কম্পিউটার শিক্ষা : সময়ের দাবি ও তালেবে ইলমের প্রয়োজনীয়তা

কম্পিউটার শিক্ষা : সময়ের দাবি ও তালেবে ইলমের প্রয়োজনীয়তা

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 

বর্তমান যুগ এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, যেখানে প্রতিযোগিতা জীবনের প্রতিটি স্তরে অবধারিত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, দাওয়াহ, প্রশাসন কিংবা সামাজিক সেবার ময়দান— কোথাও আর কেবল ইচ্ছা বা আন্তরিকতা যথেষ্ট নয়; বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজ নিজ যোগ্যতার একটি সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়। এই প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতায় টিকে থাকতে এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের অবশ্যই কিছু মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

এই মৌলিক দক্ষতাগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো কম্পিউটার শিক্ষা। বর্তমান সময়ে কম্পিউটার আর বিলাসিতা নয়; এটি হয়ে উঠেছে জীবনের অপরিহার্য একটি মাধ্যম। যেমন লেখাপড়ার জন্য কলম অপরিহার্য, ঠিক তেমনি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় কম্পিউটার একটি অপরিহার্য উপকরণে পরিণত হয়েছে।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কম্পিউটার শিক্ষা কেন অপরিহার্য

যাঁরা জেনারেল শিক্ষাধারায় পড়াশোনা করছেন, তাঁদের জন্য কম্পিউটার শিক্ষা প্রায় বাধ্যতামূলক। কারণ তাঁদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের অধিকাংশ কাজই সরাসরি কম্পিউটারের ওপর নির্ভরশীল। অ্যাসাইনমেন্ট লেখা, প্রেজেন্টেশন তৈরি, তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন পরীক্ষা, এমনকি চাকরির আবেদন— সব কিছুতেই কম্পিউটার দক্ষতা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

কম্পিউটারের প্রোগ্রাম ও ব্যবহারিক কাজের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো এমএস ওয়ার্ড, এমএস এক্সেল ও পাওয়ার পয়েন্ট। এই তিনটি সফটওয়্যার এখন আধুনিক শিক্ষার ভিত্তিমূল হিসেবে গণ্য হয়। এমএস ওয়ার্ড ছাড়া কোনো প্রাতিষ্ঠানিক লেখালেখি কল্পনাই করা যায় না, এক্সেল ছাড়া তথ্য সংরক্ষণ ও হিসাব ব্যবস্থাপনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, আর পাওয়ার পয়েন্ট ছাড়া উপস্থাপনা কার্যত প্রাণহীন হয়ে পড়ে।

শিক্ষার্থীরা চাইলে বিরতির সময়গুলোতে এই দক্ষতাগুলো কাজে লাগিয়ে সম্মানজনক উপায়ে কিছু আয়ও করতে পারে। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা জরুরি— কম্পিউটার শেখার উদ্দেশ্য কেবল আয় বা ব্যবসা করা নয়। বরং মূল উদ্দেশ্য হলো সময়ের প্রয়োজনে, প্রয়োজনীয় স্থানে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হওয়া।

তালেবে ইলম ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য কম্পিউটার শিক্ষার গুরুত্ব

অনেকের মনে ধারণা রয়েছে—কম্পিউটার শিক্ষা হয়তো কেবল জেনারেল শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাদ্রাসার তালেবে ইলমদের জন্যও কম্পিউটার শিক্ষা দিন দিন অপরিহার্য হয়ে উঠছে। কারণ বর্তমান যুগে দ্বীনি খেদমতও ধীরে ধীরে প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

আমরা যদি বিরতির এই মূল্যবান সময়গুলোকে নষ্ট না করে কম্পিউটার শিক্ষায় ব্যয় করি, তাহলে এর বহুমুখী উপকার আমরা ভবিষ্যতে প্রত্যক্ষ করতে পারব। আল্লাহ যখন আমাদেরকে দ্বীনের খেদমতের কোনো দায়িত্ব অর্পণ করবেন, তখন আমরা মাদ্রাসার বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিজ হাতে, কম্পিউটারের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে পারব।

মাদ্রাসার প্রশ্নপত্র প্রস্তুত, নেজাম ও সিলেবাস টাইপিং, ছাত্রদের তথ্য সংরক্ষণ, নোটিশ ও নিয়ম-কানুন ডিজিটাল আকারে সংরক্ষণ, এমনকি মাদ্রাসার ওয়েবসাইট বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তথ্য প্রকাশ— এসব কাজ আজকাল কম্পিউটার ছাড়া কল্পনাই করা যায় না।

কম্পিউটার : একটি সর্বজনীন মাধ্যম

বর্তমান সময়ে কম্পিউটার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটি প্রায় সকল পেশার একটি সাধারণ ও অপরিহার্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে। শিক্ষক, আলেম, প্রশাসক, ব্যবসায়ী, দাঈ—সকলের কাজেই কোনো না কোনোভাবে কম্পিউটারের ব্যবহার রয়েছে।

এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই বলা যায়—যাঁদের কম্পিউটার শেখার আগ্রহ রয়েছে, তাঁদের জন্য অন্তত এমএস ওয়ার্ড, এমএস এক্সেল ও পাওয়ার পয়েন্ট এই তিনটি বিষয় শেখে রাখা ন্যূনতম প্রয়োজন। এগুলো শেখে রাখলে কোনো ক্ষতি নেই; বরং প্রয়োজনের সময় এটি আমাদের জন্য একটি বড় সহায়ক শক্তিতে পরিণত হবে।

বিরতির সময় : প্রস্তুতির শ্রেষ্ঠ সুযোগ

বিরতির সময়গুলো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে দেওয়া একটি বিশেষ নিয়ামত। এই সময়গুলো যদি আমরা গাফলত ও অলসতায় কাটিয়ে দিই, তাহলে পরে আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। অন্যদিকে, যদি আমরা এই সময়গুলোকে দক্ষতা অর্জনের জন্য কাজে লাগাই, তাহলে তা আমাদের ভবিষ্যৎকে সহজ ও ফলপ্রসূ করে তুলবে।

কম্পিউটার শেখা মানে নিজের ইলমি পরিচয় হারিয়ে ফেলা নয়; বরং নিজের ইলমকে আরও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার একটি হাতিয়ার অর্জন করা। এই হাতিয়ার ব্যবহার করে আমরা দ্বীনের খেদমতকে আরও সুসংগঠিত, পরিচ্ছন্ন ও যুগোপযোগী করে তুলতে পারি।

পরিশেষে বলতে চাই,,,

সারকথা হলো—বর্তমান যুগের বাস্তবতায় কম্পিউটার শিক্ষা আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি সময়ের দাবি। সাধারণ শিক্ষার্থী হোক বা মাদ্রাসার তালেবে ইলম— সবার জন্যই মৌলিক কম্পিউটার দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন।

সময় নষ্ট না করে, বিরতির মুহূর্তগুলোকে কাজে লাগিয়ে যদি আমরা এই দক্ষতাগুলো অর্জন করি, তাহলে ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে তা আমাদের ব্যক্তিগত জীবন, ইলমি অগ্রগতি ও দ্বীনের খেদমতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সময়ের সঠিক মূল্য বুঝার তৌফিক দান করুন, ইলম ও দক্ষতার সমন্বয়ে জীবন গড়ার শক্তি দান করুন—আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি