ليلة النصف من شعبان
ليلة النصف من شعبان : গাফিলতি নয়, ইবাদতেই হোক আমাদের রাত
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
আজ সন্ধ্যার পর আমাদের সামনে উপস্থিত হচ্ছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ রজনী— لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ। বাংলা ভাষায় যাকে আমরা সাধারণত শবে বরাত নামে চিনি। এটি এমন একটি রাত, যে রাত আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এক বিশেষ উপলক্ষ। এই রজনী আমাদের জীবনে বারবার আসে না; বছরে মাত্র একবারই আসে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা অনেকেই এই মহামূল্যবান সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হই।
শবে বরাত আমাদের সামনে আসে একটি প্রশ্ন নিয়ে— আমরা কি আল্লাহর দিকে ফিরে যাব, নাকি আবারও গাফিলতিতে ডুবে থাকব? এই রাত তো ছিল আত্মশুদ্ধির জন্য, নিজেকে আল্লাহর দরবারে সঁপে দেওয়ার জন্য, নিজের গুনাহের বোঝা হালকা করার জন্য। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক সময় ভিন্ন হয়ে যায়।
এই সময়ে আমরা অনেকেই ইবাদতের পরিবর্তে ব্যস্ত হয়ে পড়ি বিভিন্ন আয়োজন আর উৎসবে। কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়ে রুটি, হালুয়া, গোশত, পোলাও—নানান রকম খাবার তৈরিতে। সারা রাত কেটে যায় রান্নাঘরে, হাঁড়ি-পাতিলের শব্দে, কিন্তু কপাল মাটিতে পড়ে না। কেউ আবার গল্প, আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা, টিভি, সিনেমা, নাটক, গান— এসবের মধ্যেই রাত শেষ করে ফেলে।
আমরা ভুলে যাই, এই রাত কোনো সামাজিক উৎসবের জন্য নয়, কোনো ভোজন-বিলাসের জন্য নয়। এই রাত ছিল আল্লাহর দরবারে দাঁড়ানোর জন্য, চোখের পানি ফেলে ক্ষমা চাওয়ার জন্য, হৃদয় ভেঙে দোয়া করার জন্য।
শবে বরাত আমাদের শেখায়— আমরা কতটা অসহায়, কতটা মুখাপেক্ষী আল্লাহর। এই রাতে বান্দার আমল আল্লাহর কাছে বিশেষভাবে পেশ করা হয়, অনেক আলেমের বর্ণনায় এসেছে, এই রাতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো— আমরা কি সেই ক্ষমাপ্রাপ্তদের কাতারে থাকতে চাই না?
তাই আসুন, এই শবে বরাতে আমরা আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনি আমলের দিকে। নিজেকে মনোনিবেশ করি ইবাদতে। বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করি। আল্লাহর জিকিরে আমাদের জিহ্বাকে সিক্ত রাখি। নফল নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ি গভীর রাতে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, যখন হৃদয় কথা বলার সুযোগ পায়।
বিশেষভাবে আমরা চেষ্টা করি সালাতুত তাসবিহ আদায় করার। এই নামাজের ফজিলত অত্যন্ত বড়। তবে অবশ্যই আমরা আলেমদের কাছ থেকে এর নিয়ম-কানুন শিখে নিই। জেনে-বুঝে আমল করাই হলো ইখলাসের পরিচয়। অজ্ঞতার উপর দাঁড়িয়ে আমল করলে অনেক সময় সে আমল ফলপ্রসূ হয় না।
এই রাতে আমরা যেন কোনোভাবেই আমাদের আমলকে গুনাহ দিয়ে নষ্ট না করি। টিভি, সিনেমা, নাটক, গান— এসব থেকে নিজেদেরকে হেফাজত করি। কারো গীবত না করি, কারো সম্পর্কে কটু কথা না বলি, কারো অন্তরে কষ্ট দিই না। কারণ গুনাহ আমলকে ধ্বংস করে দেয়, যেমন আগুন কাঠ পুড়িয়ে দেয়।
শবে বরাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো— অনুতাপ। আমরা সবাই গুনাহগার। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, কত ভুল, কত অবহেলা, কত আলস্য আমাদের জীবনে জমে আছে। এই রাতে আমরা আমাদের অতীতের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হই। চোখের পানি দিয়ে, ভাঙা হৃদয় দিয়ে বলি— হে আল্লাহ, আমি ভুল করেছি, আমাকে মাফ করে দিন।
আল্লাহ তাআলা তো অতি দয়ালু, তিনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। শুধু প্রয়োজন, একটু ফিরে আসার, একটু মাথা নত করার। এই রাত আমাদের সেই সুযোগ এনে দেয়।
আসুন, আমরা সিদ্ধান্ত নেই— এই শবে বরাত আমরা নষ্ট করব না। সময় অপচয় করব না। এই রাতকে আমরা বানাব ইবাদতের রাত, দোয়ার রাত, তওবার রাত। আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য এই রাতকে আমরা একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত বানাই।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সবাইকে এই মহামূল্যবান রাতের কদর করার তৌফিক দান করুন। আমাদের গাফিলতি মাফ করে দিন। আমাদের আমল কবুল করে নিন। আমাদের অতীতের গুনাহ ক্ষমা করে দিন এবং ভবিষ্যতে আপনাকে সন্তুষ্ট রেখে চলার শক্তি দান করুন।
আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।
Comments
Post a Comment