তাওয়াক্কুলের আলোয় একটি ছোট ঘটনা
তাওয়াক্কুলের আলোয় একটি ছোট ঘটনা
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)
"যা বড় শিক্ষা দিয়ে যায়"আজ আল্লাহর রহমত ও দয়া ছিল আমার জীবনে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এমন এক মুহূর্তে, যখন আমি একপ্রকার হতাশার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলাম, ঠিক তখনই আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম করুণা ও অনুগ্রহ দিয়ে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন—তিনি আছেন, তিনি দেখছেন, তিনি সাহায্য করেন।
গতকাল থেকে আমার ল্যাপটপটি অন হচ্ছিল না। প্রযুক্তির এই যুগে ল্যাপটপ যেন শুধু একটি যন্ত্র নয়—বরং কাজ, দায়িত্ব, পরিকল্পনা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আমার লেখালেখি, পড়াশোনা, পরিকল্পনা—সবকিছুই যেন থমকে গিয়েছিল। বারবার চেষ্টা করেছি, চার্জ দিয়েছি, পাওয়ার বাটন চেপেছি—কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
হতাশার মুহূর্তেও আশার প্রদীপ
মানুষ হিসেবে মনটা ভেঙে যাওয়াই স্বাভাবিক। কাজ জমে যাচ্ছে, সময় নষ্ট হচ্ছে—এই চিন্তা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। তবুও আমি পুরোপুরি আশাহারা হইনি। কারণ আমার বিশ্বাস ছিল—যিনি আমাকে এতদিন সাহায্য করেছেন, তিনি আজও নিরাশ করবেন না।
আমি একের পর এক দোয়া করতে থাকলাম। কখনো মুখে, কখনো মনে। আল্লাহর দরবারে বারবার আরজি জানালাম—হে আল্লাহ, তুমি জানো আমার অবস্থা। তুমি চাইলে মুহূর্তেই সমাধান দিতে পারো।
একপর্যায়ে মনে মনে ভেবেই নিয়েছিলাম—সম্ভবত এবার রিপেয়ারের কাছে নিয়ে যেতেই হবে। খরচ হবে, সময় লাগবে, কাজ পিছিয়ে যাবে। তবুও অন্তরের এক কোণে অদ্ভুত এক শান্তি ছিল—আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।
একান্ত মুহূর্তে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া
আজ সকালে আমি গোসল করতে গেলাম। পানি যখন শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল, তখন যেন মনের ভেতরের ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতাও ধুয়ে যাচ্ছিল। গোসলের ফাঁকেই আবার আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম। কোনো জটিল ভাষা নয়, কোনো সাজানো বাক্য নয়—একেবারে অন্তর থেকে উঠে আসা মিনতি।
গোসল শেষে রুমে ফিরে এলাম। মনে হলো—শেষবারের মতো একবার চেষ্টা করে দেখি। অন্তরে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা অনুভব করলাম। ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে পাওয়ার বাটনে চাপ দিলাম।
আল্লাহর সাহায্য—নিঃশব্দ কিন্তু বিস্ময়কর
আলহামদুলিল্লাহ! লাইট জ্বলে উঠল। স্ক্রিনে আলো ফুটে উঠল। ল্যাপটপ অন হয়ে গেল।
সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। যেন বুকের ওপর থেকে পাহাড় সরে গেল। চোখের কোণে অজান্তেই কৃতজ্ঞতার জল জমে উঠল। আমি বুঝে গেলাম—এটা শুধু একটি যন্ত্র চালু হওয়া নয়; এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট বার্তা।
অনেকে বলতে পারে—এ তো ছোট বিষয়। একটি ল্যাপটপ অন হয়েছে মাত্র। কিন্তু ঈমানদারের চোখে ছোট-বড় বলে কিছু নেই। কারণ আমরা জানি—সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়।
এই ঘটনায় লুকিয়ে থাকা গভীর শিক্ষা
এই ছোট ঘটনাটির ভেতরে অনেক বড় বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে। প্রথম শিক্ষা হলো—তাওয়াক্কুল। আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করা। আমরা চেষ্টা করব, কিন্তু ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেব।
দ্বিতীয় শিক্ষা হলো—দোয়ার শক্তি। দোয়া কখনো বৃথা যায় না। হয় আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে কবুল করেন, নয়তো আরও ভালো কিছুর জন্য জমা রাখেন।
তৃতীয় শিক্ষা হলো—হতাশ না হওয়া। বান্দা যখন হতাশ হয়ে পড়ে, তখনই শয়তান সুযোগ নেয়। কিন্তু মুমিন জানে—আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া গুনাহ।
আল্লাহ বান্দাকে কীভাবে সাহায্য করেন
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে এমনভাবে সাহায্য করেন, যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কখনো মানুষ দিয়ে, কখনো পরিস্থিতি বদলে, আবার কখনো একেবারে অদৃশ্য উপায়ে।
এই ল্যাপটপ অন হওয়ার ঘটনাটি আমাকে আবার স্মরণ করিয়ে দিল—আমাদের শক্তি, বুদ্ধি, পরিকল্পনা—সবই সীমিত। কিন্তু আল্লাহর কুদরত অসীম।
তিনি চাইলে বন্ধ দরজা খুলে দেন। তিনি চাইলে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেন। শুধু প্রয়োজন—তার দিকে ফিরে যাওয়া।
তাওয়াক্কুল মানে বসে থাকা নয়
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। তাওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়। আমি চেষ্টা করেছি, উপায় খুঁজেছি, তারপর আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছি। এটিই হলো প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
আমরা চেষ্টা করব, পরিকল্পনা করব, পরিশ্রম করব—তারপর ফলাফল আল্লাহর উপর ছেড়ে দেব। সফলতা এলে শুকরিয়া আদায় করব, না এলে ধৈর্য ধরব।
শুকরিয়া—মুমিনের অলংকার
ল্যাপটপ অন হওয়ার পর আমার মুখে যে প্রথম শব্দটি বের হয়েছে, তা হলো—আলহামদুলিল্লাহ। এই শুকরিয়াই মুমিনের পরিচয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—তোমরা যদি শুকরিয়া আদায় কর, আমি তোমাদের নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেব।
এই ঘটনা আমাকে আবার নতুন করে শিখিয়েছে—প্রতিটি ছোট নেয়ামতের জন্যও শুকরিয়া আদায় করতে হবে।
উপসংহার: এক আল্লাহই যথেষ্ট
শেষ কথা হলো—এই দুনিয়াতে আমাদের ভরসার একমাত্র ঠিকানা আল্লাহ। মানুষ সাহায্য করতে পারে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য একমাত্র আল্লাহ।
যে আল্লাহ একটি ল্যাপটপ চালু করতে পারেন, তিনি আমাদের জীবনকেও সঠিক পথে চালাতে পারেন। শুধু দরকার—খাঁটি মন, দৃঢ় বিশ্বাস আর নিরবচ্ছিন্ন দোয়া।
Comments
Post a Comment