ভালো চরিত্রের গুরুত্ব, উপকারিতা ও মর্যাদা — কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে বিস্তৃত আলোচনা
ভালো চরিত্রের গুরুত্ব, উপকারিতা ও মর্যাদা — কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে বিস্তৃত আলোচনা
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য, যিনি মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সুন্দর চরিত্রের শিক্ষা দিয়েছেন। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর, যিনি মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। ভাই ও বোনেরা, ইসলামে ভালো চরিত্র (حُسْنُ الْخُلُقِ) শুধু একটি সামাজিক গুণ নয়; এটি ঈমানের পরিপূর্ণতার অন্যতম প্রধান নিদর্শন। মানুষ নামাজ পড়তে পারে, রোজা রাখতে পারে, দান করতে পারে; কিন্তু যদি তার চরিত্র খারাপ হয়, তবে তার আমল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর যদি চরিত্র সুন্দর হয়, তবে অল্প আমল দিয়েও সে উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে বলেন:
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।” (সূরা আল-কলম ৬৮:৪)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, নবী ﷺ এর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর মহান চরিত্র। তিনি ছিলেন সত্যবাদী, আমানতদার, দয়ালু, ক্ষমাশীল ও নম্র।
ইসলামে ভালো চরিত্র ঈমানের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। রাসূল ﷺ বলেছেন:
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا
অর্থ: “মুমিনদের মধ্যে যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর, তার ঈমান সবচেয়ে পরিপূর্ণ।” (তিরমিযি)
অতএব, চরিত্র ভালো না হলে ঈমান পূর্ণতা পায় না। অনেক সময় আমরা বাহ্যিক ইবাদতের দিকে বেশি গুরুত্ব দিই, কিন্তু মানুষের সাথে আচরণে অবহেলা করি। অথচ ইসলামে চরিত্রের গুরুত্ব এত বেশি যে, কিয়ামতের দিন মানুষের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে সুন্দর চরিত্র।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَا مِنْ شَيْءٍ أَثْقَلُ فِي مِيزَانِ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ
অর্থ: “কিয়ামতের দিন মুমিনের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে তার সুন্দর চরিত্র।” (আবু দাউদ)
এখন প্রশ্ন—ভালো চরিত্রের লাভ কী?
প্রথম লাভ হলো আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন। রাসূল ﷺ বলেছেন:
إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلَاقًا
অর্থ: “তোমাদের মধ্যে যারা চরিত্রে উত্তম, তারা কিয়ামতের দিন আমার নিকটতম ও প্রিয় হবে।” (তিরমিযি)
চিন্তা করুন—কে না চায় নবী ﷺ এর নিকটবর্তী হতে? সুন্দর চরিত্র সেই সুযোগ এনে দেয়।
দ্বিতীয় লাভ—জান্নাত লাভ। এক ব্যক্তি রাসূল ﷺ কে জিজ্ঞেস করলেন, কোন আমল মানুষকে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করায়? তিনি বললেন:
تَقْوَى اللَّهِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ
অর্থ: “আল্লাহভীতি ও সুন্দর চরিত্র।” (তিরমিযি)
অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশের প্রধান দুটি কারণ—তাকওয়া ও ভালো চরিত্র।
ভালো চরিত্র সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে। যদি একজন স্বামী স্ত্রীর সাথে কোমল আচরণ করে, স্ত্রী স্বামীর সাথে সম্মান দেখায়, প্রতিবেশী প্রতিবেশীর হক আদায় করে—তবে সমাজে ঝগড়া, হিংসা, বিদ্বেষ কমে যাবে।
আল্লাহ বলেন:
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا
অর্থ: “মানুষের সাথে সুন্দর কথা বলো।” (সূরা বাকারা ২:৮৩)
ভালো কথা বলা, ধৈর্য ধরা, ক্ষমা করা—এসবই সুন্দর চরিত্রের অংশ।
রাসূল ﷺ ছিলেন ক্ষমাশীলতার সর্বোত্তম উদাহরণ। মক্কা বিজয়ের দিন যারা তাকে নির্যাতন করেছিল, তাদেরকে তিনি ক্ষমা করে দেন। এটি ছিল মহান চরিত্রের অনন্য দৃষ্টান্ত।
ভালো চরিত্রের আরেকটি উপকার হলো—মানুষের হৃদয় জয় করা। কঠোরতা মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, কোমলতা মানুষকে কাছে আনে। আল্লাহ বলেন:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ
অর্থ: “আল্লাহর রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল ছিলেন; যদি আপনি কঠোর ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৫৯)
এ আয়াত প্রমাণ করে—নেতৃত্ব, দাওয়াহ ও সামাজিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সুন্দর চরিত্র অপরিহার্য।
ভালো চরিত্রের মধ্যে রয়েছে—সত্যবাদিতা। রাসূল ﷺ বলেছেন:
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ
অর্থ: “তোমরা সত্যকে অবলম্বন করো, কারণ সত্য সৎকর্মের দিকে নিয়ে যায়।” (বুখারি ও মুসলিম)
মিথ্যা, গীবত, অপবাদ—এসব খারাপ চরিত্রের লক্ষণ, যা সমাজ ও আখিরাত উভয়ই নষ্ট করে।
ভালো চরিত্রের অংশ হলো ধৈর্য। কষ্টের সময় ধৈর্য ধারণ করলে আল্লাহ সাহায্য করেন। রাগ নিয়ন্ত্রণ করা সুন্দর চরিত্রের বড় নিদর্শন। রাসূল ﷺ বলেছেন:
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
অর্থ: “শক্তিশালী সেই নয় যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।” (বুখারি)
উপসংহারে বলা যায়—ভালো চরিত্র একজন মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য। সম্পদ, সৌন্দর্য, ক্ষমতা—এসব ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু চরিত্র মানুষকে সম্মানিত করে দুনিয়ায় এবং সফল করে আখিরাতে।
আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি:
اللَّهُمَّ اهْدِنِي لِأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِي لِأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমাকে উত্তম চরিত্রের দিকে পরিচালিত করুন; উত্তম চরিত্রের দিকে পরিচালিত করতে আপনি ছাড়া কেউ সক্ষম নয়।” (মুসলিম)
আল্লাহ আমাদেরকে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী করুন, ঈমান পরিপূর্ণ করুন এবং কিয়ামতের দিন আমাদের পাল্লা ভারী করুন। আমীন।
Comments
Post a Comment