সেহরি ও ইফতারের সময়ের বিশেষ ফজীলত, করণীয় ও বর্জনীয়

সেহরি ও ইফতারের সময়ের বিশেষ ফজীলত, করণীয় ও বর্জনীয়

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

ভূমিকা

রমজান মাসে দুটি সময় বিশেষভাবে বরকতময়—সেহরির সময় এবং ইফতারের সময়। এই দুই মুহূর্তে আল্লাহ তা‘আলা বান্দার প্রতি বিশেষ রহমত ও তাওয়াজ্জুহ দান করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা এই মূল্যবান সময়গুলো ব্যস্ততার মধ্যে হারিয়ে ফেলি—সেহরির সময় খাবার প্রস্তুতি ও খাওয়ার ব্যস্ততায়, আর ইফতারের সময় রান্না ও আয়োজনের ব্যস্ততায়।

অথচ এই সময়গুলো দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়। তাই সচেতনভাবে আমাদের জানা উচিত—এই সময়ের ফজীলত কী, করণীয় কী, বর্জনীয় কী এবং কিভাবে আমরা সর্বোচ্চ উপকার লাভ করতে পারি।

সেহরির সময়ের ফজীলত

রাসূল ﷺ বলেছেন:

تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السُّحُورِ بَرَكَةً

অর্থ: তোমরা সেহরি করো, কারণ সেহরিতে বরকত রয়েছে। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

সেহরি শুধু খাবার নয়; এটি একটি ইবাদত। নিয়তের সাথে সেহরি খেলে সওয়াব পাওয়া যায়।

শেষ রাতের বিশেষ সময়

সেহরির সময় মূলত রাতের শেষ তৃতীয়াংশের মধ্যে পড়ে। এই সময় সম্পর্কে রাসূল ﷺ বলেছেন:

يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ فَيَقُولُ: مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ؟

অর্থ: প্রতি রাতে যখন শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন আমাদের রব নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন—কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব?

অতএব সেহরির সময় শুধু খাওয়ার সময় নয়; এটি দোয়া, ইস্তিগফার ও কান্নাকাটির সময়।

সেহরির সময় করণীয়

১. নিয়ত সহ সেহরি করা

সেহরি খাওয়া রোজার শক্তি অর্জনের জন্য এবং আল্লাহর হুকুম পালন করার উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত।

২. ইস্তিগফার করা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ

অর্থ: তারা সেহরির সময় ইস্তিগফার করত। (সূরা যারিয়াত: ১৮)

৩. তাহাজ্জুদ আদায় করা

দুই রাকাত হলেও তাহাজ্জুদ পড়া উত্তম।

৪. দোয়া করা

নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, উম্মাহর জন্য কান্নাকাটি করে দোয়া করা।

৫. কুরআন তিলাওয়াত

সেহরির আগে বা পরে অল্প হলেও কুরআন পাঠ করা।

সেহরির সময় বর্জনীয়

  • অতিরিক্ত খাওয়া।
  • অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা।
  • মোবাইল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় নষ্ট।
  • ফজরের নামাজ দেরিতে আদায় করা।

ইফতারের সময়ের ফজীলত

রাসূল ﷺ বলেছেন:

لِلصَّائِمِ عِنْدَ فِطْرِهِ دَعْوَةٌ لَا تُرَدُّ

অর্থ: রোজাদারের জন্য ইফতারের সময় এমন একটি দোয়া আছে যা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।

এই সময় আল্লাহর বিশেষ রহমত নাযিল হয়।

ইফতারের সময় করণীয়

১. সময়মতো ইফতার করা

রাসূল ﷺ দ্রুত ইফতার করতে পছন্দ করতেন।

২. দোয়া করা

ইফতারের সময় পড়া যায়:

اللهم لك صمت وعلى رزقك أفطرت

ذهب الظمأ وابتلت العروق وثبت الأجر إن شاء الله

৩. খেজুর দিয়ে ইফতার

রাসূল ﷺ খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন।

৪. দান করা

অন্যকে ইফতার করালে সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়।

ইফতারের সময় বর্জনীয়

  • ইফতারের আয়োজনে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে দোয়া ভুলে যাওয়া।
  • অপচয় করা।
  • গীবত ও অশালীন কথা বলা।
  • মাগরিবের নামাজ দেরি করা।

ব্যস্ততার মধ্যেও কিভাবে আমল বজায় রাখবো

  • খাবার আগে ৫ মিনিট নির্ধারণ করে শুধু দোয়া করা।
  • রান্না করতে করতে জিকির করা।
  • মোবাইল দূরে রাখা।
  • পরিবারকে আমলে উদ্বুদ্ধ করা।

সেহরি ও ইফতারের সময় এমন দুইটি সোনালী সুযোগ, যা অবহেলা করা উচিত নয়। এই সময়ে আল্লাহ বান্দার দিকে বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন। তাই ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের সচেতনভাবে দোয়া, ইস্তিগফার, জিকির ও কুরআন তিলাওয়াতে মনোযোগী হতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের এই মূল্যবান সময়গুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি