নিয়তের সংশোধন (تَصْحِيحُ النِّيَّةِ) ও ইখলাস (الإخلاص) – ইসলামের আলোকে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা
নিয়তের সংশোধন (تَصْحِيحُ النِّيَّةِ) ও ইখলাস (الإخلاص) – ইসলামের আলোকে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
ইসলামে মানুষের প্রতিটি কাজের ভিত্তি হলো নিয়ত (نية)। নিয়ত ছাড়া কোনো ইবাদত গ্রহণযোগ্য নয়, বরং দুনিয়ার সাধারণ কাজও সওয়াবের কাজে পরিণত হয় সঠিক নিয়তের মাধ্যমে। নিয়তের সাথে জড়িত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইখলাস (الإخلاص) — অর্থাৎ কাজটি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা।
১. নিয়তের সংজ্ঞা
আরবি “نية” শব্দের অর্থ হলো ইচ্ছা, সংকল্প, অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য। ইসলামী শরীয়তে নিয়ত বলতে বোঝায়—কোনো কাজ করার আগে অন্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য স্থির করা।
নিয়ত মুখে বলা জরুরি নয়; এটি অন্তরের বিষয়। তবে অন্তরের এই সংকল্পই একটি কাজকে ইবাদত বানায় বা নিছক দুনিয়াবি কাজে পরিণত করে।
২. হাদিসে নিয়তের গুরুত্ব
প্রথম হাদিস: ইসলামের মৌলিক নীতি
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى
(সহিহ বুখারি ও মুসলিম) অর্থ: “নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল; প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।”
এই হাদিসকে ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ইসলামের এক-তৃতীয়াংশ বলেছেন। কারণ দীন মানে—কথা, কাজ ও অন্তর—এই তিনটির সমন্বয়। নিয়ত হলো অন্তরের কাজ।
৩. কুরআনে ইখলাসের শিক্ষা
১. একমাত্র আল্লাহর জন্য কাজ
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ
(সূরা البينة 98:5) অর্থ: “তাদেরকে আদেশ করা হয়েছে শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে, তাঁর জন্য দীনকে খাঁটি রেখে।”
২. রিয়া থেকে সতর্কতা
فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ
(সূরা الماعون 107:4-6) অর্থ: “ধ্বংস তাদের জন্য যারা নামাজ পড়ে কিন্তু লোক দেখানোর জন্য পড়ে।”
এখানে বোঝানো হয়েছে—নামাজের মতো ইবাদতও যদি লোক দেখানোর জন্য হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. নিয়ত ছাড়া কাজের অবস্থা
নিয়ত না থাকলে:
- ইবাদত শুদ্ধ হয় না
- সওয়াব পাওয়া যায় না
- কখনও গুনাহ হতে পারে (যদি রিয়া থাকে)
কিন্তু সহিহ নিয়ত থাকলে সাধারণ কাজও ইবাদতে পরিণত হয়। যেমন: ঘুমানো—যদি নিয়ত হয় শক্তি অর্জন করে আল্লাহর ইবাদত করা।
৫. কাজ না করলেও সওয়াব পাওয়া যায়
রাসূল ﷺ বলেছেন:
إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ أَوْ سَافَرَ كُتِبَ لَهُ مَا كَانَ يَعْمَلُ مُقِيمًا صَحِيحًا
(সহিহ বুখারি) অর্থ: “কোন বান্দা অসুস্থ বা সফরে থাকলে, সুস্থ ও স্থায়ী অবস্থায় যা করত, তা তার জন্য লিখে দেওয়া হয়।”
অর্থাৎ, নিয়ত থাকলে কাজ করতে না পারলেও সওয়াব পাওয়া যায়।
৬. নিয়তের ফায়দা
১. আমলের মূল্য বৃদ্ধি
ছোট কাজ বড় সওয়াবে রূপ নেয়।
২. দুনিয়াবি কাজ ইবাদতে রূপান্তর
খাওয়া, ঘুম, পড়াশোনা—সব ইবাদত হতে পারে।
৩. অন্তরের পরিশুদ্ধি
নিয়ত সংশোধন আত্মাকে শুদ্ধ করে।
৪. আল্লাহর সাহায্য লাভ
খাঁটি নিয়ত আল্লাহর সাহায্য টেনে আনে।
৭. ইখলাস কী?
ইখলাস মানে—কাজটি শুধু আল্লাহর জন্য করা, কারো প্রশংসা বা দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য নয়।
قُلِ اللَّهَ أَعْبُدُ مُخْلِصًا لَّهُ دِينِي
(সূরা الزمر 39:14) অর্থ: “বলুন, আমি আল্লাহর ইবাদত করি তাঁর জন্য দীনকে খাঁটি রেখে।”
৮. নিয়ত সংশোধনের উপায়
- কাজের আগে নিজেকে প্রশ্ন করা: আমি কার জন্য করছি?
- নিয়মিত দোয়া করা
- রিয়া থেকে বাঁচার চেষ্টা
- আখিরাত স্মরণ করা
দোয়া:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ عَمَلِي خَالِصًا لِوَجْهِكَ
৯. নিয়তের প্রকারভেদ
- ইবাদতের নিয়ত (নামাজ, রোজা)
- মুয়ামালাতের নিয়ত (ব্যবসা, কাজ)
- মুবাহ কাজের নিয়ত (ঘুম, খাওয়া)
১০. শেষ কথা
নিয়ত ইসলামের প্রাণ। প্রত্যেক কাজের শুরুতে সহিহ নিয়ত করা জরুরি। কারণ নিয়তই নির্ধারণ করে কাজটি গ্রহণযোগ্য হবে কি না।
আমরা যেন সব কাজে অন্তরে বলি—
إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
(সূরা الأنعام 6:162) অর্থ: “নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য।”
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহিহ নিয়ত ও ইখলাস দান করুন। আমীন।
Comments
Post a Comment