দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জনের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা

দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জনের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

ভূমিকা

প্রত্যেক মানুষ সফল হতে চায়। কেউ চায় দুনিয়াতে সম্মান, সম্পদ ও সুখ; আবার কেউ চায় আখিরাতে মুক্তি ও জান্নাত। কিন্তু একজন প্রকৃত মুমিনের লক্ষ্য শুধু দুনিয়ার সাময়িক সাফল্য নয়, বরং উভয় জাহানের কামিয়াবী—দুনিয়াতেও কল্যাণ, আখিরাতেও মুক্তি। ইসলাম এমন একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে শেখায় কিভাবে দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের সফলতার সোপান বানানো যায়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের শিখিয়েছেন এই দোআ:

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

“হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।” (সূরা বাকারা: ২০১)

এই আয়াত প্রমাণ করে—ইসলাম দুনিয়া ত্যাগের ধর্ম নয়; বরং দুনিয়া ও আখিরাতের সমন্বিত সাফল্যের পথ।

সফলতা বলতে ইসলাম কী বোঝায়?

কুরআনে “সফলতা” শব্দটি এসেছে “فلاح” (ফালাহ) শব্দ দ্বারা। ফালাহ মানে হলো—চিরস্থায়ী সফলতা, মুক্তি ও কল্যাণ।

আল্লাহ বলেন:

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ

“নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে।” (সূরা মু’মিনুন: ১)

এখানে সফলতার মানদণ্ড হচ্ছে ঈমান ও সৎকর্ম।

১. বিশুদ্ধ ঈমান — উভয় জাহানের সফলতার মূলভিত্তি

দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হতে হলে প্রথম শর্ত হলো বিশুদ্ধ ঈমান।

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ

“নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে…” (সূরা বায়্যিনাহ: ৭)

ঈমান ছাড়া দুনিয়ার সাফল্য সাময়িক; কিন্তু ঈমানসহ আমল মানুষকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।

২. নিয়মিত নামাজ — সফলতার চাবিকাঠি

আল্লাহ বলেন:

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

“তোমরা সালাত কায়েম কর।” (সূরা বাকারা: ৪৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

أول ما يحاسب به العبد يوم القيامة الصلاة

“কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে।” (তিরমিযি)

নামাজ মানুষকে অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে:

إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ

(সূরা আনকাবুত: ৪৫)

৩. তাকওয়া — আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ

আল্লাহ বলেন:

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

“যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।” (সূরা তালাক: ২)

তাকওয়া থাকলে দুনিয়ার সমস্যার সমাধান আসে এবং আখিরাতে জান্নাত লাভ হয়।

৪. হালাল রিজিক অর্জন

দুনিয়ার সুখ ও আখিরাতের মুক্তির জন্য হালাল উপার্জন অপরিহার্য।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

إن الله طيب لا يقبل إلا طيبا

“নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র; তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না।” (মুসলিম)

হারাম উপার্জন দুনিয়ায় অশান্তি ও আখিরাতে শাস্তির কারণ।

৫. সৎকর্ম ও নেক আমল

আল্লাহ বলেন:

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً

“যে ব্যক্তি ঈমানসহ সৎকর্ম করবে, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব।” (সূরা নাহল: ৯৭)

এই আয়াত প্রমাণ করে—নেক আমল দুনিয়াতেও শান্তি দেয়।

৬. কুরআনের অনুসরণ

কুরআন হলো সফলতার সংবিধান।

إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ

“এই কুরআন সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করে।” (সূরা ইসরা: ৯)

৭. ধৈর্য (সবর)

আল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

“নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা বাকারা: ১৫৩)

ধৈর্য দুনিয়ার পরীক্ষায় সফল করে এবং আখিরাতে উচ্চ মর্যাদা দেয়।

৮. কৃতজ্ঞতা (শুকর)

আল্লাহ বলেন:

لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ

“তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব।” (সূরা ইবরাহিম: ৭)

৯. দোআ ও আল্লাহর উপর ভরসা

রাসূল ﷺ বলেছেন:

الدعاء هو العبادة

“দোআই হলো ইবাদত।” (তিরমিযি)

তাওয়াক্কুল সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ

“যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।” (সূরা তালাক: ৩)

১০. আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া

রাসূল ﷺ বলেছেন:

من كانت الآخرة همه جعل الله غناه في قلبه

“যার চিন্তা আখিরাত, আল্লাহ তার অন্তরে সম্পদ দান করেন।” (তিরমিযি)

১১. উত্তম চরিত্র

রাসূল ﷺ বলেছেন:

إنما بعثت لأتمم مكارم الأخلاق

“আমি উত্তম চরিত্র পূর্ণ করতে প্রেরিত হয়েছি।” (মুয়াত্তা)

দুনিয়াতেও সুখ, আখিরাতেও সুখ — কিভাবে?

  • নিয়মিত নামাজ
  • হালাল উপার্জন
  • পিতা-মাতার খেদমত
  • সত্যবাদিতা
  • গুনাহ থেকে তওবা
  • মানুষের উপকার

রাসূল ﷺ বলেছেন:

خير الناس أنفعهم للناس

“সর্বোত্তম মানুষ সে, যে মানুষের জন্য অধিক উপকারী।” (তাবারানি)

উভয় জাহানের কামিয়াবীর সংক্ষিপ্ত সূত্র

  1. শিরকমুক্ত ঈমান
  2. সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন
  3. হারাম বর্জন
  4. সবর ও শুকর
  5. দোআ ও ইস্তিগফার
  6. আখিরাতের প্রস্তুতি

শেষ কথা,,

দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা একসাথে অর্জন করা সম্ভব, যদি আমরা ঈমান, নামাজ, তাকওয়া, হালাল উপার্জন, সৎকর্ম ও কুরআনের অনুসরণ করি। ইসলাম আমাদের শেখায় ভারসাম্যপূর্ণ জীবন—যেখানে দুনিয়া আখিরাতের প্রস্তুতির মাঠ।

আল্লাহ আমাদেরকে উভয় জাহানের কামিয়াবী দান করুন, তাঁর সন্তুষ্টি নসিব করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি