এক গাছের আর্তনাদ

 

এক গাছের আর্তনাদ

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা 

আমি গাছ। এইটুকুই আমার নাম, এইটুকুই আমার পরিচয়। কোনো পদবি নেই, নেই কোনো বংশমর্যাদা, নেই কোনো পরিচয়পত্র। তবুও আমি দাঁড়িয়ে আছি যুগের পর যুগ—নীরবে, অবিচল, সহিষ্ণু হয়ে।

মানুষ আমাকে দেখে, কিন্তু দেখে না। মানুষ আমাকে ব্যবহার করে, কিন্তু বোঝে না। মানুষ আমার ছায়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নেয়, কিন্তু আমার ক্লান্তির কথা একবারও ভাবে না।

আমাকে ডিল দেয়—আমি ফল দিই। আমাকে কষ্ট দেয়—আমি সুখ দিই। আমাকে কেটে ফেলে—আমি কাঠ দিই। আমাকে পোড়ায়—আমি উষ্ণতা দিই।

বলুন তো, এমন নিঃস্বার্থতা আর কোথায় আছে?

আমার শিকড় মাটির গভীরে গেঁথে থাকে। সেখানে অন্ধকার, সেখানে চাপা কষ্ট। পাথর আমাকে আঘাত করে, পোকা আমাকে কামড়ায়, পানি না পেলে আমি শুকিয়ে যাই। তবুও আমি উপরে তাকিয়ে থাকি—আকাশের দিকে। কারণ আমি বিশ্বাস করি, উপরে আলো আছে।

মানুষ ভাবে, গাছের কোনো অনুভূতি নেই। কিন্তু আমি অনুভব করি—সবচেয়ে বেশি।

যখন ছোট্ট একটি শিশু আমার ডালে দোল খায়, আমি ব্যথা পাই—তবুও হাসি। যখন প্রেমিক-প্রেমিকা আমার ছায়ায় বসে স্বপ্ন দেখে, আমি নীরবে পাহারা দিই। যখন ক্লান্ত পথিক আমার গায়ে হেলান দেয়, আমি শক্ত হয়ে দাঁড়াই—যেন সে পড়ে না যায়।

আমার পাতায় বাতাস খেললে আমি কথা বলি। আমার ডালে পাখি বসলে আমি সান্ত্বনা পাই। কিন্তু মানুষ? মানুষ আমাকে কথা বলার সুযোগই দেয় না।

একদিন মানুষ আমার কাছে আসে কোদাল হাতে। সে বলে—“এই গাছটা কাটতে হবে।” আমি প্রশ্ন করতে পারি না—কেন? আমি চিৎকার করতে পারি না—থামো! আমি শুধু তাকিয়ে থাকি—নীরবে।

প্রথম কোপটা লাগে আমার শরীরে। মানুষ ভাবে, এটা শুধু কাঠ। কিন্তু আমি জানি—এটা আমার বুক।

দ্বিতীয় কোপে আমি কেঁপে উঠি। তৃতীয় কোপে আমার পাতা ঝরে পড়ে। চতুর্থ কোপে আমার ডাল ভেঙে যায়। আর পঞ্চম কোপে—আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি।

তখনও আমি মানুষকে অভিশাপ দিই না। কারণ আমি জানি—মানুষ ভুলে যায়।

আমি ফল দিয়েছি—কিন্তু মানুষ খেয়েছে শুধু স্বাদ। আমি অক্সিজেন দিয়েছি—কিন্তু মানুষ শ্বাস নিয়েছে কৃতজ্ঞতা ছাড়া। আমি ছায়া দিয়েছি—কিন্তু মানুষ বসেছে অধিকার নিয়ে।

মানুষ বলে—“গাছ না থাকলে জীবন নেই।” কিন্তু জীবন থাকতে থাকতে গাছকে বাঁচায় না।

আমার বুক চিরে রাস্তা বানানো হয়। আমার শরীর ভেঙে ঘর বানানো হয়। আমার অস্তিত্ব মুছে দিয়ে সভ্যতা দাঁড় করানো হয়।

তারপর মানুষ বলে—“প্রকৃতি রেগে গেছে।” আমি হাসি—নীরব হাসি। কারণ প্রকৃতি রাগ করে না, মানুষ সীমা ছাড়ায়।

বৃষ্টি না হলে মানুষ অভিযোগ করে। রোদ বেশি হলে মানুষ অভিযোগ করে। ঝড় এলে মানুষ ভয় পায়।

কিন্তু কেউ প্রশ্ন করে না— গাছগুলো কোথায়?

আমি চাইনি সোনার মুকুট। আমি চাইনি রাজকীয় সম্মান। আমি শুধু চেয়েছি—বাঁচতে।

আমার স্বপ্ন খুব ছোট ছিল। আমি চাইতাম— কয়েকটা পাখি আমার ডালে বাসা বাঁধুক, কয়েকটা শিশু আমার ছায়ায় খেলুক, কয়েকটা মানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়ে আল্লাহকে স্মরণ করুক।

হ্যাঁ, আল্লাহ। আমি আল্লাহর সৃষ্টি। আমি তাঁরই আদেশে ফল দিই, ছায়া দিই, বাতাস পরিষ্কার করি।

মানুষ যখন আমার উপর বসে আল্লাহর ইবাদত করে, আমি তখন সমস্ত কষ্ট ভুলে যাই।

কিন্তু মানুষ কি জানে— আমারও কষ্ট হয়?

রোদে পুড়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকি। ঝড়ে ভেঙে পড়লেও আমি চেষ্টা করি আবার মাথা তুলতে। কারণ আমি জানি—আমার বেঁচে থাকা মানে কারো বেঁচে থাকা।

আমি গাছ। আমার আর্তনাদ নেই শব্দে, আমার কান্না নেই চোখে, আমার ব্যথা নেই রক্তে।

আমার আর্তনাদ পাতার ঝরে পড়ায়, আমার কান্না ডাল ভাঙায়, আমার ব্যথা শিকড়ের ক্ষতিতে।

মানুষ, একবার থেমে দাঁড়াও। আমার দিকে তাকাও।

আমি তোমার শত্রু নই। আমি তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী নই। আমি তোমার নীরব বন্ধু।

আমাকে বাঁচাও— আমি তোমাকে বাঁচাবো।

আমাকে কষ্ট দিও না— আমি তোমাকে সুখ দিতে চাই।

আমি গাছ। আমার নাম কেউ মনে রাখে না, কিন্তু আমার অবদান সবাই ভোগ করে।

যদি একদিন পৃথিবী নিঃশ্বাস নিতে না পারে, যদি একদিন আকাশ ভারী হয়ে যায়, যদি একদিন বাতাস বিষ হয়ে ওঠে—

সেদিন মনে পড়বে— একটা গাছ ছিল, যে কিছু চায়নি, শুধু দিয়েই গেছে।

এই ছিল আমার আর্তনাদ। শব্দহীন, কিন্তু গভীর। নীরব, কিন্তু সত্য।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি