অপচয় রোধ করা: প্রতিটি মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব ও নৈতিক কর্তব্য
অপচয় রোধ করা: প্রতিটি মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব ও নৈতিক কর্তব্য
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
অপচয় রোধ করা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয়—আমাদের দ্বারা যে পরিমাণ অপচয় হয়, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। পানি অপচয়, ভাত অপচয়, বিদ্যুৎ অপচয়, সময় অপচয়—কত কিছুই না আমরা নষ্ট করছি! বিশেষ করে সাহরি ও ইফতারের সময় বহু আইটেম তৈরি করা হয়; কিন্তু দেখা যায়, সামান্য কিছু খাওয়া হয়, বাকিগুলো ফেলে দেওয়া হয়। এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; বরং এটি একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সমস্যা।
১. অপচয় সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অপচয় সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। তিনি বলেন:
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
“তোমরা খাও ও পান কর, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আল-আ'রাফ: ৩১)
এ আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—খাওয়া ও পান করা বৈধ, কিন্তু সীমালঙ্ঘন বা অপচয় হারামসদৃশ কাজ। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না। একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সতর্কতা আর কী হতে পারে?
আরও বলেন:
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ
“নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সূরা আল-ইসরা: ২৭)
এই আয়াতে অপচয়কারীদের তুলনা করা হয়েছে শয়তানের সাথে। কারণ শয়তান অকৃতজ্ঞ, আর অপচয়ও এক ধরনের অকৃতজ্ঞতা—আল্লাহর নেয়ামতের অবমূল্যায়ন।
২. হাদীসের আলোকে অপচয়ের ভয়াবহতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত সংযমী জীবনযাপন করতেন। তিনি অল্প খাবারেই তৃপ্ত থাকতেন এবং অপচয়কে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করতেন।
একবার তিনি ওযু করার সময় একজন সাহাবীকে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে দেখে বললেন:
مَا هَذَا السَّرَفُ؟
“এ কেমন অপচয়?” সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন: “ওযুতেও কি অপচয় আছে?” রাসূল ﷺ বললেন: نَعَمْ، وَإِنْ كُنْتَ عَلَى نَهْرٍ جَارٍ “হ্যাঁ, তুমি যদি প্রবাহিত নদীর তীরেও থাকো তবুও।” (ইবনে মাজাহ)
এ হাদীস প্রমাণ করে—পানি যতই প্রচুর হোক, অপচয় বৈধ নয়।
আরেক হাদীসে এসেছে:
مَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ
“মানুষ তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না।” (তিরমিজি)
অর্থাৎ অতিরিক্ত খাওয়া ও অপচয়—দুটিই অনুচিত।
৩. সাহরি ও ইফতারে অপচয়ের বাস্তব চিত্র
রমযান মাসে আমরা প্রায়ই সাহরি ও ইফতারে নানা রকম খাবার তৈরি করি। ফল, ভাজাপোড়া, মিষ্টান্ন, শরবত—অসংখ্য আইটেম। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নামমাত্র কিছু খাওয়া হয়, বাকিগুলো ফেলে দেওয়া হয়। এটি কেবল অপচয় নয়; বরং রোযার প্রকৃত শিক্ষা থেকে বিচ্যুতি।
রোযা আমাদের শেখায় সংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দরিদ্রের কষ্ট অনুভব করা। অথচ আমরা রোযার মাসেই সবচেয়ে বেশি অপচয় করি!
৪. অপচয়ের আধ্যাত্মিক ক্ষতি
অপচয় মানুষের অন্তরে কঠোরতা সৃষ্টি করে। যখন কেউ আল্লাহর নেয়ামতকে তুচ্ছ করে, তখন তার অন্তর কৃতজ্ঞতা হারায়। কৃতজ্ঞতা হারালে বরকতও হারিয়ে যায়।
আল্লাহ বলেন:
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
“তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে আমি অবশ্যই তোমাদের বৃদ্ধি করে দেব।” (সূরা ইবরাহীম: ৭)
অপচয় কৃতজ্ঞতার বিপরীত। তাই অপচয় বরকত কমিয়ে দেয়।
৫. অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
একদিকে আমরা খাবার ফেলে দিচ্ছি; অন্যদিকে বহু মানুষ না খেয়ে আছে। আমাদের সমাজে দরিদ্র, এতিম ও মিসকীন মানুষ রয়েছে, যারা একবেলা খাবারের জন্য অপেক্ষা করে। অপচয় বন্ধ করলে সেই খাবার তাদের মাঝে বিতরণ করা যেত।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ الَّذِي يَشْبَعُ وَجَارُهُ جَائِعٌ
“সে মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।” (বাইহাকী)
৬. অপচয় রোধে করণীয়
- খাবার পরিকল্পনা করে রান্না করা
- অপ্রয়োজনীয় আইটেম কমানো
- বেঁচে যাওয়া খাবার সংরক্ষণ বা বিতরণ
- ওযু ও গোসলের সময় পানি সংযত ব্যবহার
- বিদ্যুৎ ও সময়ের সঠিক ব্যবহার
এগুলো ছোট ছোট পদক্ষেপ, কিন্তু বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
৭. সময়ের অপচয়: এক অদৃশ্য বিপদ
সময়ও একটি বড় নেয়ামত। রাসূল ﷺ বলেছেন:
نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ
“দুটি নেয়ামত আছে, যার ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত—স্বাস্থ্য ও অবসর সময়।” (সহীহ বুখারী)
অতএব, সময় অপচয়ও এক ধরনের বড় ক্ষতি।
৮. সংযমী জীবনই সুন্নাহ
রাসূল ﷺ এর ঘরে কখনো কখনো মাসের পর মাস চুলা জ্বলত না। তিনি খেজুর ও পানি দিয়ে দিন কাটাতেন। অথচ আমরা বিলাসিতায় ডুবে থেকে অপচয় করছি।
সুন্নাহ হলো পরিমিতি, ভারসাম্য ও সরলতা
অপচয় রোধ করা কেবল অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি ঈমানের অংশ। কুরআন ও হাদীস আমাদের স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছে—অপচয় পরিহার করতে। সাহরি ও ইফতারে সংযম, পানি ব্যবহারে সতর্কতা, সময়ের সদ্ব্যবহার—এসব আমাদের নৈতিক উন্নতির পথ।
আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি—আল্লাহর প্রতিটি নেয়ামতের যথাযথ কদর করবো। অপচয় বর্জন করবো। সংযমী জীবনযাপন করবো। কারণ অপচয়কারীদের আল্লাহ ভালোবাসেন না, আর সংযমীদের জন্য রয়েছে বরকত ও কল্যাণ।
Comments
Post a Comment