ব্যস্ততার অজুহাত নয়, আমলের অঙ্গীকার

 ব্যস্ততার অজুহাত নয়, আমলের অঙ্গীকার

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

জীবনের পথে চলতে গেলে ব্যস্ততা এক অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। দুনিয়াতে আগমন মানেই ব্যস্ততার ভিড়ে নিজেকে খুঁজে নেওয়ার সংগ্রাম। এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যার জীবনে ব্যস্ততা নেই। বরং মানুষ যত বড় হয়, তার ব্যস্ততার পরিধিও তত বিস্তৃত হয়।

একজন ছোট শিশুর দিকেই তাকিয়ে দেখলে বোঝা যায়— তারও ব্যস্ততা আছে। খাবার নিয়ে, খেলনা নিয়ে, বন্ধুদের নিয়ে, হাসি-কান্নার মধ্যেই তার দিন কেটে যায়। কিন্তু সে নাবালেগ। তার উপর তখনও শরিয়তের ফরজ বিধান আরোপিত হয়নি। নামাজ তার জন্য ফরজ নয়, রোজা তার উপর আবশ্যক নয়, কুরআন শেখার বাধ্যবাধকতাও তখন তার উপর নেই।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে শিশুটি বড় হয়। তার মধ্যে বুঝ আসে, বোধশক্তি তৈরি হয়। সে যখন বালেগ হয়, ঠিক তখন থেকেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। কারণ বালেগ হওয়ার সাথে সাথেই আল্লাহ তাআলা তার কাঁধে আমানত তুলে দেন। নামাজ ফরজ হয়, রোজা ফরজ হয়, কুরআন তেলাওয়াত শেখা ও পড়া ফরজ হয়, হালাল-হারামের সীমারেখা তার জীবনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ সময় দুনিয়াবী ব্যস্ততাও কমে না, বরং আরও বেড়ে যায়। কেউ কৃষিকাজে ব্যস্ত, কেউ রিকশা চালায়, কেউ দোকানদার, কেউ চাকরিজীবী, কেউ ছাত্র, কেউ শিক্ষক, কেউ রাজনীতি করে, কেউ মঞ্চে বক্তৃতা দেয়, কেউ ইট-বালুর কাজে শ্রম দেয়, কেউ বিদ্যুৎ মিস্ত্রি, কেউ কাঠমিস্ত্রি। ব্যস্ততার ধরন আলাদা, কিন্তু ব্যস্ততা সবার জীবনেই আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই ব্যস্ততাই কি আমল ছেড়ে দেওয়ার বৈধ অজুহাত হতে পারে? কখনোই না। কারণ আল্লাহ তাআলা কখনোই এমন কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না, যা মানুষের সাধ্যের বাইরে।

বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে, পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে হবে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকবে, মানসিক চাপ থাকবে— এই সবকিছুর মাঝেও নামাজের সময় নামাজ আদায় করতে হবে। রোজার মাস এলে রোজা রাখতে হবে। প্রতিদিন কুরআনের সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে।

আমলের অর্থ শুধু নামাজ-রোজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আমল হলো— নফল নামাজ, জিকির-আযকার, কুরআন তেলাওয়াত, মানুষের হক আদায়, কারো হক নষ্ট না করা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, ভালো ব্যবহার করা, ভদ্র ভাষায় কথা বলা, সৎ কাজে আদেশ করা, অসৎ কাজে নিষেধ করা, এবং নিজের চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করা।

একজন মানুষ যদি সারাদিন ব্যস্ত থেকেও রাতে ঘুমানোর আগে নিজেকে প্রশ্ন করে— আজ আমি কী কী আমল করেছি? আমার কোনো ফরজ কি ছুটে গেছে? আমি কি কাউকে কষ্ট দিয়েছি? তাহলে এই আত্মসমালোচনাই তাকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনবে।

আমাদের বড় সমস্যা হলো— আমরা ব্যস্ততাকে ঢাল বানিয়ে ফেলি। আমরা বলি, “আজ সময় পাইনি”, “মন বসেনি”, “পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না”। অথচ বাস্তবতা হলো— যার কাছে আল্লাহ অগ্রাধিকার, তার কাছে সময়ের অভাব হয় না।

যেভাবে আমরা খাবারের সময় ঠিক রাখি, অফিসের সময় ঠিক রাখি, পরীক্ষার রুটিন মেনে চলি, ঠিক সেভাবেই নামাজের সময়কেও জীবনের রুটিনে স্থায়ীভাবে বসিয়ে দিতে হবে।

যদি আমল ছুটে যায়, তাহলে ইমান দুর্বল হয়ে পড়ে। আর ইমান দুর্বল হলে জীবনে অস্থিরতা নেমে আসে। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি ব্যস্ততার মাঝেও আমল আঁকড়ে ধরে, তার জীবনে বরকত নেমে আসে। অল্প সময়েও সে অনেক কিছু করে ফেলতে পারে।

তাই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত— আমল ছেড়ে দেব না, বরং ধীরে ধীরে আমল বাড়াব। অল্প হলেও নিয়মিত করব। আজ যদি দুই রাকাত নফল পড়ি, আগামীকাল চার রাকাত পড়ব। আজ যদি এক পৃষ্ঠা কুরআন পড়ি, কাল দুই পৃষ্ঠা পড়ার চেষ্টা করব।

এই ধারাবাহিকতাই একদিন আমাদের আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাতারে শামিল করবে—ইনশাআল্লাহ।

পরিশেষে, মহান আল্লাহর দরবারে এই দোয়াই করি— হে আল্লাহ, আমাদেরকে ব্যস্ততার অজুহাতে আমল ছেড়ে দেওয়া থেকে হেফাজত করুন। আমাদের অন্তরে আমলের মহব্বত দান করুন। ফরজ আদায়ে দৃঢ়তা দিন, নফল আমলে আগ্রহ দিন, এবং মৃত্যু পর্যন্ত আমাদেরকে আপনার ইবাদতের উপর অবিচল রাখুন।

আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।

Comments

Popular posts from this blog

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি

🌸 শুরু কথা: ফুলের মত সুন্দর জীবন