ছোট আমল, বড় সওয়াব — কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে বিস্তৃত আলোচনা
ছোট আমল, বড় সওয়াব — কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে বিস্তৃত আলোচনা
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য, যিনি অল্প আমলের মাধ্যমে অসংখ্য সওয়াব দান করেন। দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর, যিনি আমাদের এমন সব সহজ আমল শিখিয়ে গেছেন যার সওয়াব আকাশসমান। মানুষ সাধারণত মনে করে বড় সওয়াব পেতে হলে বড় কাজ করতে হবে। কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্য হলো—এখানে ছোট ছোট আমলও বিশাল সওয়াবের কারণ হয়ে যায়, যদি তা ইখলাসের সাথে করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ
لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا
অর্থ: “কোনো ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে করো না।” (সহিহ মুসলিম)
অতএব, ছোট আমল অবহেলা করা উচিত নয়। এখন আমরা ধারাবাহিকভাবে এমন কিছু ছোট আমল আলোচনা করব, যেগুলোর সওয়াব অনেক বড়, অথচ অনেক সময় আমরা তা থেকে বঞ্চিত হয়ে যাই।
১. হাসিমুখে কথা বলা
রাসূল ﷺ বলেছেন:
تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ صَدَقَةٌ
অর্থ: “তোমার ভাইয়ের সামনে হাসিমুখে থাকা সদকা।” (তিরমিযি)
একটি হাসি—কোনো টাকা লাগে না, কোনো কষ্ট লাগে না। অথচ এটি সদকার সওয়াব এনে দেয়।
২. সঠিকভাবে সালাম দেওয়া
রাসূল ﷺ বলেন:
أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
অর্থ: “তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালাম প্রচার করো।” (সহিহ মুসলিম)
একটি পূর্ণ সালামের জবাবে ৩০টি নেকি পর্যন্ত পাওয়া যায়।
৩. সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার বলা
রাসূল ﷺ বলেছেন:
كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ، ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ
অর্থ: “দুটি বাক্য জিহ্বায় হালকা কিন্তু পাল্লায় ভারী।” (বুখারি)
এই বাক্য দুটি হলো:
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের যিকির—কিন্তু আমলনামায় ভারী।
৪. পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো
রাসূল ﷺ বলেন:
وَإِمَاطَةُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
অর্থ: “রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো সদকা।” (বুখারি ও মুসলিম)
একটি কাঁটা সরানো—জান্নাতের কারণ হতে পারে।
৫. ওজুর পর কালিমা পড়া
রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَا مِنْ أَحَدٍ يَتَوَضَّأُ فَيُحْسِنُ الْوُضُوءَ ثُمَّ يَقُولُ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ...
إِلَّا فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ الثَّمَانِيَةُ
অর্থ: “যে সুন্দরভাবে ওজু করে এবং কালিমা পড়ে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে যায়।” (মুসলিম)
৬. মসজিদে যাওয়ার প্রতি কদম
রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَنْ غَدَا إِلَى الْمَسْجِدِ أَوْ رَاحَ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُ نُزُلًا فِي الْجَنَّةِ
অর্থ: “যে মসজিদে যায়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে মেহমানদারি প্রস্তুত করেন।” (বুখারি)
প্রতি পদক্ষেপে একটি নেকি বৃদ্ধি ও একটি গুনাহ মোচন।
৭. একবার দরূদ শরীফ পড়া
রাসূল ﷺ বলেন:
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا
অর্থ: “যে আমার উপর একবার দরূদ পড়ে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন।” (মুসলিম)
৮. অসুস্থকে দেখতে যাওয়া
হাদিসে এসেছে—যে ব্যক্তি অসুস্থকে দেখতে যায়, সে জান্নাতের বাগানে বিচরণ করে। (মুসলিম)৯. ইস্তিগফার করা
রাসূল ﷺ দিনে ৭০ বারের বেশি ইস্তিগফার করতেন। (বুখারি) একটি “أستغفر الله” — গুনাহ মাফের দরজা খুলে দেয়।১০. নিয়ত ঠিক রাখা
রাসূল ﷺ বলেছেন:
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।” (বুখারি)
একই কাজ—ভিন্ন নিয়তে—অসংখ্য সওয়াবের কারণ হতে পারে।
১১. ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি পড়া
হাদিসে এসেছে—যে ব্যক্তি রাতে আয়াতুল কুরসি পড়ে, তার সাথে আল্লাহ একজন রক্ষক নিযুক্ত করেন। (বুখারি)১২. কারো জন্য দোয়া করা
রাসূল ﷺ বলেছেন—যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য গোপনে দোয়া করে, ফেরেশতা বলে: তোমার জন্যও অনুরূপ। (মুসলিম)১৩. ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া
একটি খেজুর দিয়েও সদকা করা যায়। (বুখারি)১৪. স্ত্রী-সন্তানের জন্য ব্যয় করা
রাসূল ﷺ বলেছেন—নিজ পরিবারের জন্য ব্যয় করাও সদকা। (মুসলিম)১৫. ভালো কথা বলা বা চুপ থাকা
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
অর্থ: “যে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে ভালো কথা বলুক অথবা চুপ থাকুক।” (বুখারি)
১৬. রোজার নিয়ত ও ইফতার করানো
রোজাদারকে ইফতার করালে সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়। (তিরমিযি)১৭. তাসবিহ ১০০ বার
مَنْ قَالَ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ فِي يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ غُفِرَتْ لَهُ خَطَايَاهُ
অর্থ: “যে দিনে ১০০ বার সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহি বলে, তার গুনাহ মাফ হয়।” (বুখারি)
১৮. কুরআনের একটি অক্ষর পড়া
রাসূল ﷺ বলেছেন—প্রতিটি অক্ষরে ১০টি নেকি। (তিরমিযি)১৯. পানির পাত্র এগিয়ে দেওয়া
সদকা হিসেবে গণ্য হয়।২০. আল্লাহর উপর ভরসা
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
অর্থ: “যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।” (সূরা তালাক ৬৫:৩)
উপসংহারে বলবো—ছোট আমলকে অবহেলা করা যাবে না। অনেক সময় আমরা বড় কাজের চিন্তায় ছোট কাজগুলো ছেড়ে দেই। অথচ কিয়ামতের দিন হয়তো একটি হাসি, একটি সালাম, একটি তাসবিহ আমাদের মুক্তির কারণ হবে।
আল্লাহ আমাদেরকে ছোট আমলকে গুরুত্ব দেওয়ার তাওফিক দিন। আমীন।
Comments
Post a Comment