পরিবার: এক মহান আমানত, এক হৃদয়ের হিসাব

পরিবার: এক মহান আমানত, এক হৃদয়ের হিসাব

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

প্রতিটি পরিবার একটি আমানত। এটি কেবল রক্তের সম্পর্কের সমষ্টি নয়; এটি দায়িত্ব, ভালোবাসা, করুণা ও জবাবদিহিতার এক পবিত্র বন্ধন। আল্লাহ তাআলা আমাদের যাদের হাতে তুলে দিয়েছেন—আমার স্ত্রী, আমার সন্তান, আমার মা-বাবা—তারা কেউই আমার সম্পত্তি নয়; তারা আমার কাছে অর্পিত আমানত। কিয়ামতের দিন এই আমানতের হিসাব হবে। আমরা প্রায়ই ভাবি—আমি উপার্জন করি, সংসার চালাই, দায়িত্ব পালন করি। কিন্তু প্রশ্ন হলো: আমি কি হৃদয়ের দায়িত্ব পালন করছি? আমি কি ভালোবাসার হক আদায় করছি? আমি কি তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি, নাকি অজান্তেই তাদের চোখে অশ্রু এনেছি?

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا﴾ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।” (সূরা তাহরীম ৬৬:৬)। এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিবার কেবল দুনিয়ার আরাম-আয়েশের জন্য নয়; আখিরাতের নাজাতের পথও পরিবারের ভেতর থেকেই শুরু হয়। আমি যদি নিজে নামাজ না পড়ি, কুরআন না তিলাওয়াত করি, আল্লাহর হুকুম মানতে গাফেল থাকি—তবে কিভাবে আমি আমার পরিবারকে নাজাতের পথে ডাকব?

আমরা সারাদিন বাইরে কাজ করি, ক্লান্ত হই, দায়িত্ব পালন করি—এটি সত্য। কিন্তু বাড়িতে ফেরার পর আমার আচরণ কেমন? আমি কি দরজা খুলে হাসিমুখে প্রবেশ করি, নাকি বিরক্ত মুখে? আমার স্ত্রী কি আমার উপস্থিতিতে স্বস্তি পায়, নাকি ভয় পায়? সে কি আমার কাছে তার মনের কথা বলতে পারে? তার ছোট ছোট আবদার কি আমার কাছে বোঝা, নাকি ভালোবাসার সুযোগ?

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي» “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।” (তিরমিযী)। তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত, অথচ ঘরে তিনি ছিলেন কোমল স্বামী, স্নেহময় পিতা। তিনি ঘরের কাজে সাহায্য করতেন, স্ত্রীদের সাথে পরামর্শ করতেন, তাদের অনুভূতির মর্যাদা দিতেন। আমরা কি তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করছি?

স্ত্রী কেবল সংসারের কর্মী নয়; সে হৃদয়ের সঙ্গী। আল্লাহ বলেন: ﴿وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً﴾ “তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও; আর তিনি তোমাদের মাঝে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।” (সূরা রূম ৩০:২১)। এই ‘মাওয়াদ্দাহ’ ও ‘রহমাহ’—ভালোবাসা ও দয়া—যদি আমাদের ঘরে না থাকে, তবে উপার্জনের প্রাচুর্যও সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না।

আমার সন্তান—সে আমার ভবিষ্যৎ নয়, সে আমার পরীক্ষা। আমি তাকে কী শিখাচ্ছি? শুধু দুনিয়ার সাফল্য, নাকি দীনদারির মূল্য? সে কি আমাকে দেখে নামাজের প্রতি আগ্রহী হয়, নাকি মোবাইল আর দুনিয়ার ব্যস্ততায় নিমগ্ন দেখতে পায়? সন্তানরা আমাদের কথা যত না শোনে, তার চেয়ে বেশি আমাদের কাজ অনুসরণ করে। যদি আমার চরিত্রে ইসলাম না থাকে, তবে মুখের উপদেশ ফলপ্রসূ হবে না।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ» “তোমাদের প্রত্যেকেই রাখাল, এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)। আমি আমার পরিবারের রাখাল। যদি তারা আমার আচরণে কষ্ট পায়, যদি তারা অবহেলিত হয়, তবে কিয়ামতের দিন আমি কী জবাব দেব?

মা-বাবা—তারা আমাদের জান্নাতের দরজা। আল্লাহ বলেন: ﴿وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا﴾ “তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন—তোমরা তাঁর ইবাদত ছাড়া কারও ইবাদত করো না এবং মা-বাবার সাথে উত্তম আচরণ কর।” (সূরা ইসরা ১৭:২৩)। আমার কথা, আমার আচরণ, আমার উপেক্ষা—এসব কি তাদের হৃদয়ে ব্যথা দেয় না? তারা হয়তো মুখে কিছু বলে না, কিন্তু অন্তরে কষ্ট জমে। সেই কষ্টের হিসাব কে দেবে?

পরিবারের প্রতি দায়িত্ব কেবল ভরণপোষণ নয়; সময় দেওয়া, মনোযোগ দেওয়া, সম্মান দেওয়া—এসবও ইবাদত। আমি কি কখনো পরিবারের সাথে বসে কুরআন তিলাওয়াত করেছি? আমি কি তাদের নিয়ে জামাতে নামাজ পড়েছি? আমি কি ঘরে ইসলামী পরিবেশ গড়ে তুলেছি, নাকি টিভি, গীবত, রাগ আর অবহেলাই আমাদের ঘরের পরিচয়?

যদি আমার স্ত্রী আমার দ্বারা কষ্ট পায়, যদি আমার সন্তান আমাকে ভয় পায়, যদি আমার মা-বাবা আমার কারণে অশ্রু ফেলে—তবে আমার এই জীবন কীভাবে সফল হবে? বাইরে মানুষ আমাকে সম্মান করলেও ঘরের মানুষ যদি অসন্তুষ্ট থাকে, তবে আমি ব্যর্থ।

আসুন আমরা নিজেদের প্রশ্ন করি—আমার পরিবার কি আমার উপর সন্তুষ্ট? তারা কি আমাকে ভালোবাসে? তারা কি আমাকে কাছে পেলে নিরাপদ বোধ করে? যদি না করে, তবে এখনই পরিবর্তনের সময়। কারণ সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়। সন্তান বড় হয়ে যায়, মা-বাবা চলে যান, যৌবন শেষ হয়ে যায়—তখন আফসোস ছাড়া কিছুই থাকে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ﴾ “সেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান কোনো উপকার করবে না, কেবল সেই ব্যক্তি ব্যতীত যে আল্লাহর কাছে বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে আসবে।” (সূরা শু‘আরা ২৬:৮৮-৮৯)। পরিবারের প্রতি দয়া, ভালোবাসা, ন্যায় ও ইসলামি আচরণ—এগুলোই হৃদয়কে বিশুদ্ধ করে।

আসুন, আজ আমরা সংকল্প করি—আমরা ঘরে ফিরব হাসিমুখে, কথা বলব কোমল ভাষায়, শুনব মনোযোগ দিয়ে, বুঝব ভালোবাসা দিয়ে। আমরা আমাদের পরিবারকে দুনিয়ার প্রতিযোগিতার মাঝে হারিয়ে যেতে দেব না; বরং জান্নাতের পথে একসাথে চলব।

হে আল্লাহ! আমাদের পরিবারকে আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন। ﴿رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا﴾ “হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানান।” (সূরা ফুরকান ২৫:৭৪)। আমাদের ঘরগুলোকে রহমতের বাগান বানিয়ে দিন, আমাদের হৃদয়গুলোকে ভালোবাসায় পূর্ণ করুন, এবং আমাদেরকে সেই মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা তাদের পরিবারের কাছে উত্তম। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি