সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখা, নম্র আচরণ করা ও কটু কথা পরিহার করা — কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিস্তৃত আলোচনা

সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখা, নম্র আচরণ করা ও কটু কথা পরিহার করা — কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিস্তৃত আলোচনা

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

মানুষ সামাজিক জীব। একা জীবনযাপন করা তার স্বভাব নয়। পরিবার, সমাজ, প্রতিবেশী, বন্ধু, আত্মীয়—সবাইকে নিয়ে মানুষের জীবন। ইসলাম এমন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা যা মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদত যেমন শিখিয়েছে, তেমনি শিখিয়েছে কিভাবে মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ করতে হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শুধু নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাতের মাধ্যমে তাঁর ইবাদত করতে বলেননি; বরং মানুষের সাথে উত্তম আচরণকেও ঈমানের অংশ বানিয়েছেন।

১. উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব

উত্তম চরিত্র ইসলাম ধর্মের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রিয় নবী ﷺ বলেছেন:

إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ

“আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দান করার জন্য।” — হাদীস: মুয়াত্তা মালিক

এই হাদীস প্রমাণ করে যে ইসলামের মূল শিক্ষা কেবল আচার-অনুষ্ঠান নয়, বরং চরিত্র গঠন। নম্রতা, সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা, মিষ্টভাষিতা—এসবই ইসলামের সৌন্দর্য।

২. সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখার কুরআনিক নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা পবিত্র আল-কুরআন-এ বলেন:

وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا

“মানুষের সাথে সুন্দর কথা বল।” (সূরা আল-বাকারা: ৮৩)

এখানে আল্লাহ তাআলা “لِلنَّاسِ” বলেছেন— অর্থাৎ সকল মানুষের সাথে। শুধু মুসলিম নয়, বরং সকল মানুষের সাথে উত্তম কথা বলা ঈমানের দাবি।

৩. নম্র আচরণ করার নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَعِبَادُ الرَّحْمَٰنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا

“রহমানের বান্দারা তারা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।” (সূরা আল-ফুরকান: ৬৩)

নম্রতা হচ্ছে ঈমানদারের পরিচয়। অহংকার, রুক্ষতা ও কঠোরতা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। নবী ﷺ ছিলেন সর্বাধিক নম্র মানুষ।

৪. কটু কথা ও গালমন্দ পরিহার

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلَا اللَّعَّانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ

“মুমিন ব্যক্তি নিন্দাকারী নয়, অভিশাপদাতা নয়, অশ্লীলভাষী নয়।” — তিরমিযী

আজ আমাদের সমাজে গালমন্দ যেন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে। কিন্তু একজন প্রকৃত মুমিন কখনো অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করতে পারে না।

৫. দরিদ্রদের সাথে উত্তম আচরণ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ

“আর ভিক্ষুককে ধমক দিও না।” (সূরা আদ-দুহা: ১০)

দরিদ্র মানুষকে অবজ্ঞা করা নয়; বরং সম্মান দিয়ে কথা বলা উচিত। দান না পারলেও অন্তত হাসিমুখে কথা বলা উচিত।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ

“তোমার ভাইয়ের মুখে হাসি উপহার দেওয়াও সদকা।” — তিরমিযী

৬. সুসম্পর্ক বজায় রাখার বাস্তব উপায়

  • রাগ নিয়ন্ত্রণ করা
  • ক্ষমা করার অভ্যাস করা
  • পেছনে সমালোচনা না করা
  • ভদ্র ভাষা ব্যবহার করা
  • হাসিমুখে কথা বলা
  • সালাম প্রচলন করা
  • আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা

৭. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা

রাসূল ﷺ বলেছেন:

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ

“আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” — বুখারী ও মুসলিম

আজ সামান্য বিষয়ে ভাই ভাইয়ের সাথে কথা বলে না। কিন্তু ইসলাম শিখিয়েছে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে।

৮. কোমল ভাষার শক্তি

আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে ফেরাউনের কাছে পাঠানোর সময় বলেছিলেন:

فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا

“তার সাথে কোমল কথা বল।” (সূরা ত্বা-হা: ৪৪)

যদি ফেরাউনের মতো অত্যাচারীর সাথে কোমল কথা বলার নির্দেশ হয়, তবে আমাদের সাধারণ মানুষের সাথে কেমন আচরণ করা উচিত?

৯. গীবত ও অপবাদ পরিহার

আল্লাহ বলেন:

وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا

“তোমরা একে অপরের গীবত করো না।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)

গীবত সমাজে ঘৃণা সৃষ্টি করে। সুসম্পর্ক নষ্ট করে।

১০. উত্তম চরিত্রের প্রতিদান

রাসূল ﷺ বলেছেন:

إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلَاقًا

“কিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।” — তিরমিযী

এটাই সবচেয়ে বড় প্রেরণা। উত্তম চরিত্র আমাদেরকে জান্নাতের পথে এগিয়ে দেয়।

সুসম্পর্ক, নম্রতা, কোমল ভাষা, দরিদ্রের সম্মান, গালমন্দ পরিহার— এসব শুধু সামাজিক শিষ্টাচার নয়; এসব ঈমানের দাবি।

আমরা যদি সত্যিকার অর্থে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করি, তবে আমাদের পরিবারে শান্তি আসবে, সমাজে ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হবে, এবং আল্লাহর রহমত নাযিল হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী বানান, আমাদের মুখে মিষ্টি কথা দান করুন, এবং আমাদেরকে মানুষের জন্য রহমত বানিয়ে দিন। আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি