রমজান মাসের প্রস্তুতি
রমজান মাসের প্রস্তুতি
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
আজ ১১ই শাবান। সময় যেন চোখের পলকে বয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে আর মাত্র প্রায় বিশ দিন পরেই আমাদের দরজায় কড়া নাড়বে বরকতময়, রহমতের মাস—রমজান। এই মাসটি এমন একটি নেয়ামত, যার প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমতে পরিপূর্ণ। অথচ আফসোসের বিষয় হলো—এই মূল্যবান মাসটি অনেক সময় আমরা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারি না।
এর প্রধান কারণ হলো প্রস্তুতির অভাব। রমজান আসে, আমরা রোজা রাখি, তারাবী পড়ি—কিন্তু পরিকল্পনা ছাড়া, লক্ষ্য ছাড়া। ফলে সময় নষ্ট হয়, অযথা কাজে দিন কেটে যায়, আর রমজান শেষ হলে মনে হয়—এই বুঝি মাসটা চলে গেল!
তাই এখনই, শাবান মাসেই, আমাদের উচিত রমজানের জন্য একটি সুস্পষ্ট প্রস্তুতি গ্রহণ করা। একটি গাইডলাইন তৈরি করা, একটি নেজামুল আউকাত (সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা) বানানো এবং একটি বাস্তবসম্মত রুটিন নির্ধারণ করা।
কেন রমজানের জন্য রুটিন জরুরি?
রুটিন ছাড়া জীবন মানেই বিশৃঙ্খলা। রুটিন না থাকলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সময়ের। সময় নষ্ট হলে আমল কমে যায়, ইবাদতের স্বাদ নষ্ট হয় এবং লক্ষ্যহীনভাবে দিন পার হয়ে যায়। অথচ রমজান এমন একটি মাস, যেখানে প্রতিটি সেকেন্ডের মূল্য আখিরাতের পাল্লায় ওজন করা হয়।
রুটিন থাকলে—
- সময় অপচয় হয় না
- ইবাদত নিয়মিত হয়
- পড়াশোনা ও মুতালাআ সহজ হয়
- দুনিয়াবি কাজও শৃঙ্খলার সাথে সম্পন্ন হয়
তাই রমজানের শুরু হওয়ার আগেই আমাদের ঠিক করে নিতে হবে—আমি কী করব, কখন করব এবং কতটুকু করব।
রমজানের জন্য একটি প্রাথমিক রুটিন কেমন হতে পারে
প্রত্যেক মানুষের পরিস্থিতি এক নয়। তবে একটি সাধারণ কাঠামো সবার জন্যই প্রযোজ্য হতে পারে।
- প্রতিদিন কত পারা কুরআন তেলাওয়াত করব
- নিয়মিত ফরজের পাশাপাশি কত রাকাআত নফল নামাজ আদায় করব
- তারাবীর আগে বা পরে কত সময় কুরআন অধ্যয়ন করব
- প্রতিদিন কত পৃষ্ঠা কিতাব মুতালাআ করব
- যিকির, দরুদ ও দোয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়
এছাড়াও পারিবারিক কাজ, লেখা-পড়া, উস্তাদদের সাথে সাক্ষাৎ, সমাজিক দায়িত্ব—সবকিছুকে এই রুটিনের আওতায় আনতে হবে।
রমজান মাস নষ্ট করার মাস নয়
রমজান হলো অর্জনের মাস। এই মাসে আমাকে প্রমাণ করতে হবে—আমি আল্লাহর কতটা নিকটবর্তী হতে চাই। এই মাসে আমল বাড়াতে হবে, গুনাহ কমাতে হবে এবং দুনিয়াবি ব্যস্ততা সীমিত করতে হবে।
যদি আমি একজন ছাত্র হই, তবে আমাকে পড়াশোনায়ও মনোযোগী হতে হবে। কারণ ইসলাম কখনো দায়িত্বহীনতা শেখায় না। বরং সময়কে সঠিকভাবে ভাগ করে নেওয়াই ইসলামের শিক্ষা।
জেনারেল শিক্ষার্থীদের জন্য রমজান
যারা স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, তাদের জন্য রমজান একটি সুবর্ণ সুযোগ। এই মাসেই তারা কুরআন শিখে নিতে পারে। ভালো একজন শিক্ষকের কাছে গিয়ে সহীহভাবে কুরআন শেখা—এটাই হতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
একই সাথে দোয়া মুখস্থ করা, নামাজ শুদ্ধ করা এবং ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো জানা—এসব কাজ এই মাসেই করা সম্ভব।
মাদ্রাসার তালেবে ইলমদের জন্য রমজান
মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য রমজান হলো কিতাবের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ার সময়। এই মাসে তুলনামূলকভাবে সময় বেশি পাওয়া যায়, তাই নিজের মতো করে মুতালাআ করার সুযোগ থাকে।
কারো আগ্রহ থাকলে উসূলুল ফিকহ, উসূলুত তাফসীর বা উলুমুল হাদীসের মতো গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রে হাত দিতে পারে। অবশ্যই উস্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী।
যদি কারো নাহু-সরফে দুর্বলতা থাকে, তাহলে এই মাসেই সেটি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। দুর্বলতা চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে ইনশাআল্লাহ সফলতা আসবেই।
রমজানের পূর্বপ্রস্তুতির কিছু বাস্তবধর্মী আমল
- এখন থেকেই নফল রোজার অভ্যাস করা
- কুরআনের সাথে সম্পর্ক বাড়ানো
- নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া
- গুনাহ থেকে নিজেকে সংযত করা
- সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার সীমিত করা
- একটি বাস্তবসম্মত রমজান রুটিন লিখে রাখা
রমজানের মূল লক্ষ্য
রমজানের মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন। শুধু রোজা রাখা নয়, বরং চোখ, কান, জিহ্বা, মন—সবকিছুকে সংযত রাখা।
আমাদের চেষ্টা থাকতে হবে—
- কুরআন তেলাওয়াতে গাফিলতি না করা
- ইবাদতের সময় নষ্ট না করা
- পরিবার ও সমাজের জন্য উপকারী হওয়া
- অহংকার ও আত্মপ্রশংসা থেকে বেঁচে থাকা
শেষ কথা,,
রমজান মাস বারবার আসে না। জীবনের প্রতিটি রমজানই হতে পারে শেষ রমজান। তাই এই মাসটিকে অবহেলায় নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এখনই প্রস্তুতি গ্রহণ করি, রুটিন বানাই এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে যাই।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রমজান মাসকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর তৌফিক দান করুন। আমীন।
Comments
Post a Comment