রমজানে দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো: ইফতার ভাগাভাগির ফজীলত, করণীয় ও সামাজিক দায়িত্ব

রমজানে দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো: ইফতার ভাগাভাগির ফজীলত, করণীয় ও সামাজিক দায়িত্ব

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

শুরু কথা,,

রমজান মাস শুধু রোজা রাখা, তারাবীহ পড়া বা কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সহানুভূতি, দানশীলতা ও মানবিকতার মাস। এই মাস আমাদের শেখায়—আমরা নিজেরা ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করে যেন অন্যের কষ্ট বুঝতে পারি। সমাজে এমন বহু দরিদ্র পরিবার রয়েছে যারা ইফতারের সময় সামান্য খাবারও জোগাড় করতে পারে না। আমরা যখন নানা রকম ফল, শরবত, ভাজাপোড়া ও মিষ্টান্ন দিয়ে ইফতার সাজাই, তখন হয়তো পাশের ঘরেই কেউ শুকনো রুটি বা এক গ্লাস পানি দিয়ে রোজা ভাঙে।

এই বাস্তবতা আমাদের অন্তরকে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রশ্ন হলো—আমরা কি পারি না এমন পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করতে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে? নিশ্চয়ই পারি, এবং সেটাই হওয়া উচিত একজন সচেতন মুমিনের কাজ।

দান ও সহানুভূতির ইসলামী ভিত্তি

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:

وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا

অর্থ: তারা আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে। (সূরা দাহর: ৮)

এই আয়াত প্রমাণ করে যে, খাদ্য দান করা একটি মহৎ ইবাদত। বিশেষ করে রমজানে ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার খাওয়ানো অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ غَيْرَ أَنَّهُ لَا يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْءٌ

অর্থ: যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ঐ রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, অথচ রোজাদারের সওয়াবে কোনো কমতি হবে না।

সমাজে দরিদ্রদের বাস্তব চিত্র

আমাদের আশেপাশে এমন বহু মানুষ রয়েছে—

  • দিনমজুর, যারা কাজ না পেলে উপার্জন করতে পারে না।
  • বিধবা নারী, যারা সন্তানদের নিয়ে কষ্টে জীবনযাপন করেন।
  • এতিম শিশু, যাদের মাথার উপর অভিভাবক নেই।
  • রাস্তায় বসবাসকারী অসহায় মানুষ।

রমজানে বাজারদর বেড়ে যায়, ফলে দরিদ্র পরিবারগুলোর কষ্ট আরও বাড়ে। তারা হয়তো খেজুর, ফল বা পুষ্টিকর খাবার কিনতেই পারে না।

আমাদের করণীয়

১. দরিদ্র পরিবার খুঁজে বের করা

মসজিদের ইমাম, স্থানীয় মুরব্বি বা বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে প্রকৃত অভাবী পরিবার চিহ্নিত করা যেতে পারে।

২. ইফতার সামগ্রী বিতরণ

চাল, ডাল, তেল, ছোলা, খেজুর, চিনি, লবণ, ফল ইত্যাদি নিয়ে একটি প্যাকেট তৈরি করে তাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।

৩. গোপনে দান করা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِن تُبْدُوا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ ۖ وَإِن تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ

অর্থ: তোমরা যদি প্রকাশ্যে সদকা দাও তা ভালো, কিন্তু গোপনে গরিবদের দিলে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম। (সূরা বাকারা: ২৭১)

৪. রাস্তাঘাটে ইফতার বিতরণ

অনেক শ্রমজীবী মানুষ রাস্তায় কাজ করতে করতে ইফতার করে। তাদের জন্য পানি, খেজুর ও হালকা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা যেতে পারে।

৫. মসজিদে ইফতার আয়োজন

মসজিদে সাধারণ ইফতার আয়োজন করলে দরিদ্র ও পথচারীরা উপকৃত হয়।

ইফতারে অপচয় বর্জন

আমাদের সমাজে ইফতারের নামে প্রায়ই অপচয় হয়। অথচ সেই অতিরিক্ত খাবার দিয়ে কয়েকটি পরিবারকে সাহায্য করা যেত।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

كُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا

অর্থ: তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।

সমষ্টিগত উদ্যোগ

বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন বা এলাকার মানুষ মিলে একটি তহবিল গঠন করা যেতে পারে। এতে বৃহৎ পরিসরে সাহায্য করা সম্ভব।

  • মাসব্যাপী ইফতার কর্মসূচি
  • সাপ্তাহিক খাদ্য বিতরণ
  • এককালীন সহায়তা

আত্মিক প্রভাব

দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ালে হৃদয়ে নম্রতা আসে, অহংকার দূর হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হয়।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ

অর্থ: যারা দয়া করে, পরম করুণাময় তাদের প্রতি দয়া করেন।

পরিবারকে সম্পৃক্ত করা

সন্তানদের নিয়ে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করলে তাদের মাঝে দানশীলতা ও মানবিকতা গড়ে ওঠে।

নিয়ত ও ইখলাস

সব কাজই একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। লোক দেখানো বা ছবি তোলার উদ্দেশ্যে নয়।

রমজান আমাদের জন্য একটি সুযোগ—নিজের ইবাদতের পাশাপাশি সমাজের দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ। আমরা যদি সামান্য কিছু কম খাই, কম খরচ করি এবং সেই অংশটুকু অভাবীদের জন্য বরাদ্দ করি, তবে সমাজে নেমে আসবে বরকত ও শান্তি।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন বান্দা বানান যারা শুধু নিজের ইফতার সাজায় না, বরং অন্যের ঘরেও ইফতারের আলো জ্বালায়। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি