বিরতিতে আমার নেযামুল আউকাত
বিরতিতে আমার নেযামুল আউকাত
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি
একটি সুশৃঙ্খল দ্বীনী ও চিন্তাশীল জীবনের প্রতিচ্ছবিমানুষের জীবনে সময় হলো আল্লাহ তাআলার এক মহান আমানত। এই আমানতের সঠিক ব্যবহারই মানুষকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেয়, আর অবহেলাই তাকে ধ্বংসের অতলে নিক্ষেপ করে। বিশেষ করে একজন তালেবে ইলমের জীবনে সময়ের মূল্য আরও বেশি। কারণ তার প্রতিটি মুহূর্ত শুধু তার নিজের জন্য নয়, বরং জাতি, উম্মাহ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই উপলব্ধি থেকেই আমি আমার বিরতির সময়গুলোকে এলোমেলোভাবে কাটাই না; বরং একটি সুস্পষ্ট, নির্ধারিত ও নিয়মতান্ত্রিক নেযামুল আউকাতের মাধ্যমে আমার দিনগুলো পরিচালনা করি।
আমার দিনের সূচনা হয় ফজরের আগেই। ঘড়ির কাঁটা যখন এখনও ভোরের নীরবতা আঁকড়ে ধরে রাখে, তখনই আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি। এই সময়টাকে আমি আল্লাহর সাথে একান্ত সম্পর্ক গড়ে তোলার সর্বোত্তম সময় হিসেবে বিবেচনা করি। ফজরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করার আগে তিন তাসবিহ পাঠ করি—যা আমার হৃদয়কে প্রশান্ত করে, মনকে স্থির করে এবং দিনব্যাপী কাজের জন্য আত্মাকে প্রস্তুত করে তোলে।
এরপর শুরু হয় কুরআনের সাথে আমার দিনের প্রথম গভীর সংযোগ। ফজরের নামাজ শেষে আমি নিয়মিত দুই পারা কুরআন তেলাওয়াত করি। এই তেলাওয়াত শুধু ঠোঁটের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আয়াতের অর্থ, বার্তা ও হেদায়াত হৃদয়ে ধারণ করার চেষ্টা করি। কুরআনের আলোয় আমার চিন্তা, পরিকল্পনা ও কর্মকে শুদ্ধ করার এই প্রচেষ্টা আমাকে সারাদিন এক ভিন্ন রকম প্রশান্তি ও দৃঢ়তা দেয়।
তেলাওয়াত শেষে আমি আমার ভাই-বোনদের পড়াশোনায় মনোযোগ দিই। তাদের খাতায় বিভিন্ন প্রশ্ন লিখে দিই, পাঠ বুঝিয়ে দিই এবং উত্তরগুলো যাচাই করি। এই সময়টা শুধু পড়ানো নয়; বরং আদর্শ গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সকাল আটটা পর্যন্ত এই দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে আদায় করি। এতে তাদের পড়াশোনার অগ্রগতি যেমন হয়, তেমনি আমার মাঝেও দায়িত্ববোধ ও ধৈর্যের চর্চা ঘটে।
সকাল আটটা থেকে নয়টা—এই এক ঘণ্টা সম্পূর্ণভাবে লেখালেখির জন্য নির্ধারিত। এই সময়ে আমি আমার চিন্তা, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে কলমের মাধ্যমে প্রকাশ করি। কখনো দ্বীনী প্রবন্ধ, কখনো নসীহত, কখনো সমাজ-সংস্কারমূলক লেখা—বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য থাকলেও লক্ষ্য একটাই: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানুষের উপকার সাধন।
এরপর নাস্তা করে আমি ল্যাপটপের সামনে বসি। সকাল নয়টা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত এই সময়টুকু আমার জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীল কাজের মূল ভিত্তি। আগে লেখাগুলো গুছিয়ে নেই, সম্পাদনা করি, প্রিন্ট করি এবং অনলাইনে বিভিন্ন কিতাব ও প্রামাণ্য গ্রন্থ পাঠ করি। এই সময়টায় আমি নিজেকে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করি—যেন জ্ঞান কখনো স্থবির না হয়ে যায়।
দুপুরের দিকে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে যোহরের নামাজের প্রস্তুতি নিই। যোহরের নামাজ আদায়ের পর বাড়িতে এসে আহার করি এবং কিছু সময় বিশ্রাম নেই। এই কায়লুলা বা দুপুরের ঘুম আমাকে পরবর্তী সময়ের কাজের জন্য নতুন শক্তি ও সতেজতা দান করে।
আসরের আগমুহূর্তে ঘুম থেকে উঠে নামাজের প্রস্তুতি নিই। আসরের নামাজ শেষে মাগরিব পর্যন্ত সময়টুকু আমি বাইরে কাটাই। বন্ধুদের সাথে হালকা হাঁটাচলা করি, তবে এই সময়টাও উদ্দেশ্যহীন নয়। তাদেরকে হাতে-কলমে ওযু করার নিয়ম, কুরআন তেলাওয়াতের শুদ্ধ পদ্ধতি এবং ইসলামের প্রাথমিক বিষয়গুলো শেখানোর চেষ্টা করি। এই ছোট ছোট প্রচেষ্টাগুলোই সমাজে দ্বীনের আলো ছড়ানোর মাধ্যম হয়ে ওঠে।
মাগরিবের নামাজের পর আবার ভাই-বোনদের পড়াশোনায় মনোযোগ দিই। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিত—এই দুই বিষয়ে তাদেরকে গুরুত্ব সহকারে পড়াই। কারণ আমি বিশ্বাস করি, দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই একজন সচেতন মুসলমানের বৈশিষ্ট্য।
ইশার আযান হলে মসজিদে চলে যাই। নামাজ আদায় করে বাড়িতে ফিরে রাতের খাবার খাই। পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমার দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়—রাতের লেখালেখি। রাত বারোটা পর্যন্ত আমি লেখায় ডুবে থাকি। আগে থেকেই আমার খাতায় বিভিন্ন বিষয় শিরোনাম আকারে লেখা থাকে। সেই শিরোনাম অনুযায়ী আমি একে একে লেখাগুলো সম্পন্ন করি।
এই পুরো দিনটি একটি নির্দিষ্ট ছকের মধ্যে আবদ্ধ। প্রতিটি কাজের জন্য নির্ধারিত সময় আছে, নির্ধারিত দায়িত্ব আছে। আমি সচেতনভাবে সময়ের ব্যতিক্রম এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কখনো যদি সামান্য এদিক-সেদিক হয়েও যায়, তবুও মূল নিয়মের বাইরে যাই না। এই শৃঙ্খলাই আমাকে তেলাওয়াত, মুতালাআ, লেখালেখি, পারিবারিক খেদমত, সামাজিক দাওয়াত এবং আত্মশুদ্ধির সবগুলো দিক একসাথে বজায় রাখতে সাহায্য করে।
বাজারে যাওয়া, পরিবারের কাজ, মসজিদে মুসল্লিদের সাথে সময় কাটানো, এলাকার যুবকদের নিয়ে ইসলামের কথা বলা—সবকিছুই এই নেযামুল আউকাতের মধ্যেই সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়ে যায়। এতে করে আমার দিনগুলো শুধু ব্যস্তই নয়, বরং অর্থবহ ও ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে।
আমি বিশ্বাস করি, নিয়মতান্ত্রিক জীবনই একজন তালেবে ইলমকে প্রকৃত অর্থে গড়ে তোলে। সময়ের শৃঙ্খলা, নিয়মের প্রতি আনুগত্য এবং আল্লাহর উপর নির্ভরতা—এই তিনটি যদি একত্রে থাকে, তবে বিরতির সময়ও ইলমের পথে অগ্রযাত্রা থেমে থাকে না; বরং আরও সুদৃঢ় হয়।
Comments
Post a Comment