তাওবার দরজা খোলা — বান্দা যতই গুনাহ করুক, আল্লাহর রহমত অবারিত
তাওবার দরজা খোলা — বান্দা যতই গুনাহ করুক, আল্লাহর রহমত অবারিত
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
মানুষ ভুল করবে — এটাই তার স্বভাব। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য এক অনন্য রহমতের পথ উন্মুক্ত রেখেছেন, সেটি হলো তাওবা। বান্দা যতই গুনাহ করুক না কেন, যদি সে আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তবে আল্লাহ ক্ষমা করেন। এই দরজা সবসময় খোলা — তবে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। তাই এই দরজা বন্ধ হওয়ার আগেই আমাদেরকে অবশ্যই তাওবা করে ফেলতে হবে এবং সমস্ত গুনাহ থেকে নিজেকে পবিত্র করে নিতে হবে।
তাওবার অর্থ ও পরিচয়
তাওবা (التوبة) শব্দের অর্থ হলো ফিরে আসা। অর্থাৎ, গুনাহ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। তাওবা শুধু মুখের কথা নয়; এটি অন্তরের অনুতাপ, কাজের পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতে গুনাহ পরিত্যাগের দৃঢ় সংকল্প।
কুরআনের আলোকে তাওবার গুরুত্ব
১. আল্লাহর রহমতের ঘোষণা
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
অর্থ: “বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।” (সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩)
এই আয়াতে আল্লাহ সরাসরি ডাক দিয়ে বলেছেন—যে যত বড় পাপীই হোক, যদি সে তাওবা করে, আল্লাহ ক্ষমা করবেন।
২. আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।” (সূরা আল-বাকারা ২:২২২)
তাওবা শুধু গুনাহ মোচন নয়; এটি আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথ।
হাদিসের আলোকে তাওবার মর্যাদা
১. তাওবাকারীর প্রতি আল্লাহর আনন্দ
لَلَّهُ أَفْرَحُ بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ مِنْ أَحَدِكُمْ بِضَالَّتِهِ إِذَا وَجَدَهَا
অর্থ: “তোমাদের কেউ তার হারানো উট ফিরে পেলে যত আনন্দিত হয়, আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবায় তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন।” (সহিহ মুসলিম)
২. আদম সন্তান ভুলকারী, তবে উত্তম তারা যারা তাওবা করে
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
অর্থ: “আদম সন্তানেরা সবাই ভুলকারী; আর উত্তম তারা, যারা তাওবা করে।” (তিরমিযি)
তাওবার প্রকারভেদ
১. তাওবাতুন নাসূহা (খাঁটি তাওবা)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا
অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা কর।” (সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৮)
এটি এমন তাওবা যেখানে—
- গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা
- আন্তরিক অনুতাপ করা
- ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প
২. মুখের তাওবা (যা প্রকৃত নয়)
শুধু মুখে “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা কিন্তু অন্তরে পরিবর্তন না আনা—এটি প্রকৃত তাওবা নয়।
তাওবা কবুলের শর্ত
- গুনাহ ত্যাগ করা
- আন্তরিক অনুতাপ করা
- পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প
- মানুষের হক নষ্ট করলে তা ফেরত দেওয়া
তাওবার দরজা কখন বন্ধ হবে?
১. মৃত্যুর সময়
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِن قَرِيبٍ
অর্থ: “তাওবা তাদের জন্য, যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে এবং পরে দ্রুত তাওবা করে।” (সূরা আন-নিসা ৪:১৭)
২. সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হলে
لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا
অর্থ: “কিয়ামত কায়েম হবে না, যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে।” (সহিহ বুখারি)
এই সময় থেকে তাওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।
তাওবার উপকারিতা
- গুনাহ মাফ হয়
- অন্তর পবিত্র হয়
- রিজিক বৃদ্ধি পায়
- বালা-মুসিবত দূর হয়
- আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হয়
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا
(সূরা নূহ ৭১:১০–১১) এখানে ইস্তিগফারের মাধ্যমে বৃষ্টি ও রিজিক বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
কেন এখনই তাওবা জরুরি?
মৃত্যুর সময় আমরা জানি না। গুনাহ হৃদয়কে কালো করে দেয়। তাই দেরি না করে এখনই তাওবা করতে হবে। আজকের তাওবা কাল পর্যন্ত স্থগিত রাখলে হয়তো সুযোগ নাও থাকতে পারে।
তাওবার দরজা আল্লাহর এক অসীম রহমত। বান্দা যত বড় পাপীই হোক না কেন, আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে এলে তিনি ক্ষমা করেন। কিন্তু মৃত্যুর আগ পর্যন্তই এই সুযোগ। তাই আমাদের উচিত—আজই, এখনই, অন্তর থেকে তাওবা করা, গুনাহ ত্যাগ করা এবং পবিত্র জীবন শুরু করা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে খাঁটি তাওবা করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
Comments
Post a Comment