“চুরি থেকে তাওবা: এক হৃদয়ের জাগরণের আহ্বান”

“চুরি থেকে তাওবা: এক হৃদয়ের জাগরণের আহ্বান”

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

আমরা প্রায়ই এমনভাবে জীবন যাপন করি যেন এই দুনিয়া আমাদের স্থায়ী আবাস, যেন মৃত্যু আমাদের দরজায় কখনো কড়া নাড়বে না। হৃদয়ের গভীরে কোথাও আমরা ভুলে যাই—আমরা মুসাফির, আমরা অস্থায়ী। অথচ আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন: ﴿كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ﴾ “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৮৫)। এই আয়াত কেবল একটি ঘোষণা নয়, এটি এক জাগরণী ধ্বনি। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, ফিরে যাওয়া অবধারিত, হিসাব অনিবার্য। তবুও আমরা এমনভাবে পাপ করি যেন জাহান্নামের আগুন কেবল গল্প, যেন কবরের অন্ধকার কেবল কল্পনা।

চুরি—এটি কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি একটি বিশ্বাসঘাতকতা, এটি একটি জুলুম। কেউ হয়তো বলে, “আমি গরিব, আমি এতিম, আমি অভাবী। আমার তো উপায় নেই।” কিন্তু প্রশ্ন হলো—অভাব কি হারামকে হালাল করে দেয়? ক্ষুধা কি অন্যের হক নষ্ট করার অনুমতি দেয়? যদি আমি কারও সম্পদ চুরি করি, তা সে সামান্য হোক বা বিশাল, আমি কি ভেবেছি তার হৃদয়ের কষ্টের কথা? হয়তো সেই টাকায় তার সন্তানের ওষুধ কেনার কথা ছিল, হয়তো তা ছিল তার পরিশ্রমের ঘাম ঝরা উপার্জন।

আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ﴾ “তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।” (সূরা বাকারা ২:১৮৮)। চুরি করা মানে অন্যের সম্পদ বাতিলভাবে ভক্ষণ করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ» “চোর যখন চুরি করে, তখন সে পূর্ণ ঈমানদার অবস্থায় চুরি করে না।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। অর্থাৎ চুরির মুহূর্তে ঈমানের নূর হৃদয় থেকে সরে যায়। যে ঈমান আল্লাহর ভয়ে কাঁপে, সে কি করে অন্যের হক নষ্ট করতে পারে?

হয়তো তুমি বলবে—“আমি চুরি করে কিছুদিন আরামে থাকব।” কিন্তু কতদিন? একদিন ধরা পড়লে সমাজে অপমান, আর যদি ধরা না-ও পড়ো, কিয়ামতের দিন? সেদিন তো সব প্রকাশ হবে। আল্লাহ বলেন: ﴿فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ﴾ “যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সে তা দেখবে।” (সূরা যিলযাল ৯৯:৮)। চুরি করা এক টাকাও সেখানে হারিয়ে যাবে না। সব হিসাব হবে।

একবার ভেবে দেখো—তুমি যদি কারও মাল চুরি করো, সে যদি রাতভর কাঁদে, তার সেই চোখের পানির হিসাব কে দেবে? যদি সে আল্লাহর কাছে অভিযোগ করে? আল্লাহ তো মজলুমের দোয়া প্রত্যাখ্যান করেন না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «اتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهَا لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ» “মজলুমের দোয়া থেকে বেঁচে থাকো, কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই।” (সহীহ বুখারী)। তুমি কি সেই দোয়ার বোঝা বইতে পারবে?

অভাব থাকলে আল্লাহর দরবারে যাও। তিনি নিজেই বলেছেন: ﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ﴾ “তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব।” (সূরা গাফির ৪০:৬০)। তুমি যদি চোখের পানি ফেলো, রাতের অন্ধকারে দু’হাত তুলে বলো—“হে আল্লাহ, আমি অভাবী, তুমি রিযিক দাও”—তিনি কি তোমাকে ফিরিয়ে দেবেন? আল্লাহ তো আর-রাযযাক, রিযিকদাতা।

ইসলামের ইতিহাসে এমন মানুষও ছিলেন যারা জীবনের শুরুতে চোর ছিলেন, কিন্তু এক আয়াত, এক উপদেশ, এক মুহূর্তের তাওবা তাদের জীবন বদলে দিয়েছে। ফুযাইল ইবনু ‘ইয়াদ রহ. একসময় দস্যু ছিলেন। পথরোধ করে লুটতরাজ করতেন। এক রাতে তিনি একটি দেয়াল টপকাচ্ছিলেন। তখন তিনি শুনলেন কেউ কুরআন তিলাওয়াত করছে: ﴿أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَن تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ﴾ “ঈমানদারদের জন্য কি সময় আসেনি যে তাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে নম্র হবে?” (সূরা হাদীদ ৫৭:১৬)। এই আয়াত তার হৃদয়ে বজ্রাঘাতের মতো আঘাত করল। তিনি কেঁদে উঠলেন, বললেন—“হ্যাঁ, হে আল্লাহ! সময় এসে গেছে।” সেই রাতেই তিনি তাওবা করলেন। পরে তিনি এমন আল্লাহওয়ালা হলেন যে মানুষ তার জ্ঞান ও তাকওয়ার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে আসত।

তুমি যদি আজ চোর হও, তবুও হতাশ হয়ো না। দরজা এখনো খোলা। তাওবার দরজা বন্ধ হয়নি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ» “যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে তাওবা করে, সে যেন গুনাহই করেনি।” (ইবনে মাজাহ)। তুমি যদি সত্যিকার অনুতপ্ত হও, চুরি করা মাল ফিরিয়ে দাও বা ক্ষমা চাও, আল্লাহর কাছে কান্না করো—আল্লাহ তোমাকে নতুন জীবন দেবেন।

ভাবো, যদি তুমি চুরি ছেড়ে দিয়ে হালাল রিযিকের পথে ফিরে আসো, হয়তো প্রথমে কষ্ট হবে। কিন্তু সেই কষ্টে বরকত থাকবে, শান্তি থাকবে। হারাম উপার্জনে পেট ভরলেও হৃদয় খালি থাকে। হালাল অল্প হলেও তাতে প্রশান্তি থাকে।

আজ তুমি সিদ্ধান্ত নিতে পারো। আজ তুমি বলতে পারো—“আমি আর কারও হক নষ্ট করব না। আমি আল্লাহর পথে ফিরব।” মৃত্যুর আগে ফিরে আসা সৌভাগ্যের বিষয়। কারণ কবরের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে আর সুযোগ থাকবে না।

হে আমার ভাই, যদি তুমি চোর হও, জেনে রাখো—আল্লাহ তোমাকে ঘৃণা করেন না, তিনি তোমার গুনাহকে ঘৃণা করেন। তুমি যদি ফিরে আসো, তিনি তোমাকে ভালোবাসবেন। কুরআনে তিনি বলেন: ﴿إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ﴾ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।” (সূরা বাকারা ২:২২২)। তুমি কি সেই ভালোবাসা পেতে চাও না?

আসো, আমরা সবাই নিজেদের হৃদয়কে জিজ্ঞেস করি—আমরা কি এমন জীবন চাই যা কয়েক দিনের আরাম দেয়, না এমন জীবন যা আখিরাতে চিরস্থায়ী শান্তি দেয়? চুরি ছেড়ে দাও। অন্যের হক ফিরিয়ে দাও। আল্লাহর কাছে কাঁদো। দেখবে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তোমার জন্য রিযিকের এমন দরজা খুলে দেবেন, যা তুমি কল্পনাও করোনি।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি