আল্লাহর ভালোবাসা কীভাবে অর্জন করা যায় এবং তিনি আমাদের কত নিকটবর্তী

আল্লাহর ভালোবাসা কীভাবে অর্জন করা যায় এবং তিনি আমাদের কত নিকটবর্তী 

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

 আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। 

 সমস্ত প্রশংসা সেই মহান রব আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, রিজিক দিয়েছেন, হিদায়াত দিয়েছেন এবং আমাদেরকে তাঁর ভালোবাসা অর্জনের সুযোগ দিয়েছেন। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর। আজকের আলোচনার বিষয় — আল্লাহর ভালোবাসা কীভাবে অর্জন করা যায়, তিনি আমাদের কতটুকু নিকটবর্তী, এবং বান্দা এক হাত এগিয়ে এলে আল্লাহ কিভাবে বহু গুণ এগিয়ে আসেন। আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা একজন মুমিনের সর্বোচ্চ কামনা হওয়া উচিত। কারণ আল্লাহ যদি কাউকে ভালোবাসেন, তবে সে ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতে সফল। আল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদের ভালোবাসেন। (সূরা বাকারা ২:২২২) এ আয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহর ভালোবাসা পেতে হলে প্রথম কাজ হলো তওবা। মানুষ ভুল করবে, গুনাহ করবে — এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে বান্দা ভুলের পর ফিরে আসে, কান্না করে, ক্ষমা চায় — আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। আল্লাহ আরো বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান ৩:৭৬) তাকওয়া মানে আল্লাহকে ভয় করা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা, গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে স্মরণ করা। যে ব্যক্তি তার জীবনে তাকওয়া আনে, সে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হয়ে যায়। আরো বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। (সূরা বাকারা ২:১৯৫) অতএব, তওবা, তাকওয়া ও ইহসান — এই তিনটি গুণ আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের প্রধান মাধ্যম। এখন প্রশ্ন — আল্লাহ আমাদের কত নিকটবর্তী? আল্লাহ বলেন:
وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
অর্থ: আমি তার গ্রীবাধমনী থেকেও নিকটবর্তী। (সূরা কাফ ৫০:১৬) এই আয়াত আমাদের হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়। আমরা মনে করি আল্লাহ অনেক দূরে। অথচ তিনি আমাদের রক্তনালীর চেয়েও নিকটবর্তী। তিনি আমাদের চিন্তা জানেন, আমাদের কষ্ট জানেন, আমাদের চোখের অশ্রু দেখেন। আরো বলেন:
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ
অর্থ: যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আমি তো নিকটবর্তী। (সূরা বাকারা ২:১৮৬) এখানে আল্লাহ নিজেই বলছেন — আমি নিকটবর্তী। তিনি দূরের কোনো স্রষ্টা নন; তিনি বান্দার ডাকে সাড়া দেন। এখন আসি সেই বিখ্যাত হাদীসে, যেখানে আল্লাহর রহমত ও ভালোবাসার প্রকাশ সবচেয়ে সুন্দরভাবে এসেছে। রাসূল ﷺ বলেন, আল্লাহ তা’আলা বলেন:
مَنْ تَقَرَّبَ إِلَيَّ شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا، وَمَنْ تَقَرَّبَ إِلَيَّ ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ بَاعًا، وَمَنْ أَتَانِي يَمْشِي أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً
অর্থ: যে বান্দা আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। সে এক হাত এগিয়ে এলে আমি দুই হাত এগিয়ে যাই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) সুবহানাল্লাহ! এখানে বোঝানো হয়েছে, আল্লাহ আমাদের থেকে দূরে সরে থাকেন না। বরং বান্দা একটু চেষ্টা করলেই আল্লাহ তার প্রতি বহুগুণ অনুগ্রহ করেন। আল্লাহ শাস্তি দিতে পছন্দ করেন না। তিনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। কুরআনে বলেন:
مَا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِن شَكَرْتُمْ وَآمَنتُمْ
অর্থ: তোমরা যদি কৃতজ্ঞ হও ও ঈমান আনো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের শাস্তি দিয়ে কী করবেন? (সূরা নিসা ৪:১৪৭) এ আয়াত স্পষ্ট জানিয়ে দেয় — আল্লাহ শাস্তি দেওয়ার জন্য উদগ্রীব নন। তিনি চান বান্দা ঈমান আনুক, কৃতজ্ঞ হোক। আরেক হাদীসে এসেছে:
إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي
অর্থ: নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর প্রাধান্য লাভ করেছে। (সহিহ বুখারি) অর্থাৎ আল্লাহর দয়া তাঁর শাস্তির চেয়ে অধিক। সুতরাং আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথ হলো — তওবা, নামাজ, দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত, মানুষের হক আদায়, হারাম থেকে বেঁচে থাকা, এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা। যে বান্দা রাতে উঠে দুই রাকাত নফল পড়ে কান্না করে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। যে বান্দা গোপনে দান করে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। যে বান্দা পাপ থেকে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। সবশেষে আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ حُبَّكَ وَحُبَّ مَنْ يُحِبُّكَ وَحُبَّ عَمَلٍ يُقَرِّبُنِي إِلَى حُبِّكَ
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার ভালোবাসা চাই, যারা আপনাকে ভালোবাসে তাদের ভালোবাসা চাই, এবং এমন আমল চাই যা আমাকে আপনার ভালোবাসার নিকটবর্তী করবে। (তিরমিযি) আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমাদেরকে তাঁর নিকটবর্তী করুন। আমরা যেন এক হাত এগিয়ে এসে তাঁর অসীম রহমত লাভ করতে পারি। وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি