কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক: এক আত্মসমালোচনার আহ্বান

কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক: এক আত্মসমালোচনার আহ্বান

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি আমাদের হিদায়াতের জন্য নাযিল করেছেন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ–এর উপর, যিনি কুরআনের জীবন্ত ব্যাখ্যা ছিলেন।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমাদের জীবনের সবচেয়ে হতাশাজনক এবং আফসোসের বিষয় হলো—আমরা কুরআন তেলাওয়াত করি না। কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক নেই বললেই চলে। আমরা মুসলিম, আমরা ঈমানদার বলে পরিচয় দিই, আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি—কিন্তু কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে আমরা কতটা সচেতন?

বাস্তবতা হলো, অনেক নামাজি মুসল্লিও বছরে একবার পূর্ণ কুরআন তেলাওয়াত করতে পারেন না। অন্যদের কথা তো বাদই দিলাম। অথচ এই কুরআন আমাদের জন্যই নাযিল হয়েছে—আমাদের জীবন পরিচালনার জন্য, আমাদের অন্তর আলোকিত করার জন্য।

কুরআন কেন নাযিল হয়েছে?

আল্লাহ তাআলা বলেন—

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ

“রমজান মাস, যাতে নাযিল হয়েছে কুরআন—মানবজাতির জন্য হিদায়াত এবং সুস্পষ্ট প্রমাণ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)

এই কুরআন কোনো নির্দিষ্ট জাতির জন্য নয়, কোনো নির্দিষ্ট যুগের জন্য নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ।

আল্লাহ আরও বলেন—

كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ

“এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি—যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে।” (সূরা সাদ: ২৯)

অর্থাৎ কুরআন শুধু তেলাওয়াতের জন্য নয়; বরং বোঝার জন্য, চিন্তা করার জন্য, জীবনে বাস্তবায়নের জন্য।

আমাদের বাস্তবতা: অবহেলা ও দূরত্ব

আজ আমরা কত বই পড়ি—পাঠ্যবই, উপন্যাস, খবরের কাগজ, সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট। কিন্তু কুরআন? দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কুরআন খোলা হয় না।

আল্লাহর রাসূল ﷺ কিয়ামতের দিন অভিযোগ করবেন—

يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا

“হে আমার রব! আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে।” (সূরা আল-ফুরকান: ৩০)

কুরআন পরিত্যাগ করার অর্থ শুধু না পড়া নয়; বরং না বোঝা, না মানা, না অনুসরণ করা—সবই এর অন্তর্ভুক্ত।

কুরআন তেলাওয়াতের ফযিলত

রাসূল ﷺ বলেছেন—

خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ

“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়।” (বুখারি)

আরও বলেছেন—

مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ

“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পড়বে, তার জন্য একটি নেকি লেখা হবে; আর একটি নেকি দশগুণ বৃদ্ধি করা হবে।” (তিরমিজি)

ভাবুন—‘আলিফ লাম মীম’ তিনটি অক্ষর; অর্থাৎ অন্তত ত্রিশটি নেকি!

কুরআন অন্তরকে জীবিত করে

মানুষের হৃদয় মাঝে মাঝে কঠিন হয়ে যায়। দুনিয়ার চিন্তা, পাপ, ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে হৃদয় অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কুরআন সেই হৃদয়ের জন্য নূর।

আল্লাহ বলেন—

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

“জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা রা‘দ: ২৮)

কুরআন হলো সর্বশ্রেষ্ঠ যিকির। নিয়মিত তেলাওয়াত করলে অন্তরে প্রশান্তি আসে, হতাশা দূর হয়, জীবনে লক্ষ্য পরিষ্কার হয়।

আমরা কেন শিখি না?

আমরা অজুহাত দিই—সময় নেই, ব্যস্ততা বেশি, আরবি কঠিন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই চেষ্টা করেছি?

আমরা যদি প্রতিদিন ১০ মিনিট কুরআনের জন্য নির্ধারণ করি, তবে বছরে একটি পূর্ণ খতম সহজেই সম্ভব।

  • প্রতিদিন অন্তত ১ পৃষ্ঠা পড়া
  • অর্থসহ তেলাওয়াত করা
  • সাপ্তাহিক একটি হালকা তাফসির পাঠ
  • পরিবারের সাথে মিলিত কুরআন পাঠের আসর

কুরআন আমাদের জন্যই নাযিল

কুরআন তাকের উপরে সাজিয়ে রাখার জন্য নয়; মৃত ব্যক্তির জন্য শুধু খতম করার জন্য নয়; বরং জীবিত মানুষের পথনির্দেশের জন্য।

আমরা যদি কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলি, তবে আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন—সবকিছু আলোকিত হবে।

শেষ কথা: আজই শুরু হোক

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আফসোস করে লাভ নেই। আজ থেকেই শুরু করি। প্রতিদিন অল্প হলেও কুরআন পড়ি। বুঝে পড়ি। আমল করার নিয়ত করি।

হয়তো আমরা বড় আলেম হতে পারবো না, কিন্তু অন্তত কুরআনের বন্ধু হতে পারি।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করার তাওফিক দান করুন। আমাদের অন্তরকে কুরআনের নূরে আলোকিত করুন। কুরআনকে আমাদের জীবনের সাথী বানিয়ে দিন। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি