মাহে রমজান
পবিত্র মাহে রমাদান: আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও রহমতের মাস
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা(দ্বীনের দ্বীপ্তি)
আলহামদুলিল্লাহ! পবিত্র মাহে রমাদান শুরু হয়েছে। গতকাল প্রথম তারাবীহ আদায় করেছি, আজ রাতে সেহরি খেয়ে প্রথম রোজা রাখছি। এটি কেবলই আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ। তাঁর তাওফিক ছাড়া এই মহান ইবাদত আদায় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি একমাত্র তাওফিকদাতা, একমাত্র সহায়ক, একমাত্র রব।
রমাদান আমাদের জন্য শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; এটি তাকওয়া অর্জনের মাস, আত্মশুদ্ধির মাস, কুরআনের মাস, রহমত ও মাগফিরাতের মাস। এই মাসে প্রতিটি মুমিনের উচিত রোজার হক বুঝে রোজা রাখা এবং করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো সচেতনভাবে পালন করা।
রোজার ফরজ হওয়ার দলিল
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৩)
এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন। অর্থাৎ আল্লাহভীতি, আত্মসংযম এবং পাপ থেকে বিরত থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা।
রমাদানের ফজিলত
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমাদানের রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” (সহিহ বুখারী, মুসলিম)
এ মাসে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। রমাদান হলো রহমতের বৃষ্টি বর্ষণের মাস।
রমাদান হলো কুরআনের মাস
আল্লাহ তাআলা বলেন:
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ
“রমাদান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)
অতএব এই মাসে কুরআন তিলাওয়াত, তাদাব্বুর (অর্থ অনুধাবন) এবং আমল বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।
রোজার প্রকৃত হক
রোজা শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়। রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ
“যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার পরিত্যাগ করার আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” (সহিহ বুখারী)
অর্থাৎ রোজা হবে চক্ষুর রোজা, কানের রোজা, জিহ্বার রোজা, অন্তরের রোজা।
রমাদানে করণীয়
১. নিয়ত শুদ্ধ করা
প্রতিটি রোজা হবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়
নামাজ হলো দ্বীনের স্তম্ভ। রোজার পাশাপাশি নামাজে যত্নবান হওয়া অপরিহার্য।
৩. তারাবীহ ও কিয়ামুল লাইল
রাতের ইবাদত রমাদানের বিশেষ সৌন্দর্য।
৪. কুরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি
প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কুরআন পড়ার চেষ্টা করা।
৫. দান-সদকা
রমাদানে দান-সদকার সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
৬. দোয়া করা
ইফতারের সময় দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত।
রমাদানে বর্জনীয়
- মিথ্যা কথা বলা
- গীবত ও পরনিন্দা
- রাগ ও ঝগড়া
- অশ্লীলতা
- অপচয় ও বিলাসিতা
রোজা রেখে গুনাহ করলে রোজার নূর নষ্ট হয়ে যায়।
সেহরি ও ইফতারের সুন্নাহ
রাসূল ﷺ বলেছেন:
تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السُّحُورِ بَرَكَةً
“সেহরি খাও, কারণ সেহরিতে বরকত রয়েছে।” (সহিহ বুখারী)
আর ইফতার দ্রুত করা সুন্নাহ।
লাইলাতুল কদর
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ
“শবে কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” (সূরা আল-কদর: ৩)
এই রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের সমান সওয়াবের অধিকারী।
রমাদান আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
১. আত্মসংযম ২. ধৈর্য ৩. কৃতজ্ঞতা ৪. দরিদ্রের কষ্ট অনুভব ৫. আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা
রমাদান আমাদের জীবনে পরিবর্তনের সুযোগ। এই মাসে আমরা যদি নিজেদের সংশোধন করতে পারি, তবে সারা বছরের জন্য তা কল্যাণ বয়ে আনবে। রোজার হক আদায় করে, করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমাদের প্রতিটি দিন কাটাতে হবে।
আল্লাহ আমাদের রোজা কবুল করুন, নামাজ কবুল করুন, দোয়া কবুল করুন। এই রমাদান আমাদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের কারণ হোক। আমীন।
Comments
Post a Comment