সকালের শুরুটা

 সকালের শুরুটা

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 

একটি ঈমানি সকাল, এক টুকরো আলোর পথচলা

আলহামদুলিল্লাহ—প্রতিদিনের সকাল যেন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নতুন করে জীবন উপহার পাওয়ার এক অপূর্ব মুহূর্ত। ভোরের মুগ্ধ হাওয়া, নীরব আকাশ আর আলো-ছায়ার মিশেলে সৃষ্টি হওয়া পরিবেশ আমাকে গভীরভাবে আপ্লুত করে। মনে হয়, প্রতিটি সকাল শুধু একটি নতুন দিন নয়; বরং এটি একটি নতুন সুযোগ—নিজেকে গড়ে তোলার, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এবং আগের দিনের ভুলগুলো সংশোধন করার।

ফজরের সময় ঘুম ভেঙে উঠে যখন অজু করে নামাজের জন্য দাঁড়াই, তখন অন্তরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে। ফজরের নামাজ আমার দিনের ভিত্তি। এই নামাজ আমাকে শিখিয়ে দেয় শৃঙ্খলা, আত্মসংযম এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা। জামাতের সাথে নামাজ আদায় করার পর সকালের আমলগুলো—যেগুলো নবীজী ﷺ আমাদের শিখিয়ে গেছেন—আমার হৃদয়কে আলোয় ভরিয়ে তোলে।

তিন তাসবীহ ও জিকির আমার সকালের অবিচ্ছেদ্য অংশ। “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার”—এই ছোট ছোট বাক্যগুলো যেন আত্মার জন্য বিশাল শক্তির উৎস। এগুলো আমাকে অনুপ্রাণিত করে, মনকে পরিষ্কার করে এবং দুনিয়ার ব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগেই আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্ককে দৃঢ় করে দেয়।

এরপর শুরু হয় কুরআনের সাথে আমার সকালের দীর্ঘ সময়। প্রতিদিন দুই পারা কুরআন তেলাওয়াত করার চেষ্টা করি। এই তেলাওয়াত শুধু পাঠ নয়—এটা আমার জন্য আত্মশুদ্ধির এক নিয়মিত সাধনা। কুরআনের আয়াতগুলো আমাকে শক্তিশালী করে, ঈমানকে মজবুত করে এবং জীবনের পথে অবিচল থাকতে সাহস জোগায়। মনে হয়, কুরআনের আলো ছাড়া দিন শুরু করলে দিনটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

কুরআন তেলাওয়াতের পর আমার মন আরও সতেজ ও প্রস্তুত থাকে দিনের কাজগুলোর জন্য। এই সময়টাতে আমি অনলাইনে বিভিন্ন উপকারী বই পড়ি। ইলমি লেখা, চিন্তাশীল প্রবন্ধ, দ্বীনী আলোচনা—সবকিছুই আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। জ্ঞান অর্জনের এই নীরব মুহূর্তগুলো আমার ভিতরের মানুষটাকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে।

মাইক্রোসফট এমএস ওয়ার্ডে লেখালেখি করা আমার সকালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যখন আমি কলম নয়, কিবোর্ডের মাধ্যমে নিজের চিন্তা ও অনুভূতিগুলোকে শব্দে রূপ দিই, তখন মনে হয় আমি ধীরে ধীরে অনেক দূরে এগিয়ে যাচ্ছি। লেখার প্রতিটি লাইন আমাকে চিন্তার গভীরতায় নিয়ে যায়, আমাকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। কখনো নসীহত, কখনো জীবনঘনিষ্ঠ অনুভব—সব মিলিয়ে লেখালেখি আমার আত্মিক যাত্রার সঙ্গী।

এরপর আসে আমার দিনের সবচেয়ে প্রিয় একটি দায়িত্ব—ভাই-বোনদের পড়ালেখা করানো। তাদেরকে নতুন কিছু শেখানো, প্রশ্ন করে চিন্তা করতে শেখানো, ধীরে ধীরে আমলের দিকে অভ্যস্ত করা—এই কাজগুলো আমার নিজের উন্নতির পথও প্রশস্ত করে দেয়। কারণ শেখাতে গেলে নিজেকেও শিখতে হয়, নিজেকেও আরও ভালো হতে হয়।

ভাই-বোনদেরকে বিভিন্ন আমল শেখানোর সময় আমি অনুভব করি, দায়িত্ব মানেই শুধু কর্তব্য নয়—বরং এটি একটি আমানত। তাদের ছোট ছোট প্রশ্ন, কৌতূহলী দৃষ্টি আর শেখার আগ্রহ আমাকে আরও যত্নবান করে তোলে। তাদের মধ্যে যদি দ্বীনের ভালোবাসা জন্ম নেয়, তাহলেই আমার শ্রম সার্থক।

এই পুরো সকালের সময়টা আমাকে শুধু ব্যস্ত রাখে না; বরং আমাকে ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে এগিয়ে দেয়। আত্মিক উন্নতি, জ্ঞানগত উন্নতি এবং নৈতিক উন্নতি—এই তিনটি দিক একসাথে চলতে থাকে। আমি বুঝতে পারি, একটি সুন্দর সকাল মানেই একটি সুন্দর দিন, আর একটি সুন্দর দিন মানেই একটি অর্থবহ জীবন।

সকালের এই নেযাম শুধু সময় কাটানোর উপায় নয়; বরং এটি আমার জীবনের দিকনির্দেশনা। ফজরের নামাজ থেকে শুরু করে তেলাওয়াত, জিকির, পড়াশোনা, লেখালেখি এবং পরিবারের খেদমত—সবকিছু মিলেই আমার সকালকে করে তোলে আলোকিত।

আমি বিশ্বাস করি, যে ব্যক্তি তার সকালকে আল্লাহর স্মরণে শুরু করে, আল্লাহ তার পুরো দিনকে বরকতে ভরে দেন। আর সেই বরকতই মানুষকে ধীরে ধীরে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। আলহামদুলিল্লাহ—এই আশাতেই প্রতিদিন নতুন সকালকে বরণ করে নিই।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি