শেষ রাত: রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহামূল্যবান সময়

শেষ রাত: রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহামূল্যবান সময়

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

শেষ রাত আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি সময়। বিশেষ করে রমযান মাসে এ সময়ের মর্যাদা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। অথচ আমরা অনেকেই শুরু রাতে অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট করি। তারাবীহ নামাযের পর গল্প-আড্ডা, মোবাইল ব্যবহার, অনর্থক আলাপ—এসব আমাদের শেষ রাতের বরকত থেকে বঞ্চিত করে। ফলে সাহরীতে ঠিক সময়ে উঠতে পারি না; উঠলেও তাড়াহুড়ো করে খেয়ে আবার ঘুমিয়ে যাই। কেউ ফজরের নামায আদায় করি, কেউ বা তাও ছেড়ে দেই। অথচ সামান্য সচেতনতা ও নিয়ত থাকলে এই সময়টুকু হতে পারে আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ।

১. শেষ রাতের গুরুত্ব 

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে শেষ রাতের ইবাদতের প্রশংসা করেছেন।

আল্লাহ বলেন:

وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ

“আর তারা শেষ রাত্রিতে ক্ষমা প্রার্থনা করত।” (সূরা আয-যারিয়াত: ১৮)

এ আয়াত প্রমাণ করে, সাহরীর সময় তথা শেষ রাত ছিল নেককার বান্দাদের বিশেষ ইবাদতের সময়। তারা শুধু রোযা রাখার জন্য জাগত না, বরং ইস্তিগফার, তাওবা ও আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করত।

আরও বলেন:

تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا

“তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে দূরে থাকে; তারা তাদের রবকে ডাকে ভয় ও আশা নিয়ে।” (সূরা আস-সাজদাহ: ১৬)

এ আয়াতে বোঝা যায়, আল্লাহর প্রিয় বান্দারা স্বেচ্ছায় আরামের ঘুম ত্যাগ করে শেষ রাতে দাঁড়াতেন।

২. শেষ রাতে আল্লাহর নুযূল (অবতরণ)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَىٰ كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَىٰ ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ فَيَقُولُ: مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ، مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ

“প্রতিদিন রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের রব দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন: কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

এই হাদীসের মধ্যে রয়েছে এক গভীর রহস্য। দুনিয়ার কোনো রাজা এমনভাবে তার প্রজাদের ডাকেন না। অথচ আল্লাহ নিজেই আহ্বান করছেন—“চাও, আমি দেবো!” আমরা কি এই ডাক অগ্রাহ্য করবো?

৩. তাহাজ্জুদের গুরুত্ব

তাহাজ্জুদ নামায ফরয নয়, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত। নবী ﷺ এর উপর এটি ওয়াজিব ছিল।

আল্লাহ বলেন:

وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ عَسَىٰ أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا

“রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করো—এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত; আশা করা যায় তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন।” (সূরা আল-ইসরা: ৭৯)

মাকামে মাহমুদ—এটি কিয়ামতের দিন মহান সুপারিশের মর্যাদা। সুতরাং তাহাজ্জুদ শুধু নফল নামায নয়; এটি আখিরাতের সম্মান অর্জনের পথ।

৪. রমযানের শেষ রাতের বিশেষ মর্যাদা

রমযানে শেষ রাতগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মধ্যেই রয়েছে লাইলাতুল কদর।

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ

“নিশ্চয়ই আমি এটি অবতীর্ণ করেছি লাইলাতুল কদরে। তুমি কি জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” (সূরা আল-কদর)

হাজার মাস মানে প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস। এক রাতের ইবাদত একটি পূর্ণ জীবনের চেয়েও বেশি সওয়াবের।

৫. কেন আমরা বঞ্চিত হচ্ছি?

  • তারাবীহর পর অপ্রয়োজনীয় আড্ডা
  • মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় নষ্ট
  • দেরি করে ঘুমানো
  • সাহরীতে শুধু খাওয়াকে লক্ষ্য বানানো
  • ফজরের প্রতি অবহেলা

এগুলো আমাদের আত্মিক উন্নতির পথে বড় বাধা।

৬. করণীয় কী?

১. নিয়ত ঠিক করা

প্রতিদিন ঘুমানোর আগে নিয়ত করবো—শেষ রাতে উঠবো।

২. দ্রুত ঘুমানো

তারাবীহ শেষে অপ্রয়োজনীয় কাজ বর্জন করা।

৩. সাহরীতে বরকত

রাসূল ﷺ বলেছেন: “তোমরা সাহরী খাও; কারণ সাহরীতে বরকত রয়েছে।” (সহীহ বুখারী)

৪. অন্তত ২ রাকাত তাহাজ্জুদ

কম হলেও নিয়মিত হওয়া জরুরি।

৫. ইস্তিগফার ও দু’আ

শেষ রাতে বেশি বেশি বলা: أستغفر الله، رب اغفر لي

৭. আত্মশুদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ

শেষ রাত আত্মসমালোচনার সময়। নিজের গুনাহ স্মরণ করে কান্না করা, ক্ষমা চাওয়া, ভবিষ্যতের জন্য দৃঢ় সংকল্প নেওয়া—এসব আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।

হাসান আল-বাসরী (রহ.) বলেছেন: “রাতের কান্না দিনের পাপ ধুয়ে দেয়।”

৮. দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা

শেষ রাতের ইবাদত দুনিয়ার সমস্যাও দূর করে। অনেক আলেম বলেছেন—যে ব্যক্তি নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ে, আল্লাহ তার রিযিক বৃদ্ধি করেন, দুশ্চিন্তা দূর করেন, অন্তরে প্রশান্তি দেন।

৯. একটি বাস্তব পরিকল্পনা

  • রাত ১১টার মধ্যে ঘুমানো
  • অ্যালার্ম সেট করা
  • উঠেই অজু করা
  • ২-৮ রাকাত তাহাজ্জুদ
  • ১৫ মিনিট কুরআন তিলাওয়াত
  • দীর্ঘ দু’আ
  • সাহরী খাওয়া
  • ফজর জামাতে আদায়

শেষ রাত আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়। এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন আসমানের দরজা খুলে যায়, রহমত বর্ষিত হয়, আর আল্লাহ নিজেই আহ্বান করেন—“কে আছে আমার কাছে চাইবে?” আমরা কি এই ডাকে সাড়া দেব না?

আসুন, শুরু রাতের অপচয় বন্ধ করি। সাহরীর বরকত গ্রহণ করি। তাহাজ্জুদে দাঁড়াই। ইস্তিগফারে ভিজে যাই। কারণ এই সুযোগ সারা বছর আসে না। আজকের রাতই হতে পারে আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার রাত।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি