ঈমানের শক্তি আলোচনা
ঈমান মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। এটি শুধু একটি বিশ্বাস নয়, বরং হৃদয়ের গভীরে স্থির হয়ে থাকা এক নূর, যা মানুষের চিন্তা, কাজ, সিদ্ধান্ত ও চরিত্রকে পরিচালিত করে। ঈমান মানে আল্লাহ তাআলার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, আখিরাত এবং তাকদীরের প্রতি অবিচল আস্থা রাখা। যখন এই বিশ্বাস অন্তরে প্রবেশ করে, তখন তা মানুষের জীবনকে পরিবর্তন করে দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ (سورة الأنفال: 2)
অর্থাৎ, প্রকৃত মুমিন তারা, যাদের সামনে আল্লাহর কথা বলা হলে তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, যখন তাঁর আয়াত পাঠ করা হয় তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে।
এ আয়াত আমাদের বুঝিয়ে দেয়—ঈমানের শক্তি অন্তরে অনুভূত হয়। এটি মানুষের অন্তরকে নরম করে, চোখে অশ্রু আনে, পাপ থেকে ফিরিয়ে আনে এবং সৎ পথে পরিচালিত করে। ঈমান মানুষকে ভয়হীন করে তোলে, কারণ সে জানে—আল্লাহ তার সাথে আছেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ شُعْبَةً، أَعْلَاهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ، وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ (رواه مسلم)
ঈমানের শক্তি এমন যে, এটি শুধু মুখের স্বীকারোক্তি নয়; এটি আচরণে প্রকাশ পায়। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াও ঈমানের অংশ। অর্থাৎ, মানুষের উপকার করা, লজ্জাশীল হওয়া, ভালো চরিত্র ধারণ করা—এসবই ঈমানের ফল।
ঈমানের শক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এটি মানুষকে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য শেখায়। দুনিয়ার ঝড়-ঝাপটার মাঝেও যে ব্যক্তি ঈমানদার, সে স্থির থাকে। কষ্টে সে ধৈর্য ধারণ করে, সুখে সে শোকর আদায় করে। সে জানে সব কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে।
আল্লাহ বলেন:
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ (سورة التغابن: 11)
যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তার অন্তরকে হিদায়াত দেন। অর্থাৎ, ঈমানের শক্তি অন্তরকে শান্ত করে, বিভ্রান্তি দূর করে, হতাশা দূর করে।
কখন বুঝব আমার ভিতরে ঈমান আছে? যখন নামাজ পড়তে ভালো লাগে, কুরআন তিলাওয়াত করলে হৃদয় নরম হয়, গুনাহ করলে অনুতাপ হয়, অন্যায় করলে লজ্জা লাগে—তখন বুঝতে হবে ঈমান জীবিত আছে। যখন একা থাকলেও পাপ করতে ভয় লাগে—এটাই ঈমানের প্রমাণ।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَنْ سَرَّتْهُ حَسَنَتُهُ وَسَاءَتْهُ سَيِّئَتُهُ فَذَلِكَ الْمُؤْمِنُ (رواه الترمذي)
যার ভালো কাজ তাকে আনন্দ দেয় এবং খারাপ কাজ তাকে কষ্ট দেয়—সে-ই প্রকৃত মুমিন। এই হাদীস আমাদের ঈমান পরিমাপের মানদণ্ড শিখিয়ে দেয়।
আর কখন বুঝব ঈমান দুর্বল বা নেই? যখন নামাজ কষ্টকর মনে হয়, গুনাহ করতে ভয় লাগে না, আল্লাহর স্মরণে হৃদয় নরম হয় না, দুনিয়ার বিষয়ই বড় মনে হয়—তখন বুঝতে হবে ঈমান দুর্বল হয়ে গেছে। তখন তওবা করা, ইস্তিগফার করা, সৎ কাজ বৃদ্ধি করা জরুরি।
ঈমান বাড়ে ও কমে—এটি আহলে সুন্নাহর আকীদা। নেক আমলের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়, আর গুনাহের মাধ্যমে কমে যায়। তাই ঈমান রক্ষা করা সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
ঈমানের শক্তি মানুষকে মৃত্যুভয় থেকে মুক্ত করে। কারণ সে জানে মৃত্যু শেষ নয়; বরং আখিরাতের সূচনা। সে জানে জান্নাত আছে, জাহান্নাম আছে, হিসাব আছে। তাই সে নিজেকে প্রস্তুত করে।
আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ (سورة آل عمران: 102)
এই আয়াত আমাদের শেখায়—ঈমান নিয়ে বাঁচতে হবে, ঈমান নিয়েই মরতে হবে।
অতএব, ঈমানের শক্তি হলো অন্তরের আলো, যা মানুষকে আল্লাহর দিকে টেনে নিয়ে যায়। এটি চরিত্র গঠন করে, সমাজকে সুন্দর করে, মানুষকে সত্যবাদী, আমানতদার ও দয়ালু বানায়। ঈমান ছাড়া মানুষ বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী হলেও ভেতরে দুর্বল থাকে। আর ঈমান থাকলে বাহ্যিক দারিদ্র্য থাকলেও অন্তর থাকে প্রশান্ত।
আমাদের উচিত নিয়মিত দোয়া করা:
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ (رواه الترمذي)
হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির রাখুন।
শেষ কথা—ঈমান কোনো দাবির বিষয় নয়; এটি প্রমাণের বিষয়। আমাদের নামাজ, চরিত্র, কথা, আচরণ—সবকিছুই সাক্ষ্য দেবে আমাদের ঈমানের। তাই নিজেকে প্রতিদিন প্রশ্ন করি—আজ আমার ঈমান কি বেড়েছে, না কমেছে?
Comments
Post a Comment