রমজান মাসে রাসূল ﷺ যেসব আমল অধিক পরিমাণে করতেন
রমজান মাসে রাসূল ﷺ যেসব আমল অধিক পরিমাণে করতেন
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
রমজান মাস আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য এক মহা নিয়ামত। এ মাসে নাজিল হয়েছে পবিত্র কুরআন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ
অর্থ: “রমজান মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)
এই মাসে রাসূলুল্লাহ ﷺ কিভাবে ইবাদত করতেন, কোন আমলগুলো বেশি করতেন, তাঁর জীবনচিত্র কেমন ছিল—এগুলো জানা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে সহিহ হাদীস ও সিরাতের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো।
১. রোজা পালনে বিশেষ যত্ন
রাসূলুল্লাহ ﷺ রমজান মাসের রোজাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আদায় করতেন। তিনি শুধু ফরজ রোজাই রাখতেন না, বরং রোজার আদব, নিয়ত, সাহরি ও ইফতারে বিশেষ যত্নবান ছিলেন।
হাদীসে এসেছে:
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
অর্থ: “যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াবের আশা নিয়ে রমজানের রোজা রাখবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদীস নং ৩৮; সহিহ মুসলিম)
ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূল ﷺ রোজার সময় অপ্রয়োজনীয় কথা, ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকতেন।
২. সাহরি গ্রহণে উৎসাহ
রাসূল ﷺ সাহরি খেতে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি সাহরি বিলম্বে খেতেন এবং ফজরের আগে শেষ করতেন।
تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السُّحُورِ بَرَكَةً
অর্থ: “সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।” (সহিহ বুখারি, হাদীস ১৯২৩; সহিহ মুসলিম)
ইমাম নববী (রহ.) তাঁর “শরহ মুসলিম”-এ উল্লেখ করেছেন যে, সাহরির বরকত দুনিয়া ও আখিরাত উভয় দিকেই প্রযোজ্য।
৩. ইফতারে দ্রুততা
রাসূল ﷺ সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করতেন। তিনি বিলম্ব করতেন না।
لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ
অর্থ: “মানুষ কল্যাণে থাকবে, যতক্ষণ তারা দ্রুত ইফতার করবে।” (সহিহ বুখারি, হাদীস ১৯৫৭)
ইবনে হিশাম তাঁর “আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়্যাহ” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, নবী ﷺ খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করতেন।
৪. কুরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি
রমজান মাস ছিল কুরআনের মাস। রাসূল ﷺ এই মাসে অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করতেন।
হাদীসে এসেছে:
كَانَ جِبْرِيلُ يَلْقَاهُ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ فَيُدَارِسُهُ الْقُرْآنَ
অর্থ: “জিবরাইল (আ.) রমজানের প্রতি রাতে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং কুরআন পুনরাবৃত্তি করতেন।” (সহিহ বুখারি, হাদীস ৬)
ইমাম ইবন হাজার আসকালানী “ফাতহুল বারী”-তে উল্লেখ করেছেন যে, এ থেকে বোঝা যায় রমজানে কুরআন খতম করা সুন্নাহস্বরূপ।
৫. তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল
রাসূল ﷺ রমজানে রাত্রিকালীন নামাজে দীর্ঘ সময় দাঁড়াতেন। বিশেষত শেষ দশকে তিনি অধিক ইবাদতে মশগুল থাকতেন।
مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
অর্থ: “যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াবের আশা নিয়ে রমজানে রাতে দাঁড়ায় (নামাজ পড়ে), তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি, ২০০৯)
সিরাত গ্রন্থ “আর-রাহীকুল মাখতূম”-এ উল্লেখ আছে যে, শেষ দশকে তিনি পরিবারের সদস্যদের জাগিয়ে তুলতেন এবং অধিক ইবাদতে রত হতেন।
৬. ইতিকাফ
রাসূল ﷺ প্রতি রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।
كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ
(সহিহ বুখারি, ২০২৬)
ইবনে কাসীর তাঁর “আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ” গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, ওফাতের বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেছিলেন।
৭. দান-সদকা বৃদ্ধি
রাসূল ﷺ ছিলেন সবচেয়ে দানশীল। রমজানে তাঁর দানশীলতা আরও বেড়ে যেত।
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ، وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ
(সহিহ বুখারি, ৬)
ইবন হাজার বলেন, তাঁর দান ছিল প্রবাহমান বাতাসের মতো দ্রুত ও ব্যাপক।
৮. লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান
শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে তিনি লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতেন।
تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ
(সহিহ বুখারি, ২০১৭)
এই রাতে তিনি অধিক দোয়া করতেন। আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলে তিনি দোয়া শিখিয়েছেন:
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
(তিরমিযি, ৩৫১৩ – সহিহ)
৯. আত্মশুদ্ধি ও তাওবা
রমজানে তিনি অধিক ইস্তিগফার করতেন।
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ
(সূরা নূর: ৩১)
ইমাম গাজালী “ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন”-এ লিখেছেন, রমজান আত্মশুদ্ধির মাস—রাসূল ﷺ এ মাসে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতেন।
১০. পরিবারকে ইবাদতে উৎসাহিত করা
আয়েশা (রা.) বলেন:
إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ وَأَحْيَا لَيْلَهُ وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ
অর্থ: “শেষ দশক প্রবেশ করলে তিনি কোমর বেঁধে নিতেন, রাত জাগতেন এবং পরিবারকে জাগিয়ে তুলতেন।” (সহিহ বুখারি, ২০২৪)
সিরাত গ্রন্থসমূহে বর্ণনা
- ইবনে হিশাম (আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়্যাহ): রমজানে তাঁর দান ও ইবাদতের বিশেষ বর্ণনা রয়েছে।
- ইবন কাসীর (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ): শেষ বছরে বিশ দিন ইতিকাফের উল্লেখ।
- আর-রাহীকুল মাখতূম: শেষ দশকে ইবাদতে বিশেষ মনোযোগ ও লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান।
- ফাতহুল বারী (ইবন হাজার): রমজানে কুরআন অধ্যয়নের তাৎপর্য।
রমজান ছিল রাসূল ﷺ এর জন্য ইবাদতের বসন্তকাল। তিনি রোজা, কুরআন তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদ, দান-সদকা, ইতিকাফ ও লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানে অতুলনীয় ছিলেন। তাঁর জীবনই আমাদের জন্য আদর্শ।
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
অর্থ: “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।” (সূরা আহযাব: ২১)
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রাসূল ﷺ এর সুন্নাহ অনুযায়ী রমজান কাটানোর তৌফিক দান করুন। আমীন।
Comments
Post a Comment