দরিদ্রদের জন্য আমাদের এগিয়ে যেতে হবে
দরিদ্রদের জন্য আমাদের এগিয়ে যেতে হবে
প্রারম্ভিকা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি আমাদেরকে রমজানের মতো বরকতময় মাস দান করেছেন—সংযমের মাস, সহমর্মিতার মাস, তাকওয়ার মাস। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক মানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মদ ﷺ–এর উপর, যিনি ছিলেন দানশীলতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, রমজান আমাদের সামনে এক মহামূল্যবান সুযোগ এনে দেয়—নিজেকে সংশোধনের, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার, এবং সমাজের অবহেলিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের আশেপাশেই এমন বহু মা-বোন ও পরিবার রয়েছে যারা সাহরী ও ইফতারের সামান্য আয়োজন করতেও অক্ষম। কেউ হয়তো অল্প ভাত আর লবণ দিয়ে ইফতার করে, কেউ বা শুধু পানি দিয়ে রোযা ভাঙে।
আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যেই এমন মানুষ আছে যারা চুপচাপ কষ্ট সহ্য করছে। তারা মুখে কিছু বলে না, কিন্তু তাদের অভাবের ভাষা আমরা যদি হৃদয় দিয়ে শুনি—তবে বুঝতে পারবো আমাদের কত বড় দায়িত্ব রয়েছে।
রমজান: সহমর্মিতার শিক্ষা
রমজান কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণার নাম নয়; এটি হৃদয়ের জাগরণের নাম। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল—যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৩)
তাকওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—অন্যের কষ্ট অনুভব করা। যখন আমরা ক্ষুধার্ত থাকি, তখন দরিদ্রের স্থায়ী ক্ষুধার যন্ত্রণা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারি। এই অনুভূতি যদি আমাদের অন্তরকে নাড়া না দেয়, তবে রোযার উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়।
দরিদ্রের হক ও ইসলামের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন—
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ
“তাদের সম্পদে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতের একটি নির্ধারিত অধিকার রয়েছে।” (সূরা আয-যারিয়াত: ১৯)
অর্থাৎ আমাদের সম্পদ কেবল আমাদের নয়; তাতে দরিদ্রেরও অংশ রয়েছে। আমরা যখন সাহায্য করি, তখন দয়া করছি না—বরং তাদের হক আদায় করছি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ
“যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।” (তিরমিজি)
এই হাদীস আমাদের সামনে অসীম সুযোগের দরজা খুলে দেয়। একটি খেজুর, এক গ্লাস পানি কিংবা সামান্য ভাত—যদি ইখলাসের সাথে কাউকে ইফতার করানো হয়, তবে আল্লাহ তার বিনিময়ে অপরিসীম প্রতিদান দান করেন।
আমাদের আত্মীয়দের মধ্যেই লুকানো অভাব
আমরা প্রায়ই দূরের মানুষদের কথা ভাবি, কিন্তু নিজের আত্মীয়দের খোঁজ নিতে ভুলে যাই। অথচ আত্মীয়ের প্রতি দান দ্বিগুণ সওয়াবের কারণ।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
الصَّدَقَةُ عَلَى الْمِسْكِينِ صَدَقَةٌ وَعَلَى ذِي الرَّحِمِ اثْنَتَانِ: صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ
“মিসকীনের প্রতি দান এক সওয়াব; আর আত্মীয়কে দান করলে দুটি সওয়াব—দান ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা।” (তিরমিজি)
তাই আমাদের উচিত প্রথমে নিজের পরিবার ও আত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া। কেউ লজ্জায় মুখ খুলে না—তাদের খুঁজে বের করা আমাদের দায়িত্ব।
ইখলাস: দানের প্রাণ
দান তখনই কবুল হয়, যখন তা ইখলাসের সাথে হয়। আল্লাহ বলেন—
إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا
“আমরা তোমাদেরকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আহার করাই; আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।” (সূরা আল-ইনসান: ৯)
সাহায্য এমনভাবে করতে হবে, যেন ডান হাত যা দেয়—বাম হাতও তা জানতে না পারে। লোক দেখানো দান নয়; বরং গোপনে, সম্মান রক্ষা করে, হৃদয় জয় করে সাহায্য করতে হবে।
কিভাবে সাহায্য করবো?
- সাহরী ও ইফতারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া
- টাকা না দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে দেওয়া
- নিয়মিত খোঁজ নেওয়া ও মানসিক সমর্থন দেওয়া
- সম্মান রক্ষা করে গোপনে সাহায্য করা
- সম্ভব হলে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা
আমাদের সাধ্য অনুযায়ী সামান্য চেষ্টা—কাউকে নতুন জীবন দিতে পারে।
দান বরকত বাড়ায়
অনেকে মনে করেন—দান করলে সম্পদ কমে যাবে। কিন্তু রাসূল ﷺ বলেছেন—
مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ
“দান করলে সম্পদ কমে না।” (মুসলিম)
বরং আল্লাহ তাআলা বরকত বৃদ্ধি করেন, অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে রিযিক দান করেন।
আহ্বান
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, রমজান চলে যায়, কিন্তু সুযোগ চিরকাল থাকে না। আজ যদি আমরা দরিদ্রদের পাশে না দাঁড়াই, কাল হয়তো আফসোস ছাড়া কিছুই থাকবে না।
আসুন, আমরা নিয়ত করি—আমাদের সাধ্য অনুযায়ী সাহায্য করবো। হয় টাকা, নয়তো খাদ্যসামগ্রী। কিন্তু ইখলাসের সাথে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সহানুভূতিশীল হৃদয় দান করুন, আমাদের দান কবুল করুন এবং আমাদেরকে দয়ালু বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।
Comments
Post a Comment