এসো, ১৫ শাবান দিনের আমল নিয়ে আলোচনা করি
এসো, ১৫ শাবান দিনের আমল নিয়ে আলোচনা করি
শবে বরাতের পরের দিন হলো শাবান মাসের ১৫ তারিখ। এই দিনটি নিয়ে আমাদের সমাজে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে— এই দিনে কি রোযা রাখা উচিত? এর ফজিলত কী? এসো, কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে বিষয়টি শান্তভাবে বুঝে নিই।
শাবান মাসের ১৫ তারিখের রোযা
শবে বরাতের পরের দিন অর্থাৎ শাবান মাসের ১৫ তারিখে অনেকেই রোযা রেখে থাকেন। এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা অত্যন্ত জরুরি।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি চান্দ্র মাসে তিন দিন রোযা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও মাসে তিন দিন রোযা রাখতে উৎসাহ দিতেন। এই আমলটি সুন্নত হিসেবে হাদীসে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
এ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে—
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখা সুন্নত। (দ্রষ্টব্য: জামে তিরমিযী, হাদীস: ৭৬০; ৭৬৩)
এই তিন দিন মাসের শুরুতে হতে পারে, মাঝখানে হতে পারে কিংবা মাসের শেষের দিকেও হতে পারে। তবে কিছু হাদীসে বিশেষভাবে মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোকে বলা হয় আইয়ামে বীয।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে এই আইয়ামে বীযে রোযা রাখতে বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন।
(দ্রষ্টব্য: জামে তিরমিযী, হাদীস: ৭৬১; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২৪৪৯; ফাতহুল বারী, হাদীস ১৯৮১-এর আলোচনা)
আইয়ামে বীযের ফজিলত
এই হাদীসগুলোর আলোকে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেয ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ বলেন—
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে তিন দিনের কথা বলেছেন, সেই নির্দিষ্ট তিন দিন (১৩, ১৪, ১৫) রোযা রাখাই সর্বোত্তম।
(দ্রষ্টব্য: ফাতহুল বারী, হাদীস ১৯৮১-এর আলোচনা)
সুতরাং বোঝা যায়, প্রতি মাসের আইয়ামে বীযে রোযা রাখা একটি সুন্নত আমল। শাবান মাসও এর ব্যতিক্রম নয়।
১৫ শাবান রোযার সারকথা
যেহেতু শাবান মাসের ১৫ তারিখ আইয়ামে বীযের অন্তর্ভুক্ত, তাই এই দিনে রোযা রাখা সুন্নত হিসেবে গণ্য হয়।
এটি কোনো নতুন বা বিশেষ আলাদা বিধান নয়, বরং মাসিক তিন দিনের সুন্নত রোযার অন্তর্ভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন, সুন্নতের অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের আমলগুলো কবুল করুন।
১৫ শাবান রোযা : পৃথক বর্ণনা ও শাস্ত্রীয় মূল্যায়ন১৫ শাবান তারিখে রোযা রাখা সম্পর্কে একটি পৃথক বর্ণনাও হাদীসের কিতাবসমূহে পাওয়া যায়।
এই বর্ণনায় বিশেষভাবে শাবান মাসের ১৫ তারিখে রোযা রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
(দ্রষ্টব্য: সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৩৮৪)
তবে হাদীস শাস্ত্রের বিচারে এই বর্ণনাটি দুর্বল (যঈফ) বলে গণ্য করা হয়েছে।
এই কারণেই মুহাক্কিক ও গবেষক আলেমগণ মতামত দিয়েছেন যে— কেবল এই দুর্বল বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে শাবান মাসের ১৫ তারিখকে পৃথকভাবে সুন্নত কিংবা মুস্তাহাব মনে করা সঠিক নয়।
সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি কী?
তবে, পূর্বে যেভাবে আলোচনা করা হয়েছে— শাবান মাসের ১৫ তারিখ আইয়ামে বীযের অন্তর্ভুক্ত।
এ কারণে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ মিলিয়ে তিন দিন রোযা রাখাকে নিঃসন্দেহে সুন্নত মনে করা যাবে।
এই সুন্নত কোনো দুর্বল বর্ণনার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
১৫ শাবান রোযা রাখার পরিসর
মোটকথা, শাবান মাসের ১৫ তারিখে রোযা রাখা সর্বাবস্থায় বৈধ।
কেউ চাইলে পূর্বের দুই দিন অর্থাৎ ১৩ ও ১৪ তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে টানা তিন দিন রোযা রাখতে পারেন।
আবার চাইলে কেবল ১৫ তারিখেও রোযা রাখতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে কোনো শরঈ বাধা বা সন্দেহ নেই।
তবে উত্তম হলো—আইয়ামে বীযের তিন দিন একসঙ্গে রোযা রাখা।
যে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি
১৫ তারিখ আইয়ামে বীযের একটি দিন হিসেবে— এই দৃষ্টিকোণ থেকে ১৫ শাবানের রোযাকে সুন্নত মনে করা যাবে।
কিন্তু শাবান মাসের ১৫ তারিখকে একটি বিশেষ স্বতন্ত্র দিন হিসেবে ধরে, পৃথকভাবে এ দিনের রোযাকে সুন্নত মনে করা যাবে না।
এক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় সীমারেখা রক্ষা করা এবং সহীহ দালিলের আলোকে আমল করাই একজন সচেতন মুসলমানের পরিচয়।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন, অতিশয়তা ও অবহেলা—উভয় দিক থেকে হেফাজত করুন এবং সুন্নতের পথে চলার তাওফিক দান করুন।
শাবান মাসের ১৫ তারিখের রোযা : শাইখুল ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিশাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম এই বিষয়ে বলেন— ‘শবে বরাতের পরবর্তী দিন, অর্থাৎ শাবানের ১৫ তারিখে রোযা রাখা নিয়ে একটি বিষয় বিশেষভাবে বোঝা প্রয়োজন।
হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশাল ভাণ্ডার থেকে কেবল একটি মাত্র হাদীস এই বিষয়কে সমর্থন করছে। সেই হাদীসে বলা হয়েছে, “শবে বরাতের পরবর্তী দিন রোযা রাখো।”
তবে, হাদীসটির সনদ ও বর্ণনার দিক থেকে তা দুর্বল (যঈফ)। এই একমাত্র দুর্বল হাদীসের ওপর নির্ভর করে শাবানের ১৫ তারিখের রোযাকে পৃথকভাবে সুন্নত বা মুস্তাহাব বলা, মুহাক্কিক আলেমদের দৃষ্টিতে অনুচিত।
শাবান মাসের অন্যান্য রোযা
যথাসম্ভব হাদীস অনুসারে শাবানের গোটা মাসে রোযা রাখার ফযীলত রয়েছে। অর্থাৎ ১ শাবান থেকে ২৭ শাবান পর্যন্ত প্রতিদিন বা প্রয়োজনমত রোযা রাখা অত্যন্ত বরকতপূর্ণ।
তবে ২৮ এবং ২৯ শাবানকে ব্যতীত রাখার বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন— “রমজানের দু-একদিন পূর্বে রোযা রাখো না।” এটি রমজানের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি এবং স্বস্তির সুযোগ রাখতে নির্দেশিত।
সারসংক্ষেপ
শাইখুল ইসলামের ব্যাখ্যা অনুযায়ী— শাবানের ১৫ তারিখের রোযা রাখা কেবল এক দুর্বল হাদীসের কারণে সুন্নত বা মুস্তাহাব ধরা যাবে না। তবে, শাবান মাসের অন্যান্য দিনে যেমন ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ মিলিয়ে তিন দিন রোযা রাখা সুন্নত এবং উত্তম। ২৭ তারিখ পর্যন্ত যে কোন দিনে রোযা রাখা বরকতপূর্ণ। ২৮ ও ২৯ তারিখে রোযা রাখা থেকে বিরত থাকা উত্তম।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহীহ দালিল অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের ইবাদত বরকতপূর্ণ করুন। আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।
শাবানের ১৫ তারিখের রোযা : আইয়ামে বীযের প্রেক্ষাপটএকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, শাবানের ১৫ তারিখ ‘আইয়ামে বীয’-এর অন্তর্ভুক্ত। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি মাসের আইয়ামে বীযের দিনে রোযা রাখতেন।
যদি কোনো ব্যক্তি এই বিষয়টি মাথায় রেখে শাবানের ১৫ তারিখ রোযা রাখে, যা আইয়ামে বীয-এর অন্তর্ভুক্ত এবং শাবানেরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন, তাহলে ইনশাআল্লাহ সে অবশ্যই সওয়াব অর্জন করবে।
তবে, কেবল ১৫ শাবানের কারণে এ রোযাকে বিশেষভাবে সুন্নত ঘোষণা করা অনেক আলেমের মতে সঠিক নয়। এর কারণ হলো, অধিকাংশ ফুকাহায়ে কেরাম মুস্তাহাব রোযার তালিকায় মূলত মুহাররমের ১০ তারিখ এবং ইয়াওমে আরাফা (যিলহজ্জের ৯ তারিখ) উল্লেখ করেছেন। শাবানের ১৫ তারিখের কথা কোনো বিশেষভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
তাদের মতে, শাবানের যেকোনো দিনেই রোযা রাখা উত্তম। সুতরাং, যদি কেউ শাবানের ১৫ তারিখ রোযা রাখে, সে ইনশাআল্লাহ সওয়াব পাবে, তবে মনে রাখতে হবে যে, এই মাসের কোনো নির্দিষ্ট দিনের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা শাস্ত্রসম্মত নয়।
এই বিষয়টি ইসলাহী খুতুবাত, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৬৭-২৬৮-এ উল্লেখ আছে।
অতএব, শাবানের ১৫ তারিখে রোযা রাখার ফযীলতকে কেবল একটি সুন্নত হিসেবে গ্রহণের প্রয়োজন নেই, বরং মাসের যেকোনো দিন রোযা রাখা উত্তম। এটি আমাদের জন্য শিক্ষণীয় যে, ইসলামের নির্দেশনা অনুসারে আমল করা উচিত এবং বিশেষ কোনো দিনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা উচিত নয়।
শবে বরাতের ফযীলত এবং শবে কদরের তুলনাঅনেকে ধারণা করেন, শবে বরাতের ফযীলত শবে কদরের মতোই। কিন্তু এটি সঠিক নয়। শবে বরাতের ফযীলত অবশ্যই স্বীকৃত এবং গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা শবে কদরের ফযীলতের সঙ্গে সমতুল্য নয়।
শবে কদরের ফযীলত সম্পর্কে কুরআন-মজীদ ও হাদীসে যে বরকতময় ঘটনাগুলো এসেছে, শবে বরাত সম্পর্কে সেসব প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশেষত, শবে কদরে কুরআন নাযিল হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা অন্য কোনো রজনীতে ঘটেনি। এই কারণে শবে কদরের মর্যাদা ও ফযীলত অনন্য।
অন্য একটি ভুল ধারণা হলো, কুরআন মজীদের সূরা দুখানে ‘لَيْلَةٌ مُبَارَكَةٌ’ শব্দটি শবে বরাতের জন্য নির্দেশ করছে। এটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে এই আয়াতটি শবে কদরের উদ্দেশ্য নির্দেশ করছে। শবে কদরের সঠিক বিশদ সূরা কদরে পাওয়া যায়, যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে শবে বরাতকে উদ্দেশ্য করে কোনো ধারণা গ্রহণ করা যায় না।
তথ্যসূত্র: লাতায়েফুল মাআরেফ, পৃ. ২৬৮; মাকালাতুল কাওছারী, পৃ. ৪৯-৫০
Comments
Post a Comment