আমলের সৌন্দর্য: ইখলাস, সুন্নাহ ও ইহসানের আলোকে সফল জীবনের পথ
আমলের সৌন্দর্য: ইখলাস, সুন্নাহ ও ইহসানের আলোকে সফল জীবনের পথ
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا (سورة الكهف: 107)
আমলের সৌন্দর্য তখনই আসে, যখন তা ইখলাস ও সুন্দর নিয়তের সাথে সম্পাদিত হয়। ইখলাস মানে—শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা। মানুষের প্রশংসা, দুনিয়ার লাভ, নাম-খ্যাতি—এসব উদ্দেশ্য যেন অন্তরে স্থান না পায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى (متفق عليه)
এই হাদীস প্রমাণ করে, আমলের মূল্য নির্ভর করে নিয়তের উপর। একই কাজ দুই ব্যক্তি করলে একজন সওয়াব পেতে পারে, অন্যজন কিছুই পায় না—কারণ নিয়ত ভিন্ন।
আমল কত প্রকার? উলামায়ে কেরাম আমলকে বিভিন্নভাবে ভাগ করেছেন। একটি সাধারণ বিভাজন হলো:
- ফরজ আমল – যেমন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, রমজানের রোজা, যাকাত, হজ।
- ওয়াজিব আমল – কিছু মতানুসারে বিতর নামাজ ইত্যাদি।
- সুন্নত আমল – রাসূল ﷺ এর নিয়মিত আমল।
- নফল আমল – অতিরিক্ত ইবাদত, যা করলে সওয়াব, না করলে গুনাহ নেই।
- মুস্তাহাব ও মুবাহ কাজ – যা সৎ নিয়তের মাধ্যমে ইবাদতে রূপ নিতে পারে।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, মুবাহ কাজও যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা সওয়াবের কাজ হয়ে যায়। যেমন—ঘুমানো যদি শক্তি অর্জনের জন্য হয় যেন ইবাদত করা যায়, তবে সেটিও ইবাদত।
আমলের সৌন্দর্য কীভাবে আসবে? প্রথমত, ইলম অর্জন করতে হবে। অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় মানুষ বিদআত বা ভুল আমল করে। তাই কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে আমল করতে হবে।
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ (سورة محمد: 19)
দ্বিতীয়ত, ইখলাস। আল্লাহ বলেন:
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ (سورة البينة: 5)
তৃতীয়ত, সুন্নাহ অনুসরণ। আমল তখনই কবুল হবে যখন তা রাসূল ﷺ এর তরীকা অনুযায়ী হবে। তিনি বলেন:
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ (رواه مسلم)
অর্থাৎ, যে কাজ আমাদের পদ্ধতি অনুযায়ী নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।
রাসূল ﷺ কীভাবে আমল করতেন? তিনি ছিলেন আমলে সবচেয়ে অগ্রগামী। তাঁর রাতের তাহাজ্জুদ এত দীর্ঘ হতো যে পা ফুলে যেত। যখন জিজ্ঞেস করা হলো, কেন এত কষ্ট করেন, তিনি বললেন:
أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا (متفق عليه)
তিনি অল্প আমলেও ধারাবাহিকতা পছন্দ করতেন। তিনি বলেছেন:
أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ (متفق عليه)
অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো যা নিয়মিত, যদিও তা অল্প হয়।
বেশি বেশি আমল কীভাবে করা যায়?
- সময়ের সঠিক ব্যবহার করা।
- অপ্রয়োজনীয় কাজ পরিহার করা।
- সৎ সঙ্গ গ্রহণ করা।
- নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত।
- দৈনিক যিকিরের অভ্যাস।
আমলের মধ্যে “ইহসান” কী? ইহসান মানে—এমনভাবে ইবাদত করা যেন তুমি আল্লাহকে দেখছো, আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত বিশ্বাস করা যে তিনি তোমাকে দেখছেন।
أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ (رواه مسلم)
ইহসান আমলের সর্বোচ্চ স্তর। এটি আমলকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। তখন নামাজ শুধু দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহর সাথে অন্তরের সংলাপ হয়ে যায়। দান শুধু সাহায্য নয়, বরং আখিরাতের বিনিয়োগ হয়ে যায়।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন: “العمل بغير إخلاص ولا اقتداء كالمسافر يملأ جرابه رملًا” — ইখলাস ও সুন্নাহ ছাড়া আমল সেই পথিকের মতো, যে তার ব্যাগে বালি ভরে—যা কোনো উপকারে আসে না।
আমাদের উচিত প্রতিদিন নিজের আমল পর্যালোচনা করা। হযরত উমর (রাঃ) বলেছেন: “حاسبوا أنفسكم قبل أن تحاسبوا” — হিসাবের আগে নিজেদের হিসাব নাও।
সবশেষে, আমলের সৌন্দর্য আসে অন্তরের বিশুদ্ধতা থেকে। যদি অন্তর পরিষ্কার হয়, নিয়ত সঠিক হয়, সুন্নাহ অনুসরণ করা হয় এবং ইহসানের চেতনা থাকে—তবে ছোট আমলও আল্লাহর কাছে বিশাল হয়ে যায়।
আমাদের দোয়া হওয়া উচিত:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ أَعْمَالَنَا كُلَّهَا صَالِحَةً، وَلِوَجْهِكَ خَالِصَةً، وَلَا تَجْعَلْ لِأَحَدٍ فِيهَا شَيْئًا
হে আল্লাহ, আমাদের সমস্ত আমলকে সৎ বানিয়ে দিন, আপনার সন্তুষ্টির জন্য খালেস বানিয়ে দিন, এবং তাতে কারো জন্য কোনো অংশ রাখবেন না।
Comments
Post a Comment