শবে বরাতের রাতে সালাতুত তাসবিহ
শবে বরাতের রাতে সালাতুত তাসবিহ
ক্ষমা ও রহমতের এক অপূর্ব সুযোগআজকের এই বরকতময় রাত—লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান, যাকে আমরা বাংলায় শবে বরাত নামে চিনি—আমাদের জীবনে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ নিয়ে হাজির হয়েছে। এটি এমন এক রাত, যে রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন, বান্দার তাওবা কবুল করেন এবং অসংখ্য গুনাহ মাফ করে দেন।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো—এই মহামূল্যবান রাতকে আমরা অনেক সময় অবহেলায় হারিয়ে ফেলি। কেউ ব্যস্ত থাকে অপ্রয়োজনীয় আয়োজন নিয়ে, কেউ রাত জাগে বিনোদনে, আবার কেউ এই রাতের ফজিলত সম্পর্কে জানার আগ্রহই দেখায় না। অথচ এই রাত ছিল ইবাদতের, আত্মশুদ্ধির, গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়ার এক সুবর্ণ সময়।
এই রাতে যে গুরুত্বপূর্ণ আমলটি আমরা করতে পারি, এবং যা আমাদের জীবনে হয়তো অনেকেরই এখনো আদায় করার সুযোগ হয়নি—তা হলো সালাতুত তাসবিহ।
সালাতুত তাসবিহ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
সালাতুত তাসবিহ এমন একটি বিশেষ নামাজ, যার ফজিলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে—এই নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রকাশ্য ও গোপন, ছোট ও বড়, ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত—সব ধরনের গুনাহ ক্ষমা করে দেন।
সহীহ হাদীসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত— রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর চাচা হযরত আব্বাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিব (রাঃ)-কে বলেন:
“চাচাজি, আমি আপনাকে একটি বিশেষ উপহার দিতে চাই। আপনি যদি এটি পালন করেন, তাহলে আল্লাহ আপনার ছোট-বড়, পূর্বের-পেছনের, ইচ্ছাকৃত-অনিচ্ছাকৃত, প্রকাশ্য-গোপন—সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তা হলো—আপনি চার রাক‘আত সালাত আদায় করবেন।”
এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) সালাতুত তাসবিহের পূর্ণ পদ্ধতি বর্ণনা করেন। প্রত্যেক রাক‘আতে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পাঠ করার পর নির্দিষ্ট সংখ্যায় এই তাসবিহ পাঠ করতে বলা হয়েছে:
سبحان الله والحمد لله ولا إله إلا الله والله أكبر
প্রতিটি রাক‘আতে মোট ৭৫ বার এবং চার রাক‘আতে সর্বমোট ৩০০ বার এই তাসবিহ পাঠ করা হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন— যদি সম্ভব হয়, তাহলে প্রতিদিন একবার এই নামাজ আদায় করবে। না পারলে প্রতি সপ্তাহে একবার, না পারলে প্রতি মাসে একবার, না পারলে বছরে একবার, আর যদি তাও সম্ভব না হয়—তাহলে অন্তত জীবনে একবার হলেও এই সালাত আদায় করবে।
আমাদের নিজেদের দিকে তাকানো দরকার
এখন প্রশ্ন হলো—আমরা নিজেরাই কি কখনো ভেবে দেখেছি, আমাদের জীবনে কতবার সালাতুত তাসবিহ আদায় করা হয়েছে? অনেকের উত্তর হবে—কখনোই না। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) এমন একটি আমলকে এত গুরুত্ব দিয়ে উম্মতকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন।
আজকের এই রাত হতে পারে আমাদের জীবনের সেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ—যেদিন আমরা আল্লাহর সামনে মাথা নত করে বলবো, “হে আল্লাহ, আমি অপরাধী, আমি ভুল করেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন।”
শবে বরাতে আমাদের করণীয়
এই রাতে আমাদের উচিত—
- সালাতুত তাসবিহ আদায় করা
- নফল নামাজে মনোনিবেশ করা
- বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করা
- কুরআন তিলাওয়াত করা
- জিকির ও দোয়ায় নিজেকে ব্যস্ত রাখা
- গুনাহের কাজ থেকে দূরে থাকা
টিভি, সিনেমা, নাটক, গান, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা, গীবত ও বাজে কথাবার্তার মাধ্যমে যেন আমরা এই রাতের বরকত নষ্ট না করি।
শেষ কথা
এই রাত হয়তো আমাদের জীবনে বারবার আসে না, কিন্তু প্রতিটি রাতই আমাদের মৃত্যুর দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই আজই সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার—আমরা আল্লাহর দিকে ফিরবো, নাকি গাফিলতায় ডুবে থাকবো।
আসুন, আজকের এই বরকতময় রাতে আমরা সবাই সালাতুত তাসবিহ আদায় করি, নিজেদের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হই, আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চাই।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই মহামূল্যবান রাতকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর তৌফিক দান করুন। আমাদের গুনাহ মাফ করে দিন, অন্তর পরিষ্কার করে দিন এবং আমলের পথে দৃঢ় থাকার শক্তি দান করুন।
হাদিসটির আরবী পাঠ আমরা তুলে ধরছি :
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لِلْعَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ: يَا عَبَّاسُ يَا عَمَّاهُ أَلَا أُعْطِيكَ؟ أَلَا أَمْنَحُكَ؟ أَلا أحبوك؟ أَلَا أَفْعَلُ بِكَ عَشْرَ خِصَالٍ إِذَا أَنْتَ فَعَلْتَ ذَلِكَ غَفَرَ اللَّهُ لَكَ ذَنْبَكَ أَوَّلَهُ وَآخِرَهُ قَدِيمَهُ وَحَدِيثَهُ خَطَأَهُ وَعَمْدَهُ صَغِيرَهُ وَكَبِيرَهُ سِرَّهُ وَعَلَانِيَتَهُ: أَنْ تُصَلِّيَ أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ تَقْرَأُ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ فَاتِحَةَ الْكِتَابِ وَسُورَةً. فَإِذَا فَرَغْتَ مِنَ الْقِرَاءَةِ فِي أَوَّلِ رَكْعَةٍ وَأَنْتَ قَائِمٌ قُلْتَ سُبْحَانَ اللَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ خَمْسَ عَشْرَةَ مَرَّةً ثُمَّ تَرْكَعُ فَتَقُولُهَا وَأَنْتَ رَاكِعٌ عَشْرًا ثُمَّ تَرْفَعُ رَأْسَكَ مِنَ الرُّكُوعِ فَتَقُولُهَا عَشْرًا ثُمَّ تَهْوِي سَاجِدًا فَتَقُولُهَا وَأَنْتَ سَاجِدٌ عَشْرًا ثُمَّ تَرْفَعُ رَأْسَكَ مِنَ السُّجُودِ فَتَقُولُهَا عَشْرًا ثُمَّ تَسْجُدُ فَتَقُولُهَا عَشْرًا ثُمَّ تَرْفَعُ رَأْسَكَ فَتَقُولُهَا عَشْرًا فَذَلِكَ خَمْسٌ وَسَبْعُونَ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ تَفْعَلُ ذَلِكَ فِي أَرْبَعِ رَكَعَاتٍ إِنِ اسْتَطَعْت أَن تصليها فِي كل يَوْم فَافْعَلْ فَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَفِي كُلِّ جُمُعَةٍ مَرَّةً فَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَفِي كُلِّ شَهْرٍ مَرَّةً فَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَفِي كُلِّ سَنَةٍ مَرَّةً فَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَفِي عُمْرِكَ مَرَّةً . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي الدَّعْوَات الْكَبِير
হাদিসটির অনুবাদ:
আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আব্বাস ইবনু ’আবদুল মুত্ত্বালিবকে বললেন, হে ’আব্বাস! হে আমার চাচাজান! আমি কি আপনাকে দান করব না? আমি কি আপনাকে দান করব না? আমি কি আপনাকে বলে দেব না? আপনাকে কি দশটি অভ্যাসের অধিপতি বানিয়ে দেব না? আপনি যদি এগুলো ’আমল করেন তাহলে আল্লাহ আপনাকে পূর্বের, পরের, পুরানো ও নতুন, ইচ্ছাকৃত অথবা ভুলক্রমের, ছোট কি বড়, প্রকাশ্য কি গোপন, সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। আর সেটা হলো আপনি চার রাক্’আত সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করবেন। প্রতি রাক্’আতে ফাতিহাতুল কিতাব ও সঙ্গে একটি সূরাহ্। প্রথম রাক্’আতের ক্বিরাআত (কিরআত) পড়া শেষ হলে দাঁড়ানো অবস্থায় পনের বার এ তাসবীহ পড়বেনঃ ’’সুবহা-নাল্ল-হি ওয়াল হামদু লিল্লা-হি, ওয়ালা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হু আল্ল-হু আকবার’’। তারপর রুকূ’তে যাবেন। রুকূ’তে এ তাসবীহটি দশবার পড়বেন। তারপর রুকূ’ হতে মাথা উঠিয়ে এ তাসবীহ আবার দশবার পড়বেন।
তারপর সিজদা্ (সিজদা/সেজদা) করবেন। সাজদায় এ তাসবীহ দশবার পড়বেন। তারপর সিজদা্ হতে মাথা উঠাবেন। সেখানেও এ তাসবীহ দশবার পড়বেন। তারপর দ্বিতীয় সাজদায় যাবেন। এ তাসবীহ দশবার এখানেও পড়বেন। তারপর সিজদা্ হতে মাথা উঠিয়ে এ তাসবীহ দশবার পড়বেন। সর্বমোট এ তাসবীহ এক রাক্’আতে পঁচাত্তর বার হবে। চার রাক্’আতে এ রকম পড়ে যেতে হবে। আপনি যদি প্রতিদিন এ সালাত এ রকম পড়তে পারেন তাহলে প্রতিদিনই পড়বেন। প্রতিদিন পড়তে না পারলে সপ্তাহে একদিন পড়বেন। সপ্তাহে একদিন পড়তে না পারলে প্রতিমাসে একদিন পড়বেন। যদি প্রতি মাসে একদিন পড়তে না পারেন, বছরে একবার পড়বেন। যদি বছরেও একবার পড়তে না পারেন, জীবনে একবার অবশ্যই পড়বেন। (আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ, বায়হাক্বী’র দা’ওয়াতুল কাবীর)
আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।
Comments
Post a Comment