তারাবীহ নামাযের গুরুত্ব, ফযীলত ও বিস্তারিত ইলমি আলোচনা
তারাবীহ নামাযের গুরুত্ব, ফযীলত ও বিস্তারিত ইলমি আলোচনা
ভূমিকা
রমাযান মাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এ মাসে ফরয রোযার পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা বিশেষ কিছু নফল ইবাদতের সুযোগ দিয়েছেন, যার মধ্যে তারাবীহ নামায অন্যতম। এটি শুধু একটি নফল নামায নয়; বরং এটি রমাযানের বিশেষ নিদর্শন ও মুসলিম উম্মাহর ঐতিহ্যবাহী ইবাদত।
তারাবীহ শব্দের আভিধানিক অর্থ
তারাবীহ শব্দটি আরবি "ترويحة" শব্দের বহুবচন। এর আভিধানিক অর্থ হলো বিশ্রাম নেওয়া। কারণ সাহাবায়ে কেরাম দীর্ঘ কিরাআতের কারণে প্রতি চার রাকাত পর পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন। সেখান থেকেই এ নামকরণ।
তারাবীহের পারিভাষিক অর্থ
পারিভাষিক অর্থে তারাবীহ হলো রমাযান মাসে ইশার নামাযের পর জামাতের সাথে আদায়কৃত বিশেষ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা নামায, যা সাধারণত ২০ রাকাত আদায় করা হয়।
কুরআনের দলীল
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ
অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে।
আরও বলেন:
وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ
অর্থ: তোমরা আল্লাহর জন্য বিনীতভাবে দাঁড়াও।
এ আয়াতগুলোর মাধ্যমে রমাযানের রোযা ও কিয়ামের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।
হাদীসের দলীল
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
من قام رمضان ايمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه
অর্থ: যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমাযানে কিয়াম করবে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।
এখানে “قام رمضان” দ্বারা তারাবীহ নামাযকে বোঝানো হয়েছে।
২০ রাকাতের প্রমাণ
হযরত উমর (রা.) এর যুগে সাহাবায়ে কেরাম ২০ রাকাত তারাবীহ আদায় করতেন।
عن السائب بن يزيد قال كانوا يقومون على عهد عمر بن الخطاب في شهر رمضان بعشرين ركعة
অর্থ: হযরত উমর (রা.) এর যুগে মানুষ রমাযানে ২০ রাকাত কিয়াম করতেন।
এটি সাহাবায়ে কেরামের ইজমা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।
আট রাকাত বনাম বিশ রাকাত প্রসঙ্গ
কিছু লোক ৮ রাকাতের পক্ষে যুক্তি দেয়। কিন্তু ফিকহী ও ঐতিহাসিকভাবে উম্মাহর ধারাবাহিক আমল ২০ রাকাতের উপর প্রতিষ্ঠিত। চার মাযহাবের ইমামগণ ২০ রাকাতকেই গ্রহণ করেছেন।
চার মাযহাবের অবস্থান
হানাফী: ২০ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।
মালেকী: ২০ বা তার বেশি।
শাফেয়ী: ২০ রাকাত।
হাম্বলী: ২০ রাকাত।
তারাবীহের ফযীলত
১. গুনাহ মাফ হয়।
২. জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ হয়।
৩. কুরআন শ্রবণের সওয়াব পাওয়া যায়।
৪. রমাযানের বরকত পূর্ণতা পায়।
তারাবীহ অবহেলার ক্ষতি
তারাবীহ ত্যাগ করা উচিত নয়। এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। নিয়মিত পরিত্যাগ করা গুনাহের কাছাকাছি।
ফেতনা থেকে বাঁচা
রমাযান ঐক্যের মাস। ৮ বা ২০ নিয়ে বিতর্কে না জড়িয়ে উম্মাহর ঐতিহ্য অনুসরণ করা উত্তম। ফেতনা সৃষ্টি করা হারাম।
রাসূল (সা.) বলেন:
المسلم اخو المسلم لا يظلمه ولا يخذله
অর্থ: মুসলমান মুসলমানের ভাই।
তারাবীহ আদায়ের পদ্ধতি
১. ইশার ফরয ও সুন্নাত আদায়ের পর শুরু।
২. দুই রাকাত করে ২০ রাকাত।
৩. প্রতি চার রাকাত পর বিশ্রাম।
৪. শেষে বিতর নামায।
জামাতে পড়ার গুরুত্ব
রাসূল (সা.) বলেন:
من قام مع الامام حتى ينصرف كتب له قيام ليلة
অর্থ: যে ব্যক্তি ইমামের সাথে শেষ পর্যন্ত দাঁড়াবে, তার জন্য পূর্ণ রাতের কিয়ামের সওয়াব লেখা হবে।
নারীদের জন্য মাসআলা
নারীরা ঘরে তারাবীহ পড়তে পারে। জামাতে যাওয়া বৈধ তবে ঘরে পড়া উত্তম।
কুরআন খতমের মাসআলা
তারাবীহে এক খতম কুরআন করা সুন্নাত। তবে দীর্ঘ করলে মুসল্লিদের কষ্ট দেওয়া উচিত নয়।
নিয়তের মাসআলা
নিয়ত অন্তরের বিষয়। মুখে উচ্চারণ জরুরি নয়।
তারাবীহ নামায রমাযানের সৌন্দর্য। এটি অবহেলা করা উচিত নয়। আগ্রহ ও ইচ্ছার সাথে ২০ রাকাত আদায় করা উম্মাহর ঐতিহ্য। ফেতনায় না পড়ে ঐক্য বজায় রেখে ইবাদতে মনোযোগী হওয়াই মুমিনের দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রমাযানের পূর্ণ বরকত লাভের তাওফীক দান করুন। আমীন।
Comments
Post a Comment