চিন্তা থেকে সংরক্ষণ: এক পরিবর্তনের শুরু

 

চিন্তা থেকে সংরক্ষণ: এক পরিবর্তনের শুরু

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
 

যখন আমি নাহবেমির জামাতে দরসে বসতাম, তখন প্রতিদিনই মনে হতো—আজকের এই দরস শুধু আজকের জন্য নয়। এখানে যে গুরুত্বপূর্ণ নুকতা, সূক্ষ্ম ইশারা ও ইলমি দিকগুলো আলোচিত হচ্ছে, সেগুলো এমন নয় যে দরস শেষ হলেই শেষ হয়ে যাবে। বরং এগুলো এমন সম্পদ, যা যদি সংরক্ষণ করা যায়, তবে সারা জীবনের পাথেয় হয়ে থাকতে পারে।

এই অনুভূতি থেকেই আমার ভিতরে একটি তীব্র আগ্রহ জন্ম নেয়—আমি এই ইলম হারাতে চাই না। তাই নিয়ম করে খাতায় লিখে রাখা শুরু করি। দরসে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা, কায়েদা, ইবারতের ব্যাখ্যা—সব কিছু যত্ন করে লিপিবদ্ধ করতাম। মনে হতো, খাতার পাতায় না তুলতে পারলে হয়তো স্মৃতির পাতায়ও টিকবে না।

কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, ততই মনে একটি নতুন প্রশ্ন জন্ম নিতে শুরু করল—শুধু খাতায় লিখে রাখাই কি যথেষ্ট? খাতা তো একদিন পুরোনো হবে, হারিয়ে যেতে পারে, নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাহলে কি এই ইলমের সংরক্ষণ এখানেই থেমে থাকবে?

এই প্রশ্নই আমার চিন্তাধারায় একটি নতুন দরজা খুলে দিল। তখন মনে হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষণের মাধ্যমও পরিবর্তিত হওয়া উচিত। কাগজের পাশাপাশি ডিজিটাল সংরক্ষণ—এটাই হয়তো সময়ের দাবি। আর সেখান থেকেই আমার জীবনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ: মোবাইলে কম্পোজ করা।

আমি একটি সাধারণ মোবাইল নিয়ে শুরু করলাম ইলমি নুকতাগুলো কম্পোজ করা। প্রতিটি বিষয় টাইপ করতে করতে অনুভব করলাম—এটা শুধু লেখা নয়, বরং আবার নতুন করে পড়া, বোঝা এবং নিজের ভিতরে গেঁথে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। লিখতে গিয়ে অনেক সময় বুঝতে পারতাম, কোন জায়গায় আমার বোঝার ঘাটতি আছে, কোন মাসআলা আরও পরিষ্কার করা দরকার।

তবে আজ আমি এই কম্পোজ করার পদ্ধতি বা কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। বরং আমি আজ শেয়ার করতে চাই আমার জীবনের একটি শিক্ষা—একটি চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন। এই পরিবর্তন আমাকে শিখিয়েছে, ইলম শুধু অর্জন করলেই যথেষ্ট নয়; ইলমকে সংরক্ষণ করা, পুনরায় চিন্তা করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করাও ইলমেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

এই উপলব্ধিই আমার চলার পথে একটি নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ইনশাআল্লাহ, পরবর্তী অংশগুলোতে আমি এই চিন্তার আরও গভীর দিক, এর প্রভাব এবং এর মাধ্যমে জীবনে যে পরিবর্তন এসেছে—সেগুলো ধাপে ধাপে শেয়ার করব।

চিন্তার মোড় ও আত্মপর্যালোচনা :

তখন বয়স ছিল ছোট। চিন্তার জগৎ ছিল সীমিত, আকাঙ্ক্ষাগুলো ছিল সহজ ও সরল। ইলম মানে ছিল পড়া, শোনা এবং খাতার পাতায় তুলে রাখা। মোবাইল তখন কেবল একটি মাধ্যম—যেখানে লেখা সংরক্ষণ করা যায়, দরসের নুকতা টাইপ করে রাখা যায়। এর বাইরে কিছু ভাবার অবকাশও ছিল না, প্রয়োজনও ছিল না।

নিজের ছবি ছাড়তে হবে, পোস্ট করতে হবে, সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড করতে হবে—এই শব্দগুলো তখন চিন্তার আঙিনাতেই প্রবেশ করেনি। মনে হতো, ইলম মানে নীরবতা, ইখলাস এবং নিজের মধ্যে গুছিয়ে রাখা। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা কিংবা প্রশংসা কুড়ানো—এসব যেন ইলমি জীবনের অংশই নয়।

কিন্তু সময় এক জায়গায় থেমে থাকে না। বয়স বাড়ে, স্তর পরিবর্তন হয়। যখন জালালাইন জামাতে ভর্তি হলাম, মেশকাতে উঠলাম—তখন চিন্তার জগতে এক ধরনের নড়াচড়া শুরু হলো। আগের সেই সরলতা যেন একটু একটু করে ভাঙতে লাগল। মনে হতে শুরু করল, এখন তো আমি একটু বড় হয়েছি, আমারও কিছু পরিচয় আছে।

ঠিক তখনই মনের ভেতরে এক নতুন ভাবনা উঁকি দিতে লাগল—এখন থেকে হয়তো নিজের ছবিও আপলোড করা যায়। যেসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি, সেগুলোর ভিডিও শেয়ার করা যায়। মানুষ দেখবে, পরিচিতজন দেখবে, ছাত্র ভাইয়েরা দেখবে। হয়তো কিছু প্রশংসাও আসবে, কিছু স্বীকৃতিও মিলবে।

এই ভাবনাগুলো প্রথমে খুব সাধারণ মনে হলেও, আসলে এগুলো ছিল চিন্তার একটি মোড়। এখান থেকেই শুরু হয় আত্মসমালোচনার দরকার। কারণ প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা খুব সূক্ষ্ম একটি বিষয়—এটা কখন যে ইখলাসকে আড়াল করে দেয়, মানুষ নিজেও টের পায় না। বাহ্যিকভাবে কাজ হয় ইলমের নামে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মন ধাবিত হয় মানুষের দিকে।

এই পর্যায়ে এসে বুঝতে শুরু করলাম—ইলমি জীবনে শুধু পড়ার স্তর পরিবর্তন হয় না, পরীক্ষাও পরিবর্তিত হয়। ছোট বয়সে পরীক্ষা ছিল অলসতা ও অবহেলা। আর একটু বড় হলে পরীক্ষা আসে রিয়া, সুনাম ও আত্মপ্রদর্শনের মাধ্যমে। তখন প্রয়োজন হয় আরও বেশি সতর্কতা, আরও গভীর আত্মপর্যালোচনা।

এই উপলব্ধিই আমাকে থামিয়ে দেয়, ভাবতে শেখায়। আমি বুঝতে শুরু করি—সবকিছু করা যায়, কিন্তু সবকিছু করা জরুরি নয়। ইলমের পথে চলতে গেলে শুধু বাহ্যিক অগ্রগতি নয়, ভেতরের দিকটাও আগলে রাখতে হয়। নতুবা অজান্তেই পথ বদলে যেতে পারে।

ভাবনার সংঘাত ও ফিরে আসার সিদ্ধান্ত :

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি একটি বিষয় স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করলাম—আমার কাজগুলোকে সবাই একই চোখে দেখছে না। যদিও আমার উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই ইতিবাচক, তবুও কিছু মানুষের অন্তরে নেগেটিভ ধারণা প্রবেশ করতে শুরু করল। অবশ্যই এমন অনেক মানুষও ছিলেন, যাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পজিটিভ, যারা বিষয়গুলোকে ভালোভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি একরকম হয় না।

আমার অন্তরের আশা ছিল—আমি যা কিছু শেয়ার করছি, তা যেন সবার জন্য অনুপ্রেরণার কারণ হয়। কেউ যেন এটাকে ভুলভাবে না নেয়, কেউ যেন এতে অহংকার কিংবা আত্মপ্রদর্শনের কিছু খুঁজে না পায়। কিন্তু যখন দেখলাম কিছু হিতাকাঙ্ক্ষী ও শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষের অন্তরেও সন্দেহ, দ্বিধা ও নেতিবাচক চিন্তা জন্ম নিচ্ছে, তখন সেই আশায় এক ধরনের আঘাত লাগল।

এই পরিস্থিতিতে এসে আমাকে থেমে যেতে হলো। ভাবতে হলো—যে কাজের উদ্দেশ্য ছিল কল্যাণ, সেটিই যদি কারো মনে বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই কাজ থেকে সরে আসাই কি উত্তম নয়? এই প্রশ্নটাই আমাকে সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

এর আগে আমি বিভিন্ন সময়ে নিজের আপলোডকৃত ভিডিও ও ছবি শেয়ার করতাম। কখনো কোনো প্রতিযোগিতার মুহূর্ত, কখনো বন্ধু ও সাবি ভাইদের সঙ্গে একসাথে বসে খাওয়ার দৃশ্য, কখনো আবার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তোলা স্মৃতির ছবি। এসব মুহূর্ত তখন আমার কাছে ছিল নিছক স্মৃতি আর সময়ের দলিল।

কিন্তু ধীরে ধীরে উপলব্ধি হলো—সব স্মৃতি সবার সামনে তুলে ধরার জন্য নয়। কিছু মুহূর্ত নিজের ভেতরেই সুন্দর থাকে। আর কিছু কাজ এমন, যেগুলো নিঃশব্দে হলে বেশি বরকত হয়। মানুষের চোখে পড়ার আগেই যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি হারিয়ে যায়, তাহলে সেই প্রকাশের কোনো মূল্য থাকে না।

এই উপলব্ধি থেকেই আমি আমার অনেক আপলোডকৃত ভিডিও ও ছবি সরিয়ে নিতে শুরু করি। নিজেকে আবার আগের অবস্থানে ফেরানোর চেষ্টা করি। নিজের নিয়তকে নতুন করে পরখ করি। আমি বুঝতে পারি—ইলমের পথে চলতে গেলে শুধু বাহ্যিক কাজ নয়, মানুষের ধারণা ও নিজের অন্তরের অবস্থাও বিবেচনায় রাখতে হয়।

এই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত আমার জন্য সহজ ছিল না। তবে এটি আমাকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে—সব ভালো কাজ প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই, আর সব প্রকাশ যে ভালো হবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইলমের পথে সবচেয়ে নিরাপদ চলা হলো নীরবতা, সতর্কতা ও আল্লাহর দিকে মনোযোগ ধরে রাখা।

ইলমের সাথে বেড়ে ওঠা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন:

মানুষ যত বড় হতে থাকে, তার জীবনে কেবল বয়সই বাড়ে না; বরং কিতাবের সাথে সম্পর্ক গভীর হয়, ইলম বৃদ্ধি পায়, আর সেই সঙ্গে চিন্তা-চেতনায়ও এক ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করে। যে বিষয়গুলো একসময় খুব স্বাভাবিক মনে হতো, ইলম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন জাগে। নিজের কাজ, উদ্দেশ্য ও পথ—সবকিছু নতুন করে ভাবতে শেখে মানুষ।

এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় একসময় আমার মনেও প্রশ্ন আসতে শুরু করল—কেন আমাকে নিয়মিত নিজের ছবি তুলে ফেসবুকে ছাড়তে হবে? কেন আমার দৈনন্দিন কাজ কিংবা বিভিন্ন ভিডিও ইউটিউব বা ফেসবুকে আপলোড করতে হবে? আমি কি ধীরে ধীরে আমার মূল উদ্দেশ্য থেকে ভিন্ন পথে সরে যাচ্ছি না?

ইলম আমাকে শিখিয়েছে, প্রতিটি কাজের পেছনে নিয়ত থাকতে হয়। আর যখন নিয়ত দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন কাজের বাহ্যিক সৌন্দর্য আর কোনো মূল্য রাখে না। তখন উপলব্ধি হলো—সবকিছু শেয়ার করা প্রয়োজন নেই। কিছু কাজ নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে তাতে বরকত বেশি থাকে।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ফেসবুক আমি ব্যবহার করব, কিন্তু এমন কোনো কিছু আপলোড করব না, যা হারামের অন্তর্ভুক্ত বা মানুষের মনে ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে। বরং আমি চেষ্টা করব নসিহা লিখতে, কুরআনের বাণী শেয়ার করতে, হাদিসের টুকরা তুলে ধরতে, মানুষকে সৎ পথে আহ্বান করতে এবং অসৎ পথ থেকে বিরত থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে।

কারণ আমি বিশ্বাস করি, একটি ছোট লেখা, একটি সংক্ষিপ্ত নসিহা, কিংবা একটি সত্য কথা—কার কখন অন্তরে আলো জ্বালিয়ে দিতে পারে, তা কেউ জানে না। হয়তো আমার লেখা পড়ে কোনো ভাই এক মুহূর্ত থেমে যাবে, নিজের ভুল নিয়ে ভাববে, কিংবা আল্লাহর দিকে ফিরে আসার একটি দরজা তার জন্য খুলে যাবে।

যদি আমার লেখা বা বক্তব্যের মাধ্যমে একজন মানুষের মধ্যেও সামান্য পরিবর্তন আসে, যদি সে আল্লাহর সাথে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলে—তাহলে সেটাই আমার জন্য হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল নেয়ামত। কারণ মানুষের অন্তর পরিবর্তন করা আমাদের কাজ নয়; আমাদের কাজ শুধু পৌঁছে দেওয়া। হেদায়েত তো একমাত্র আল্লাহই দেন।

এই উপলব্ধি আমাকে শিখিয়েছে—দাওয়াতের কাজ সব সময় মঞ্চে দাঁড়িয়ে কিংবা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েই করতে হয় না। কখনো কলমের মাধ্যমে, কখনো কিবোর্ডের মাধ্যমে, আবার কখনো নিঃশব্দ দোয়ার মাধ্যমেও আল্লাহ বান্দার কাছ থেকে অনেক বড় কাজ নিয়ে নেন।

ইলম যত বাড়ে, ততই মানুষ বুঝতে শেখে—খ্যাতির চেয়ে ইখলাস বড়, মানুষের প্রশংসার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি বড়, আর প্রকাশের চেয়ে নীরবতার মাঝে অনেক সময় বেশি নিরাপত্তা ও বরকত লুকিয়ে থাকে।

উদ্দেশ্যের পরিশুদ্ধতা ও চিন্তার পরিবর্তন:

একারণেই আমি ধীরে ধীরে নিজের ছবি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। ফেসবুকে কিংবা অন্য কোনো সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও আপলোড করাও বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ গভীরভাবে ভেবে দেখলাম—এই কাজগুলোর মধ্যে না আমার নিজের কোনো প্রকৃত উপকার ছিল, না ইসলামের কোনো দৃশ্যমান উপকার সাধিত হচ্ছিল। শুধু ছবি কিংবা ভিডিও আপলোড করলেই যে তা দ্বীনের খেদমত হয়ে যায়—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় মিলে না।

আমি উপলব্ধি করলাম, এমন অনেক কাজ আছে যেগুলো বাহ্যিকভাবে নির্দোষ মনে হলেও বাস্তবে তা সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। যে কাজে কোনো ফায়দা নেই, কোনো উপকার নেই—সেই কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখা মানে নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করা। অথচ এই সময়টাই যদি এমন কাজে ব্যয় করা যায়, যার মধ্যে ভালো উদ্দেশ্য আছে, সুন্দর স্বপ্ন আছে, এবং যা মানুষের চিন্তা-চেতনায় ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা দিতে পারে—তাহলেই তো সেই সময় সার্থক।

এই উপলব্ধি থেকেই আমি নিজেকে সীমাবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। এমন কাজেই নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করলাম, যেগুলোর মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের উপকার হতে পারে। আমার পথচলার শুরুটা ছিল অনেক সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে। দ্বীনের জন্য কিছু করার আগ্রহ, মানুষের উপকারে আসার ইচ্ছা—এই সবকিছু নিয়েই আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল।

কিন্তু মাঝপথে এসে, কিছু সময়ের জন্য আমার মনের ভেতরে পরিবর্তন এসেছিল। মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে ভিন্ন কিছু উদ্দেশ্য যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। হয়তো সেটা ছিল মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, কিংবা নিজেকে প্রকাশ করার প্রবণতা। তবে আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তাআলা আমাকে সেই জায়গায় আটকে রাখেননি।

যখন কুরআনের অমীয় বাণী, কিতাবের পাতা আর হাদিসের বিভিন্ন লফজ ও তার গভীর মর্ম চোখের সামনে স্পষ্ট হতে শুরু করল, তখন নিজের মধ্যেই পরিবর্তন অনুভব করলাম। ইলম যত বাড়তে লাগল, ততই বুঝতে পারলাম—এইভাবে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া আমার জন্য সঠিক পথ নয়।

আমি বুঝতে পারলাম, সমাজের ও মানুষের প্রকৃত উপকার হয় এমন বিষয়গুলোই সামনে আনা উচিত। নসিহা, কুরআনের বাণী, হাদিসের শিক্ষা, সৎ পথে আহ্বান ও অসৎ পথ থেকে বিরত থাকার বার্তা—এসবই তো এমন বিষয়, যা মানুষের অন্তরে আলো জ্বালাতে পারে।

তাই এখন আমার কাছে মনে হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিত থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং সেখানে কী তুলে ধরা হচ্ছে, সেটাই আসল। যদি সেই মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষের উপকার করা যায়, কাউকে আল্লাহর দিকে এক ধাপ এগিয়ে নেওয়া যায়—তাহলেই সেই উপস্থিতির অর্থ আছে। নচেৎ নীরবতা অনেক সময় প্রকাশের চেয়েও বেশি নিরাপদ ও বরকতময়।

উদ্দেশ্যের পরিশুদ্ধতা :

ভবিষ্যতের কথা আমি অস্বীকার করি না। আল্লাহ যদি দয়া করে আমাকে কখনো বড় কোনো দায়িত্ব দেন, যদি কখনো মানুষের সামনে কথা বলার সুযোগ দেন, যদি কোনো সেমিনার, কনফারেন্স কিংবা দ্বীনি মাহফিলে বক্তৃতা করার তাওফিক দেন—তখন হয়তো স্বাভাবিকভাবেই অনেকেই ক্যামেরা চালু করবে, ছবি তুলবে, ভিডিও ধারণ করবে এবং তা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করবে। সে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা, যা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

কিন্তু নিজের পক্ষ থেকে, নিজের ইচ্ছা ও উদ্যোগে—আমি ইনশাআল্লাহ এমন অহেতুক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখব না। আমি চেষ্টা করব, আমার সময়, শক্তি ও চিন্তাকে এমন কাজে ব্যয় করতে, যেগুলো আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য, মানুষের জন্য উপকারী এবং আখিরাতের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।

আমার কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—উদ্দেশ্যের পরিশুদ্ধতা। মানুষ কী বলল, কে দেখল, কে প্রশংসা করল কিংবা কে সমালোচনা করল—এসবের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহ কী দেখছেন, সেটাই মুখ্য। কারণ আমলের মূল্য নির্ধারিত হয় মানুষের চোখে নয়, বরং আল্লাহর দৃষ্টিতে।

এই উপলব্ধি থেকেই আমি নিজের পথকে সীমিত করেছি, কিন্তু উদ্দেশ্যকে করেছি বিস্তৃত। কম কথা, কম প্রদর্শন—কিন্তু বেশি অর্থবহ কাজ। কম পরিচিতি—কিন্তু বেশি ইখলাস। এই নীতিতেই আমি সামনে এগোতে চাই।

আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া—তিনি যেন আমাকে সব সময় সঠিক নিয়ত দান করেন, ইখলাসের সাথে কাজ করার তাওফিক দেন এবং এমন সব কাজ থেকে হেফাজত করেন, যেগুলো বাহ্যিকভাবে সুন্দর হলেও ভেতরে ফাঁপা। তিনি যেন আমার প্রতিটি চেষ্টা ও প্রচেষ্টাকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কবুল করে নেন।

ইনশাআল্লাহ, যতদিন জীবন আছে—ভালো কাজে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করব, উপকারী বিষয়গুলোই মানুষের সামনে তুলে ধরব এবং নিজের আমলকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত রাখব। এটাই আমার অঙ্গীকার, এটাই আমার পথচলার শেষ কথা।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি