মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ: কেন করব, কীভাবে করব, এবং এর ফজীলত

মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ: কেন করব, কীভাবে করব, এবং এর ফজীলত

মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। একজন মুসলমানের পরিচয় শুধু ইবাদতের মাধ্যমে নয়, বরং তার আচার-আচরণ, কথা-বার্তা এবং মানুষের সাথে ব্যবহার দ্বারা প্রকাশ পায়। ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা যেখানে মানুষের সাথে সুন্দর ব্যবহার করা ঈমানের অংশ হিসেবে গণ্য হয়েছে।

সুন্দর আচরণ কেন করব?

১. আল্লাহর আদেশ

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায় ও সদাচরণের আদেশ দেন।” (সূরা নাহল ৯০)

এখানে “الإحسان” মানে উত্তম আচরণ। অর্থাৎ মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করা আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ।

২. রাসূল ﷺ-এর আদর্শ

إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ

“আমি উত্তম চরিত্র পূর্ণাঙ্গ করার জন্যই প্রেরিত হয়েছি।” (মুয়াত্তা মালিক)

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মিশনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মানুষের চরিত্র সুন্দর করা।

 সুন্দর আচরণের ফজীলত

১. জান্নাতের নিকটবর্তী হওয়া

إِنَّ أَقْرَبَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلَاقًا

“কিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সে, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।” (তিরমিজি)

২. আমলের পাল্লা ভারী হওয়া

مَا مِنْ شَيْءٍ أَثْقَلُ فِي الْمِيزَانِ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ

“কিয়ামতের দিনে মীযানে উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী কিছু থাকবে না।” (আবু দাউদ)

৩. পূর্ণ ঈমানের নিদর্শন

أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا

“মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তি ঈমানে পরিপূর্ণ, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।” (তিরমিজি)

কীভাবে মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ করব?

১. নম্র ভাষায় কথা বলা

وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا

“মানুষের সাথে উত্তম কথা বল।” (সূরা বাকারা ৮৩)

২. হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা

تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ

“তোমার ভাইয়ের মুখে হাসি দেওয়া সদকা।” (তিরমিজি)

৩. রাগ নিয়ন্ত্রণ করা

لَا تَغْضَبْ

রাসূল ﷺ বললেন: “রাগ করো না।” (বুখারি)

 হাদিসে বর্ণিত বাস্তব ঘটনা

১. বেদুইনের সাথে আচরণ

এক বেদুইন মসজিদে প্রস্রাব করে ফেলেছিল। সাহাবারা রাগান্বিত হয়ে তাকে থামাতে চাইলে রাসূল ﷺ বললেন:

دَعُوهُ وَأَرِيقُوا عَلَى بَوْلِهِ سَجْلًا مِنْ مَاءٍ

“তাকে ছেড়ে দাও এবং তার প্রস্রাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও।” (বুখারি)

এর মাধ্যমে তিনি শিক্ষা দিয়েছেন—রাগ নয়, বরং কোমল আচরণই মানুষকে শিক্ষা দেয়।

২. তায়েফের ঘটনা

তায়েফে রাসূল ﷺ-কে পাথর মারা হয়েছিল। ফেরেশতা পাহাড় চাপা দিতে চাইলে তিনি বললেন:

بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللَّهُ مِنْ أَصْلَابِهِمْ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ

“আমি আশা করি, আল্লাহ তাদের বংশ থেকে এমন মানুষ বের করবেন যারা আল্লাহর ইবাদত করবে।” (বুখারি)

এটি সুন্দর আচরণের সর্বোচ্চ উদাহরণ।

সামাজিক জীবনে সুন্দর আচরণের প্রভাব

  • সম্পর্ক মজবুত হয়
  • বিদ্বেষ দূর হয়
  • সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়
  • আল্লাহর রহমত নাযিল হয়

 পরিবারে সুন্দর আচরণ

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ

“তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।” (তিরমিজি)

মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি ঈমানের দাবি। আল্লাহর সন্তুষ্টি, রাসূল ﷺ-এর নৈকট্য, জান্নাত লাভ এবং সমাজে শান্তি—সবকিছুই এর মাধ্যমে অর্জিত হয়।

আমরা যদি কুরআন ও হাদিসের আলোকে নিজের চরিত্র গঠন করি, তাহলে ব্যক্তি জীবন, পরিবার ও সমাজ—সবক্ষেত্রে বরকত নাযিল হবে।

আল্লাহ আমাদেরকে উত্তম চরিত্র অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি