অমূল্য সময়ের অপচয়: রমজান, মোবাইল এবং আমাদের আত্মসমালোচনা
অমূল্য সময়ের অপচয়: রমজান, মোবাইল এবং আমাদের আত্মসমালোচনা
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। ধন-সম্পদ হারিয়ে গেলে আবার অর্জন করা যায়, স্বাস্থ্য হারিয়ে গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে ফিরে পাওয়া যায়; কিন্তু যে সময় চলে যায়, তা আর কখনো ফিরে আসে না। অথচ আমাদের জীবনের এই অমূল্য সময়টিই আমরা অনেক সময় এমন কাজে ব্যয় করি যার না আছে দুনিয়াবী উপকার, না আছে আখিরাতের কোন কল্যাণ।
বিশেষ করে রমজান মাস—যে মাসটি আল্লাহ তাআলা রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস হিসেবে দান করেছেন—সেই পবিত্র মাসেও আমাদের অনেকের জীবনে তেমন পরিবর্তন আসে না। রমজানের আগে আমরা যেমন মোবাইলের মধ্যে অহেতুক সময় কাটাতাম, তেমনি রমজান মাসেও অবসর পেলেই আমরা রিলস, শর্ট ভিডিও, নাচ-গান বা বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় বিষয় দেখে সময় নষ্ট করি।
রমজান: পরিবর্তনের মাস
রমজান এমন একটি মাস, যার প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর কাছে অমূল্য। এই মাসে একটি নফল ইবাদতের সওয়াব ফরজের সমান এবং একটি ফরজ ইবাদতের সওয়াব সত্তর গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা বাকারা: ১৮৩)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে রমজানের মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন করা। কিন্তু আমরা যদি এই মাসেও মোবাইলের মধ্যে সময় নষ্ট করি, তাহলে সেই তাকওয়া কিভাবে অর্জন করব?
অহেতুক ভিডিও সংস্কৃতি
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন একটি জায়গায় পরিণত হয়েছে যেখানে মানুষ খুব সহজেই নিজেকে প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এই সুযোগটিকে অনেকেই এমন কাজে ব্যবহার করছে যার কোন উপকারিতা নেই।
আমরা দেখতে পাই, অনেক তরুণ-তরুণী এমন ভিডিও তৈরি করে যেখানে নাচ, গান, অশ্লীলতা বা অপ্রয়োজনীয় হাস্যরস ছাড়া আর কিছুই নেই। এই ভিডিওগুলো হয়তো কিছু সময়ের জন্য মানুষকে বিনোদন দেয়, কিন্তু এর মাধ্যমে কি কোন স্থায়ী কল্যাণ অর্জিত হয়?
বরং অনেক সময় দেখা যায়—এই ধরনের ভিডিও মানুষের সম্মান নষ্ট করে দেয়। মানুষ তাকে দেখে হাসাহাসি করে, উপহাস করে, কিন্তু প্রকৃত সম্মান দেয় না।
সম্মান বনাম অর্থ
অনেকে মনে করে—এই ধরনের ভিডিও বানিয়ে যদি কিছু টাকা আয় করা যায় তাহলে তাতে সমস্যা কী? কিন্তু বাস্তবতা হলো টাকা আর সম্মান এক জিনিস নয়।
যার টাকা আছে সে সবসময় সম্মানিত নয়। কিন্তু যে সম্মানিত, সে টাকা না থাকলেও সম্মানিত থাকে।
ইতিহাসে আমরা এমন অসংখ্য মানুষের উদাহরণ পাই যাদের হয়তো ধন-সম্পদ খুব বেশি ছিল না, কিন্তু তাদের জ্ঞান, চরিত্র এবং কর্মের কারণে মানুষ আজও তাদের সম্মানের সাথে স্মরণ করে।
মৃত্যুর পরের স্মৃতি
মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া কাজই তাকে স্মরণীয় করে রাখে। কেউ যদি এমন কাজ করে যায় যা মানুষের উপকারে আসে, তাহলে সে মৃত্যুর পরেও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।
আমরা দেখতে পাই—অনেক আলেম ও দায়ী এমন ভিডিও বা বক্তব্য রেখে গেছেন যা আজও মানুষ শুনে কাঁদে, অনুপ্রাণিত হয়, এবং দ্বীনের পথে ফিরে আসে।
উদাহরণস্বরূপ অনেক বড় আলেম ও দ্বীনি ব্যক্তিত্ব তাদের জীবদ্দশায় এমন কিছু কাজ করে গেছেন যা আজও মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে।
তাদের বক্তৃতা, নসিহত এবং দ্বীনি দাওয়াত আজও মানুষের জীবন পরিবর্তন করছে।
অপ্রয়োজনীয় জনপ্রিয়তার মোহ
বর্তমান যুগে “ভাইরাল হওয়া” যেন অনেকের জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ চায় তার ভিডিও লাখ লাখ মানুষ দেখুক, শেয়ার করুক, মন্তব্য করুক।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ভাইরাল হওয়ার মাধ্যমে আমরা কি অর্জন করছি?
যদি ভাইরাল হওয়ার মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হয়, শিক্ষা লাভ করে, দ্বীনের পথে আসে—তাহলে সেটি অবশ্যই একটি ভালো কাজ।
কিন্তু যদি ভাইরাল হওয়ার জন্য আমরা এমন কাজ করি যা আমাদের সম্মান নষ্ট করে দেয়, তাহলে সেটি কেবল সাময়িক আনন্দ ছাড়া আর কিছুই নয়।
সময়ের সঠিক ব্যবহার
একজন সচেতন মুসলমানের উচিত তার সময়কে এমন কাজে ব্যয় করা যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের জন্য উপকারী।
যদি কেউ শিক্ষক হন, তাহলে তিনি শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি করতে পারেন।
যদি কেউ কুরআন বা ইসলামি জ্ঞান জানেন, তাহলে তিনি সেই জ্ঞান মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারেন।
এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
আত্মসমালোচনার সময়
আজ আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত—আমরা কি সত্যিই আমাদের সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করছি?
আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত কি আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি আমরা এমন কাজে ব্যস্ত যা আমাদের জীবনকে অর্থহীন করে দিচ্ছে?
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لا تزول قدما عبد يوم القيامة حتى يسأل عن عمره فيما أفناه
“কিয়ামতের দিন বান্দার পা নড়বে না যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে—সে তার জীবন কোথায় ব্যয় করেছে।”
আমাদের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। এই সংক্ষিপ্ত জীবনে আমরা যা করি তাই আমাদের পরিচয় হয়ে থাকে।
তাই আমাদের উচিত এমন কাজ করা যা আমাদের মৃত্যুর পরেও মানুষের উপকারে আসে এবং আমাদের জন্য সাদাকায়ে জারিয়াহ হয়ে থাকে।
অহেতুক ভিডিও, নাচ-গান বা অপ্রয়োজনীয় বিনোদনের পেছনে সময় নষ্ট না করে আমরা যদি জ্ঞান, শিক্ষা ও কল্যাণমূলক কাজের দিকে মনোযোগ দিই, তাহলে আমাদের জীবন অর্থবহ হয়ে উঠবে।হয়তো তখন আমাদের রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো মানুষ দেখবে, শুনবে, এবং আমাদের জন্য দোয়া করবে।
Comments
Post a Comment