তাকওয়ার গুরুত্ব, অর্থ ও জীবনে তার প্রভাব

তাকওয়ার গুরুত্ব, অর্থ ও জীবনে তার প্রভাব

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

ভূমিকা

তাকওয়া ইসলামের একটি মৌলিক ও গভীর ধারণা। কুরআনুল কারীমে বারবার “তাকওয়া” শব্দটি এসেছে এবং আল্লাহ তাআলা মুমিনদের তাকওয়া অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাকওয়া শুধু একটি অনুভূতি নয়; এটি একটি জীবনব্যবস্থা, একটি নৈতিক কাঠামো এবং আল্লাহভীতির মাধ্যমে নিজেকে গুনাহ থেকে সংযত রাখার এক অন্তর্নিহিত শক্তি। যে হৃদয়ে তাকওয়া থাকে, তার জীবন আলোকিত হয় ঈমান, ইখলাস ও সৎকর্ম দ্বারা।

তাকওয়া মানে কী?

“তাকওয়া” শব্দটি আরবি “وقى” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ—রক্ষা করা, বাঁচানো, ঢাল তৈরি করা। শরীয়তের পরিভাষায় তাকওয়া মানে হলো:

আল্লাহর ভয়, তাঁর সন্তুষ্টির আশায় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং তাঁর আদেশ পালন করা।

হযরত আলী (রাঃ) তাকওয়ার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে:

التقوى هي الخوف من الجليل والعمل بالتنزيل والقناعة بالقليل والاستعداد ليوم الرحيل

অর্থ: তাকওয়া হলো মহান আল্লাহকে ভয় করা, কুরআনের বিধান অনুযায়ী আমল করা, অল্পে সন্তুষ্ট থাকা এবং পরকালের জন্য প্রস্তুত হওয়া।

কুরআনে তাকওয়ার গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর।” (সূরা আলে ইমরান: ১০২)

আরও বলেন:

إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ

“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে সম্মানিত, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।” (সূরা হুজুরাত: ১৩)

এখানে স্পষ্ট বোঝা যায়, মর্যাদা, বংশ বা সম্পদ নয়—বরং তাকওয়াই আল্লাহর কাছে সম্মানের মাপকাঠি।

হাদিসে তাকওয়ার গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

اتق الله حيثما كنت

“তুমি যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় কর।” (তিরমিযি)

আরেক হাদিসে এসেছে:

التقوى هاهنا

অর্থ: “তাকওয়া এখানে”—এবং তিনি তাঁর বুকে ইঙ্গিত করলেন। (সহীহ মুসলিম)

এ থেকে বোঝা যায়, তাকওয়া বাহ্যিক পোশাক বা চেহারায় নয়; বরং অন্তরের গুণ।

কীভাবে তাকওয়া অর্জন করা যায়?

১. আল্লাহর পরিচয় অর্জন

আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে জানা এবং তাঁর কুদরত উপলব্ধি করলে অন্তরে ভয় ও ভালোবাসা জন্মায়।

২. নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত

কুরআন তাকওয়া বৃদ্ধি করে। আল্লাহ বলেন:

هُدًى لِلْمُتَّقِينَ

“এটি মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত।” (সূরা বাকারা: ২)

৩. গুনাহ থেকে দূরে থাকা

তাকওয়া মানে শুধু ইবাদত নয়; বরং হারাম থেকে বিরত থাকা।

৪. হিসাবের দিনের স্মরণ

কিয়ামতের ভয় হৃদয়ে থাকলে মানুষ অন্যায় থেকে বিরত থাকে।

৫. সৎ সঙ্গ গ্রহণ

তাকওয়াবানদের সঙ্গে থাকলে হৃদয় পরিশুদ্ধ হয়।

প্রত্যেক কাজে তাকওয়ার গুরুত্ব

নামাজে

তাকওয়া ছাড়া নামাজ কেবল শারীরিক ব্যায়াম হয়ে যায়।

ব্যবসায়

তাকওয়া থাকলে কেউ প্রতারণা করবে না।

পারিবারিক জীবনে

স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের হক আদায় করবে তাকওয়ার কারণে।

কথাবার্তায়

তাকওয়া মানুষকে গীবত ও মিথ্যা থেকে রক্ষা করে।

নেতৃত্বে

যে শাসকের তাকওয়া আছে, সে ন্যায়বিচার করবে।

তাকওয়ার ফলাফল

আল্লাহ বলেন:

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।” (সূরা তালাক: ২)

আরও বলেন:

وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ

“এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না।” (সূরা তালাক: ৩)

তাকওয়া মানুষকে দুনিয়ায় সম্মান ও আখিরাতে জান্নাত দেয়।

পরিশেষে,,

তাকওয়া হলো ঈমানের প্রাণ। এটি অন্তরের এমন এক আলো, যা মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং নেক আমলের দিকে পরিচালিত করে। তাকওয়া ছাড়া ইবাদত পূর্ণতা পায় না, সমাজে শান্তি আসে না এবং ব্যক্তিজীবনে স্থায়ী সাফল্য অর্জিত হয় না।

আল্লাহ আমাদের অন্তরে সত্যিকারের তাকওয়া দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি