শুদ্ধ ভাষায় কথা বলার গুরুত্ব, উপকারিতা ও শেখার কার্যকর পদ্ধতি
শুদ্ধ ভাষায় কথা বলার গুরুত্ব, উপকারিতা ও শেখার কার্যকর পদ্ধতি
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
আজ আমরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি— কথা বলার শুদ্ধতা ও সৌন্দর্য।
মানুষের জীবনে কথা এমন একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা অনেক সময় কাজের থেকেও বেশি প্রভাব বিস্তার করে। কারণ কাজ চোখে দেখা যায়, কিন্তু কথা সরাসরি অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে। একটি সুন্দর, মার্জিত ও শুদ্ধ কথা মানুষের হৃদয়ে দাগ কাটে, সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সম্মান ও মর্যাদার আসন তৈরি করে।
কথার শক্তি ও প্রভাব
মানুষের সমাজে পরিচিতি, গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মান—এই তিনটির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে তার কথা বলার ধরন। একজন মানুষ হয়তো খুব বেশি শিক্ষিত নন, কিন্তু যদি তিনি সুন্দরভাবে কথা বলতে জানেন, তাহলে মানুষ তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে।
আবার অন্যদিকে, কেউ হয়তো জ্ঞানী ও দক্ষ, কিন্তু তার ভাষা যদি অশুদ্ধ, এলোমেলো ও আক্রমণাত্মক হয়, তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়।
গ্রাম্য ভাষা বনাম শুদ্ধ ভাষা
গ্রাম্য ভাষা বা নিজ এলাকার ভাষায় কথা বলা কোনো দোষের বিষয় নয়। বরং এটি আমাদের শিকড়, পরিচয় ও সংস্কৃতির অংশ। পরিবার, ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে কথোপকথনে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু সমস্যা তখনই হয়, যখন আমরা প্রয়োজনের জায়গায়ও অশুদ্ধ ও এলোমেলো ভাষা ব্যবহার করি— যেমন: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, দাওয়াহমূলক আলোচনায়, জনসম্মুখে বক্তব্যে, অফিস-আদালতে বা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে।
শুদ্ধ ভাষায় কথা বলার উপকারিতা
- মানুষের কাছে সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়
- কথা সহজে ও স্পষ্টভাবে পৌঁছে যায়
- ভুল বোঝাবুঝি কমে যায়
- ব্যক্তিত্ব আরও আকর্ষণীয় হয়
- দাওয়াহ ও উপদেশ বেশি কার্যকর হয়
- আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়
অশুদ্ধ ভাষার ক্ষতিকর দিক
অশুদ্ধ ও অগোছালো ভাষা আমাদের জন্য নানাবিধ অপকার বয়ে আনে। যেমন—
- মানুষ আমাদের কথা গুরুত্ব সহকারে নেয় না
- অনেক সময় আমরা লজ্জিত ও বিব্রত হই
- কথার ভুল অর্থ তৈরি হয়
- ব্যক্তিত্বের মান কমে যায়
- দাওয়াহ ও নসিহত ব্যর্থ হয়ে যায়
শুদ্ধ ভাষায় কথা বলার টেকনিক
১. ধীরে ও পরিষ্কারভাবে কথা বলা
দ্রুত কথা বললে উচ্চারণ নষ্ট হয়। ধীরে, স্পষ্ট ও ঠান্ডা মাথায় কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
২. উচ্চারণ শুদ্ধ করা
প্রতিটি শব্দের সঠিক উচ্চারণ শিখতে হবে। প্রয়োজনে অভিধান, ইউটিউব বা অডিও ক্লিপের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
৩. বইয়ের ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক গড়া
নিয়মিত বই পড়লে ভাষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিশীলিত হয়। বিশেষ করে প্রবন্ধ, সাহিত্য ও মানসম্মত লেখালেখি।
৪. আয়নার সামনে অনুশীলন
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার অনুশীলন করলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং ভুল ধরা পড়ে।
৫. লজ্জাকে ভেঙে ফেলতে হবে
প্রথম দিকে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে লজ্জা লাগতেই পারে। কিন্তু এই লজ্জাই আমাদের উন্নতির সবচেয়ে বড় বাধা।
শুদ্ধ ভাষা শেখার উপায়
- নিয়মিত মানসম্মত বক্তৃতা শোনা
- শুদ্ধ বাংলা সংবাদ শোনা
- নিজের কথা রেকর্ড করে শোনা
- ভুল হলে সংশোধন গ্রহণ করা
- ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা
ইসলামের দৃষ্টিতে সুন্দর ভাষা
ইসলাম সুন্দর ভাষা ব্যবহারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন সর্বোত্তম ভাষাভঙ্গির অধিকারী। তিনি কখনো অশ্লীল, কটু বা অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করতেন না।
সুতরাং একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের ভাষাও হওয়া উচিত মার্জিত, শালীন ও হৃদয়গ্রাহী।
শেষ কথা,,
শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা কোনো জন্মগত প্রতিভা নয়— এটি একটি অর্জিত দক্ষতা।
চেষ্টা, অনুশীলন ও আল্লাহর তাওফিকের মাধ্যমে যে কেউ শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারে। আজ যদি আমরা সিদ্ধান্ত নিই, ইনশাআল্লাহ আগামীকাল থেকেই পরিবর্তন আসবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্দর, শুদ্ধ ও প্রভাবশালী ভাষায় কথা বলার তাওফিক দান করুন। আমীন।
Comments
Post a Comment