সকাল ও সন্ধ্যার আমল—একটি নিরাপদ ও বরকতময় জীবনের চাবিকাঠি

 সকাল ও সন্ধ্যার আমল—একটি নিরাপদ ও বরকতময় জীবনের চাবিকাঠি

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

আলহামদুলিল্লাহ—সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহ তাআলার জন্য, যাঁর রহমত, দয়া ও অনুগ্রহেই আমরা প্রতিদিন নতুন একটি সকাল পাই, আবার তাঁরই অনুগ্রহে একটি সন্ধ্যায় উপনীত হই। আমরা খাই, পান করি, চলাফেরা করি, কথা বলি, কাজ করি—সবকিছুই আল্লাহর দয়ায় সম্ভব হয়। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমরা অনেক সময় এই মহান রবের নাম নিয়েই দিন শুরু করতে ভুলে যাই, আবার সন্ধ্যায় দিন শেষ করতেও তাঁর স্মরণ থেকে গাফিল হয়ে পড়ি।

আমাদের এই গাফিলতি ও অসচেতনতা ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছে যায় যে, আল্লাহর যিকির ছাড়া সকাল আসে, আবার যিকির ছাড়াই সন্ধ্যা নেমে আসে। অথচ প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ সকাল ও সন্ধ্যার জন্য উম্মতকে কত সুন্দর, কত মূল্যবান এবং কত গভীর অর্থবহ আমল শিক্ষা দিয়ে গেছেন! এই আমলগুলো শুধু মুখে পড়ার জন্য নয়; বরং এগুলো আমাদের জীবন, ঈমান, নিরাপত্তা ও মানসিক প্রশান্তির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

হাদীসে স্পষ্টভাবে এসেছে—যে ব্যক্তি সকাল ও সন্ধ্যার যিকির ও দোয়াগুলো আদায় করে, আল্লাহ তাআলা তাকে বহু অজানা বিপদ থেকে রক্ষা করেন। এমন অনেক বিপদ আছে, যা আমাদের চোখে পড়ে না, কল্পনাতেও আসে না; কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দার সকাল-সন্ধ্যার আমলের বরকতে সেসব বিপদ দূরে সরিয়ে দেন। কখনো দুর্ঘটনা থেকে, কখনো অসুস্থতা থেকে, কখনো শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে, আবার কখনো মানুষের ক্ষতি থেকে আল্লাহ আমাদের হেফাজত করেন।

সকাল ও সন্ধ্যার আমল শুধু আখিরাতের সওয়াবের বিষয় নয়; বরং দুনিয়ার জীবনকেও সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করে তোলে। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাম নিয়ে সকাল শুরু করে, তার মন থাকে প্রশান্ত, চিন্তা থাকে নিয়ন্ত্রিত, আর কাজের মধ্যে থাকে বরকত। আবার যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে সন্ধ্যাকে বিদায় জানায়, তার অন্তর থাকে শান্ত, উদ্বেগ কমে যায় এবং রাতটি কাটে নিরাপদে।

দুঃখের বিষয় হলো—আমরা অনেকেই মনে করি, সকাল ও সন্ধ্যার আমলগুলো খুব বেশি, সময়সাপেক্ষ বা কঠিন। অথচ বাস্তবতা হলো, নবী ﷺ আমাদের জন্য যেসব আমল নির্ধারণ করেছেন, সেগুলো অত্যন্ত সহজ, সংক্ষিপ্ত এবং বাস্তবসম্মত। এগুলোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগার দরকার নেই; বরং কয়েক মিনিটের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো আদায় করা সম্ভব।

এ কথাও সত্য যে, সকাল ও সন্ধ্যার সব আমল একসাথে মুখস্থ করা বা নিয়মিত পালন করা অনেকের জন্য সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু তাই বলে একেবারেই আমল ছেড়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়—অল্প হলেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। যে কয়টি আমল আমরা সহজে পারি, অন্তত সেগুলোই যেন ছুটে না যায়।

আমরা চাইলে সকাল ও সন্ধ্যার কিছু নির্বাচিত আমল লিখে রাখতে পারি, মোবাইলে সংরক্ষণ করতে পারি কিংবা একটি ছোট কার্ড বানিয়ে নিতে পারি। শুরুতে দেখে দেখে পড়লেও অসুবিধা নেই। ধীরে ধীরে ইনশাআল্লাহ মুখস্থ হয়ে যাবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আমল যেন ছুটে না যায়, যিকির যেন বন্ধ না হয়, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক যেন দুর্বল না হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সকাল ও সন্ধ্যার এই আমলগুলো শুধু অভ্যাসের বিষয় নয়; বরং এগুলো আমাদের ঈমানের পরিচয়, নবী ﷺ–এর সুন্নতের বাস্তব প্রয়োগ এবং আল্লাহর প্রতি আমাদের নির্ভরতার প্রকাশ। উদাসীনতা ও অলসতার কারণে যদি আমরা এই আমলগুলো অবহেলা করি, তবে আমরা অগণিত সওয়াব থেকে বঞ্চিত হব এবং নিজের অজান্তেই নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেব।

তাই আসুন, আমরা আজই নতুন করে নিয়ত করি—যে কোনো অবস্থায় সকাল ও সন্ধ্যার আমল ছেড়ে দেব না। যত ব্যস্ততাই থাকুক, যত কাজই থাকুক, আল্লাহর স্মরণকে জীবনের মূল অংশ বানিয়ে নেব। কারণ এই আমলগুলো শুধু কিছু দোয়া নয়; বরং এগুলো আমাদের জীবনের নিরাপত্তা বেষ্টনী, আমাদের অন্তরের আলো এবং আমাদের ঈমানের শক্তি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সকাল ও সন্ধ্যার আমলগুলো গুরুত্বসহকারে আদায় করার তৌফিক দান করুন, এগুলোর ফজিলত বুঝে আমল করার শক্তি দিন এবং আমাদের জীবনকে তাঁর যিকিরে আলোকিত করে দিন। আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।

    সকাল ও সন্ধ্যার গুরুত্বপূর্ণ আমল ও ফজিলত

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

নবী করীম ﷺ সকাল ও সন্ধ্যার সময় কিছু বিশেষ আমল করতে উৎসাহ দিয়েছেন। এই আমলগুলো বান্দাকে শয়তান, জিন, মানুষের অনিষ্ট, রোগ-ব্যাধি ও অদৃশ্য বিপদ থেকে হেফাজত করে। নিচে ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো উল্লেখ করা হলো—

১. সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস (৩ বার করে)

আরবি:

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ... قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ ... قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ ...

ফজিলত: নবী ﷺ বলেন, সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার পাঠ করলে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা হয়। (তিরমিযী, হাদীস: 3575)

২. সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত

আরবি:

هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ... إِلَىٰ آخِرِ السُّورَةِ

ফজিলত: যে ব্যক্তি সকালে এগুলো পাঠ করে, তার জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা দোয়া করতে থাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। (তিরমিযী)

৩. সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার (১ বার)

আরবি:

اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَىٰ عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ

ফজিলত: সকালে পড়ে দিনে মারা গেলে জান্নাত, সন্ধ্যায় পড়ে রাতে মারা গেলে জান্নাত। (বুখারী)

৪. حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ (৭ বার)

আরবি:

حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ

ফজিলত: যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় ৭ বার পাঠ করে, আল্লাহ তার সব দুশ্চিন্তা দূর করেন। (আবু দাউদ)

৫. لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ (৭ বার)

ফজিলত: এটি জান্নাতের গুপ্ত ভাণ্ডারসমূহের একটি। (বুখারী, মুসলিম)

৬. اللَّهُمَّ أَجِرْنِي مِنَ النَّارِ (৭ বার)

ফজিলত: সকালে বা সন্ধ্যায় পড়ে মারা গেলে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লিখে দেওয়া হয়। (আবু দাউদ)

৭. بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّهُ شَيْءٌ (৩ বার)

আরবি:

بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

ফজিলত: সব ধরনের আকস্মিক বিপদ থেকে নিরাপত্তা। (তিরমিযী)

৮. أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ (৩ বার)

আরবি:

أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ

ফজিলত: বিষাক্ত প্রাণী ও জিনের অনিষ্ট থেকে হেফাজত। (মুসলিম)

৯. رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا (৩ বার)

আরবি:

رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ ﷺ نَبِيًّا

ফজিলত: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন নিশ্চিত। (তিরমিযী)

১০. اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ

আরবি:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ

ফজিলত: নবী ﷺ সবচেয়ে বেশি যে দোয়া চাইতেন—সেটি হলো আফিয়াত। (তিরমিযী)

১১. أَصْبَحْنَا وَأَصْبَحَ الْمُلْكُ لِلَّهِ

ফজিলত: ঈমানের নবায়ন ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা। (মুসলিম):

এই আমলগুলো পুরোটা একসাথে না পারলেও, অন্তত কিছু আমল যেন ছুটে না যায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সকাল ও সন্ধ্যার আমলগুলো নিয়মিত আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি