাতে পারতেন। আমরা হয়তো বিছানায় পড়ে থাকতাম, অন্যের সাহায্য ছাড়া এক পা-ও চলতে পারতাম না। কিন্তু তিনি আমাদেরকে সেই অবস্থায় রাখেননি। তিনি আমাদেরকে সুস্থ শরীর দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন, চলার ক্ষমতা দিয়েছেন।

এই সবকিছুই প্রমাণ করে যে আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি কতটা দয়ালু। তিনি আমাদেরকে শুধু সৃষ্টি করেননি, বরং অসংখ্য নিয়ামত দিয়ে আমাদের জীবনকে সুন্দর করে দিয়েছেন। তাই একজন সচেতন মানুষের উচিত এই নিয়ামতগুলোর মূল্য বোঝা, এগুলোর জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং এই নিয়ামতগুলোকে এমন কাজে ব্যবহার করা, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হয়।

p> তবুও দেখো, আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি কতটা দয়ালু এবং কতটা মেহেরবান। তিনি যদি শুধু আমাদের সৃষ্টি করেই ছেড়ে দিতেন, তাহলেও তো আমাদের কিছু বলার থাকত না। কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং তিনি আমাদেরকে তাঁর অসীম দয়া, ভালোবাসা ও মমতায় ঘিরে রেখেছেন। মানুষ যখন সত্যিই উপলব্ধি করে যে তার রব তাকে কতটা ভালোবাসেন, তখন তার হৃদয় নরম হয়ে যায়। তখন সে বুঝতে পারে—এই পৃথিবীতে সে একা নয়; বরং একজন মহান স্রষ্টার করুণা তাকে প্রতিনিয়ত আগলে রেখেছে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শুধু জীবন দেননি, তিনি আমাদেরকে তাঁর সর্বোচ্চ নিয়ামতগুলোও দান করেছেন। এই নিয়ামতগুলো এতই মূল্যবান যে আমরা অনেক সময় সেগুলোর গুরুত্বই বুঝতে পারি না। যেমন—আমরা খুব সহজভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছি। আমরা হয়তো কখনো ভেবেও দেখি না যে এই শ্বাস-প্রশ্বাসই আমাদের জীবনের মূল ভিত্তি। যদি এক মুহূর্তের জন্য শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে মানুষের সমস্ত শক্তি, সমস্ত ক্ষমতা মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। তাই আমরা যে প্রতিটি মুহূর্তে শ্বাস নিতে পারছি—এটাও আল্লাহ তাআলার এক মহান নিয়ামত।

এই পৃথিবীতে চারদিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই মানুষের জীবন কত রকমের হয়। কেউ খুব কষ্টে জীবন কাটায়, কেউ অভাবের মধ্যে দিন পার করে। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে যারা ঠিকমতো খাবার পায় না। তারা কখনো না খেয়ে দিন কাটায়, কখনো অল্প খাবার নিয়ে জীবন চালায়। আবার এমন মানুষও আছে যাদের জীবনে শান্তি নেই—তাদের ঘুম আসে না, তাদের মনে সবসময় দুশ্চিন্তা আর অশান্তি কাজ করে।

আরও অনেক মানুষ আছে যারা নিজেদের ইচ্ছামতো চলতে পারে না। কেউ অসুস্থতার কারণে কষ্টে থাকে, কেউ পারিবারিক সমস্যার কারণে দুঃখে থাকে, কেউ আবার জীবনের নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। মানুষের জীবন সবসময় সমানভাবে সহজ নয়। পৃথিবীর অনেক মানুষের গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে অনেক কষ্ট, অনেক বেদনা।

কিন্তু এখন একটু নিজের জীবনের দিকে তাকাও। আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে কত সুন্দর একটি পরিবার দিয়েছেন। পরিবার মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। পরিবার এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ ভালোবাসা পায়, নিরাপত্তা পায়, স্নেহ পায়। তোমাদের জীবনে সেই সৌভাগ্য রয়েছে। তোমাদের আপু আছে, তোমাদের বোন আছে, তোমাদের ভাই আছে—তোমরা সবাই একসাথে একটি সুন্দর পরিবারের অংশ হয়ে আছো।

একটি পরিবারের ভেতরে যখন ভালোবাসা থাকে, যখন সবাই একে অপরের প্রতি যত্নশীল থাকে, তখন সেই পরিবার পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তোমরা একসাথে হাসো, একসাথে কথা বলো, একসাথে সময় কাটাও—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য তৈরি করে।

আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করো—তোমরা প্রতিদিন খাবার খেতে পারছো। আল্লাহ তাআলা তোমাদের সামনে প্রতিদিন তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। আমরা অনেক সময় এই বিষয়টিকে খুব সাধারণ মনে করি। কিন্তু যদি আমরা একটু গভীরভাবে ভাবি, তাহলে বুঝতে পারি—এটিও একটি বড় নিয়ামত। পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে যারা প্রতিদিন তিন বেলা খাবার পায় না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তোমাদের সেই অভাবের মধ্যে রাখেননি।

শুধু খাবারই নয়—আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে আরও অনেক কিছু দিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে সম্মান দিয়েছেন, আশ্রয় দিয়েছেন, নিরাপত্তা দিয়েছেন। তোমাদের জীবনকে এমনভাবে সাজিয়ে দিয়েছেন যাতে তোমরা শান্তিতে থাকতে পারো, পড়াশোনা করতে পারো এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারো।

এই সবকিছুই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি বড় দান। এগুলো কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এগুলো এমন নিয়ামত, যার জন্য মানুষের অন্তর থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। একজন সচেতন বান্দা যখন আল্লাহর এই সব দান উপলব্ধি করে, তখন তার হৃদয়ে স্বাভাবিকভাবেই শুকরিয়া জন্ম নেয়।

তাই মারিয়া ও মাসুমা, তোমাদের জীবনে এই উপলব্ধি থাকা খুব জরুরি। তোমাদের বুঝতে হবে—তোমরা যা কিছু পেয়েছো, সবই আল্লাহ তাআলার দান। তাই তোমাদের উচিত সবসময় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের কথা নয়; এটি মানুষের হৃদয়ের অনুভূতি। যখন একজন মানুষ সত্যিই কৃতজ্ঞ হয়, তখন তার আচরণেও সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়।

তোমরা প্রতিদিন আল্লাহ তাআলার কাছে শুকরিয়া আদায় করবে। যখন ভালো কিছু পাবে, তখন বলবে—“আলহামদুলিল্লাহ।” যখন কোনো নিয়ামত অনুভব করবে, তখন বলবে—“আলহামদুলিল্লাহ।” এই একটি শব্দের মধ্যে মানুষের কৃতজ্ঞতার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ রয়েছে।

“আলহামদুলিল্লাহ” শুধু একটি বাক্য নয়; এটি একজন মুমিনের হৃদয়ের ভাষা। এই শব্দের মাধ্যমে মানুষ স্বীকার করে—তার জীবনের সমস্ত প্রশংসা, সমস্ত কৃতিত্ব এবং সমস্ত কল্যাণের উৎস একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তাই তোমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এই কৃতজ্ঞতার অনুভূতি ধরে রাখবে এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতগুলোর মূল্য বুঝে চলার চেষ্টা করবে।

p> তোমরা যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করো, তাহলে একটি বড় সত্য তোমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে—এই পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলা ছাড়া প্রকৃত অর্থে আমাদের আর কেউ নেই। মানুষ জীবনের পথে অনেক মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। আমাদের মা-বাবা আছেন, ভাই-বোন আছে, আত্মীয়-স্বজন আছে, বন্ধু আছে। তারা সবাই আমাদেরকে ভালোবাসেন, আমাদের যত্ন নেন, আমাদের জন্য চেষ্টা করেন। মা-বাবা তো সন্তানের জন্য জীবনের সবকিছু উজাড় করে দেন। তারা তাদের সন্তানকে সুখে রাখতে চান, আরামে রাখতে চান, তাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর করার জন্য নিজেদের অনেক স্বপ্নও ত্যাগ করে দেন।

এই ভালোবাসা সত্যিই অমূল্য। মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন এবং পরিবারের মানুষরা আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা আমাদের জন্য অনেক কিছু করেন, আমাদের কষ্ট কমানোর চেষ্টা করেন, আমাদের আরাম দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এর পরেও একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে—এই সমস্ত ভালোবাসা এবং যত্নের পেছনেও একজন মহান স্রষ্টার ইচ্ছা কাজ করে। প্রকৃত অর্থে আমাদের আসল অভিভাবক, আমাদের প্রকৃত রক্ষক এবং আমাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় একমাত্র আল্লাহ তাআলা।

আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতিটি বান্দাকে অসীম ভালোবাসা দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। মানুষের প্রতি তাঁর দয়া এত বেশি যে আমরা অনেক সময় সেটির গভীরতা উপলব্ধি করতে পারি না। আমরা দিনে কত ভুল করি, কত অবাধ্যতা করি, কত সময় তাঁর আদেশকে অবহেলা করি—তবুও তিনি আমাদের প্রতি তাঁর দয়া বন্ধ করে দেন না। তিনি আমাদেরকে ধ্বংস করে দেন না, বরং বারবার আমাদের সুযোগ দেন যেন আমরা তাঁর দিকে ফিরে আসতে পারি।

তিনি আমাদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার আদেশ দিয়েছেন। নামাজ এমন একটি ইবাদত, যা মানুষের হৃদয়কে তার রবের সাথে যুক্ত করে। কিন্তু আমরা নিজেদের দিকে তাকালে দেখতে পাই—আমরা কি সত্যিই সেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিকমতো আদায় করতে পারি? অনেক সময় অলসতা আমাদের গ্রাস করে, অনেক সময় ব্যস্ততা আমাদের ভুলিয়ে দেয়, আবার কখনো কখনো আমরা নিজেরাই অবহেলা করে ফেলি। অথচ যে আল্লাহ আমাদেরকে এই আদেশ দিয়েছেন, তিনিই তো আমাদের সবকিছু দিয়েছেন।

তোমরা একটু ভেবে দেখো—আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কী দেননি? আমাদের জীবনের জন্য যা যা দরকার, প্রায় সবকিছুই তিনি আমাদের জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। যখন আমাদের যা প্রয়োজন হয়েছে, তিনি কোনো না কোনোভাবে তা আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে জ্ঞান দিয়েছেন, মেধা দিয়েছেন, চিন্তা করার শক্তি দিয়েছেন। সেই মেধাকে ব্যবহার করেই আমরা পড়াশোনা করি, নতুন কিছু শিখি, পৃথিবীর নানা বিষয় বুঝতে পারি।

এই মেধা এবং বুদ্ধি আল্লাহর এক বড় নিয়ামত। আমরা যখন বই পড়ি, কিছু বুঝি, কিছু মনে রাখি—তখন বুঝতে হবে এগুলো সবই তাঁর দেওয়া শক্তির ফল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই শক্তিকে সবসময় সঠিক কাজে ব্যবহার করতে পারছি? আমরা কি নিয়মিত কুরআন মাজীদ পড়তে পারছি? আমরা কি আমাদের রবের সাথে সম্পর্ককে মজবুত করার চেষ্টা করছি?

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত থাকা উচিত, যখন সে একান্তভাবে তার রবের দিকে ফিরে যায়। যখন সে নীরবে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, তাঁর কাছে দোয়া করে, তাঁর কাছে নিজের মনের কথা বলে। কখনো কখনো দু’ফোঁটা চোখের পানি ফেলাও মানুষের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে দেয়। সেই চোখের পানি মানুষের দুর্বলতার নয়; বরং তার আন্তরিকতার পরিচয়।

আমাদের রব আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য কত কিছু করেছেন—আমরা যদি একটু চারদিকে তাকাই, তাহলেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি আমাদের জন্য সকালে সূর্য দিয়েছেন। সূর্যের আলো পৃথিবীকে আলোকিত করে, সেই আলো পেয়েই আমরা দিনের কাজ শুরু করতে পারি। আলো না থাকলে পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যেত, মানুষ কিছুই দেখতে পারত না, কোনো কাজই করতে পারত না।

আবার রাত হলে তিনি আমাদের জন্য চাঁদের আলো দিয়েছেন, অন্ধকারের প্রশান্তি দিয়েছেন। রাতের নিস্তব্ধতা মানুষের ক্লান্ত শরীরকে বিশ্রাম দেয়। আমরা শান্তিতে ঘুমাতে পারি, আমাদের শরীর নতুন শক্তি ফিরে পায়। পরের দিন আবার আমরা নতুন উদ্যম নিয়ে কাজ শুরু করতে পারি।

এই দিন-রাতের পরিবর্তন, সূর্যের আলো, চাঁদের শান্তি—সবকিছুই আল্লাহ তাআলার পরিকল্পনার অংশ। তিনি পৃথিবীকে এমনভাবে পরিচালনা করছেন যাতে মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে। আমরা হয়তো প্রতিদিন এই দৃশ্য দেখি, কিন্তু এর পেছনের মহান ব্যবস্থাপনাকে সবসময় উপলব্ধি করি না।

একটু ভেবে দেখো—যদি আল্লাহ তাআলা সূর্য না দিতেন, যদি তিনি আলো না দিতেন, তাহলে আমরা কীভাবে আমাদের কাজ করতাম? যদি রাত না আসত, যদি বিশ্রামের সুযোগ না থাকত, তাহলে আমাদের শরীর কীভাবে টিকে থাকত? যদি দিন-রাতের এই সুন্দর নিয়ম না থাকত, তাহলে পৃথিবীর জীবনই হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যেত।

তাই যখন আমরা এই সব বিষয় নিয়ে চিন্তা করি, তখন বুঝতে পারি—আমাদের জীবনের প্রতিটি দিকেই আল্লাহ তাআলার করুণা জড়িয়ে আছে। তিনি আমাদের জন্য এমন একটি পৃথিবী তৈরি করেছেন যেখানে আমরা শান্তিতে থাকতে পারি, কাজ করতে পারি, শিখতে পারি এবং ধীরে ধীরে তাঁর দিকে ফিরে যেতে পারি।

p> কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো—মানুষ এত নিয়ামতের মাঝে বসবাস করার পরেও অনেক সময় তার রবকে ভুলে যায়। আমরা প্রতিদিন আল্লাহ তাআলার অসংখ্য দান ভোগ করি, তাঁর করুণা অনুভব করি, কিন্তু অনেক সময় সেই মহান স্রষ্টার কথা আমাদের মনে থাকে না। আমরা অনেক সময় এমনভাবে জীবন কাটাই যেন আমাদের উপর কোনো দায়িত্ব নেই, যেন আমাদের কাজের কোনো হিসাব নেই। অথচ বাস্তবতা হলো—মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহ তাআলার সামনে মূল্যবান, এবং প্রতিটি কাজের জন্য একদিন তাকে জবাবদিহি করতে হবে।

আমরা অনেকভাবে আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয়ে পড়ি। কখনো ইচ্ছা করে, আবার কখনো অসচেতনভাবে। কখনো আমরা বুঝেও ভুল করি, আবার কখনো আমরা ভুলকে স্বাভাবিক মনে করে ফেলি। অথচ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে আমাদের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের একটি সঠিক ব্যবহার আছে, একটি উদ্দেশ্য আছে। কিন্তু আমরা অনেক সময় সেই উদ্দেশ্য ভুলে যাই।

দেখো, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দুটি সুন্দর চোখ দিয়েছেন। এই চোখের মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর অসংখ্য দৃশ্য দেখতে পারি। এই চোখ দিয়ে আমরা কুরআন মাজীদের আয়াত পড়তে পারি, আল্লাহর বাণী দেখতে পারি। এই চোখ দিয়ে আমরা আমাদের মা-বাবার মুখের দিকে তাকাতে পারি। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে—মা-বাবার দিকে ভালোবাসা ও সম্মানের দৃষ্টিতে তাকানোও একটি নেক কাজ। যখন একজন সন্তান তার অভিভাবকের দিকে স্নেহভরা চোখে তাকায়, তখন আল্লাহ তাআলা তার জন্য সওয়াব লিখে দেন।

কিন্তু আমরা কি সবসময় এই চোখের সঠিক ব্যবহার করতে পারি? অনেক সময় আমরা এই চোখকে এমন কাজে ব্যবহার করি, যেগুলো একেবারেই প্রয়োজনীয় নয়, বরং ক্ষতিকর। আমরা মোবাইল ফোনে, ল্যাপটপে কিংবা বিভিন্ন স্ক্রিনে এমন অনেক ছবি ও দৃশ্য দেখি, যা আমাদের সময় নষ্ট করে দেয়। কখনো আমরা অপ্রয়োজনীয় নাটক দেখি, কখনো অযথা ভিডিও দেখি, আবার কখনো এমন কিছু বিষয় দেখি যা আমাদের হৃদয়কে কলুষিত করে।

একটু ভেবে দেখো—এই চোখ কি সেই সবকিছু দেখার জন্য আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে? নিশ্চয়ই না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে চোখ দিয়েছেন যেন আমরা সত্যকে দেখতে পারি, ভালোকে চিনতে পারি এবং এমন বিষয়ের দিকে তাকাই যা আমাদের হৃদয়কে পবিত্র করে। কিন্তু যখন আমরা এই চোখকে ভুল পথে ব্যবহার করি, তখন আমরা আল্লাহর দেওয়া একটি বড় নিয়ামতের অপব্যবহার করি।

শুধু চোখ নয়—আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কানও দিয়েছেন। এই কান দিয়ে আমরা অসংখ্য শব্দ শুনতে পারি। ভালো কথা শুনতে পারি, জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনতে পারি, ইসলামের শিক্ষা শুনতে পারি, কুরআনের তিলাওয়াত শুনতে পারি। একজন মানুষের জীবনে ভালো কথা শোনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভালো কথা মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করে, তার চিন্তাকে উন্নত করে এবং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

কিন্তু অনেক সময় আমরা আমাদের কানকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি না। আমরা মানুষের দোষ-ত্রুটি নিয়ে আলোচনা শুনি, গীবত শুনি, অভিযোগ শুনি, খারাপ কথা শুনি। কখনো কখনো আমরা নিজেরাও সেই আলোচনার অংশ হয়ে যাই। অথচ ইসলাম আমাদেরকে শিখিয়েছে—মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ানো বা গীবত করা একটি বড় গুনাহ। আমাদের কান এমন কথার জন্য তৈরি হয়নি।

আমাদের জিহ্বাও একটি বড় নিয়ামত। এই জিহ্বা দিয়ে আমরা কথা বলতে পারি, ভালো কথা বলতে পারি, কাউকে উৎসাহ দিতে পারি, কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারি। একটি সুন্দর কথা অনেক সময় মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু আমরা কি সবসময় এই জিহ্বার সঠিক ব্যবহার করি? অনেক সময় আমরা মিথ্যা কথা বলে ফেলি, কখনো খারাপ কথা বলি, আবার কখনো অন্যকে ঠকানোর চেষ্টা করি। অথচ এই জিহ্বা আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে সত্য কথা বলার জন্য, ভালো কথা বলার জন্য এবং মানুষের মধ্যে শান্তি ও ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য।

আবার আমাদের হাতও একটি বড় নিয়ামত। এই হাত দিয়ে আমরা কাজ করতে পারি, সাহায্য করতে পারি, অন্যের উপকার করতে পারি। একটি ছোট সাহায্যও অনেক সময় কারো জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দেয়। কিন্তু কখনো কখনো মানুষ তার হাতকে ভুলভাবে ব্যবহার করে। কেউ ছোটদের উপর জুলুম করে, কেউ দুর্বলদের কষ্ট দেয়, কেউ রাগের বশে অন্যকে আঘাত করে। অথচ এই হাত অত্যাচারের জন্য তৈরি হয়নি।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন ভালো কাজ করার জন্য, মানুষের উপকার করার জন্য এবং ন্যায়ের পথে চলার জন্য। তিনি চান আমরা আমাদের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে এমন কাজে ব্যবহার করি, যা তাঁর সন্তুষ্টির কারণ হয়। যখন আমরা চোখ দিয়ে ভালো দেখি, কান দিয়ে ভালো শুনি, জিহ্বা দিয়ে ভালো কথা বলি এবং হাত দিয়ে ভালো কাজ করি—তখন আমাদের জীবন সত্যিই সুন্দর হয়ে ওঠে।

তাই আমাদের সবার উচিত একটু থেমে নিজের জীবনের দিকে তাকানো। আমরা কীভাবে আমাদের সময় ব্যবহার করছি, কীভাবে আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করছি—সেগুলো নিয়ে ভাবা। সময় খুব মূল্যবান একটি নিয়ামত। একবার চলে গেলে সেই সময় আর ফিরে আসে না। তাই এই সময়কে এমন কাজে ব্যবহার করা উচিত, যা আমাদের জীবনকে উন্নত করে এবং আমাদেরকে আল্লাহ তাআলার কাছাকাছি নিয়ে যায়।

যদি আমরা আমাদের চোখ, কান, জিহ্বা এবং হাতের সঠিক ব্যবহার শিখে ফেলতে পারি, তাহলে আমাদের জীবন অনেক সুন্দর হয়ে উঠবে। তখন আমরা শুধু নিজের জন্যই ভালো হবো না; বরং আমাদের আশেপাশের মানুষও আমাদের মাধ্যমে উপকার পাবে। আর এভাবেই একজন মানুষের জীবন সত্যিকার অর্থে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।

p> মানুষের জীবনের একটি বড় সৌন্দর্য হলো—তার মাধ্যমে যেন অন্য কেউ কষ্ট না পায়। একজন সচেতন মানুষের সবসময় চেষ্টা থাকা উচিত যেন তার কথা, তার আচরণ কিংবা তার কাজের কারণে কারো মনে আঘাত না লাগে। যদি কখনো এমন হয় যে আমার কারণে কেউ কষ্ট পেয়েছে, আমার কথা শুনে কারো মন ভেঙে গেছে বা আমার আচরণে কেউ দুঃখ পেয়েছে—তাহলে আমাদের থেমে একটু চিন্তা করা উচিত। তখন নিজের মনকে প্রশ্ন করা দরকার—আমি কি সত্যিই সেই পথে চলছি, যেভাবে একজন ভালো মানুষকে চলা উচিত?

মানুষের প্রকৃত মহত্ব তার ক্ষমতায় নয়, তার আচরণে প্রকাশ পায়। একজন মানুষ তখনই বড় হয়ে ওঠে, যখন তার ব্যবহার অন্যের হৃদয়ে শান্তি এনে দেয়। তাই আমাদের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমনভাবে চলা, যেন মানুষ আমাদেরকে ভালোবাসে, আমাদের জন্য দোয়া করে এবং আমাদের সাথে থাকতে স্বস্তি অনুভব করে।

মারিয়া ও মাসুমা, তোমাদের জীবনের পথ এখনো অনেক বড়। এই সময় থেকেই যদি তোমরা সুন্দর আচরণ, নম্রতা এবং ভদ্রতার অভ্যাস তৈরি করতে পারো, তাহলে ভবিষ্যতে তোমাদের জীবন খুবই সুন্দর হয়ে উঠবে। মানুষের সাথে কথা বলার সময় সবসময় নরম ভাষা ব্যবহার করবে। কারো সাথে উচ্চ গলায় কথা বলা কখনোই ভালো নয়। উঁচু গলায় কথা বললে মানুষের হৃদয় আহত হয়, আর নম্র ভাষায় কথা বললে মানুষের হৃদয় জয় করা যায়।

তোমরা সবসময় চেষ্টা করবে যেন তোমাদের কথা শুনে মানুষের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। মানুষ যেন মনে করে—তোমাদের সাথে কথা বললে তার মন ভালো হয়ে যায়। কারণ একটি সুন্দর আচরণ মানুষের মনে অনেকদিন ধরে থেকে যায়। মানুষ অনেক সময় বড় উপকারের কথা ভুলে যায়, কিন্তু সুন্দর ব্যবহার খুব সহজে ভুলে যায় না।

আর একটি বিষয় মনে রাখবে—কাউকে কখনো বকা দেওয়া উচিত নয়, কাউকে আঘাত করা তো আরও বড় ভুল। মানুষের হৃদয় খুবই কোমল। একটি কঠিন কথা বা একটি রাগী আচরণ অনেক সময় মানুষের মনে গভীর কষ্ট সৃষ্টি করে। তাই সবসময় ধৈর্য ধরতে হবে, নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং অন্যদের সাথে শান্তভাবে কথা বলতে হবে।

তোমাদের জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ হলো তোমাদের মা-বাবা। তাদের সাথে তোমাদের আচরণ হবে সবচেয়ে সুন্দর। তাদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা সবসময় মনে রাখতে হবে। একইভাবে তোমাদের ভাই-বোনদের সাথেও তোমাদের সম্পর্ক হবে ভালোবাসা ও সহযোগিতার। একে অপরকে সাহায্য করবে, একে অপরকে বুঝবে এবং সবসময় একে অপরের পাশে থাকবে।

শুধু পরিবার নয়—তোমাদের পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং আশেপাশের মানুষদের সাথেও তোমাদের আচরণ হবে খুবই সুন্দর। মানুষের সাথে কথা বলার সময় হাসিমুখে কথা বলবে, কারো কষ্ট দেখলে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করবে। এভাবেই ধীরে ধীরে একজন মানুষের চরিত্র মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।

যখন মানুষের আচরণ সুন্দর হয়, তখন তার পরিচয় আলাদা করে বলতে হয় না। মানুষ তার চলাফেরা দেখেই তাকে চিনে ফেলে। তোমাদের চলাফেরা, তোমাদের কথা বলা, তোমাদের ব্যবহার—সবকিছু দেখে মানুষ বুঝতে পারবে তোমরা কেমন মানুষ। আর যদি তোমাদের চরিত্র সত্যিই সুন্দর হয়, তাহলে মানুষ নিজেরাই তোমাদের প্রশংসা করবে।

এক সময় এমনও হতে পারে—তোমাদের এলাকার মানুষ, সমাজের মানুষ কিংবা তোমাদের বন্ধুবান্ধব সবাই তোমাদের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করবে। তারা হয়তো বলবে, যদি সত্যিকারের ভালো মানুষ হতে হয়, তাহলে মারিয়া ও মাসুমার মতো হতে হবে। তারা যেমন সুন্দরভাবে জীবন পরিচালনা করছে, তেমন জীবনই তো হওয়া উচিত।

মানুষ তখন তোমাদের দিকে তাকিয়ে বলবে—দেখো, তারা কত সুন্দরভাবে একসাথে মিলেমিশে চলে। তারা পড়াশোনা করে, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে, কারো সাথে ঝগড়া করে না, কাউকে কষ্ট দেয় না। এভাবেই তো প্রতিটি সন্তানের হওয়া উচিত। এমন কথা শুনলে তোমাদের মা-বাবার হৃদয় গর্বে ভরে উঠবে।

ভাবো তো, যখন মানুষ নিজের সন্তানদেরকে তোমাদের দিকে ইশারা করে বলবে—“তোমরা তাদের মতো হও, তাদের মতো সুন্দর আচরণ শিখো”—তখন সেই দৃশ্য কত সুন্দর হবে। তখন তোমরা শুধু নিজের জীবনের জন্যই ভালো হবে না, বরং অন্যদের জীবনেও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে।

তাই সবসময় চেষ্টা করবে যেন তোমাদের জীবন এমন হয়, যা দেখে অন্যরা শিক্ষা নিতে পারে। তোমাদের চলাফেরা, তোমাদের ব্যবহার এবং তোমাদের চরিত্র যেন মানুষের কাছে একটি সুন্দর উদাহরণ হয়ে ওঠে। যখন একজন মানুষের জীবন অন্যদেরকে ভালো পথে চলতে উৎসাহিত করে, তখন সেই জীবন সত্যিই মূল্যবান হয়ে ওঠে।

p> জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো—যে মানুষ কিছু বড় অর্জন করতে চায়, তাকে কষ্টের পথ অতিক্রম করতেই হয়। পৃথিবীতে এমন কোনো মূল্যবান জিনিস নেই যা একেবারে সহজে পাওয়া যায়। মানুষের সাফল্যের পেছনে থাকে ধৈর্য, পরিশ্রম এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি। অনেক সময় পথ কঠিন হয়, কখনো বাধা আসে, কখনো মনে হয় আর এগোনো সম্ভব নয়। কিন্তু যারা সত্যিই নিজের লক্ষ্যকে ভালোবাসে, তারা কষ্টকে ভয় পায় না। বরং তারা সেই কষ্টকে নিজের উন্নতির সোপান বানিয়ে নেয়।

এই পৃথিবীতে মানুষের সম্মান পেতে হলে, মানুষের চোখে ভালো হতে হলে এবং সর্বোপরি আল্লাহ তাআলার কাছে প্রিয় হতে হলে মানুষকে নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হয়। একজন মানুষ যখন আল্লাহর খাঁটি বান্দা হওয়ার চেষ্টা করে, তখন তার জীবনেও অনেক ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন হয়। নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করা, ভালো কাজের দিকে নিজেকে পরিচালিত করা এবং খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকা—এসবই ধীরে ধীরে একজন মানুষকে উন্নত করে তোলে।

মারিয়া ও মাসুমা, আমি সবসময় তোমাদের জন্য দোয়া করি। আমি আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি তোমাদের জীবনকে সুন্দর করে দেন, তোমাদের হৃদয়কে সৎ পথে স্থির রাখেন এবং তোমাদের ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করে তোলেন। তোমাদের মধ্যে আমি অনেক ভালো গুণ দেখেছি। তোমরা মাশাআল্লাহ খুব সুন্দরভাবে চলাফেরা করার চেষ্টা করো, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করো এবং পড়াশোনার প্রতিও মনোযোগী থাকার চেষ্টা করো।

জীবনের পথে অনেক সময় এমন কিছু পরিস্থিতি আসে, যখন পড়াশোনা বা অন্য কাজগুলো কিছুটা কঠিন মনে হয়। কখনো পরিবেশের কারণে, কখনো পরিস্থিতির কারণে মানুষের পথ একটু কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে—কঠিন সময় চিরদিন থাকে না। যদি মানুষের ইচ্ছা দৃঢ় থাকে এবং তার নিয়ত ভালো থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার জন্য সহজ পথ খুলে দেন।

তোমাদের মধ্যেও আমি সেই আশা ও স্বপ্ন দেখতে পাই। তোমরা জীবনে ভালো কিছু করার ইচ্ছা রেখেছো, নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার আশা রেখেছো। এই আশাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ মানুষের হৃদয়ে যদি ভালো নিয়ত থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা সেই নিয়তকে কখনো বৃথা যেতে দেন না।

আমি আশাবাদী—ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা তোমাদের সেই আশাকে পূর্ণ করবেন। তিনি তোমাদের সহযোগী হবেন, তোমাদের প্রতিটি কাজে বরকত দান করবেন এবং তোমাদেরকে এমন পথ দেখাবেন যা তোমাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। মানুষের জীবনে আল্লাহর সাহায্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। যখন আল্লাহ তাআলা কারো সাথে থাকেন, তখন তার পথের বাধাগুলো ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যায়।

তবে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হলো—মা-বাবার প্রতি ভালো আচরণ করা। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে বহু জায়গায় আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমরা আমাদের মা-বাবার সাথে সদয় আচরণ করি। কারণ তারা আমাদের জন্য অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। আমাদের জন্মের আগে থেকে শুরু করে বড় হওয়া পর্যন্ত তারা নিজেদের আরাম ত্যাগ করে আমাদের জন্য চেষ্টা করে গেছেন।

তোমাদের উচিত সবসময় তোমাদের মা-বাবার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা। তাদের হৃদয়ে যেন কখনো কষ্ট না লাগে, সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা। কখনো এমন কোনো কথা বলা যাবে না, যা তাদের মনে আঘাত দেয়। কখনো তাদের সামনে উঁচু গলায় কথা বলা উচিত নয়। বরং সবসময় তাদের সাথে নরম ভাষায় কথা বলতে হবে, সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে।

মা-বাবা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তারা আমাদের জন্য রত্নের মতো। তাদের দোয়া মানুষের জীবনে অসাধারণ বরকত নিয়ে আসে। তাই তাদের কষ্ট দেওয়া কখনোই উচিত নয়। বরং তাদের মুখে হাসি ফোটানোই হওয়া উচিত একজন সন্তানের সবচেয়ে বড় আনন্দ।

তোমরা দুজন মাঝে মাঝে তোমাদের আম্মুর কাছে গিয়ে ভালোবাসার সাথে বলতে পারো—“আম্মা, তুমি আমাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। তুমি শুধু আমাদের জন্য দোয়া করো। তুমি আমাদের জন্য চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো।” একজন মায়ের দোয়া আল্লাহ তাআলার কাছে খুব মূল্যবান। মায়ের হৃদয় থেকে বের হওয়া দোয়া অনেক সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়।

তোমরা এমন সন্তান হওয়ার চেষ্টা করবে, যাদের দিকে তাকালে তাদের মায়ের চোখ শীতল হয়ে যায়। ইসলামের ভাষায় যাকে বলা হয়—“চোখের শীতলতা।” অর্থাৎ এমন সন্তান, যাদের আচরণ, চরিত্র এবং জীবন দেখে মা-বাবার হৃদয় শান্তি অনুভব করে।

তোমরা এমনভাবে জীবন পরিচালনা করার চেষ্টা করবে, যেন তোমাদের মা-বাবা তোমাদের নিয়ে গর্ব করতে পারেন। তারা যেন মানুষের সামনে বলতে পারেন—“এরা আমার সন্তান।” সেই গর্ব যেন তাদের হৃদয়কে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।

যখন তোমাদের আম্মু এলাকার মানুষের সামনে তোমাদের কথা বলবেন এবং তোমাদের প্রশংসা শুনবেন, তখন তার হৃদয় আনন্দে ভরে উঠবে। তাই এমন জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা করো, যা তোমাদের মা-বাবার জন্য সম্মানের কারণ হয়। একজন সন্তানের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো—তার কারণে তার মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল হওয়া।

p> শোনো, মনোযোগ দিয়ে শোনো। তোমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি হলো—তোমাদের মা-বাবা। তারা তোমাদের জন্য কত কষ্ট করেন, কত চিন্তা করেন, তা অনেক সময় তোমরা বুঝতে পারো না। একজন মা-বাবা তাদের সন্তানের সুখের জন্য নিজের আরাম ত্যাগ করেন, নিজের প্রয়োজন ভুলে যান এবং সারাক্ষণ ভাবেন—কীভাবে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুন্দর করা যায়।

তাই তোমাদের দায়িত্ব হলো—তোমাদের মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানো। একজন সন্তানের সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই হয়, যখন তার কারণে তার মা-বাবার হৃদয় আনন্দে ভরে ওঠে। তোমাদের আম্মু-আব্বু যেন তোমাদের দিকে তাকিয়ে গর্ব অনুভব করতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত তোমাদের জীবনের বড় লক্ষ্য।

এই লক্ষ্য পূরণ করার জন্য তোমাদেরকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। শুধু সাধারণ শিক্ষা নয়, ভালো চরিত্র, সুন্দর আচরণ এবং দ্বীনের জ্ঞান—এই সবকিছুই একজন মানুষের প্রকৃত শিক্ষা। তাই পড়াশোনার প্রতি তোমাদের বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। প্রতিদিন নিয়ম করে পড়াশোনা করবে, সময়কে মূল্য দেবে এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় আশা রাখবে।

মাঝেমধ্যে জীবনের পথে কিছু বাধা আসে। কখনো অর্থের অভাব হয়, কখনো পরিবেশ অনুকূলে থাকে না। কিন্তু এইসব কারণে কখনো হতাশ হওয়া যাবে না। টাকা-পয়সা মানুষের জীবনকে সহজ করে দিতে পারে, কিন্তু মানুষের আশা এবং ইচ্ছাশক্তিকে থামিয়ে দিতে পারে না। তাই টাকার কারণে কখনো পিছিয়ে পড়বে না।

সবকিছু আল্লাহ তাআলার কাছে বলবে। যখন মানুষের হৃদয়ে সত্যিকারের আশা থাকে এবং সে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া করে, তখন আল্লাহ তাআলা তার জন্য অপ্রত্যাশিত পথ খুলে দেন। অনেক সময় মানুষের চোখের দুই ফোঁটা অশ্রুই তার জীবনের বড় পরিবর্তনের কারণ হয়ে যায়।

তোমাদের হৃদয়ের মধ্যে অনেক বড় আশা রয়েছে। তোমরা পড়াশোনা করতে চাও, মাদ্রাসায় পড়তে চাও, হাফেজা হতে চাও, আলেমা হতে চাও। এই ইচ্ছাগুলো খুবই সুন্দর এবং মহৎ। আমি আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি—তিনি যেন তোমাদের এই ইচ্ছাকে কবুল করেন এবং তোমাদের সেই পথে সফলতা দান করেন।

আমি বিশ্বাস করি—তোমরা পারবে। ইনশাআল্লাহ তোমরা অবশ্যই পারবে। মানুষের জীবনে যদি ইচ্ছা দৃঢ় হয় এবং আল্লাহর উপর ভরসা থাকে, তাহলে কোনো কিছুই অসম্ভব থাকে না। আমার দৃঢ় আশা—তোমরা দুজনই একদিন হাফেজা হবে, আলেমা হবে এবং মানুষের জন্য কল্যাণের কারণ হবে।

এই মুহূর্তে হয়তো কিছু আর্থিক সমস্যা রয়েছে। কিন্তু এই বিষয় নিয়ে বেশি চিন্তা করবে না। আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে একটি ভালো পথে চলার ইচ্ছা দেন, তখন তিনি সেই পথকে সহজ করার ব্যবস্থাও করে দেন। তাই হতাশ না হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা রাখবে।

আমি তোমাদের একটি সুন্দর আমল শিখিয়ে দিই। তোমরা যদি নিয়মিত এই আমলটি করার চেষ্টা করো, তাহলে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা তোমাদের মনের আশা পূরণ করবেন।

এই আমলটি হলো—তাহাজ্জুদ নামাজ। তাহাজ্জুদ এমন একটি নামাজ, যা আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়। যখন পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, তখন যে মানুষ আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, আল্লাহ তার দোয়া বিশেষভাবে কবুল করেন।

তোমরা চেষ্টা করবে রাতে তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য। যখন রাত গভীর হয়ে যায়—ধরো রাত দুইটা বা তিনটার সময়—তখন ঘুম থেকে উঠে সুন্দরভাবে অজু করবে। তারপর শান্ত মনে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে।

তোমরা দুই রাকাত করে চার রাকাত বা ছয় রাকাত পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নিয়তে নামাজ পড়তে পারো। নামাজের পরে আল্লাহর কাছে মন খুলে দোয়া করবে। নিজের মনের সব কথা আল্লাহকে বলবে। বলবে—“হে আল্লাহ, তুমি আমাদের পড়াশোনা সহজ করে দাও, তুমি আমাদেরকে হাফেজা ও আলেমা হওয়ার তাওফীক দাও, তুমি আমাদের মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করে দাও।”

মনে রাখবে—রাতের নির্জনে করা দোয়া আল্লাহ তাআলার কাছে খুবই মূল্যবান। অনেক সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন শুরু হয় সেই নীরব রাতের দোয়া থেকেই।

এরপর তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে দু’হাত তুলে খুব মনোযোগ দিয়ে দোয়া করবে। হৃদয়ের গভীর থেকে আল্লাহকে ডাকবে। মানুষের জীবনে এমন অনেক সময় আসে, যখন তার সামনে কোনো পথ খোলা থাকে না। তখন একমাত্র ভরসা হয়ে থাকেন আল্লাহ তাআলা। তাই দোয়ার সময় মন খুলে নিজের সব কথা আল্লাহর কাছে বলবে।

তোমরা চোখের পানি ফেলে আল্লাহকে বলতে পারো—হে আল্লাহ! তুমি আমাদের মনের আশা পূরণ করে দাও। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের জীবনে সচ্ছলতা দান করো। তুমি আমাদের অভাব দূর করে দাও এবং আমাদের এমন ব্যবস্থা করে দাও যাতে আমরা সুন্দরভাবে পড়াশোনা করতে পারি।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে তোমার পবিত্র কোরআন মুখস্থ করার সুযোগ দাও। তুমি আমাদেরকে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করার সুযোগ করে দাও। আমরা যেন দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করতে পারি, সেই পথ আমাদের জন্য সহজ করে দাও।

হে আল্লাহ! আমাদের পড়াশোনার জন্য যত খরচ প্রয়োজন, যত অর্থ প্রয়োজন—তুমি সবকিছুর ব্যবস্থা করে দাও। তুমি এমন ব্যবস্থা করে দাও, যেন আমাদের সামনে কোনো বাধা না থাকে এবং আমরা মনোযোগ দিয়ে আমাদের লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে যেতে পারি।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে ভালো মেধা দাও, সুন্দর বুঝ দাও এবং এমন শক্তি দাও যাতে আমরা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে পারি। তুমি আমাদের হৃদয়কে দৃঢ় করে দাও, যেন আমরা কখনো হতাশ না হই এবং সবসময় ভালো কাজের পথে অটল থাকতে পারি।

হে আল্লাহ! আমরা দুই বোন যেন এমন একটি সুন্দর জীবন গঠন করতে পারি, যা দেখে মানুষ অনুপ্রাণিত হবে। আমাদের জীবন যেন মানুষের জন্য একটি সুন্দর উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ যেন আমাদের জীবন দেখে বুঝতে পারে—একজন মানুষের জীবন কেমন হওয়া উচিত।

হে আল্লাহ! আমরা দুই বোন যেন আমাদের মা-বাবার চোখের শীতলতা হতে পারি। আমাদের কারণে যেন তাদের হৃদয় আনন্দে ভরে ওঠে। তারা যেন মানুষের সামনে আমাদের নিয়ে গর্ব করতে পারেন এবং আমাদের জীবন দেখে তাদের চোখ শান্তি পায়।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদের এমন তাওফীক দাও, যেন আমরা আমাদের এলাকাকে আলোকিত করতে পারি। আমাদের সমাজের মানুষের জন্য আমরা যেন উপকারের কারণ হতে পারি। আমাদের জীবন যেন মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যয় হয়।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে এমনভাবে কবুল করে নাও, যেন আমাদের মাধ্যমে আমাদের পরিবার উপকৃত হয়, আমাদের সমাজ উপকৃত হয় এবং আমাদের দেশ উপকৃত হয়। আমরা যেন এমন কিছু করতে পারি, যার মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদের এই দুই বোনের দ্বারা অনেক বড় কাজ গ্রহণ করো। আমাদেরকে তোমার দ্বীনের খেদমত করার তাওফীক দাও। আমাদের জীবনকে বরকতময় করে দাও।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে এমনভাবে কবুল করে নাও, যেন আমরা পুরো বাংলাদেশের সামনে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারি। তুমি আমাদেরকে এমন বানাও যেন আমরা মানুষের মাঝে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো হয়ে উঠি—যাদের আলো মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করে।

p> তোমরা এভাবেই আল্লাহ তাআলার কাছে চাইতে থাকবে, চাইতে থাকবে। কখনো হতাশ হবে না, কখনো মনে করবে না যে আমার দোয়া হয়তো কবুল হবে না। বরং দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে—আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তার বান্দার দোয়া শোনেন এবং তার মনের কথা জানেন।

যদি তোমরা প্রতিদিন এভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করতে থাকো, চোখের পানি ফেলে আল্লাহকে ডাকতে থাকো, তাহলে দেখবে ধীরে ধীরে আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য পথ খুলে দেবেন। মানুষের জীবনের অনেক বড় পরিবর্তন শুরু হয় সেই আন্তরিক দোয়া থেকে।

একটি ছোট বাচ্চাকে দেখো—যখন সে কিছু চায়, তখন সে বারবার তার মা-বাবার কাছে চায়। সে কাঁদে, আবার চায়, আবার কাঁদে। শেষ পর্যন্ত তার মা-বাবা তাকে কিছু না কিছু দিয়ে দেন। ঠিক তেমনি যদি একজন বান্দা আল্লাহ তাআলার কাছে বারবার চায়, কান্না করে চায়, আশা নিয়ে চায়—তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না।

আল্লাহ তাআলা চান—তার বান্দা যেন তার কাছেই চায়। মানুষ যখন আল্লাহর কাছে দোয়া করে, তখন আল্লাহ তাআলা সেই বান্দার প্রতি খুশি হন। বান্দা যখন তার রবের সামনে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে এবং তার সাহায্য কামনা করে, তখন সেটিই আল্লাহর কাছে খুব প্রিয় হয়ে ওঠে।

আর যদি মানুষ আল্লাহর কাছে কিছুই না চায়, আল্লাহর দিকে ফিরে না আসে, তাহলে সেটিই আল্লাহ তাআলার কাছে অপছন্দনীয় হয়ে যায়। কারণ দোয়া করা মানে হলো—মানুষ তার রবের উপর ভরসা করছে, তার কাছে সাহায্য চাইছে এবং তার দয়া কামনা করছে।

মানুষের কাছে যদি কেউ বারবার কিছু চায়, তাহলে একসময় মানুষ বিরক্ত হয়ে যায়। কেউ যদি কারো কাছে একবার চায়, দুইবার চায়, তিনবার চায়—একসময় সেই মানুষটি হয়তো রাগ করে বসে। মানুষ তো সীমিত সামর্থ্যের অধিকারী। সে সবসময় দিতে পারে না, সবসময় দিতে চায়ও না।

কিন্তু আল্লাহ তাআলা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি এমন এক মহান সত্তা, যার দানের কোনো সীমা নেই। তুমি যদি তার কাছে বারবার চাও, হাজার হাজার জিনিস চাও, তবুও তিনি রাগ করেন না। বরং তিনি তার বান্দাকে দিতে ভালোবাসেন।

আল্লাহ তাআলা যেন অপেক্ষা করেন—তার বান্দা কখন তার কাছে চাইবে। তিনি চান তার বান্দা তার দিকে ফিরে আসুক, তার কাছে দোয়া করুক এবং তার রহমতের দরজায় কড়া নাড়ুক।

তাই তোমাদের জীবনের যত আশা, যত স্বপ্ন, যত প্রয়োজন—সবকিছু একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই চাইবে। মানুষের কাছে চাইলে হয়তো মানুষ কিছু দিতে পারবে, আবার অনেক সময় পারবে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলার দরবারে কখনো হতাশা নেই।

যে বান্দা আল্লাহর দরজায় বারবার কড়া নাড়ে, একসময় সেই দরজা তার জন্য খুলে যায়। তাই তোমরা সবসময় আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা রাখবে এবং আন্তরিকভাবে তার কাছেই তোমাদের মনের সব কথা জানাবে।

p> আর একটি বিষয় তোমাদের খুব ভালোভাবে মনে রাখতে হবে। জীবনে যাই ঘটুক না কেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কখনোই ছেড়ে দেওয়া যাবে না। নামাজ হলো একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল। একজন মানুষের জীবনে অনেক কাজ থাকতে পারে, অনেক ব্যস্ততা থাকতে পারে, কিন্তু নামাজের সময় হলে সবকিছুর আগে নামাজকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তোমরা দুজন আজ থেকেই একটি দৃঢ় নিয়ত করবে—জীবনে কখনোই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছেড়ে দিবে না। যত ব্যস্ততাই থাকুক, যত সমস্যা বা কষ্টই আসুক, নামাজের সময় হলে অবশ্যই নামাজ পড়বে। কারণ নামাজ মানুষের জীবনকে সুন্দর করে, মানুষের হৃদয়কে শান্ত করে এবং আল্লাহ তাআলার সাথে মানুষের সম্পর্ককে দৃঢ় করে।

যখনই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান হবে, তখন তোমরা দেরি না করে একসাথে অযু করে নেবে। তারপর তোমরা দুজন একসাথে দাঁড়িয়ে সুন্দরভাবে নামাজ পড়ে ফেলবে। একসাথে নামাজ পড়লে একে অপরের মধ্যে উৎসাহ বাড়বে এবং নামাজের প্রতি ভালোবাসাও বৃদ্ধি পাবে।

আজান তো তোমরা প্রতিদিনই শুনতে পাও। তাই আজান শোনার সাথে সাথেই চেষ্টা করবে অযু করে নামাজের জন্য প্রস্তুত হতে। এই অভ্যাসটি যদি এখন থেকেই তৈরি করতে পারো, তাহলে ইনশাআল্লাহ সারা জীবন নামাজ তোমাদের জীবনের অংশ হয়ে যাবে।

এর সাথে সাথে প্রতিদিন নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। খুব বেশি না হলেও প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়বে। চেষ্টা করবে প্রতিদিন অন্তত এক পৃষ্ঠা বা দুই পৃষ্ঠা কোরআন তেলাওয়াত করতে। দিনের যে কোনো সময়—সকালে, দুপুরে অথবা রাতে—একটু সময় বের করে এই তেলাওয়াত করে ফেলবে।

এভাবে নিয়মিত কোরআন পড়তে থাকলে ধীরে ধীরে কোরআনের সাথে তোমাদের হৃদয়ের সম্পর্ক তৈরি হবে। কোরআন মানুষের জীবনে আলো এনে দেয় এবং মানুষের মনকে প্রশান্ত করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সকাল ও সন্ধ্যার আমল। ইসলামে এমন কিছু দোয়া রয়েছে, যেগুলো সকাল ও সন্ধ্যায় পড়লে আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে হেফাজত করেন। এই দোয়াগুলো মানুষের জন্য এক ধরনের নিরাপত্তার ঢাল হয়ে থাকে।

তাই তোমাদের উচিত সকাল ও সন্ধ্যার আমলগুলো নিয়মিত করার চেষ্টা করা। প্রতিদিন সকালে এবং সন্ধ্যায় কিছু নির্দিষ্ট দোয়া পড়বে। এই দোয়াগুলো পড়লে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে অনেক অদৃশ্য বিপদ থেকে রক্ষা করবেন।

এই আমলগুলোকে গুরুত্বের সাথে শিখতে হবে এবং ধীরে ধীরে মুখস্থ করে ফেলতে হবে। আমি সকাল ও সন্ধ্যার আমলগুলো আলাদা করে একটি কাগজে লিখে দেব। তোমরা সেই দোয়াগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়বে এবং মুখস্থ করার চেষ্টা করবে।

শুধু সকাল ও সন্ধ্যার দোয়া নয়—আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সময়ের জন্যও অনেক সুন্দর দোয়া রয়েছে। যেমন—খাবার খাওয়ার আগে একটি দোয়া আছে, খাবার শেষ করার পর একটি দোয়া আছে, ঘুমানোর আগে দোয়া আছে, ঘুম থেকে ওঠার পর দোয়া আছে।

এই ছোট ছোট দোয়াগুলো যদি আমরা আমাদের জীবনের অংশ বানিয়ে নিতে পারি, তাহলে আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর স্মরণে ভরে উঠবে। তখন আমাদের জীবন হবে বরকতময় এবং আল্লাহর রহমতে পূর্ণ।

একজন মানুষ যখন তার প্রতিটি কাজে আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন আল্লাহ তাআলাও সেই বান্দার প্রতি খুশি হন। আল্লাহ তার প্রতি রহমত ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করেন এবং তার জীবনে বরকত দান করেন।

তাই চেষ্টা করবে—তোমাদের প্রতিটি দিন যেন আল্লাহর স্মরণ দিয়ে শুরু হয় এবং আল্লাহর স্মরণ দিয়েই শেষ হয়। এমন জীবনই হলো প্রকৃত শান্তির জীবন।

p> তোমরা যতগুলো কথা আমি তোমাদের বলেছি, সেগুলোর উপর তুমি যতটা সম্ভব আমল করার চেষ্টা করবে। প্রতিটি নির্দেশনা, প্রতিটি দিকনির্দেশনা তোমাদের জীবনের আলো এবং সাফল্যের পথ প্রদর্শন করে। আমি নিজেই তোমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করব যাতে তিনি তোমাদের মনের সমস্ত আশা পূরণ করেন, তোমাদের স্বপ্নগুলো কবুল করেন এবং তোমাদেরকে পুরো বাংলাদেশে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলোকিত করেণ। তোমাদের আলোয় যেন কিশোরগঞ্জ উজ্জ্বল হয় এবং সবাই দেখে যে আমাদের সন্তানরা কীভাবে আলোর দিশা হয়ে উঠতে পারে।

তোমরা এই প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করো, তোমরা ওয়াদাবদ্ধ হও এবং সঠিক পথে এগিয়ে যাও। তোমরা যেন কিশোরগঞ্জের মাটিকে উজ্জ্বল করো, শিক্ষায়, নৈতিকতায় এবং কর্মে আলোকিত করো। তোমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সর্বোচ্চ যোগ্যতা অর্জন করা। শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তোমাদের সক্ষমতা সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে হবে। কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তোমাদের শিক্ষা এবং দক্ষতা সমৃদ্ধ করতে হবে। এই সংগ্রামের মাধ্যমে তোমরা তোমাদের মা-বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে এবং তাদের চোখের আনন্দ হও।

মা-বাবাকে বলো, আমরা প্রতিদিন অধ্যবসায়ী হয়ে পড়াশোনা করব, আমাদের লক্ষ্যগুলো পূর্ণ করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব। তোমরা যেন সর্বদা তাদের জন্য প্রার্থনা করবে, তাদের আশীর্বাদ গ্রহণ করবে এবং তাদের দোয়ার মাধ্যমে নিজেকে শক্তিশালী করবে। তোমরা প্রতিদিন অধ্যবসায়ী হয়ে নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করবে। কখনোই টাকার অভাব বা অন্যান্য কষ্টকে পড়াশোনার পথে বাঁধা হতে দেবে না। আল্লাহর কাছে দোয়া করো, চোখের পানি ফেলে তার কাছে নিজের মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করো, এবং দেখবে আল্লাহ যেকোনোভাবে তোমাদের জন্য রাস্তা তৈরি করবেন।

দেখো, আল্লাহ তাআলা বলেন, "যে বান্দা আমার কাছে আসে ও আমাকে চায়, আমি তার প্রার্থনাকে পূর্ণ করি"। তাই দোয়া করাটাই মুখ্য বিষয়। যেভাবেই হোক, যতোবার দরকার মনে হবে, আল্লাহর কাছে চাও, চোখের পানি ফেলো, হৃদয় খুলে চাও। আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার চাওয়া পূর্ণ করতে দেরি করেন না, বরং খুশি হয়ে দেন এবং তার কাছে থেকে সাহায্য পাঠান। আল্লাহর রহমত এবং সাহায্য সেই সমস্ত বান্দার জন্য যারা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে এবং তার প্রতি বিশ্বাস রাখে।

তোমাদেরকে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে দোয়া করতে হবে, শুধুমাত্র দোয়া নয়, তা বিশ্বাস এবং দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে করতে হবে। প্রত্যেক দিন সকালে এবং রাতে আল্লাহর কাছে নিজের আশা এবং প্রার্থনা উপস্থাপন করতে হবে। দেখবে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য এমন ব্যবস্থা করে দেবেন যে তোমরা সর্বত্র শিক্ষা, সম্মান এবং মর্যাদায় এগিয়ে যাবে। তোমাদের আগ্রহ যদি প্রকৃত হয়, যদি তোমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করো, আল্লাহ যে কোনো রূপে তোমাদের পথ সুগম করবেন। অর্থের অভাব কখনোই তোমাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে না, বরং আল্লাহ সবসময় উপায় তৈরি করবেন।

এই জন্য, মারিয়া ও মাসুমা, তোমরা কখনো দোয়া করা বন্ধ করবে না। প্রতিদিন আল্লাহর কাছে চাও, চোখের পানি ফেলে চাও, সমস্ত আশা এবং আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর দরবারে উত্সর্গ করো। এই ধারা অনুসরণ করলেই তুমি দেখবে আল্লাহ তাআলা তোমাদের জীবনকে আলোকিত করবেন, তোমাদের স্বপ্ন পূর্ণ করবেন এবং তোমাদেরকে এমন উচ্চতা দান করবেন, যা তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না। দোয়া, অধ্যবসায়, বিশ্বাস এবং পরিশ্রম—এই চারটি গুণের মাধ্যমে তোমরা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হয়ে উঠবে এবং পৃথিবীতে আলোর প্রদীপ হিসেবে উজ্জ্বল হবে।

p> বাড়ির কাজকর্মে নিজেকে এগিয়ে দিতে হবে, নিজের কাপড় নিজে ধুতে হবে এবং নিজের প্লেট নিজে ধোয়ার চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ, নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস তোমাদের অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে। আমি জানি, তোমরা সেজন্য যথেষ্ট সচেতন। যেহেতু তোমরা মেয়ে, তাই বাড়ির কাজকর্মগুলো নিজে করার ক্ষমতা তোমাদের আছে, তবে এর পাশাপাশি মা-বাবার দোয়া পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ খেদমত করার চেষ্টা করবে। মা-বাবাকে সুখী রাখা, তাদের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করাই তোমাদের দায়িত্ব। কখনোই তাদেরকে কষ্ট দেওয়ার মত কথা বলবে না, বরং তাদের প্রতি সর্বদা নম্র এবং ভদ্র থাকবে। মা যখন কিছু বলবেন, সেই অনুযায়ী শোনার চেষ্টা করবে এবং যতটা সম্ভব তা পালন করবে।

ঘুম থেকে ওঠার পর বিছানাটি গুছিয়ে রাখবে, কাঁথা ভাঁজ করে রাখবে এবং ঝাড়ু দিয়ে ঘর পরিপাটি রাখবে। সবসময় ঘর, আসবাবপত্র এবং নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখার অভ্যাস করবে। নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া, স্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং নিজেকে সবসময় সজীব রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর, সর্দি-কাশি, ঠান্ডা, গলার ব্যথা, মাথা ব্যথা, বুক ব্যথা, টনসিলসহ নানা ধরনের অসুখ থেকে বাঁচার চেষ্টা করবে। ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি কমাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবে।

সকালে এবং রাতে ঘুমানোর আগে অবশ্যই দাঁত ব্রাশ করবে এবং নিজের স্বাস্থ্য ও শারীরিক পরিচ্ছন্নতার প্রতি যত্নশীল থাকবে। চুলগুলো পরিপাটি রাখবে, চেহারায় ক্রিম মাখার চেষ্টা করবে, যেন সবসময় পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর দেখায়। বাইরে বের হলে অবশ্যই বোরখা পরে বের হবে। নিশ্চিত করবে যে কোনো পুরুষ তোমাদের দিকে খারাপ দৃষ্টিতে না তাকায় এবং কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে না পারে। কোনো পুরুষের সাথে কখনো অনৈতিক সম্পর্ক করবে না।

এই অভ্যাসগুলো শুধু শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন নয়, বরং তোমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা মেনে চলার একটি শক্ত ভিত্তি। নিজের কাজ নিজে করা, স্বাস্থ্য রক্ষা, পরিচ্ছন্ন থাকা, এবং বাইরের দিক থেকে নিরাপত্তা বজায় রাখা—এই সব অভ্যাস তোমাদেরকে একটি সুশৃঙ্খল, নৈতিক এবং আল্লাহর কাছে প্রিয় জীবনযাপন করতে সাহায্য করবে। এগুলোই তোমাদের ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় করবে, আত্মনির্ভরশীল করবে এবং তোমাদের মা-বাবার জন্য গর্বের কারণ হয়ে উঠবে।

p> অপরিচিত কোনো মানুষের কাছে কখনোই কিছু গ্রহণ করবে না এবং তাদের সাথে কখনোই অনধিকারভিত্তিক কথাবার্তা করবে না। কোনো ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে না, কোনো ছেলের সঙ্গে রিলেশন করবে না এবং সবসময় পবিত্রতা বজায় রাখবে। এসব বিষয় নিয়ে কখনোই মাথা ঘামাবে না। নিজের জীবনে কোনো ছেলে বন্ধু আনবে না; সর্বোচ্চ সীমিতভাবে মেয়ে বান্ধবী থাকতে পারবে, তবে ছেলেদের সঙ্গে কোনো বন্ধুত্ব বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কখনোই থাকবে না। যদি কেউ বলেও, তুমি তা গ্রহণ করবে না। এসব থেকে দূরে থাকাই সঠিক, কারণ এগুলো হারাম এবং আল্লাহ তা’আলা রাগ হন।

তোমার জীবনকে সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ রাখার জন্য বাড়ির ভিতরেই থাকার চেষ্টা করবে, শুধুমাত্র প্রয়োজনের কারণে বাইরে যাবে। বাইরে ঘুরাফেরা, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা বা সময় নষ্ট করা থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। একা একা রাস্তায় হাঁটবে না, কোনো হোটেল বা দোকানে একা যাবে না এবং কোনো কিছু খাবে না। যা-ই করবে সবকিছু মায়ের অনুমতি নিয়ে করবে। তোমার আম্মুর অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ করা যাবে না।

ভাইবোনদের সঙ্গে সর্বদা সুন্দর ব্যবহার করবে, আত্মীয়দের খোঁজখবর নেবে এবং কারো সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে না। প্রতিদিন সম্ভব না হলে সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিনবার বাবার সঙ্গে কথা বলবে। বাবার স্বাস্থ্য ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাও, তাঁর মন ভালো আছে কিনা, তিনি সুস্থ আছেন কি না। বাবাকে সান্ত্বনা দেবে, বলবে, "বাবা আমরা অনেক সুখে আছি, তুমি টেনশন করো না। তুমি তোমার মতো ভালোভাবে কাজকর্ম করবে, আমরা ইনশাল্লাহ পড়াশোনা করে অনেক দূর এগিয়ে যাবো এবং তোমার চোখে আলো ফোটাবো।"

বাবার জন্য নিয়মিত দোয়া করবে এবং আল্লাহর কাছে বাবার জন্য বরকত প্রার্থনা করবে। তোমাদের প্রতিদিনের এই আচরণ ও দোয়া তোমাদের জীবনকে সুশৃঙ্খল, নিরাপদ এবং আল্লাহর রাহমতের কাছে প্রিয় বান্ধবী বানাবে। পরিবারের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক, পবিত্র জীবন, এবং সঠিক নিয়মিত দোয়া—এই সব অভ্যাস তোমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য ও খুশির পথে রাখবে।

p> অর্থাৎ তোমাদের জীবন এমনভাবে পরিচালনা করবে যে তোমাদের মা-বাবা গর্বে বলতে বাধ্য হোক, "আমাদের মতো সন্তান হয়তো আর কারো নেই, আমরা এই সন্তান পেয়ে অনেক গর্বিত।" এমন সন্তান হওয়ার চেষ্টা করবে যে প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রশংসা এবং গর্বের উদাহরণ হয়ে উঠবে। তোমার আব্বু-আম্মু যেন তোমাদের নিয়ে গর্ব করতে পারে, তোমাদের দেখে স্বপ্ন এবং আশা পূর্ণ হয়। এই স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য তোমাকে ধৈর্য, পরিশ্রম এবং মেধা দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আমি শুধু পরামর্শ দিতে পারি, যা করা প্রয়োজন সে বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিতে পারি। বাকি কাজ—মেধা খাটিয়ে নিজেকেই এগিয়ে যেতে হবে।

আমার জন্য তোমরা দোয়া করবে এবং এই লেখাগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়বে, বুঝে শুনে এবং বারবার পড়বে। প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার হলেও লেখাগুলো এ থেকে জেড পর্যন্ত পড়বে। সম্ভব হলে তোমাদের বান্ধবীদেরও একটি কপি দেব, যাতে তারা চাইলে পড়তে বা সংরক্ষণ করতে পারে। তোমাদের কাছে আমি এক কপি রাখব এবং কেউ চাইলে তাকে ছাপানোর জন্য দিব।

যদি কখনো কোন প্রশ্ন থাকে, পড়াশোনা সংক্রান্ত বা অন্য কোনো দিক নিয়ে, তুমি নির্ভীকভাবে আমাকে ফোনে বা মেসেজে জানাতে পারো। আমার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার হলো 01309644967। এছাড়াও ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারো: mohammedmoniruzzamantalha@gmail.com

এই নিয়মিত পড়াশোনা, প্রশ্ন করার সাহস, এবং নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে তোমাদের জীবন আলোকিত হবে, মা-বাবার চোখের শীতলতা হবে এবং সমাজে তোমাদের নাম উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পাবে।

p> যখনই তোমার মনে কোন প্রশ্ন জন্ম নেবে, অথবা যখনই তুমি কিছু জানতে চাও, তখন তুমি নির্দ্বিধায় আমাকে জানাবে। এক কথায়, তোমার পড়াশোনা সংক্রান্ত যত পরামর্শ, সহায়তা বা দিকনির্দেশনার প্রয়োজন, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব তোমাকে সাহায্য করার জন্য। ইনশাল্লাহ, আমি সবসময় তোমাদের পাশে থাকব। আল্লাহ তাআলা যদি আমাকে তৌফিক দান করেন, আমি তোমাদের মনের আশা পূরণে, সামান্য হলেও, সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমি চেষ্টা করব তোমাদেরকে হাফেজা বানাতে, আলেমা বানাতে এবং পর্দাশীল, নামাজি একজন উত্তম নারী হিসেবে সমাজকে উপহার দিতে। এই দোয়া আমি সবসময় করি এবং অব্যাহত রাখব। তোমাদেরও চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

আমার জন্য বিশেষভাবে দোয়া করবে, যাতে আল্লাহ আমাকে কবুল করেন, আমার মনের আশা পূরণ করেন এবং আমাকে সেই তৌফিক দান করেন যাতে আমি তোমাদের স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের পথে সাহায্য করতে পারি। আমি যেসব স্বপ্ন দেখি, তোমাদের জন্য যে পরিকল্পনা করি, তা যেন বাস্তবায়িত হয়—এই জন্য তোমাদের দোয়া আমার কাছে অত্যন্ত প্রয়োজন।

আমি এই বার্তা এবং নির্দেশনা শুধু তোমাদের জন্যই দিই না, বরং স্কুল, কলেজ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থীকে আমি এভাবে দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছি। আমার চেষ্টা সবসময় একটাই—যে শিশুরা, তরুণী বা শিক্ষার্থী এই পরামর্শগুলো মেনে চলে, তারা হাফেজা, আলেমা এবং আল্লাহর পথে দৃঢ়ভাবে চলা একজন উত্তম মানবী হিসেবে গড়ে উঠুক।

তোমাদের জীবন হোক আলোকিত, তোমাদের শিক্ষাজীবন হোক সাফল্যমণ্ডিত, এবং তোমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ হোক আল্লাহর নেক ইচ্ছে পূরণের দিকে। মনে রাখবে, চেষ্টা, ধৈর্য, নিয়ত এবং আল্লাহর ওপর ভরসার মাধ্যমে তুমি যা চাও তা অর্জন করতে পারবে। আমি তোমাদের জন্য সবসময় দোয়া করি এবং এই দোয়া অব্যাহত রাখব, যাতে তোমরা আল্লাহর খেদমতে সেরা একজন বান্দা হিসেবে গড়ে উঠতে পারো।

p> আলহামদুলিল্লাহ, আমি খুবই আনন্দিত যে এই পর্যন্ত আমার অনেক স্টুডেন্ট রয়েছে যারা আমার লেখা, বক্তৃতা ও বয়ানগুলো পড়ে এবং শুনে তাদের জীবনকে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। তারা নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে সাজিয়েছে, আগে যেভাবে অনেকে অনর্থক পথে চলে যেত—অনেক ছবি দেখতো, নাটক দেখে মূল্যবান সময় নষ্ট করতো, খারাপ ভিডিও দেখে নিজেদের জীবনকে ধ্বংস করতো—এখন আলহামদুলিল্লাহ সেই সব অভ্যাস ছেড়ে দিয়েছে।

এখন তারা তাদের সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করছে। ছবি দেখা, অপ্রয়োজনীয় নাটক দেখা, টিকটক বানানো, সব ধরনের অনর্থক কার্যক্রম থেকে বিরত রয়েছে। পরিবর্তে তারা পড়ালেখায় মনোযোগ দিচ্ছে, কুরআন তেলাওয়াত করছে, মা-বাবার খেদমত করছে, এবং প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজে লাগাচ্ছে। তাদের জীবনে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তা শুধু আল্লাহর রহমত নয়, বরং নিয়মিত দিকনির্দেশনা অনুসরণের ফলাফল।

এটি আমাদেরকে শিখায় যে একজন শিক্ষকের লেখা বা বয়ান যদি নিষ্ঠা এবং মনোযোগের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়, তবে তা জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একজন ছাত্র বা শিক্ষার্থী যে নিজেকে সঠিক পথে পরিচালনা করার ইচ্ছা রাখে, সে আল্লাহর সাহায্য নিয়ে, সুন্দর জীবন গঠন করতে পারে। সময়ের অপচয় থেকে বিরত থাকা, মনোযোগী হওয়া, পরিবারের সেবা করা এবং আল্লাহর পথে কাজ করা—এই সব অভ্যাস আমাদের জীবনকে উন্নত ও আলোকিত করে।

তোমরা যখন তোমার জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করবে, যখন অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যবহার করবে, তখন তুমি নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করবে। আলহামদুলিল্লাহ, এই ধরনের উদাহরণ দেখায় যে পরিবর্তন সম্ভব, যে কেউ সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে চললে তার জীবন আলোকিত হতে পারে।

এটি তোমাদেরও শিক্ষা দিচ্ছে যে, যদি তুমি মনোযোগীভাবে আল্লাহর পথে চলার চেষ্টা করো, নিজের সময়কে মূল্যবান কাজে লাগাও, এবং প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করো, তাহলে তোমার জীবনেও অনুরূপ পরিবর্তন আসবে। আল্লাহর সাহায্য, দোয়া এবং ধৈর্য নিয়ে প্রতিটি বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। তাই প্রতিদিন চেষ্টা করবে, অনর্থক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবে এবং আল্লাহর খেদমতে নিজেকে উন্নত করবে।

p> এইজন্য তোমরা কখনোই মোবাইলের মধ্যে সময় নষ্ট করবে না। এই মোবাইলে ভিডিও দেখে দেখে নিজেদের চোখগুলোকেও নষ্ট করবে না, মনকেও নষ্ট করবে না। এগুলো অনেক গুনাহের কাজ, তাই এই ধরনের কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। বরং মোবাইলের সঠিক ব্যবহার করতে পারো—যেমন ইংরেজি ভাষা শিখতে পারো, পড়াশোনার জন্য সার্চ করতে পারো, শিক্ষণীয় ভিডিও দেখতে পারো। কখনো ছবি, নাটক, সিনেমা বা খারাপ ভিডিও দেখে নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করবে না, বরং সময়গুলোকে আল্লাহর খেদমতে এবং ভালো কাজে কাজে লাগাবে।

যেহেতু আমার লেখা বহু মানুষের কাছে পৌঁছেছে, আমি কৃষক, শ্রমিক এবং বিভিন্ন পেশার মানুষের উদ্দেশ্যে বয়ান করেছি। তাদের জন্য আমার লেখা বই আকারে ছাপানো হয়েছে। আমার এলাকার বিভিন্ন স্টুডেন্টদের জন্যও বিভিন্ন লেখা ছাপিয়ে দিয়েছি যাতে তারা তাদের জীবনের মূল্যবান সময় কীভাবে কাজে লাগাবে তা শিখতে পারে। সেই সাথে আমি তাদের উদ্দেশ্যে বয়ানও করেছি, যাতে তারা সঠিক দিকনির্দেশনা পায়।

অর্থাৎ, আমার জীবনের মূল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে দিতে সাহায্য করা। মানুষ যেন তাদের সময়কে মূল্যবান কাজে ব্যবহার করতে পারে, তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী উন্নতি করতে পারে, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়, গুনাহ মুক্ত জীবন যাপন করতে পারে এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। আমি সবসময় ছাত্রদের সাথে আলোচনা করি, তাদের জীবনকে খেয়াল রাখি এবং প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর পথে চলার গুরুত্ব বোঝাই।

যে কাজগুলো আল্লাহ তা'আলা আদেশ করেছেন, সেই কাজগুলো পালন করতে শেখানো এবং মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করা আমার জীবনের মূল উদ্দেশ্য। তাই তোমরা তোমার প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবানভাবে ব্যবহার করবে, অনর্থক কাজে সময় নষ্ট করবে না এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে।

p> আলহামদুলিল্লাহ, আমার আরো বেশ কিছু বই রয়েছে। যেমন, 'এক আদর্শ বিয়ে' এই নামে একটি বই লিখেছি। এই বইয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজকে একটি আদর্শ বিয়ের দিকনির্দেশনা দেওয়া। আমরা দেখিয়েছি কিভাবে সুন্নতের পথে বিয়ে করতে হয়, বিয়ের অনুষ্ঠান কেমন হওয়া উচিত, খাবার এবং অন্যান্য আয়োজন কেমন হওয়া উচিত। এছাড়াও স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের প্রতি আচরণ, পারিবারিক জীবন, সাংসারিক দায়িত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলোও বইটিতে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। যদি কখনো তোমাদের এই বই প্রয়োজন হয়, নিশ্চয় আমাকে বলবে, আমি তোমাদের জন্য এটি দিয়ে দেব। যদিও বর্তমানে তোমাদের বিয়ের সময় হয়েছে না, তাই আপাতত বইটি দিচ্ছি না, তবে সময় এলে ইনশাল্লাহ তোমাদের জন্য দেব।

এছাড়াও আমি 'এক আদর্শ জীবনের খোঁজে' নামে একটি বই লিখেছি। স্বাভাবিকভাবে তোমরা আমার ল্যাপটপে দেখেছো, আমি কতগুলো কাজ করেছি, তাই এখানে সবগুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করলাম না। এ পর্যন্ত তোমাদের সাথে অনেক মূল্যবান আলোচনা করেছি এবং আল্লাহর সাহায্যে আমরা এগিয়ে চলব। প্রতিটি লেখা, প্রতিটি পরামর্শ তোমাদের জীবনে আলোর দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।

p> আল্লাহ তা'আলা আমাদের এই উপরোক্ত সকল আলোচনাগুলোর উপর আমল করার তৌফিক দান করুন। এই আলোচনাগুলো যারা পড়েছেন, তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা উত্তম জীবন দান করুন, মনের আশা পূরণ করুন, স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করুন এবং সর্বশেষ যে পথে চললে আল্লাহ তা'আলা খুশি হন, সেই পথে চলার তৌফিক দান করুন। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করুন এবং মৃত্যুর সময় কালেমা নসিব করুন। আমিন।

আল্লাহ তা'আলা যেন আমাদের সব প্রকার ভুল থেকে হেফাজত করুন। সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করুন; আকস্মিক দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, পানিতে ডুবে যাওয়া এবং নানা ধরনের বিপদ থেকে আমাদের হেফাজত করুন। আমাদের সুখময় ও সুশৃংখল জীবন দান করুন, মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে চলার তৌফিক দিন এবং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ী আমাদের চলার তৌফিক দান করুন।

এইজন্য নবীদের জীবনী পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নবী হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত অর্থাৎ জীবনীর সকল দিক—তার চলাফেরা, কথাবার্তা, খাবার-দাবার, দৈনন্দিন আচরণ—পড়তে হবে, জানতে হবে এবং তাতে আমল করতে হবে। এছাড়াও সাহাবীদের জীবনীর অধ্যয়ন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ সাহাবীরা কেমন ছিলেন তা জানলে আমরা তাদের মত নিজেদের জীবনকে সুশৃংখল ও নেকি-নির্ভরভাবে গড়ে তুলতে পারব।

p> এবং তোমাদেরকে আমি বলি সেটা হল—আমাদের নবীজির স্ত্রীরা যেমন ছিলেন, মহিলা সাহাবীরা যেমন ছিলেন, অবশ্যই তোমাদেরও সেরকম একটি জীবন গঠন করতে হবে। এমন একটি জীবন আমি তোমাদেরকে গঠন করার জন্য বলছি, যেই জীবনের ব্যাপারে কবি বলেছেন: “এমন জীবন করিও গঠন, হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।” অর্থাৎ তোমাকে এমন জীবন গঠন করতে হবে, যে জীবন থেকে তুমি দুনিয়া থেকে বিদায় নিলে, তখন দুনিয়াবাসী তোমার জন্য কান্না করবে, গাছপালা, আকাশ, গ্রহ ও নক্ষত্র—সকলই তোমার জন্য কাঁদবে, কিন্তু তুমি হাসতে থাকবে কারণ তুমি জান্নাতে চলে গিয়েছো এবং আল্লাহ তোমার উপর খুশি হয়েছেন।

এইজন্য দুনিয়াতে বেঁচে থাকতে এমন কিছু কাজ করতে হবে, যেগুলো করলে তুমি মৃত্যুর পরেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তোমরা চলে যাওয়ার পরেও মানুষ তোমাদের কথা মনে রাখবে। আমি হয়তো একদিন চলে যাব, কিন্তু এই লেখাগুলো আজীবন থেকে যাবে। কলমের কালি কখনো মুছে যায় না, বরং এগুলো সবসময় থেকে যায়। আমি চলে গেলেও এই লেখাগুলো তোমাদের কাছে থাকবে এবং ধাপে ধাপে বিভিন্ন মানুষের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাবে। আজ থেকে ৫০ বছর পরে এই লেখাগুলো থেকে মানুষ অনেক উপকার পাবে।

এইজন্য তোমাদের এমন কিছু কাজ করতে হবে, যা মানুষের জন্য এবং সমাজের জন্য অনন্য অবদান রাখবে। আর তোমরা এগুলো পারবে ইনশাল্লাহ। বাকি এখন নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে, টেনশন করবে না। চিন্তা করবে কিভাবে জীবনের উন্নতি করা যায়, কিভাবে প্রতিটি পদক্ষেপে যোগ্যতা অর্জন করা যায়, একজন যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি হওয়া যায়, পড়াশোনায় সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানো যায় এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রেখে চলা যায়। এই চিন্তা ভাবনা এখন প্রতিটি মুহূর্ত তোমাদের করতে হবে।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে আমল করার তৌফিক দান করুন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি