আদব ও আখলাকের আলোকে আমাদের জীবন কেমন হওয়া উচিত

 আদব ও আখলাকের আলোকে আমাদের জীবন কেমন হওয়া উচিত

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

মানুষ হিসেবে দুনিয়াতে আমাদের জীবন কেবল খাওয়া-পরা আর চলাফেরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি কথা, প্রতিটি ওঠা-বসা—সবকিছুই একটি বার্তা বহন করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমাদের সমাজে আদব ও শালীনতার চর্চা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

আমাদের চলাফেরা কেমন হবে, কথাবার্তার ধরন কেমন হওয়া উচিত, মানুষের সাথে আচরণ কিভাবে করতে হবে— এই বিষয়গুলো সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুবই সীমিত। অনেক সময় আমরা না বুঝেই মানুষের সাথে বেয়াদবি করে ফেলি, বড়দের সম্মান দিতে ভুলে যাই, ছোটদের প্রতি স্নেহ ও মমতা প্রদর্শন করতে পারি না।

কথাবার্তার আদব

কথা বলা মানুষের একটি বড় পরিচয়। একজন মানুষের চরিত্র, ব্যক্তিত্ব ও মানসিকতা অনেকটাই প্রকাশ পায় তার কথাবার্তার মাধ্যমে। কিন্তু আমরা অনেক সময় কথাবার্তায় ধৈর্য হারিয়ে ফেলি, ধমকের সুরে কথা বলি, উচ্চস্বরে কথা বলি— যা ইসলামের আদবের সম্পূর্ণ বিপরীত।

ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়—কথা হবে নরম, ভদ্র ও শালীন। বড়দের সাথে কথা বলার সময় সম্মানসূচক ভাষা ব্যবহার করতে হবে। কখনোই বড়দের সাথে চোখ রাঙিয়ে, ধমকের সুরে বা অবজ্ঞার ভঙ্গিতে কথা বলা উচিত নয়।

ছোটদের সাথে কথা বলার সময় আমাদের ভাষা হবে স্নেহমাখা। তাদের ভুল হলে ভালোবাসার সাথে বুঝিয়ে বলতে হবে, ধমক দিয়ে নয়। কারণ আজ যে ছোট, আগামী দিনে সে-ই বড় হবে এবং আমাদের আচরণ থেকেই শিখবে।

বড়দের সম্মান ও ছোটদের প্রতি স্নেহ

বড়দের সম্মান করা ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা। কিন্তু আজ আমরা অনেক সময় দেখি—বড় মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও আমরা বসে থাকি, তাদের বসার জন্য জায়গা করে দিই না।

এটা শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, এটি আদবেরও মারাত্মক ঘাটতি। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকে দেখলে সম্মান দেখানো, প্রয়োজনে নিজের আসন ছেড়ে দেওয়া— এগুলো আমাদের চরিত্রের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।

অন্যদিকে, ছোটদের প্রতি দয়া ও মমতা প্রদর্শন করা আমাদের ঈমানের অংশ। যে ব্যক্তি ছোটদের প্রতি দয়া করে না, সে প্রকৃত অর্থে উত্তম চরিত্রবান হতে পারে না।

চলাফেরার আদব ও বিনয়

আমাদের হাঁটা-চলাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চলাফেরার মধ্যেও আদব রয়েছে, বিনয় রয়েছে। ইসলাম আমাদের অহংকারপূর্ণ হাঁটা থেকে বিরত থাকতে শিক্ষা দেয়।

চলাফেরা হবে শান্ত, ধীর ও সংযত। অযথা জুতার শব্দ করে হাঁটা, দম্ভের ভঙ্গিতে চলা—এসব অহংকারের লক্ষণ। বরং মাথা নিচু রেখে, ধীরস্থিরভাবে, বিনয়ের সাথে চলাই একজন মুমিনের পরিচয়।

হাঁটার সময় খুব বেশি তাড়াহুড়ো করা যাবে না, আবার অলস ভঙ্গিতেও নয়। মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে হবে—যাতে ব্যক্তিত্বে ভারসাম্য প্রকাশ পায়।

উঠা-বসার শালীনতা

আমাদের ওঠা-বসার মধ্যেও শালীনতা থাকা জরুরি। যেখানে-সেখানে বসে পড়া, অশোভন ভঙ্গিতে বসা বা দাঁড়ানো— এসব আমাদের ব্যক্তিত্বকে ক্ষুণ্ণ করে।

বৈঠকে বসার সময় শালীন ভঙ্গি অবলম্বন করা, কথা বলার সময় অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা— এগুলো সুস্থ সামাজিক আচরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

খাওয়া-দাওয়ার আদব

খাওয়া-দাওয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এখানেও আমরা অনেক সময় আদব ভুলে যাই।

ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়—ডান হাতে খাবার খেতে। অথচ আজ আমরা অনেকেই বাম হাতে বিস্কুট, চা, পানি ইত্যাদি খেয়ে থাকি— যা অনভিপ্রেত।

খাবার খাওয়ার সময় তাড়াহুড়ো না করা, অন্যের খাবারের দিকে না তাকানো, অপচয় না করা—এসবই খাবারের আদবের অন্তর্ভুক্ত।

মানুষের সাথে আচরণ

মানুষের সাথে আমাদের আচরণই আমাদের আসল পরিচয়। ভালো ব্যবহার এমন একটি গুণ, যা শত্রুকেও বন্ধুত্বে পরিণত করতে পারে।

আমাদের কথা ও আচরণে যেন মায়া, মমতা ও ভালোবাসা প্রকাশ পায়। কঠোর ভাষা, রূঢ় আচরণ মানুষের হৃদয়ে আঘাত করে। আর একজন মুমিন কখনোই অন্যের হৃদয়ে কষ্ট দিতে পারে না।

নিজেকে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা

আমাদের সবাইকে পরিবর্তন আনতে হবে। এই পরিবর্তন শুরু হবে নিজের ভেতর থেকে। আমাদের উঠা-বসায় বিনয় আনতে হবে, চলাফেরায় শালীনতা আনতে হবে, কথাবার্তায় কোমলতা আনতে হবে।

অহংকার ও আত্মঅহমিকাকে দূরে সরিয়ে রেখে, আদব ও আখলাকের আলোকে জীবন গড়তে পারলেই আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারব।

শেষ কথা,,

পরিশেষে বলা যায়, আদব ও আখলাক ছাড়া কোনো ইবাদতই পূর্ণতা পায় না। আমাদের চলাফেরা, কথাবার্তা, আচরণ ও ব্যবহার— সবকিছুতেই যেন ইসলামের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।

আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করি— একজন ভদ্র, বিনয়ী, শালীন ও আদর্শ মানুষ হওয়ার। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সে তৌফিক দান করুন। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি