নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত : একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন
নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত : একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
প্রতিটি মুসলমানের জীবনে কুরআনের গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়; বরং এটি আমাদের জীবনের পূর্ণাঙ্গ দিশারি, পথপ্রদর্শক ও হেদায়েতের আলো। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবনে কুরআন ছিল নিত্যসঙ্গী। তারা নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করতেন, কুরআন মুখস্থ করতেন, কুরআনের অর্থ নিয়ে চিন্তা করতেন এবং নিজেদের জীবনে কুরআনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতেন।
অথচ আজ আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা অনেকেই কুরআন তেলাওয়াত শিখিনি, অনেকেই শিখতে পারিনি, আবার অনেকেই শিখতে চেষ্টাও করি না। সময়ের অভাব, ব্যস্ততা, অলসতা—এসব অজুহাতে আমরা কুরআন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। অথচ এই গাফিলতির পরিণতি যে কত ভয়াবহ, তা আমরা খুব কমই উপলব্ধি করি।
কুরআন তেলাওয়াত কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
কুরআন তেলাওয়াত নিজেই একটি ইবাদত। প্রতিটি হরফ পাঠের জন্য আল্লাহ তাআলা সওয়াব প্রদান করেন। কুরআন তেলাওয়াত মানুষের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, অন্তরকে প্রশান্ত করে এবং জীবনে বরকত নিয়ে আসে।
- কুরআন তেলাওয়াত করলে ঈমান বৃদ্ধি পায়
- মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক শান্তি আসে
- পাপ থেকে দূরে থাকার শক্তি তৈরি হয়
- আখিরাতে সুপারিশকারী হিসেবে কুরআন উপস্থিত হবে
কুরআনের সাথে সম্পর্ক যত গভীর হবে, আল্লাহর সাথে সম্পর্কও তত দৃঢ় হবে।
আমাদের লক্ষ্য কেমন হওয়া উচিত?
একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিয়মিত কুরআন খতম করা। উত্তম হলো—
- প্রতি মাসে অন্তত একবার কুরআন খতম
- যদি সম্ভব না হয়, দুই মাসে একবার
- অথবা তিন মাসে একবার
- অথবা ছয় মাসে একবার
- সবশেষে, বছরে অন্তত একবার হলেও কুরআন খতম
যে ব্যক্তি বছরে একবারও কুরআন খতম করতে পারে না, তাকে অবশ্যই নিজের জীবনধারা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াতের পথে প্রধান বাধা
- কুরআন শুদ্ধভাবে পড়তে না জানা
- নিয়মিত সময় নির্ধারণ না করা
- মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয়
- ইচ্ছাশক্তির অভাব
- কুরআনের প্রতি হৃদয়ের টান না থাকা
এই বাধাগুলো দূর না করলে কখনোই কুরআনের সাথে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে উঠবে না।
কিভাবে নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তুলবো
১. নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ
প্রতিদিন কুরআন তেলাওয়াতের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করতে হবে। যেমন—ফজরের পর, ইশার পর বা ঘুমানোর আগে। সময় নির্দিষ্ট হলে অভ্যাস তৈরি হয়।
২. অল্প দিয়ে শুরু
শুরুতেই বেশি পড়ার চাপ নেওয়া যাবে না। প্রথমে এক পৃষ্ঠা, দুই পৃষ্ঠা—এভাবে ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে।
৩. কুরআনকে অগ্রাধিকার দেওয়া
মোবাইল, গল্প, আড্ডা—এসবের আগে কুরআনকে সময় দিতে হবে। কুরআন যেন দিনের প্রথম কাজ হয়।
কুরআন শিখবো কীভাবে?
কুরআন শিখতে চাইলে প্রথম শর্ত হলো আন্তরিক নিয়ত। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কুরআন শেখা কখনোই সম্ভব নয়।
১. যোগ্য উস্তাদের কাছে শেখা
সহীহ তেলাওয়াত শেখার জন্য অবশ্যই যোগ্য ও অভিজ্ঞ উস্তাদের শরণাপন্ন হতে হবে।
২. তাজবিদ শেখা
তাজবিদ ছাড়া কুরআন তেলাওয়াত অসম্পূর্ণ। প্রতিটি হরফ সঠিকভাবে উচ্চারণ শেখা জরুরি।
৩. নিয়মিত অনুশীলন
প্রতিদিন যা শেখা হবে, তা বারবার পড়ে অনুশীলন করতে হবে।
কুরআন তেলাওয়াতে আনন্দ পাওয়ার উপায়
- শান্ত পরিবেশে তেলাওয়াত করা
- অর্থ বোঝার চেষ্টা করা
- আস্তে ও সুন্দরভাবে পড়া
- নিজেকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত মনে করা
কুরআন তেলাওয়াতের আসল মজা সেই পায়, যে নিয়মিত কুরআন পড়ে।
কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ার কিছু বাস্তব টিপস
- প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট কুরআনের জন্য বরাদ্দ রাখা
- মোবাইলে কুরআন অ্যাপ ব্যবহার করা
- পরিবারের সবাইকে কুরআন তেলাওয়াতে উৎসাহ দেওয়া
- রমজানকে কুরআনের মাস হিসেবে গ্রহণ করা
শেষ কথা,,,
নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করা আল্লাহর বিশেষ তৌফিক। এই তৌফিক সবাই পায় না। তাই আমাদের উচিত এই নেয়ামতের কদর করা। আজ যদি আমরা কুরআনের দিকে ফিরে না যাই, তাহলে কিয়ামতের দিন আমাদের আফসোসের শেষ থাকবে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার তৌফিক দান করুন, নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করার শক্তি দান করুন। আমীন।
Comments
Post a Comment